আমার সন্ন্যাস
অংশুদেব
দরিদ্র হলেও ধর্ম চর্চার স্বাধীন পরিবেশে বড়ো হয়েছি। অন্ধভাবে মেনে নিতে শিখিনি, কেউ বলেওনি। আমাকে আমার মতো হয়ে উঠতে অনুপ্রাণিত করেছে আমার মা ও বাবা । তাঁদের অর্থ, সামর্থ্য, শিক্ষা সেই পর্যায়ে ছিল না বলেই আমার এগিয়ে যাওয়া বা প্রতিষ্ঠা এতটা পিছিয়ে। তবে ক্রমোন্নয়নে আমি বিশ্বাসী । জন্মান্তর মানে পুনর্জন্ম যাকে বলে মানি না ।আমি মনে করি আমি আমার বংশধারায় ও শিক্ষা -সংস্কার ধারায় বার বার জন্ম নেবো , যতক্ষণ না মিশন পুরণ হচ্ছে। তারপর ক্ষয় কিম্বা নতুন ধারায় বয়ে যাব ।
আজ আমার জীবনের একটা গতির গল্প বলব । আমি একটা অতিদরিদ্র, অশিক্ষিত পরিবারের সন্তান। আমার মায়ের ধরম বাবা ছিলেন এক মুসলমান। ধরম ছেলে ছিল কাওরা সম্প্রদায় ভুক্ত । বাবাও ছিলেন পূজা পার্বণ বিরোধী। অথচ হিন্দু ধর্মীয় পূজা পার্বণ যা বাড়িতে হতো, বাবা বাজারে সেরা জিনিসটা কিনতেন সামর্থ্য মতো। মাও তাই । বাবা সময় সুযোগ পেলে সব ধর্মের পবিত্র প্রতিষ্ঠান দেখাতে নিয়ে যেতেন । বলতেন, আগে মানুষকে ভালোবাসতে হবে, তারপর ধর্ম। বাবার সঙ্গে তাঁর সহকর্মী এক মুসলমানের বাড়িতে প্রথম এক থালায় খেয়ে ছিলাম এবং স্বামী বিবেকানন্দের রচনা পড়া ধরে ছিলাম।
বিধবা দিদিমা আমাদের লালন পালন করেছেন। মায়ের জ্ঞান হবার আগে তাঁর বাবা মারা যান। সেই স্বাধীনতা অর্জনের সময়কালিন দারিদ্র্য কী দুর্বিষহ ছিল, যাদের সে অভিজ্ঞতা নেই, তা বোঝানো শক্ত । আমারও হয়নি। তবে সত্তর দশকের দারিদ্র্য আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি এবং উপলব্ধি করেছি। ক্ষিদের জ্বালায় কর্মঠ মানুষদের কাঁদতে দেখেছি, কী অসহায় সেই সময় । সকল রাজনীতির ঊর্ধ্বে গিয়ে বলছি পশ্চিমবঙ্গে ( ২০২০-২৬) তৃণমূল শাসনে এবং একই সঙ্গে কেন্দ্রে বিজেপি শাসনকালে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ না- খেতে পেয়ে দিন কাটাচ্ছে, এমন দৃষ্টান্ত আজ বিরল । এই কথাটা বলার কারণ - মানুষ দারিদ্র্যে বেশি ধর্মনিষ্ঠ,না কি স্বচ্ছলতায়? এটা বুঝতে চাই। আজ আড়ম্বরপূর্ণ ধর্মাচরণে আমি কেন মন বসাতে পারছি না, আমি তথাকথিত কমিউনিস্ট বা ধর্মনিরপেক্ষ নই। চাঁদা তুলে পূজা বা মন্দির করে ধার্মিক প্রমানের পক্ষপাতী নই। আমার মনে হয় ঈশ্বর আর তীর্থ মন্দিরে নেই, তাই তীর্থে যাই না । কারো ধর্মাচরণে বিরোধীতা করি না, যতক্ষণ না আমি কষ্ট পাই। বাড়ির বিগ্রহে ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাসী নই, তবু অঞ্জলি দিই, প্রসাদ খাই, উপোস করি । আমি কি দ্বিচারী, ধান্দাবাজ?
সালটা ১৯৭৬-৭৭ হবে । পনেরো ষোলো বছরের টাটকা তাজা মন । তখন ধর্ম কি, এসব বিষয়ে কোনো জ্ঞান হয়নি বা ছিল না। তবে সবে আগ্রহ জন্মাচ্ছে। পূজা পার্বণে মন আকৃষ্ট হচ্ছে। পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে স্বাধীন ভাবে সন্ন্যাস হবো - এই সংকল্পের কথা জানাতে মা বাবার নির্বিকার, দিদিমার চিন্তা আমি কি করে পারব । কিন্তু সে বয়েস নিষেধ শোনার নয় । আমি হঠাৎ মঠযাত্রার আগের দিন দিদিমাকে বললাম, সন্ন্যাস নেবো , কি করতে হবে?
কেন , সেই জেদ ,জানি না। সন্ন্যাস হতে গেলে শিব মন্দিরে গিয়ে থাকতে হবে, মাটিতে শুতে হবে,হবিষ্যি খেতে হবে। শুধু বাবার হুকুম, বাড়ির বাইরে রাত কাটানো যাবে না । আমি বললাম, বাড়িতেই থাকব । মা নীরব , তবে অস্থির।
তবু সন্ন্যাসী হতেই হবে। দিদিমা পাশ দাবায় খড় বিছিয়ে কম্বল পেতে বিছানা করে দিলেন, দুপুরে ভবিষ্যি খেলাম গাছ তলায়। তারপর স্নান সেরে বিকেলের দিকে ব্রাহ্মণের মন্ত্র পড়ে দেওয়া পৈতে বা উত্তরী নিলাম । দিদিমা বলে দিলেন, এই কদিন প্যান্ট, গেঞ্জি ( কাপড় পরতে পারব না তাই)আর গামছা ছাড়া অন্য কিছু পড়া যাবে না। বাড়ির বা দোকানের জিনিস খাওয়া যাবে না। শিবের মাথায় জল দিয়ে তবে জল খেতে হয় । রাতেও কিছু খাওয়া যাবে না । সূর্যের আলো থাকা পর্যন্ত একবার খেতে পারবে।
আমি মনে মনে সব পারব প্রতিজ্ঞা করে উত্তরী নিয়ে মাকে প্রণাম করতে গেলাম । মা বললেন, পৈতে গলায় ঠাকুর ছাড়া আর কাউকে প্রণাম করতে নেই। এই কদিন তুই ভিন্ন হয়ে গেলি। তুই আমাদের নয়, আবার ব্রাহ্মণদের নয়। কেমন লাগে , আমাকে বলবি ।
মা কি বলতে চাইলেন, কিছু বুঝলাম না। আনন্দ পায়নি, একটা কষ্ট মত ভয় , আবার নিরব ।অন্য সময় হলে লাঠি কথা বলত ,এবারে নয় কেন !
সেই প্রথম পাশ দাবায় খড়ের ওপর একা অন্ধকারে শুলাম । সে এক অন্য অনুভূতি। আর যাই হোক মনের জোর এক ধাক্কায় অনেকখানি বেড়ে গিয়েছিল । সেটা সম্ভবত ক্লাস নাইন হবে। ওই বছর আবার পরীক্ষা ফাস্ট হয়ে টেনে উঠি। মাঝখানে দারুন অধঃপাতে নেমে গিয়েছিলাম । এই সন্ন্যাস গ্রহণের আগে কোনো লক্ষ্য পুরণ বা কোনো বড় আগামী লক্ষ্য ছিল না। হুজুগে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলা । মাত্র কটা দিন তো । এই সন্ন্যাস নিয়ে আধা কঠোর কৃচ্ছ্বতা ,একা থাকা আমার মধ্যে কিছু পরিবর্তন এনে ছিল ,এটা ঠিক। লোভ ছিল সবাই যেমন মন্দিরে পড়ে থাকে, প্রহরে প্রহরে হাঁকে,রাত দুপুরে গ্রাম ঘোরে, চুরি চামারি করে, খুব আনন্দ হবে - ওইসব করব । ওদের সঙ্গে থাকার জন্য জেদও ধরে ছিলাম । মা বলেছিলেন, সবাই যা করে,সেটা তোকে কেন করতে হবে। তুই অন্য রকম কিছু করে দেখা ।
এই কথাই আমাকে বদলে দিল। আমি তারপর থেকে ভালো মন্দে নিজস্ব পরিচিতি নিয়ে চলতে পছন্দ করি। আমি আর অন্য কারো মতো হতে পারিনি। যাইহোক, দিদিমা রাত বারোটার সময় মন্দিরে নিয়ে গিয়ে মূল সন্ন্যাসীর হাতে আমাকে দিয়ে এলেন। তখন লোকগুলো সত্যি ভালো ছিল । আমার মতো বাড়ির বাইরে না বের হওয়া আরও কয়েকজন ছিল । তিনি সারাক্ষণ আমাদের কাছে কাছে রাখতেন। ধরে ধরে সব করাতেন। তবু বাঁধা গরু ছাড়া পেয়েছে তো !
রাত একটার সময় মূল সন্ন্যাসীর নেতৃত্বে বেগমপুরের চিত্তশালী মঠের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু হলো । সে কি আনন্দ। গলা ফাটিয়ে বাবা ভোলানাথকে ডেকে যাচ্ছি। মূল সন্ন্যাসী বলে দিয়ে ছিলেন , গলা ছেড়ে বাবাকে ডাক । বাবা তোর কষ্টই বুঝতে দেবে না । ঠিক পার করে নেবে।
প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি,এটা আমার প্রথম মঠ যাত্রা নয় । এর চার পাঁচ বছর আগে দিদিমার সঙ্গে হেঁটে মঠ ও জয়রামপুরে গিয়েছিলাম । সেটাই যেন মনে গেঁথে আছে । রাতের বেলা তুলে দিদিমা জামা প্যান্ট ছাড়িয়ে গঙ্গা জল মাথায় ছিটিয়ে দিয়ে নতুন প্যান্ট গেঞ্জি পরিয়ে গলায় উত্তরী ঝুলিয়ে দিয়েছিল । সেই ছোটবেলা গভীর রাতে বাবা ভোলানাথ নাথকে ডাকতে ডাকতে মেন রোড ছেড়ে গ্রাম গঞ্জ, চাষের মাঠের ওপর দিয়ে ভয়ে ভয়ে হাঁটা ,আর বাবাকে ডাকা। কোথায় চলেছি কোনো ঠিক নেই । একটা ছোট দলে যাত্রা শুরু করে বিশাল বড় দলে মিশে যাওয়া অন্য এক অনুভূতি। সকালের আলো ফোটার আগেই বাবার পুকুরে স্নান সেরে মাথায় জল ঢালতে যাওয়া । ছোট বলেই দিদিমা মন্দিরের এক পাশে দাঁড় করিয়ে পুজো দিতে যেতেন । কি ভয় , যদি হারিয়ে যাই! জয়রামপুরেও ওই ছোটবেলা সোনারপুর ও বারুইপুর থানার বর্ডার থেকে হেঁটে আমতলা , তারপরও প্রায় দেড় ,দু মাইল দূরে জয়রামপুরে গিয়েছিলাম । সেই যাত্রার কথাও মনে আছে। বিকেল বেলা বেরিয়ে আগ্না , মল্লিকপুর ফুঁড়ে বারুইপুরের পদ্মপুকুরে ওঠা । ওখান থেকে জোড়ামন্দিরের শ্মশান থেকে জল নিয়ে শিবের মাথায় ঢেলে আবার যাত্রা শুরু। সে এক অন্য আনন্দ । ঝিনকির পোল পার হবার পর আমতলার আকাশে লাল সিগন্যাল আলো। সেই দেখে হেঁটে যাওয়া । একবার কাছাকাছি হয় ,অন্যবার দূরে। আর হাঁটতে পারছি না, দিদিমা বলতেন, বাবাকে ডাক , বাবাকে ডাক। এই তো এসে গেছি ভাই । এই তো।
লাল আলোর আশা নিরাশা। আমতলার কাছাকাছি হতে যে কষ্ট, আমতলা থেকে জয়রামপুর পর্যন্ত ততখানি কষ্ট হয় না । কি একটা আলাদা শক্তি আমি ছোটবেলায় পেয়েছিলাম। নাইনে পড়ার বছরেও পেয়েছিলাম । তবে দিদিমার সঙ্গে প্রথম যাওয়াটা মনের মধ্যে আজো গেঁথে আছে। নাইনে পড়ার বছরে মঠে যেতে গিয়ে আনন্দ হয়েছিল । শসার ক্ষেতে শুয়ে গড়াগড়ি দিয়ে শসা চুরি । শসা বলে করলা তুলে খাওয়া এইসব। সেই এ্যাডভেঞ্চার হয়নি । তখন অনেক বড় আমি। রাতে পাঁকগোলা পুকুরে সাঁতার কেটে বাবার মাথায় জল দেবার লাইনে দাঁড়িয়ে ঠেলাঠেলি । ওইটুকু মনে আছে ।আর মনে আছে, হোঁচট খেয়ে পা কেটে যাওয়ার কথা। মূল সন্ন্যাসী ওই রাতের অন্ধকারে কি এক পাতা ছিঁড়ে এনে রগড়ে রস দিয়ে কাটা ধুয়ে দিলেন। তারপর সেই লতাপাতা দিয়ে বেঁধে বললেন , বাবাকে ডাক । কোনো ব্যথাই লাগবে না।
সত্যি ব্যথা সেদিন বা পরের দিন জয়রামপুর যাত্রায় পাইনি । তবে তারপরের দিন টের পেয়ে ছিলাম । মা কাপড় ছেড়ে গরম জল করে পায়ে সেঁক দিয়েছিলেন, ড্রেসিংও করে দিয়েছিলেন । প্রায় বারো চোদ্দ মাইল হাঁটা ওই বয়সে কম কথা নয় । পায়ের তলায় ফোস্কা পড়ে গিয়েছিল । দ্বিতীয় বার জয়রামপুর যাত্রায়ও আগের মতো আনন্দ পাইনি । অপেক্ষাকৃত বড় ছেলেদের সঙ্গে মিশে মেলায় কদমা চুরি, মেয়েদের পিছনে লাগা , আজেবাজে কথা শোনা ওই মেলায় প্রথম । ওদের সঙ্গে ভিড়ে মেলায় পেটাই পরটাও খেয়েছি। বাইরের জিনিস খেতে নেই শুনে যাওয়া। কিন্তু মূল সন্ন্যাসী বললেন, বাবার কাছে এসে সব খেতে পারিস । আমি বলছি, তুই খা ,কিচ্ছু হবে না।
সেদিন অনেক বেলা করে বাড়ি ফিরে ছিলাম। মা কিছু বলেন নি । কিন্তু সেই অদ্ভুত ভাবে চেয়েছিলেন। ওই দৃষ্টির সামনে আমি কোনদিন মিথ্যা বলতে পারিনি। মা ওই সময় আমাকে কিছু বলেন নি। তবে নীল ষষ্ঠীর দিন পুজো দিতে গিয়ে আমার নতুন বন্ধুদের দেখে ধরে ফেলেছিলেন । বাড়িতে এসেও কিছু বলেননি । আমি জানতাম ,মা ধরতে পেরেছে যখন জিজ্ঞেস করবেই। অন্য সময় হলে , নারকেল গামড়া ( পাতার শক্ত অংশ চেলা করা খণ্ড) বরাদ্দ ছিল । সন্ন্যাস হওয়ায় পিটুনিটা হলো না বোধহয়।আরে বলবি বল মায়ের সামনেই , এই সিতু তোকে কদমা দিয়েছিল ? শালা দারুন মাল মাইরি । অত বড় কদমা ,বল ?
মা তখন কিছু বলেননি, বাড়ি ফিরেও কিছু বলেননি । তবে জিজ্ঞেস করবেই। বরং ওইদিন বাড়িতে সুজির বরফি, নারকেল দিয়ে কুমড়োর ছক্কা আর পরটা হয়েছিল। আমার প্রিয় খাবার। মা সেটা ভালো মতো জানতেন। আমাদের বাড়ি রোজ রোজ ভালো কিছু হতো না । সামর্থ্য ছিল না । এইদিন,আর দুর্গাপূজার অষ্টমীর দিন লুচি কিম্বা পরটা সঙ্গে ভালো কিছু হয় ।এই দুদিন বাড়িতে ভাত হতো না। তৈরি থেকে আমার রান্না ঘরে আনাগোনা বেড়ে গেল । অন্যদিন হলে দু তিন বার আমার চাঁকা ( টেষ্ট করা ) হয়ে যেত । দুপুরে সকলকে দিয়ে মা খেতে পারছেন না। আমাকে ওইদিন ফল খেয়ে থাকতে হবে। দিদিমা ফল কেটে দিয়েছিলেন। খেয়ে সন্তুষ্ট হলাম না। সবাই খেয়ে শুয়ে পড়লে মা পাশ দাবায় এসে ডেকে তুললেন, ঘুমলি?
না মা , বলো ?
'আয় 'বলে ডেকে নিয়ে গেল রান্না ঘরে। সেখান থেকে একটা থালায় খাদ্য খাবার নিয়ে বাগানে গেলেন। কলা পাতা কেটে এনে বললেন, বস । বাইরে খেলে দোষ হয় না।
দিদিমা যে বলল হবিষ্যি আর ফল ছাড়া খেতে নেই !
আমি তোর মা বলছি ,তাতে হবে না ?
তা নয় , যদি কিছু হয় !
কিছু হবে না,তুই খা তো । বলে কলা পাতায় দুটো পরটা, সুজির বরফি আর কুমড়োর ছক্কা তুলে দিলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, তুমি খাবে না?
এই তো, তোর খাওয়া হয়ে গেলে, এইখানে খেয়ে নেবো ।
আমি খাচ্ছি মা হাসতে হাসতে বললেন, তোর আর সন্ন্যাস নেওয়া হলো না। আমি ভেঙে দিলুম ।
মানে !
এই গাজন সন্ন্যাস তো শেষ হলো না ! কোনো সন্ন্যাস ও হবে না।
মা তুমি -
দুর , খেলে কি হয়েছে। তোরা জয়রামপুরে কি সব করেছিস ভাব । ওসব কে কি সন্ন্যাস বলে ?
তাই তো ! তখনো এগরোল, চাউমিন না আসলেও ডিমেরকারী, ঘুগনি,আলুকষা তো সবাই চুটিয়ে খেয়েছে। আমি তাহলে পরটা খেয়ে কি দোষ করলাম ? মা কি কদমা চুরির কথা বললেন? না ,মা তো আমার সঙ্গে বসে খেতে খেতে বললেন, খাদ্য খাবারে, পোষাক আশাকে, টিকি দাড়িতে কি ধর্ম আছে ? ধর্ম তোর ভেতরে, তাকে জানতে চেষ্টা করতে হবে । পড়তে হবে, অনেক পড়া । হ্যাঁ,না সব জেনে তোকে ঠিক করতে হবে । এ জিনিস, কারো কথায় হয় না।
তারপর মা কেমন উদাস হয়ে গেলেন। বললেন, নিমাই সন্ন্যাস নিয়ে চলে গেলে মা কেমন কেঁদে ছিল,বল ?তোকেও নিয়ে আমার ভয় , তোর ওঝা দাদু ( মুসলমান ফকির)বলেছিল - তোকে সংসারে বাঁধা যাবে না। কোথায় যাবি ? নিজের মধ্যে খুঁজে দেখ ,সব পাবি । সংসারে সব পাবি । তুই সংসার- সন্ন্যাসী হয়ে থাকবি।
সেদিন যিনি আমার ঘুম ভাঙিয়ে দিলেন, তিনি আমার মা ,না অন্য কেউ ?জানি না। আমি সেই নাইনের সন্ন্যাসের শেষ দিকে কেমন হতাশ হয়ে পড়লাম। যারা সন্ন্যাস হয়েছিল,তারা নীল ষষ্ঠীর আগের রাতে গাছে গাছে ফল চুরি করেছে এমনভাবে, যে আশপাশের লোকজন অসন্তুষ্ট। আমি ছিলাম না। কিন্তু রাতে আমাকে ডাকতে এসেছিল। মঠে ও জয়রামপুরে গিয়ে যা করেছে, যে সব কথা আলোচনা করতে করতে গেছে তা ধর্মীয় কথা নয় , কোথায় মনের শুদ্ধতা? একজন যাত্রীকে দেখলাম না নিজেকে অতিক্রম করে উদার সৎ ধার্মিক হয়ে উঠেছে । তীর্থস্থানে যদি এত আমার আমার টানাটানি, কাড়াকাড়ি - আর কোথায় বা ধর্ম পাবো । মায়ের কথায় কি ছিল জানি না। একা পাশ দাবায় শুয়ে সেই সব ভেবেছি। বার বার জিজ্ঞেস করেছি,আমার মধ্যে ধর্ম ! সেটা কি ? তাহলে কি ঈশ্বর আমার মধ্যে?
গাজন সন্ন্যাসের শেষ দিনে সারাদিন না খেয়ে থাকতে হয় । বিকেলে মূল সন্ন্যাস ঠাকুর বিসর্জন পুকুরের পাশে বিশাল খেঁজুরগাছের মাথার ওপর উঠে মাতির পাতা নিয়ে নেমে আসার পর গ্রাম পরিক্রমা। শেষে মন্দিরে হবে আগুন ঝাঁপ,কাঁটা ঝাঁপ, ত্রিশূল ঝাঁপ । গ্রামের সব লোক দেখতে আসে। অত ওপর থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ার সময় ভয় লাগেনি। কী নির্ভীক। মনেই হয়নি সারাদিন কিছু খাইনি। এরপর সন্ন্যাস -ভোজ । ঠাকুরের নামে জমি যারা ভোগ করে,তারাই সন্ন্যাস - ভোজ দেয়। কেউ দেয় ফলার, কেউ মাংস ভাত খাওয়ায়। এই খাওয়ানো নিয়ে প্রায় বছর রাগারাগি ঝগড়া হতো। সেবারে সন্ন্যাস-ভোজে মাংস ভাত খাওয়ানো হলো । যারা খাওয়ালো,তারা ভালো লোক নয় । রাতদিন নিজেদের বাড়ি, নয়তো বাইরে কারো সঙ্গে ঝগড়া করে, গালাগাল দেয়। তাই আমি খেতে যাই নি । মাংস তখন বছরে দুই তিন বার হতো। লোভ হলেও কেন যেতে পারিনি , জানি না । তবে ঠিক ওইদিন আমিষ খেতে ইচ্ছে করেনি । দিদিমা বলেছিল, পয়লা বোশেখের স্নান সেরে আঁশ দিয়ে বছর শুরু করতে হয় । যাইহোক মায়ের কাছে গিয়ে বললাম, আমাকে জলভাত দাও। আমি ওখানে খেতে যেতে পারব না।
মা সঙ্গে সঙ্গে জলভাত বেড়ে দিলেন ।পাতিলেবু আর বাতাসা দিয়ে সেই ভাত অমৃত মনে হলো। আমি খাচ্ছি, মা জিজ্ঞেস করলেন, কেন কদমা চুরি করতে যাবি না। ?
আমি ভয় পেয়ে বললাম, না মা বিশ্বাস করো ।আমি করিনি,ওসব খাইনি।
আমারও তাই মনে হলো আজ। তুই খেয়ে নে , আজ মেলায় যেন যাত্রা দেখিসনি। ভালো করে ঘুমোস।
সেই আমার শেষ সন্ন্যাস,চিরকালিন সন্ন্যাস হয়ে গেল । সকলের সঙ্গে মিশি, কিন্তু বন্ধু হয়ে উঠতে পারি না। অনেক বার পথের পরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে দূরে দূরে কাউকে না বলে চলে গেছি। ফিরে এসে মায়ের হাতে মার খেয়েছি। আমি জানি, আমার সেই বিবাগী আচরণ মায়ের অসুস্থ হয়ে পড়ার কারণ। আমি বেশিদিন ঘরের মধ্যে স্থির থাকতে পারি না। সকলের সঙ্গে থাকলেও একা । আমি অনেক কিছু শুরু করি দ্বিধা দ্বন্দ্বে শেষ করে উঠতে পারি না। ধর্ম নিয়ে আবেগ নেই, বিরোধিতা নেই। আমি মনে প্রাণে হিন্দু , আমার মা হিন্দু। মা বলেছিলেন, ধর্ম ত্যাগ করা সহজ নয়। চোদ্দ পুরুষ লাগে রক্তের টান ভুলতে। আমিও তাই বিশ্বাস করি। আমার মা ক্লাস ফোর পাশও ছিলেন না।
...........................
অংশুদেব, চম্পাহাটি,বারুইপুর,দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা,পিন ৭৪৩৩৩০।

Comments
Post a Comment