
নববর্ষের সেকাল একাল
মিতা ভৌমিক
মুছে যাক গ্লানি,ঘুচে যাক সব জীর্ণ স্মৃতির ভার,
তবুও মন থেকে মোছে না কিছু জমে থাকা হাহাকার।
কিছু হাহাকারে থাকে পুরোনোকে ফিরে পাবার আকুলতা। যেমন প্রতি বছর বৈশাখের প্রথম দিনে হাহাকার জাগে পঞ্জিকার ডানার ওপর নববর্ষের রোদ ঝলসানো ভোরের।
পুরোনো দিনগুলো উঁকি দিয়ে যায় স্মৃতির জানলা ধরে।
প্রতিবছর ক্যালেন্ডার বদলায়,সময় এগিয়ে যায়,
আমরা ধীরে ধীরে যান্ত্রিক মানবে রূপান্তরিত হয়ে উঠি।
তবু কোথাও যেনো হৃদয়ের মণিকোঠায় অক্ষয় হয়ে থাকে শৈশবের নববর্ষরা ,রঙিন স্মৃতির ক্যানভাস জুড়ে।
সেকালের নববর্ষ মানেই ছিলো ভোরের আলো ফুটতেই নতুন জামা পড়ে ঠাকুরঘরের পূজোতে চন্দন-ধূপের সুঘ্রাণ।
"গাছে গাছে ফুল ফুটেছে,
নববর্ষের ডাক এসেছে
তুমি আমার বন্ধু হও,
নববর্ষের কার্ড লও"
বাবার এনে দেওয়া নববর্ষের কার্ডগুলোতে এই কবিতার ছড়া লিখে দাদুর হাত ধরে বিলি করতে বেরোতাম বন্ধুদের বাড়ি বাড়ি।পরিবর্তে নিজের সংগ্রহেও জমা হতো বহু নববর্ষের কার্ডের সম্ভার।
ক্যালেন্ডারের পাতায় গণেশঠাকুরের মূর্তি আর লাল খেরোর খাতার গন্ধে ম ম করতো পাড়ার দোকানগুলো।
মিষ্টির বাক্স আর বগলদাবা করে কিছু ক্যালেন্ডার সংগ্রহ করতে পারলে যেনো মনে হতো সব পেয়েছির দেশ থেকে নতুন বছরের কিছু সংগ্রহ ভরে নিলাম নিজের ঝোলায়।
এখনকার মতন সেকালে জামা কাপড়ের বৈচিত্র্য ছিলোনা।বছরে ঐ একবার পূজোতে দামী জামা আর এই নববর্ষে একটা সূতির জামা বরাদ্দ ছিলো। তাই সূতির কাপড়ের নতুন জামার গন্ধের সাথে আমার নববর্ষের গন্ধ যেনো কোথাও মিলেমিশে একাকার হয়ে রয়েছে।
তখন নববর্ষের আনন্দ মানে ছিলোনা দামী দামী রেস্তোরা বা শপিংমলে ছোটা। বরং ছিলো নববর্ষের দুপুরে বাবা-মা,ঠাকুরদা-ঠাকুমা,ভাই-বোনেদের সাথে একসাথে মেঝেতে আসন পেতে বসে, হৈ-হুল্লোড় করতে করতে মায়ের হাতের সুস্বাদু বাঙালীয়ানায় ভরপুর রান্নার স্বাদের তৃপ্তির ঢেকুর তোলা।
মনে পড়ে কোনো কোনো নববর্ষের বিকেলের দিকে আকাশটা থমথমে হয়ে ধূলো উড়িয়ে কালবৈশাখী ঝড় নিয়ে আসতো।আমরা ভাই-বোনেরা তখন একসাথে নেশা করার মতো সোঁদা মাটির গন্ধ নিতাম। যে গন্ধ আজ শহরের যান্ত্রিক ধোঁয়াশার গন্ধে খুঁজে পাওয়া বিরল।
সেকালের নববর্ষে পাড়ার মোড়ে বড়দের কোলাকুলি আর গল্পগুজব ছিলো,বাড়ি বাড়ি গিয়ে বড়োদের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে ছোটোদের আশীর্বাদ নেওয়া ছিলো। সবচেয়ে বেশী মূল্যবান যেটা ছিলো ,সেটা হলো আন্তরিকতায় ভরা অকৃত্রিমতার মোড়া এক নতুন বছরের সূচনা।
সেকালে নববর্ষের উৎসবটা ছিলো শান্ত আভিজাত্যপূর্ণ, যা আজও বুকের বামপাশের স্মৃতির অ্যালবামে বন্দী হয়ে আছে একমুঠো উজ্জ্বল রোদ্দুরের মতন।
একালে নববর্ষ আসে ছাদের পাকাঘরে এসির হাওয়া আর দিনের বেলাতেও ঘরে জ্বালানো হাজার আলোর ভিড়ে।কার্ড নিয়ে এখন আর কেউ আসেনা ঘরের দোরগোড়ায় বা আমারও পৌঁছনো হয়না কারোর বাড়িতে কার্ডে ভরা ছড়া নিয়ে। ডিজিটাল কার্ড আর ভুড়িভুড়ি ম্যাসেজের ভিড়ে কবে যে হারিয়ে গেলো নিজেহাতে লেখা বন্ধুত্বের আন্তরিকতা বুঝেই ওঠা গেলোনা।একালের নববর্ষ অনেক বেশী আধুনিক,কিন্তু আন্তরিকতা যেনো কোথাও গিয়ে ক্লান্ত যান্ত্রিকতার ভীড়ে।
তবুও,আজ যখন নববর্ষ আসে আর পুরোনো নববর্ষের স্মৃতিরা এসে জড়ো হয় নতুন বছরে আঙিনায়, তখনই যেনো সেকাল আর একালের নববর্ষ একে অপরের সাথে হাত মিলিয়ে পুনর্মিলনের উৎসব গড়ে।
মাধ্যম বদলেছে,বদলেছে উৎসবের ধরণ।কিন্তু বাঙালীর মনের কোণে বৈশাখের প্রথম দিনটি আজও এক আকাশ আনন্দ আর আগামীর জন্য একমুঠো স্বপ্ন বয়ে আনে।সেকালের নববর্ষের হাত ধরে একালের নববর্ষ যেনো বলে-
"সময় বহিয়া যায়,পুরোনো হয় পুরাতন,
তবু নতুনের মাঝে বাঁচে স্মৃতির বৃন্দাবন।"
Comments
Post a Comment