মাটি, বঁড়শি ও রক্তের আখ্যান
দিব্যেন্দু ঘোষ
বাঁকুড়ার একেবারে শেষ প্রান্তের গ্রাম খয়েরবনি। চৈত্রের দুপুরে গ্রামটাকে দেখলে মনে হয় যেন কোনও রাক্ষস তার সর্বস্ব শুষে নিয়ে ছিবড়ে করে ফেলে রেখে গেছে। মাঠের পর মাঠ ফুটিফাটা, ধানের গোলাগুলো খাঁ খাঁ করছে। গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সরু নদীটা কবেই শুকিয়ে কাঠ, সেখানে এখন শুধু বালি আর নুড়িপাথরের কঙ্কাল। এই প্রবল খরা আর খিদের জ্বালা, এ দুইয়ের সঙ্গেই খয়েরবনি গ্রামের মানুষের নাড়ির টান। এখানে জীবন মানে প্রতিদিনের ক্লান্তিহীন যুদ্ধ, যেখানে জেতার কোনও আশা নেই, শুধু টিকে থাকাটাই একমাত্র লক্ষ্য।
গ্রামের একেবারে শেষ মাথায় বুড়ো শিবতলার প্রাচীন নাটমন্দির। সেটারও ভগ্নদশা, পলেস্তারা খসে গিয়ে ভিতরের নগ্ন ইটগুলো বেরিয়ে পড়েছে। নাটমন্দিরের এক কোণে বসেছিল রতন। ওর বয়স পঁচিশ কি ছাব্বিশ হবে, কিন্তু অভাব আর রোদের তাপে চামড়া পুড়ে গিয়ে ওকে আরও অন্তত দশ বছরের বড় দেখায়। পরনে শতচ্ছিন্ন ফতুয়া, চোখের নীচে গভীর কালি, বুকের পাঁজরগুলো গোনা যায়। আর মাত্র দু'দিন পরেই গাজন। গ্রামের প্রাচীন নিয়ম অনুযায়ী, রতন এবার শিবের মূল সন্ন্যাসী বা ভক্তা। সারা চৈত্র মাস ধরে একবেলা খেয়ে, শিবের মাথায় জল ঢালা, বাড়ি বাড়ি ঘুরে চাল ভিক্ষে করা, আর শেষে চড়ক সংক্রান্তির দিন পিঠে লোহার বঁড়শি গেঁথে শূন্যে ঘোরা, সবই তাকে করতে হবে। কিন্তু রতন এ সব পুণ্য বা ভক্তির জন্য করে না। ওর শরীরে ভক্তি নেই, পেটে দাউদাউ করে জ্বলছে খিদের আগুন। এই চরম কষ্ট সহ্য করতে ও রাজি হয়েছে স্রেফ টাকার জন্য। গ্রামের একচ্ছত্র অধিপতি, সুদখোর মহাজন সদানন্দ চৌধুরী কথা দিয়েছে, এবার চড়কগাছে সবচেয়ে বেশি সময় পাক খেলে এবং দর্শকদের সবচেয়ে বেশি আমোদ দিতে পারলে তাকে পাঁচ হাজার টাকা ইনাম দেওয়া হবে। পাঁচ হাজার টাকা তো রতনের কাছে স্বর্গের চাবিকাঠি। গৌরীকে কিনে আনার দাম। গৌরী। সদানন্দর বাড়ির বাঁধা দিনমজুর পরাণ দাসের একমাত্র মেয়ে। ভরা যৌবন, শরীরে যেন এই রুক্ষ রাঢ় মাটিরই বুনো, আদিম গন্ধ। পরাণ দাস বছর দুয়েক আগে খরায় ফসল নষ্ট হওয়ার পর সদানন্দের কাছ থেকে মেয়ের বিয়ের নাম করে হাজার তিনেক টাকা ধার নিয়েছিল। অভাবের তাড়নায় সেই টাকা আর শোধ করতে পারেনি। সুদে-আসলে সেই তিন হাজার টাকা এখন দশ হাজার ছুঁয়েছে। সদানন্দ চৌধুরী গ্রামের মাতব্বর, তার কথার ওপর কথা বলার সাহস এই তল্লাটে কারও নেই। সে ফতোয়া দিয়েছে, আগামী বৈশাখের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে টাকা শোধ না হলে পরাণ দাসকে ভিটে ছাড়তে হবে এবং গৌরীকে সে সদানন্দর বাড়িতে কাজের মেয়ে হিসেবে রেখে দেবে। খয়েরবনি গ্রামের সবাই জানে, সদানন্দর বাড়িতে যুবতী মেয়ের কাজ করার আসল অর্থ কী। গৌরীকে সে নিজের রক্ষিতা করে রাখবে।
-কী রে, পিঠের চামড়া শক্ত করছিস?
পিছন ফিরে তাকাল রতন। কড়া রোদের পটভূমিতে গৌরী দাঁড়িয়ে আছে। পরনে বিবর্ণ, তালি-মারা সুতির শাড়ি, ঘামে লেপ্টে আছে শরীরের সঙ্গে। ওর চোখে একটা অদ্ভুত ক্লান্তি, অথচ ঠোঁটের কোণে বাঁকা, তিক্ত হাসি।
-শক্ত আর কী করব। এমনিতে খিদের জ্বালায় চামড়া হাড়ের সঙ্গে সেঁটে আছে।
রতন শুকনো হাসল। গৌরী এগিয়ে এসে রতনের পাশে বসল। নাটমন্দিরের এই নির্জন কোণটায় ওদের লুকিয়ে দেখা হয়। গ্রামের আর পাঁচজনের মতো ওদের প্রেমে কোনও আদিখ্যেতা নেই, কোনও রোমান্টিক স্বপ্ন নেই। ওদের প্রেম হল একসঙ্গে না খেতে পাওয়ার প্রেম, একসঙ্গে ধুঁকে ধুঁকে বাঁচার প্রেম। গৌরী রতনের হাতটা নিজের কোলের ওপর টেনে নিল। ওর আঙুলগুলো রুক্ষ, কাজ করতে করতে কড়া পড়ে গেছে, কিন্তু ছোঁয়াটা রতনের কাছে জিয়নকাঠির মতো।
-তুই পারবি তো রতন? সদানন্দ কিন্তু মানুষ নয়, জানোয়ার। ও চায় তুই চড়কগাছ থেকে ছিটকে পড়ে মরিস। তাহলে আমাকে আটকে রাখতে ওর আর বাধা থাকবে না। ও তোকে টাকা দেবে বলে মনে হয় তোর?
গৌরীর গলায় হতাশা আর ভয় স্পষ্ট। রতন গৌরীর চোখের দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে শুধু ভয় নয়, জ্বলজ্বল করছে আদিম খিদে, যে কোনও মূল্যে বেঁচে থাকার খিদে। রতন গৌরীর ঘামে ভেজা গলার কাছে মুখ নামাল। ফিসফিস করে বলল,
-আমি মরব না গৌরী। তোর শরীরের ওই গন্ধটা আমাকে মরেও বাঁচিয়ে আনবে। পাঁচ হাজার টাকা আমি আদায় করবই। বাকিটা তুই তোর বাপের জমানো খুঁদকুঁড়ো, বাসনপত্র বেচে জোগাড় করবি। টাকাটা সদানন্দের মুখের ওপর ছুড়ে দিয়ে আমরা পালাব। বর্ধমান বা দুর্গাপুরের দিকে চলে যাব, ওখানে কারখানায় কাজ জুটবে ঠিক।
গৌরী রতনকে দু'হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। সূর্যটা মাথার ওপর গনগন করছে। সেও বোধহয় রতনদের মতোই চির-ক্ষুধার্ত, না হলে ওই হলকা চিরকাল কেন পাঠায় পৃথিবীতে? সবকিছু শুষে নিতে চায় কেন? দুপুরেই বোধহয় ওর খিদেটা বাড়ে, না হলে সারা দিনের মধ্যে এই সময়টাতেই কেন এত তেতে ওঠে ধরা? তবে তপ্ত দুপুর হোক, দেবতার মন্দিরের ঠান্ডা ছায়া তো আছে। সেই ছায়ায় দুটো প্রান্তিক মানুষের শরীর মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। চরম হতাশা থেকে জন্ম নেওয়া বন্য যৌনতা খেলা করে বেড়াচ্ছে, যেখানে দুজনেই একে অপরের শরীর থেকে শুষে নিতে চাইছে বেঁচে থাকার শেষ রসদটুকু। ঠিক সূর্যের মতো। ওরা জানে না কাল ওদের ভাগ্যে কী আছে, তাই আজকের এই মুহূর্তটুকু ওরা পাগলের মতো আঁকড়ে ধরতে থাকে।
গাজনের উৎসব পুরোদমে শুরু হয়ে গেছে। চারদিকে ঢাকের গুরুগম্ভীর আওয়াজ, কাঁসরের তীক্ষ্ণ শব্দ আর ধুনোর গন্ধে বাতাস ভারী। রতনদের উপবাস চলছে। সারাদিন রোদে পুড়ে টো টো করে ঘুরে ভিক্ষে করা আর রাতে শিবের সামনে বসে নামগান করা। আজ নীল পুজোর রাত। আজ 'মড়া খেলা' বা কালিকা পাতারি নাচ। গ্রামের পিছনের পুরনো শ্মশান থেকে মানুষের মাথার খুলি আর হাড়গোড় এনে ঘোর অন্ধকারে মশাল জ্বালিয়ে সে এক বীভৎস, উদ্দাম নৃত্য শুরু হয়েছে। রতনদের মুখে কালি মাখা, গায়ে ছাই। সারাদিনের উপোস আর ক্লান্তি কাটানোর জন্য ওরা আকণ্ঠ তাড়ি গিলেছে। তাড়ির নেশায় চোখগুলো জবা ফুলের মতো লাল। এই ভক্তি আসলে ভক্তি নয়, এই নেশাই ওদের চাবুক মারা শরীরের ব্যথা, খিদের জ্বালা আর ভবিষ্যতের ভয়কে ভুলিয়ে রাখে। নাচের ফাঁকে, মশালের আলো-আঁধারিতে রতন হঠাৎ দেখল, ভিড় থেকে একটু দূরে অন্ধকারে বিশাল শিমুল গাছটার আড়ালে গৌরী দাঁড়িয়ে আছে। রতন চুপিচুপি ভিড় থেকে সরে গেল। টলমল পায়ে সে গৌরীর সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
-কী হয়েছে? এত রাতে তুই এখানে?
রতন হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞেস করল। ওর মুখ থেকে তাড়ির গন্ধ বেরোচ্ছে। ভক করে নাকে এসে লাগছে গৌরীর। ওর চোখ দুটো আজ অস্বাভাবিক শান্ত, যেন কোনও গভীর দিঘির কালো জল। সে এদিক-ওদিক একবার দেখে নিয়ে রতনের হাতের মধ্যে একটা ছোট, ধারালো ক্ষুর গুঁজে দিল।
-এটা কী?
রতন অবাক হয়ে ক্ষুরটার দিকে তাকাল। চাঁদের আলোয় ব্লেডটা চকচক করে উঠল।
-কাল চড়ক। সদানন্দর লোকেরা তোকে বঁড়শি গাঁথবে। আমি আজ বিকেলে সদানন্দর বাড়ির পিছনের দাওয়ায় লুকিয়ে ওদের কথা শুনেছি। ওরা বঁড়শিটা এমনভাবে গাঁথবে যাতে তুই শূন্যে ঘোরার সময় তোর পিঠের মাংস ছিঁড়ে তুই নীচে পড়ে যাস। গাছটা অনেক উঁচু, আর নীচে ইট-পাথর ছড়ানো। তোর মৃত্যু নিশ্চিত।
গৌরীর গলা বরফের মতো ঠান্ডা, আবেগের লেশমাত্র নেই। রতনের বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল। নেশাটা যেন এক লহমায় ছুটে গেল।
-তাহলে? আমি কি কাল চড়কে উঠব না? কিন্তু টাকাটা না পেলে তোকে যে ও...
-তুই উঠবি,
গৌরী রতনের ঠোঁটে আঙুল রাখল।
-কিন্তু তুই ঘুরবি না। যখন তোকে বঁড়শি গেঁথে শূন্যে তোলা হবে, তুই আমার দিকে তাকাবি। আমি ভিড়ের মধ্যে একেবারে সামনের দিকে থাকব। আমার মাথায় একটা লাল শালু জড়ানো থাকবে। আমি যখন শালুটা মাথা থেকে নামাব, ঠিক সেই মুহূর্তে তুই এই ক্ষুরটা দিয়ে নিজের পিঠের চামড়া নিজেই কেটে ফেলবি!
-কী বলছিস তুই, পাগল হয়েছিস! আমি এত উঁচু থেকে পড়ব, আমার হাড়গোড় সব গুঁড়ো হয়ে যাবে। আমি তো মরেই যাব।
রতন শিউরে উঠল।
-তুই পড়বি ভিড়ের ওপর। নীচে হাজার হাজার মানুষ থাকবে। কিছু মানুষ জখম হবে, তুইও খুব ব্যথা পাবি। কিন্তু তুই মরবি না। আর ঠিক ওই সময়টায় এমন একটা কিছু ঘটবে, যা এই গ্রামের কেউ কোনওদিন ভাবেনি। তুই শুধু আমার ওপর ভরসা রাখ রতন। তুই যদি আমাকে চাস, যদি আমাদের এই নরক থেকে বের হতে চাস, কাল এইটুকু কষ্ট তোকে করতেই হবে।
গৌরী আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। অন্ধকারের মধ্যে শিমুল গাছের ছায়ায় মিলিয়ে গেল। রতন বোকার মতো ক্ষুরটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর সেটা সযত্নে কোমরের কাছে ধুতির গিঁটের আড়ালে লুকিয়ে রাখল। ওর শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। গৌরী কী ছক কষছে? ভাবতে থাকে রতন। গৌরী ওকে খুব ভালবাসে, জীবন পর্যন্ত দিতে পারে, জানে সে, তাই ওর ওপর অগাধ আস্থা।
চৈত্র সংক্রান্তির বিকেল। গ্রামের খোলা মাঠে চড়কের মেলা বসেছে। মেলা মাঠে তিল ধারণের জায়গা নেই। জিলিপি, পাঁপড় ভাজা আর মাটির পুতুলের দোকানের মাঝখানে মাথা উঁচু করে দম্ভের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল চড়ক গাছটা। নীচে হাজার হাজার মানুষের ভিড়। শুধু খয়েরবনি নয়, আশপাশের পাঁচটা গ্রাম থেকে মানুষ ভেঙে পড়েছে রোমহর্ষক খেলা দেখার জন্য। সদানন্দ চৌধুরী একটা দামি কাঠের চেয়ারে বসে পান চিবোচ্ছে। তার দু'পাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে তার সাগরেদরা। সদানন্দর চোখে নিষ্ঠুর, পৈশাচিক উল্লাস। সে আজ একটা গরিবের ছেলের মৃত্যু দেখবে, আর তার বিনিময়ে এক যুবতী মেয়েকে ভোগ করবে। রতনকে আনা হল। সে উপবাসে, নেশায় আর অজানা ভয়ে রীতিমতো টলছে। সদানন্দর চারজন তাগড়াই লোক রতনকে ধরে উপুড় করে শুইয়ে দিল। রতনের পিঠের চামড়া টেনে ধরল। চকচকে দুটো বিশাল লোহার বঁড়শি। কোনও মন্ত্র নেই, কোনও দৈব শক্তি নেই, রক্তমাংসের শরীরে ঠান্ডা, ভোঁতা লোহা ঢুকে যাওয়ার নারকীয় যন্ত্রণা। রতনের মুখ থেকে জান্তব আর্তনাদ বেরিয়ে এল, যা অগণিত ঢাকের কানফাটানো আওয়াজে তলিয়ে গেল। রক্তে ভেসে যাচ্ছে রতনের পিঠ। তাকে মোটা কাছি দিয়ে বেঁধে চড়ক গাছের মাথায় ঝুলিয়ে দিল সদানন্দর সাগরেদরা। নীচ থেকে লোক লাগিয়ে চড়ক গাছ ঘোরাতে শুরু করল। বনবন করে ঘুরছে রতন। শূন্যে ঝুলতে ঝুলতে রতনের মনে হল ওর পিঠের চামড়া কেউ যেন সাঁড়াশি দিয়ে ছিঁড়ে নিচ্ছে। চারপাশের দুনিয়াটা ঘুরছে। কোথাও কোনও ভক্তি নেই, একটা গরিব মানুষের অসহায়তার যন্ত্রণা গোটা খয়েরবনি গ্রামকে ফালাফালা করে দিচ্ছে। ঘুরতে ঘুরতেই হঠাৎ রতনের চোখ পড়ল ভিড়ের একেবারে প্রান্তে। একটা লাল শালু। গৌরী! সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে রতনের দিকে। ঠিক সেই মুহূর্তে, গৌরী তার মাথার লাল শালুটা খসিয়ে দিল। রতনের মনে পড়ে গেল সেই ক্ষুরের কথা। সে জানে না এর পরিণতি কী, কিন্তু গৌরীর প্রতি অন্ধ প্রেম আর বেঁচে থাকার মরিয়া তাগিদ তাকে চালিত করল। সে অতি কষ্টে নিজের শরীরটাকে একটু বাঁকিয়ে, হাত ঘুরিয়ে নিজের ধুতির খুঁটের ভেতর থেকে ক্ষুরটা বের করল। দড়ির প্রবল টানে বঁড়শি এমনিতেই চামড়া ছিঁড়ে বেরিয়ে আসার উপক্রম করছিল, রতন ক্ষুরটা দিয়ে নিজের পিঠের সেই টান-ধরা মাংসে একটা শক্ত পোঁচ বসাল। পরমুহূর্তেই এক ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখল গ্রামবাসীরা। চড়কগাছ থেকে ছিটকে, রক্তে ভেসে যাওয়া একটা শরীর সোজা এসে পড়ল দর্শকদের নিবিড় ভিড়ের ঠিক মাঝখানে। চারদিকে ভয়াবহ আর্তনাদ, হুড়োহুড়ি, চিৎকার শুরু হয়ে গেল।
-পড়ে গেছে, ভক্তা পড়ে গেছে, মরে গেল রে!
সদানন্দ চৌধুরী চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠল। তার পরিকল্পনা সফল হয়েছে ঠিকই, কিন্তু ভিড়ের মধ্যে পদপিষ্ট হওয়ার ভয়ে তার লোকেরাও ছিটকে এদিক ওদিক সরে গেল। মেলা মাঠে তখন রীতিমতো ধুন্ধুমার। মানুষ দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটছে। ভিড়ের মধ্যে পড়ে গিয়ে রতনের জ্ঞান প্রায় শেষের পথে। দুটো পা আর একটা হাত মনে হচ্ছে ভেঙে গুঁড়ো হয়ে গেছে। পিঠ থেকে গলগল করে রক্ত বেরোচ্ছে। ধুলো আর রক্তে সে একাকার। শুধু মানুষের পায়ের জুতোর তলাগুলো দেখতে পাচ্ছিল রতন। হঠাৎ কেউ একজন তার কলার ধরে হ্যাঁচকা টানে ভিড়ের তলা থেকে টেনে বের করল। গৌরী!
-চল, উঠতে হবে তোকে।
গৌরী প্রায় হিসহিস করে উঠল। তার গায়ে তখন অভাবনীয় জোর।
-আমি... আমি আর পারছি না গৌরী, আমি মরে যাব,
রতন গোঙাতে গোঙাতে বলল।
-পারতেই হবে, মরলে চলবে না।
গৌরী রতনকে আধা-পাঁজাকোলা করে মেলার পেছনের একটা অন্ধকার বাঁশবাগানের দিকে টেনে নিয়ে গেল। সেখানে একটা পুরনো সাইকেল ভ্যান আগে থেকেই দাঁড় করানো ছিল। গৌরী রতনকে সেটার ওপর শুইয়ে দিল। রতনের ঘোলাটে চোখ হঠাৎ আটকে গেল গৌরীর কোমরে গোঁজা একটা কাপড়ের পুঁটলিতে। পুঁটলিটা বেশ ভারী, আর সেখান থেকে উঁকি মারছে একতাড়া একশো আর পাঁচশো টাকার নোট, আর কিছু সোনার গয়না। চাঁদের আলোয় গয়নাগুলো চিকচিক করে উঠল।
-এগুলো... এগুলো কী গৌরী?
রতন অস্ফুট স্বরে, অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল। গৌরী ভ্যানের প্যাডেলে পা রেখে রতনের দিকে তাকাল। তার মুখে এখন আর কোনও ভয় বা হতাশা নেই। সেখানে ফুটে উঠছে বিজয়ী, ক্রূর হাসি।
-তুই যখন চড়কগাছে ঝুলছিলি, আর গ্রামের সব লোক, সদানন্দর সব পাহারাদার হাঁ করে তোর দিকে তাকিয়ে ছিল, ঠিক সেই সময় আমি সদানন্দর বাড়ির পিছনের জানলা ভেঙে ওর ঘরে ঢুকেছিলাম।
গৌরী হাঁপাতে হাঁপাতে বলল। রতনের চোখ কপালে উঠল। যন্ত্রণাও যেন সে মুহূর্তের জন্য ভুলে গেল।
-তুই... তুই সদানন্দর সিন্দুক চুরি করেছিস?
-চুরি নয় রতন, নিজের পাওনা আদায় করেছি, আর গরিব মানুষের রক্তচোষা টাকা ফেরত নিয়েছি।
গৌরী ভ্যান চালাতে শুরু করল অন্ধকার কাঁচা রাস্তা ধরে।
-সদানন্দ ভেবেছিল আমাকে ওর ভোগের সামগ্রী বানাবে। তুই ভেবেছিলি নিজের পিঠের চামড়া ছিঁড়ে তুই আমাকে উদ্ধার করবি। কিন্তু এই গরিবের দুনিয়ায় কেউ কাউকে উদ্ধার করে না রতন। ভগবানও না। নিজেকেই নিজের রাস্তা বানাতে হয়।
-কিন্তু তুই আমাকে গাছ থেকে পড়তে বললি কেন?
রতন যন্ত্রণায় কোঁকাতে কোঁকাতে প্রশ্ন করল।
-কারণ আমার একটা বড় মাপের হট্টগোল দরকার ছিল,
গৌরীর গলায় কোনও অনুশোচনা নেই।
-তুই গাছ থেকে না পড়লে মেলায় ওই চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হত না। আর ওটা না হলে সদানন্দর বাড়ির চারপাশের পাহারাদাররা বাড়ি ছেড়ে মেলা প্রাঙ্গণে ছুটে আসত না। আমি বাড়ি ফাঁকা পেতাম না। তুই ছিলিস আমার ওই বিশৃঙ্খলা তৈরির হাতিয়ার।
রতন হতবাক হয়ে শুয়ে রইল ভ্যানের পাটাতনে। তার শরীর যন্ত্রণায় ফালাফালা, কিন্তু মনের ভেতর এক অদ্ভুত, শূন্য অনুভূতি হচ্ছে। যে মেয়েটাকে সে নিজের প্রাণ দিয়ে ভালবাসে, সেই মেয়েটা তাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে নিজের উদ্দেশ্য হাসিল করেছে। কিন্তু পরক্ষণেই রতন দেখল, গৌরীর চোখ দিয়ে অঝোরে জল পড়ছে। ভ্যান চালাতে চালাতেই গৌরী ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল,
-আমাকে ক্ষমা করে দিস রতন। আমার কাছে আর কোনও উপায় ছিল না রে। তুই পাঁচ হাজার টাকা পেলি কি না পেলি, সদানন্দ আমাকে কোনওদিন ছাড়ত না। তোকে ও মেরেই ফেলত। আমি শুধু তোর মৃত্যুকে একটা অস্ত্র বানিয়েছিলাম আমাদের দুজনের বাঁচার জন্য। এই পুঁটলিতে যা আছে, তা দিয়ে আমরা অনেক দূরে, শহরে গিয়ে নতুন করে বাঁচব। তোর চিকিৎসা করাব। তুই আর কোনওদিন আমার ওপর রাগ করে থাকবি না তো?
রাতের অন্ধকার চিরে ভ্যানটা এগিয়ে যাচ্ছে। পিছনে পড়ে থাকছে গাজনের মেলা, চড়কের রক্ত, সদানন্দর আস্ফালন আর হাজার বছরের পুরনো শোষণ। রতন আস্তে আস্তে তার রক্তমাখা হাত বাড়িয়ে গৌরীর পা ছুঁল। এই প্রথম রতন বুঝল, রূপকথার প্রেমের গল্পের সঙ্গে বাস্তবের কোনও মিল নেই। এই প্রান্তিক, ধুলোমাখা পৃথিবীতে ভালবাসা মানে হল একসঙ্গে নরক থেকে বেঁচে ফেরার যে কোনও নিষ্ঠুর চক্রান্তে একে অপরের শরিক হওয়া। পিঠের বঁড়শির ক্ষতটা জ্বলছে, কিন্তু রতনের ঠোঁটে তখন স্বস্তির হাসি। অপ্রত্যাশিত এই মোচড় তাদের জীবনটাকেই ঘুরিয়ে দিল চিরকালের মতো। ওরা হেরে গিয়েও আসলে জিতে গেল।
ভ্যানটা ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ করতে করতে খানাখন্দে ভরা মাটির রাস্তা ধরে এগোচ্ছে। দু'পাশে সারি সারি বাঁশবাগান আর ন্যাড়া মাঠ। চাঁদের আলো যেন ভৌতিক ছায়া তৈরি করেছে। গৌরীর সারা শরীর ঘামে ভেজা, শাড়ির আঁচল কোমরে শক্ত করে জড়ানো। তার পায়ের পেশিগুলো ব্যথায় টনটন করছে, কিন্তু সে প্যাডেল করা থামায়নি। একবার থামা মানেই মৃত্যু। ভ্যানের পাটাতনে শুয়ে থাকা রতনের অবস্থা ক্রমশ খারাপ হচ্ছে। পিঠের ক্ষত থেকে চুঁইয়ে চুঁইয়ে রক্ত পড়ছে ভ্যানের কাঠের তক্তায়। ধুলো আর রক্ত মিশে কালচে কাদার মতো তৈরি হয়েছে ওর পিঠের কাছে। যন্ত্রণায় ওর মুখ দিয়ে গোঙানির শব্দ বেরোচ্ছে, মাঝে মাঝে খাবি খাচ্ছে।
-আর একটু রতন, আর একটু সহ্য কর,
হাঁপাতে হাঁপাতে পিছন ফিরে না তাকিয়েই বলল গৌরী।
-আমরা বড় রাস্তায় উঠে গেলেই কোনও লরি বা ট্রাক ধরে নেব। তুই চোখ বন্ধ করিস না রতন, আমার সঙ্গে কথা বল।
-আমার... খুব ঠান্ডা লাগছে রে গৌরী...
রতনের গলা দিয়ে স্বর বেরোচ্ছে না। শরীর থেকে প্রচুর রক্ত বেরিয়ে যাওয়ায় ওর হাত-পা হিম হয়ে আসছে। গৌরী এক হাতে প্যাডেল করতে করতেই নিজের শাড়ির কিছুটা অংশ ছিঁড়ে নিল। তারপর এক হাতে সেটা দলা পাকিয়ে রতনের পিঠের ক্ষতের ওপর চেপে ধরল রক্তপাত কমানোর মরিয়া চেষ্টায়।
-ঠান্ডা লাগলে চলবে না। তুই মরতে পারবি না রতন। তুই যদি আজ মরে যাস, আমি এই মাঝরাস্তায় সদানন্দর টাকাগুলো আর তোর লাশ নিয়ে কী করব? আমাকে তো কাল সকালেই শকুনে ছিঁড়ে খাবে।
গৌরীর গলায় কান্নার বদলে বন্য আক্রোশ জেগে উঠছে। রাত তখন আড়াইটে। ওরা অবশেষে হাইওয়েতে এসে পৌঁছল। দূরে একটা ধাবার টিমটিমে আলো জ্বলছে। গৌরী ভ্যানটা রাস্তার ধারের ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে রাখল। রতনকে প্রায় কাঁধে তুলে নিয়ে সে ধাবার পিছনের অন্ধকারে গিয়ে বসল। ওর কোমরের পুঁটলি থেকে একটা একশো টাকার নোট বের করে সে ধাবার একটা খালাসি ছেলেকে দিল।
-দাদা, আমার সোয়ামির অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। একটা লরি ঠিক করে দাও না গো, বর্ধমান হাসপাতালে যাব। অনেক পুণ্যি হবে তোমার।
টাকার গন্ধ আর গৌরীর করুণ মুখ দেখে খালাসি ছেলেটা মালবোঝাই একটা লরির পেছনের ডালা খুলে দিল। আলু বোঝাই ট্রাক। সেই আলুর বস্তার ওপরেই রতনকে নিয়ে উঠে পড়ল গৌরী। ট্রাক ছুটতে শুরু করল শহরের দিকে। অন্ধকারে আলুর বস্তার ওপর শুয়ে রতনের মাথাটা নিজের কোলে তুলে নিল গৌরী। রতন তখন প্রায় অচেতন। গৌরী ওর কপালে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বিড়বিড় করে বলল,
-আর কোনওদিন তোকে কারও পায়ের তলায় থাকতে দেব না। তুই শুধু বেঁচে ওঠ।
পরদিন সকালে খয়েরবনি গ্রামে যেন বাজ পড়ল। চড়কের মেলার হট্টগোল আর রতনের গাছ থেকে পড়ে যাওয়ার ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই নতুন খবর রটে গেল, সদানন্দ চৌধুরীর বাড়ির পিছনের দরজা ভাঙা, সিন্দুক হাঁ করে খোলা। নগদ লাখ খানেক টাকা আর বাড়ির বউদের প্রায় সব সোনার গয়না গায়েব। সদানন্দ চৌধুরী নিজের বাড়ির উঠোনে বাঘের মতো পায়চারি করছে। তার চোখ দুটো রক্তজবার মতো লাল। হাতের মোটা লাঠিটা দিয়ে সে তার তিনটে পাহারাদারকে পিটিয়ে আধমরা করে ফেলেছে।
-হারামজাদার দল, মেলায় একটা ভিখারি গাছ থেকে পড়েছে বলে তোরা সব বাড়ি ছেড়ে মেলা দেখতে চলে গেলি? তোদের আমি খেতে দিই না?
সদানন্দ গজরাতে থাকল। হঠাৎ তার নায়েব ছুটে এল।
-কত্তা, একটা খবর আছে। পরাণ দাসের মেয়ে গৌরী কাল রাত থেকে নিখোঁজ। পরাণ বলছে সে নাকি মেলা দেখতে গিয়েছিল, আর ফেরেনি।
সদানন্দর চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। মাথার মধ্যে অঙ্কটা নিমেষে মিলে গেল তার। রতনের গাছ থেকে পড়া, গৌরীর নিখোঁজ হওয়া, আর ঠিক সেই সময়ে তার বাড়িতে চুরি, এগুলো কোনও কাকতালীয় ঘটনা নয়। দুটো শুয়োরের বাচ্চা মিলে তাকে, সদানন্দ চৌধুরীকে, বোকা বানিয়েছে!
-ওই রতন শালা মরেনি। ও ইচ্ছা করে পড়েছে ভিড়ের ওপর। আর ওই মাগিটা... ওই গৌরী মাগিটা আমার ঘরে ঢুকেছিল!
সদানন্দর গলা দিয়ে সাপের মতো হিসহিস শব্দ বেরোল।
-ওদের আমি খুঁজব। পাতাল থেকে টেনে বের করব। পুলিশের কাছে খবর দিস না। পুলিশ জানলে আমার কালো টাকার হিসেব চাইবে। আমার লোক লাগা। রেল স্টেশন, বাস স্ট্যান্ড, হাসপাতাল, সব জায়গায় খোঁজ। ওদের জ্যান্ত বা মরা, আমার পায়ের কাছে চাই।
খয়েরবনির মাটি আরও তেতে উঠল। পরাণ দাসকে লাথি মেরে গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দিল সদানন্দ। কিন্তু তার বুকের ভেতর অপমানের যে আগুন জ্বলছিল, সেটা কোনওভাবেই নিভল না। একটা গরিব, অশিক্ষিত দিনমজুরের মেয়ে তাকে পথে বসিয়ে দিয়ে গেছে!
বর্ধমানের একটা ঘিঞ্জি বস্তি এলাকা। রেললাইনের ধার ঘেঁষে পরপর টালি আর টিনের চালের ঘর। সেরকমই একটা বদ্ধ, স্যাঁতসেঁতে ঘরে গত এক মাস ধরে পড়ে আছে রতন। সরকারি হাসপাতালে যাওয়ার সাহস গৌরীর হয়নি। সদানন্দর হাত অনেক লম্বা, হাসপাতালে পুলিশ কেস হলে ওরা ধরা পড়ে যেত। তাই শহরের প্রান্তে এক হাতুড়ে ডাক্তারকে মোটা টাকা খাইয়ে রতনের চিকিৎসা করিয়েছে গৌরী। ডাক্তার কোনও প্রশ্ন করেনি, শুধু টাকা গুনে নিয়ে সেলাই করে দিয়েছে রতনের পিঠ। হাড় জোড়া লাগার ওষুধ দিয়েছে। রতন এখন উঠে বসতে পারে, অল্প অল্প হাঁটতেও পারে। কিন্তু তার পিঠে চড়কের বঁড়শি আর নিজের ক্ষুরের সেই আঘাত এমন একটা বীভৎস কালশিটে আর এবড়ো খেবড়ো দাগ রেখে গেছে, যা দেখলে শিউরে উঠতে হয়। গৌরী এই এক মাসে অনেক বদলে গেছে। গ্রামের সেই ভীতু, লাজুক মেয়েটা আর নেই। সে এখন বস্তির কলতলায় অন্য মেয়েদের সঙ্গে সমান তালে ঝগড়া করে। সদানন্দর বাড়ি থেকে চুরি করা গয়নাগুলো সে একসঙ্গে বেচেনি। শহরের বিভিন্ন প্রান্তে ছোট ছোট দোকানে গিয়ে একটা একটা করে বেচেছে, যাতে কারও সন্দেহ না হয়।
একদিন রাতে রতন জানলার বাইরে রেললাইনের দিকে তাকিয়ে বসেছিল। গৌরী এসে ওর পাশে বসল।
-শরীর কেমন আজ?
গৌরী জিজ্ঞেস করল।
-আগের চেয়ে ভাল,
রতন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
-কিন্তু গৌরী, এরপর কী? টাকা তো এক দিন শেষ হয়ে যাবে। আর সদানন্দ ঠিক আমাদের খুঁজছে। আমরা কি সারাজীবন ইঁদুরের মতো লুকিয়ে থাকব?
গৌরী রতনের চোখের দিকে তাকাল।
-লুকিয়ে থাকব কেন? আমরা এবার নিজেদের সাম্রাজ্য বানাব।
-সাম্রাজ্য? আমরা? কী বলছিস তুই?
-আমি এখানকার লোকাল ক্লাবের ছেলেদের সঙ্গে কথা বলেছি,
গৌরী শান্ত গলায় বলল।
-বস্তির পেছনের ওই সরকারি জমিটায় একটা দেশি মদের ঠেক খুলব। টাকা আমি দেব, ওরা পুলিশ আর প্রশাসন সামলাবে। আমি বুঝে গেছি রতন, এই দুনিয়ায় ভাল মানুষ হয়ে বাঁচার কোনও জায়গা নেই। যে যত বড় জানোয়ার, সে তত বেশি রাজা। সদানন্দ আমাদের জানোয়ার বানাতে চেয়েছিল, আমরা জানোয়ারই হব।
রতন অবাক হয়ে গৌরীর দিকে তাকিয়ে রইল। এই মেয়েটাকে সে চিনতে পারছে না। কিন্তু গৌরীর কথার মধ্যে অদ্ভুত সত্যি লুকিয়ে আছে। ওদের প্রেম, ওদের ভালবাসা সবকিছুই ওই চৈত্র সংক্রান্তির রোদে আর রক্তে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এখন যেটা আছে, সেটা হল শুধু টিকে থাকার বন্য চুক্তি।
-তুই আমাকে দিয়ে কী করাতে চাস?
রতন নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল।
-ঠেকটা আমি চালাব। আর তুই হবি আমার পাহারাদার। তোর পিঠের ওই দাগগুলো দেখে মানুষ ভয় পাবে। তুই হবি এই বস্তির নতুন ত্রাস।
গৌরীর চোখ অন্ধকারে বাঘিনীর মতো জ্বলজ্বল করে উঠল।
দেখতে দেখতে তিনটে বছর কেটে গেল। বর্ধমানের সেই বস্তি এলাকায় এখন গৌরী আর রতনের একচেটিয়া রাজত্ব। ছোট দেশি মদের ঠেক থেকে এখন ওদের জুয়ার আসর আর তোলা আদায়ের ব্যবসা চলে। রতন এখন আর সেই দুর্বল 'ভক্তা' নেই। তার গায়ে জোর ফিরেছে, চোখের চাহনিতে হিমশীতল ক্রূরতা এসেছে। এলাকার লোক ওকে 'কাটা রতন' বলে ডাকে, কারণ ওর পিঠের সেই ভয়ঙ্কর কাটা দাগটার কথা সবাই জানে। কিন্তু ওদের দুজনের মাঝখানের সম্পর্ক অদ্ভুত মোড় নিয়েছে। ওরা এক ঘরে থাকে, এক বিছানায় শোয়, কিন্তু সেই খয়েরবনি গ্রামের নাটমন্দিরের ছায়ায় যে আদিম, নিবিড় প্রেমটা ছিল, সেটা আর নেই। এখন ওদের সম্পর্ক সফল ব্যবসায়িক চুক্তির মতো। মাঝে মাঝে রাতে রতনের ঘুম ভেঙে যায়। সে স্বপ্নে দেখে চড়ক গাছটা বনবন করে ঘুরছে, আর নীচে সদানন্দ চৌধুরী হাসছে। তার পিঠের পুরনো ক্ষতটা যেন আবার নতুন করে চিনচিন করে ওঠে। রতন জানে, ওরা অনেক টাকা কামিয়েছে, কিন্তু পাপ ওদের ছাড়েনি। খয়েরবনি গ্রামের সেই বিশ্বাসঘাতকতার পাপ, সদানন্দর সিন্দুক চুরির পাপ।
একদিন গৌরী টাকা গুনছিল। রতন মদ খাচ্ছিল বসে।
-গৌরী, তোর কি একবারও বাপের কথা মনে পড়ে না? সদানন্দ নিশ্চয়ই বুড়োটাকে জ্যান্ত রাখেনি।
রতন হঠাৎ জিজ্ঞেস করল। গৌরীর হাত এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। তারপর সে আবার টাকা গুনতে শুরু করল।
-মনে করে কী হবে? দুর্বল মানুষের বাঁচার কোনও অধিকার নেই রতন। আমার বাপ দুর্বল ছিল, তাই ভুগেছে। আমরা সবল হয়েছি, তাই বেঁচে আছি।
-আমরা সবল হয়েছি, না কি আমরাও সদানন্দর মতো জানোয়ার হয়ে গেছি?
রতন তেতো হাসি হাসল। গৌরী উত্তর দিল না। সে জানে রতন ঠিকই বলছে। কিন্তু এই পঙ্কিল পথ থেকে ফেরার আর কোনও উপায় নেই। সময় বড় অদ্ভুত জিনিস। সে কাউকে ক্ষমা করে না।
শীতের এক সন্ধে। রতন ওদের মদের ঠেকের বাইরে একটা টুলে বসে বিড়ি টানছিল। হঠাৎ তিনটে লোক এসে ঠেকের সামনে দাঁড়াল। তাদের পরনে কালো চামড়ার জ্যাকেট, চোখেমুখে ঠান্ডা খুনে ভাব।
-কাটা রতন কে?
একজন জিজ্ঞেস করল। রতন উঠে দাঁড়াল।
-আমি। কী চাই?
লোকটা পকেট থেকে একটা ছবি বের করে রতনের মুখের সামনে ধরল। ছবিটা খয়েরবনি গ্রামের। চড়ক মেলার ছবি।
-সদানন্দ কত্তা পাঠিয়েছে। তিন বছর ধরে তোদের খুঁজছে কত্তা। তোরা ভেবেছিলি বর্ধমানের এই বস্তিতে লুকিয়ে পার পেয়ে যাবি?
লোকটা কোমর থেকে একটা ভোজালি বের করল। রতনের বুকের ভেতরটা একবার কেঁপে উঠল। অবশেষে সেই দিনটা এল। কিন্তু রতন ভয় পেল না। সে জোরে একটা শিস দিল। মুহূর্তের মধ্যে ঠেকের পেছন থেকে, বস্তির গলি থেকে অন্তত দশ-বারোটা ছেলে বেরিয়ে এল। সবার হাতে রড, চেন, হাঁসুয়া। এরা সবাই রতন আর গৌরীর লোক। সদানন্দর পাঠানো লোক তিনটে ঘাবড়ে গেল। তারা বুঝতে পারল, তারা শিকার করতে এসে নিজেরাই শিকার হয়ে গেছে। ঠিক সেই সময় ঠেকের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল গৌরী। পরনে দামি শাড়ি, গায়ে ভারী সোনার গয়না। সে ধীর পায়ে এগিয়ে এল সদানন্দর লোকগুলোর সামনে।
-কত্তাকে গিয়ে বলবি, গৌরী আর রতন এখন আর খয়েরবনির ওই গরিব দিনমজুর নেই,
গৌরীর গলা ছুরির ফলার মতো তীক্ষ্ণ।
-তোদের কত্তা আমাদের রক্ত চুষে খেতে চেয়েছিল। আমরা ওর সিন্দুক ফাঁকা করে দিয়েছি। আর এবার যদি ও আমাদের ছায়াও মাড়ানোর চেষ্টা করে, আমি আমার ছেলেদের পাঠিয়ে ওর খয়েরবনির বাড়িটা আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেব। ও যেন ভুলে না যায়, চড়কের গাছের দড়ি কীভাবে কাটতে হয়, সেটা রতন খুব ভাল করেই জানে।
লোক তিনটে আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না, লেজ গুটিয়ে পালাল। রতন গৌরীর পাশে এসে দাঁড়াল। দুজনে দুজনের চোখের দিকে তাকাল। সেখানে প্রেম নেই, ভক্তি নেই, রূপকথার শেষে সুখে শান্তিতে বসবাস করার প্রতিশ্রুতি নেই। সেখানে আছে শুধু দুটো শিকারির একে অপরের প্রতি ঠান্ডা সম্মান। গাজন আর চড়ক তাদের রক্ত নিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু বদলে তাদের শিখিয়ে দিয়েছিল, এই পৃথিবীতে দেবতা বলে কিছু নেই। এখানে টিকে থাকতে হলে, নিজেকেই নিজের ভগবান হতে হয়, অথবা শয়তান। ওরা শয়তান হওয়াটাই বেছে নিয়েছে। রাতের অন্ধকারে ট্রেনের হুইসেলের শব্দে বস্তির কোলাহল ঢাকা পড়ে গেল। রতন আর গৌরী আবার গিয়ে ঢুকল তাদের নিজেদের তৈরি করা সেই পাপ আর ক্ষমতার অন্ধকার জগতে, যেখান থেকে ফেরা যায় না, শুধু এগিয়ে যেতে হয়।
…………………………………….
Dibyendu Ghosh
Vill & p.o. Sankrail,
Dist. Howrah
Pin- 711313

Comments
Post a Comment