হালখাতা
চন্দ্রমা মুখার্জী
নববর্ষ – এই একটা শব্দ শুনলেই আমাদের মনে চলে আসে পয়লা বৈশাখ আর তাকে নিয়ে ছোটবেলার একরাশ স্মৃতি। পয়লা বৈশাখকে যখন ১লা বৈশাখ লেখা হয়, আমরা মজা করে বলি যে, বৈশাখ একলা এসেছে। আবার এই পয়লা বৈশাখেই বাঙালি ব্যবসায়ীরা তাদের দোকানে লক্ষ্মী – গণেশের পুজো করে। সারাদিন যেন বাঙালির উৎসব চলে। বাড়িতে – বাড়িতে পঞ্চব্যঞ্জন সহযোগে খাঁটি বাঙালি কায়দায় ভুরিভোজ, আর দোকানে – দোকানে হয় হালখাতা উৎসব।
ছোটবেলায় নতুন জামা পরে বাবার সাথে দোকানে হালখাতা করতে যাওয়ার আলাদা আনন্দ ছিল। দোকানে গেলেই ঠাণ্ডা শরবত দেওয়া হতো। আর বাড়ি ফেরা হতো বাক্সভর্তি মিষ্টি আর ক্যালেন্ডার নিয়ে। কতগুলো ক্যালেন্ডার হল, কোনটায় কোন ঠাকুরের ছবি আর বাক্স থেকে কে কোন মিষ্টি খাবে তাই নিয়ে ছোটদের মধ্যে উৎসাহের সীমা থাকতো না।
এইরকম পয়লা বৈশাখের আনন্দের গল্প একবার এক অবাঙালি বন্ধুকে করেছিলাম। হালখাতার কথা শুনে সে জিজ্ঞাসা করেছিল – হালখাতা কেন বলে? লালখাতা কেন নয়? কারণ হালখাতা আমরা সর্বদাই লালরঙের হতে দেখেছি। তাহলে আসা যাক হালখাতার কথায়।
প্রাচীনকালে জমিদাররা খাজনা আদায়ের যে খাতা রাখতেন, সেটি লাল শালুতে মোড়া থাকতো। এছাড়াও পুঁথিও লাল শালুতে মোড়া হতো। আবার লাল রঙ বাঙালি হিন্দুদের কাছে শুভ হিসেবে বিবেচিত হয়। তাই তো বিয়ের কনেও লাল বস্ত্র পরিধান করে। সে যাইহোক, লাল কাপড়ে মোড়া খাজনা আদায়ের খাতাই হালখাতা হয়ে দাঁড়ায়।
মোঘল সম্রাট আকবর প্রথম হালখাতার প্রচলন করেন বলে মনে করা হয়। প্রতি বঙ্গাব্দের সূচনায় এই খাতায় খাজনা আদায় শুরু হতো। বর্তমান নববর্ষেও ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসার অর্থবর্ষ শুরু করে। তাই লক্ষ্মী – গণেশের পুজো করে নতুন হালখাতা করে। পুরনো প্রাপ্য এইদিন খরিদ্দারদের থেকে বুঝে নেয় ব্যবসায়ীরা।
কিন্তু আবারো সেই পুরনো প্রশ্নে ফিরে আসি হালখাতা কেন? হাল কি? হাল একটি ফারসী শব্দ, যার অর্থ নতুন। হালখাতার আচারটি কিন্তু প্রথম বাঙালি মুসলমানদের দ্বারা শুরু হয়। এলাহি ভরসা লিখে হালখাতা শুরু হতো। পরবর্তীতে হিন্দু ব্যবসায়ীরা হালখাতা উৎসব শুরু করে। তবে তারা লক্ষ্মী – গণেশের পুজো করে হালখাতা শুরু করে। খাতায় সিঁদুর – চন্দন দিয়ে স্বস্তিকচিহ্ন এঁকে কাজ শুরু হয়।
তবে বর্তমানের প্রযুক্তিগত উন্নতির ফলে সবাই ধীরে ধীরে হালখাতার ব্যবহার কমিয়ে দিচ্ছে। সবকিছুই এখন গণকযন্ত্র করে দেয়। তাই হিসাব রাখতে আর হালখাতার প্রয়োজন হচ্ছে না। তাই আগের মতো হালখাতা উৎসবের মাধ্যমে সৌহার্দ্য বিনিময়ও কমে যাচ্ছে। হয়তো পরবর্তীতে চিরতরে হালখাতা উৎসব বন্ধ হয়ে যাবে। রয়ে যাবে শুধুই পয়লা বৈশাখের সাজগোজ আর খাওয়াদাওয়া। প্রকৃত অর্থেই তা হয়ে উঠবে ১লা বৈশাখ।
================
চন্দ্রমা মুখার্জী
বি সি ৮৩, সমরপল্লী, কৃষ্ণপুর, কলকাতা ৭০০১০২

Comments
Post a Comment