দুই আকাশ, এক নববর্ষ
রাজদীপ মজুমদার
নববর্ষ মানেই নতুন খাতা, নতুন জামা, আর পুরোনো মন খারাপের বিসর্জন। কিন্তু সব কি বিসর্জন দিয়ে নতুনের জন্য এগিয়ে যাওয়া যায়? পথ চলার জন্য তাই যা কিছু ইতিহাস থাকে, সেটা ওই সময়ের জন্য ভুলে যাওয়াটাই ভালো।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়-এর লেখার গভীরে যে অনুভূতিটা বারবার ধরা পড়ে, তা যেন এই নববর্ষের সাথেই মিলে যায় ; “মানুষের জীবনে পথই বড় কথা, সেই পথেই তার দেখা, তার হারানো, তার পাওয়া।”
এই কথাটুকু মনে রেখেই বলা যায়, নববর্ষ মানে শুধু নতুনকে বরণ নয়, বরং পথের নতুন শুরু। যেখানে পুরোনো স্মৃতি মুছে যায় না, শুধু একটু দূরে সরে দাঁড়ায়।
যেমন এই নববর্ষকে যদি গ্রাম আর শহরের চোখ দিয়ে দেখি, তাহলে বোঝা যায়—একই দিন, কিন্তু উদযাপনের ধরন যেন দুই ভিন্ন গ্রহের গল্প!
গ্রামে নববর্ষের সকাল মানে চারিদিকে ব্যাস্ততা।গ্রামে নববর্ষের সকাল মানে চারিদিকে ব্যস্ততা। মোরগের ডাক যেন অ্যালার্ম ক্লকের কাজ করে, আর বাতাসে মিশে থাকে কাঁচা মাটির গন্ধ। ভোরবেলা উঠেই কাকিমারা উঠোনে জল আর গোবর ছিটিয়ে পরিষ্কার করে, অন্যদিকে বাড়ির ছোট মেয়েরা আলপনা আঁকতে ব্যস্ত থাকে। সেখানে কোনো “Pinterest idea” নেই, কিন্তু যে আঁকাটা জন্ম নেয়, সেটা একেবারে হৃদয়ের ভেতর থেকে—নিখাদ, নিরাভরণ শিল্প।
এই অনুভূতির সঙ্গে মিশে আছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর সেই চিরন্তন আহ্বান— “এসো হে বৈশাখ, এসো এসো।”
এই ডাক যেন শুধু ঋতুর নয়, গ্রামের প্রতিটি মানুষের প্রাণের ভেতর নতুন করে বাঁচার আমন্ত্রণ।
নতুন শাড়ি পরে পুকুরঘাটে জল তুলতে যাওয়া, আর সেই সঙ্গে পাশের বাড়ির পিসিমার সঙ্গে গল্প—এই সরল মুহূর্তগুলোই হয়ে ওঠে আসল উৎসব।এটাই গ্রাম্য ফ্যাশন শো, যেখানে সাজ নয়, হৃদয়ের বন্ধনই আসল।
আরে, ওই দেখ—আমাদের পটলদা বাজার থেকে হেঁটে আসছে, সঙ্গে তার বিচ্ছু ছেলে শশা! পটলদার ছেলের নাম শশা কেন হলো, তা আজও কেউ ঠিক করে বলতে পারে না। থাক, সে রহস্য আর খোঁজা না-ই বা হলো।
আজ সকালে উঠে শশার দিনটাই যেন একটু উল্টোপাল্টা। প্রথমত, তার ঘুমটাই ঠিক মতো হয়নি—চোখ মেলেই কেমন বিরক্তি নিয়ে দিন শুরু। দ্বিতীয়ত, বাবার সঙ্গে বাজারে গিয়ে এই সবজি, ওই সবজির দোকানে ঢুকে একটাও সবজি টিপে খারাপ করার সুযোগ পায়নি—যা তার কাছে প্রায় অবিচারের মতো!
আর তৃতীয়ত, সবচেয়ে বড় ধাক্কা—পেটাই পরোটার দোকানে বসে গরম গরম খাওয়া আজ বন্ধ। পটলদা আজ একেবারে নিয়মে বাঁধা মানুষ! বলল, “না রে, আজ বাড়ির সবার সঙ্গে বসে খাওয়া হবে।” তাই সব খাবার প্যাকেট করে নিয়ে নিয়েছে।
তবে শশার মুখের অভিমান একটু গলল, যখন দেখল—বাবা মিষ্টির দোকান থেকে এক প্যাকেট মিষ্টি আর সঙ্গে একটা নতুন ক্যালেন্ডারও এনে দিয়েছে।
হাঁটতে হাঁটতে শশা একটু চুপ করে বাবার পাশে এসে দাঁড়াল। হয়তো বুঝতে পারল সব দুষ্টামির থেকেও বড় কিছু আছে… একসাথে বাড়ি ফেরা, আর একসাথে বসে খাওয়ার আনন্দ।
অন্যদিকে শহরে পল্টনের নববর্ষের সকালটা শুরুই হয় একটু দেরিতে। ঘুম থেকে ওঠার সঙ্গে তার চিরশত্রু যুদ্ধ যেন প্রতিদিনের মতো আজও চলছে। কখন যে তার মা উঠে এসির সুইচ বন্ধ করে রান্নাঘরে চলে গেছে, সে কিছুই টের পায়নি।
হঠাৎই গরমে ঘুম ভেঙে যায় পল্টনের। চোখ কচলাতে কচলাতে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে—সকাল ৯টা! মুখটা একটু বাঁকা হয়ে যায় তার। নববর্ষের সকাল, অথচ এমন দেরি!
শহরে যেন দিনটা শুরুই হয় অন্য ছন্দে। এখানে সূর্যের আলো জানালায় ঢোকার আগেই মোবাইলের অ্যালার্ম তিনবার স্নুজ হয়ে যায়। পল্টনের ক্ষেত্রেও তাই—অ্যালার্ম বেজেছিল, কিন্তু ঘুমের টানে সে বারবার তাকে চুপ করিয়ে দিয়েছে।
বিছানা থেকে উঠতে উঠতে সে ভাবে, “গ্রামে হলে এতক্ষণে কত কিছু হয়ে যেত!” কিন্তু শহরের এই অলস সকালও তার নিজের মতো করে একটা অভ্যাস, একটা আরাম।
হাই তুলতে তুলতে পল্টন অবশেষে উঠে বসে। নববর্ষ তার কাছে শুরু হয় একটু দেরিতে ঠিকই, কিন্তু তাতেও যে আলাদা এক মজা আছে, সেটা সে ভালোই জানে।
প্লটন হলো শসার খুড়তুতো ভাই।
পল্টন মনে মনে খুঁজতে থাকে সেই পেটাই পরোটার সুবাস। শহরের জানালা দিয়ে যেন কখনো সখনো সেই গন্ধ ভেসে এলেও, তাতে কি আর পেট ভরে! পেট ভরাতে হলে সকালে খেতেই হয় ডায়েট চার্ট মেনে সাজানো খাবার—স্বাদ নয়, নিয়মই এখানে শেষ কথা।
তার ওপর সকালেই স্যার আসবেন বাড়িতে পড়াতে। নববর্ষ হোক বা অন্য দিন—পল্টনের জীবনে এর থেকে কোনো ছুটি নেই।
চুপচাপ বসে পল্টন ভাবতে থাকে, এই মুহূর্তে শশা কী করছে? হয়তো বাড়িতে একা একা বই খুলে বসেছে… আবার এটাও হতে পারে, পড়া ছেড়ে নিজের মতো করেই দিনটা কাটাচ্ছে। দুষ্টুমি, হাসি, ঘোরাঘুরি—সব মিলিয়ে নিজের আনন্দে ডুবে আছে।
শশা হয়তো নিজের মতো করে বাঁচছে, আর পল্টন? তার সেই পথটা যেন কোথাও গিয়ে বন্ধ হয়ে আছে—নিয়ম, সময় আর বাধার ভেতরে আটকে।
দেখতে দেখতে দুপুর এলো। শশা স্নান সেরে প্রথমে ঠাকুরঘরে গিয়ে প্রণাম করল, তারপর একে একে বাড়ির বড়দের পায়ে হাত ছুঁয়ে আশীর্বাদ নিল। সব শেষে এসে দাঁড়াল তার মায়ের সামনে।
মাকে প্রণাম করতেই মা স্নেহে মাথায় হাত রাখল। সেই মুহূর্তে রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা সুস্বাদু গন্ধ যেন শশাকে ধীরে ধীরে টেনে নিল—এক অদ্ভুত টানে, যেখানে সে হারিয়ে গেল নিজেরই ছোট্ট আনন্দের ভেতর।
শশা আজ খুবই উৎফুল্ল। তার মা রান্না করেছে হরেক কিছু—আজ যে পহেলা বৈশাখ। শুরুতে আছে আম ডাল দিয়ে আলুভাজা, তারপর সোজা দেশি মুরগির ঝোল—উফ, দেখে কে! বাবার হার্টের অসুখের জন্য এ বছর খাসির মাংস আনা হয়নি। তাতে কী হয়েছে!
খেতে বসে শশা মাকে জিজ্ঞেস করে, “মা, রুই মাছের ডিম দিয়ে তরকারি আজ করোনি?”
মা হেসে শুধু বলে, “না খোকা, আজ নয়। আজ এই খাও। খাবার শেষে আম আছে। আজ সকালে দুটো আম গাছ থেকে পড়েছে। সেটাই কেটে রেখেছি। তুই দুই টুকরো নিবি, বাকি সবাইকে দিতে হবে।”
শশা না-খুশি হয়েও বলে, “ঠিক আছে, তাই করব।”
ঠিক তখনই পাশের বাড়ি থেকে শশার জন্য দিয়ে যায় চার টুকরো খাসির মাংস। সেই আনন্দ কোথায় লুকিয়ে রাখবে শশা!
তারপরই মনে পড়ে—ওকে তো ভাগ দিতেও হবে। ঠিক আছে, এক টুকরো সে পাবে, আর সঙ্গে হাফ আলু। তাতেই হবে।
ওইদিকে পল্টনের দুপুরটা কেটে যায় একেবারেই অন্যভাবে। স্নান সেরে সে শুধু তার মাকেই প্রণাম করে। তার বাবা আজ ছুটি পায়নি—নববর্ষ বলেই কাজের চাপ আরও বেশি।
বন্ধুদের সঙ্গে ঠিক হয়েছে, আজ সবাই মিলে রেস্টুরেন্টে যাবে। সবার মা-বাবা মিলে আগেই বুকিং করা—সেখানে চলছে “Poila Boishakh special platter, Flat 50% off”। চারপাশে আলো, সাজ, হৈচৈ—সব মিলিয়ে উৎসবের রঙে ভরা পরিবেশ।
খাবারের স্বাদও অপূর্ব—রকমারি পদ, সুন্দর পরিবেশন। তবু পল্টনের মনে হয়, কিছু যেন কম আছে। প্রতিটা লোকমা খেতে খেতে তার মনে পড়ে যায় গ্রামের কাকির রান্নার কথা। সেই যে এক বছর খেয়েছিল কাকির হাতের খাসির মাংসের ঝোল—আজও তার স্বাদ যেন জিভে লেগে আছে।
শহরের বড় বড় হোটেলে দামের অভাব নেই, আয়োজনেরও কমতি নেই। কিন্তু সেই মাতৃস্নেহে মেশানো রান্নার স্বাদ সেটা কি কোথাও পাওয়া যায়?
নতুন বছরের সূর্য ধীরে ধীরে অস্ত যাচ্ছে, আকাশ লাল আভায় ঢেকে উঠছে। পাখিরা দল বেঁধে তাদের বাসায় ফিরে চলেছে। আর আমাদের শশাও দিদি-দাদার হাত ধরে মেলায় যাচ্ছে।
গ্রামে আজও মেলা বসে। সেই মেলায় নাগরদোলা, বাঁশির দোকান, মাটির খেলনা, সব মিলিয়ে এক অন্যরকম আনন্দ। আজকাল তো মেলায় সাহিত্যিক অনুষ্ঠানে থাকে। ছোটরা নতুন জামা পরে ঘুরে বেড়ায়, আর বড়রা পুরোনো দিনের গল্পে ডুবে যায়। সেখানে আনন্দটা সরল, নিখাদ।
তারপর মেলা থেকে ফেরার সময় সোনার দোকান আর কিছু মুদিখানার দোকানে ঢুকে হালখাতা সেরে নেওয়া। কোথাও আইসক্রিম বা কোল্ড ড্রিঙ্কস খাওয়া, আবার কোথাও থেকে প্যাকেট হাতে করে নিয়ে আসা।
উফ, সেই আনন্দে আজ শশাকে আর ধরে কে! বাড়িতে গিয়েও আজ আর পড়ার কোনো বালাই নেই—শশা আজ নিখাদ আনন্দেই ডুবে আছে।
এইদিকে শহরে আজকাল আর তেমন মেলা বসে না—জায়গার অভাবে। তবে কিছু জায়গায় মেলা হয়, অন্যভাবে। আজ শহরে মেলাও যেন একটা ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের প্রোগ্রাম হয়ে গেছে।
যাই হোক, পল্টন যেখানে থাকে সেখানে মেলা নেই, আছে একটি সাহিত্যিক অনুষ্ঠান। সেই অনুষ্ঠানে সে একটি ইংরেজি কবিতা বলবে। মা-বাবার মতে, বাংলায় কবিতা বললে সমাজে স্ট্যাটাস কমে যাবে না ঠিকই, তবু এই আয়োজনের আলাদা একটা নিয়ম আছে।
কিন্তু পল্টনের মন বারবার চলে যায় গ্রামের সেই মেলায় যেখানে আনন্দ কিনতে টাকা লাগে না, লাগে শুধু বুকের বাঁ পাশে একটা বিশ্বাস।
আজ সে ঠিক করেছে, বাবা যত রাতেই ফিরুক না কেন, সে বাবার কাছে একটা কিছু চাইবেই।
সময় বয়ে যায়। রাত বাড়ে। অবশেষে বাবা অফিস থেকে ফিরে পল্টনের কাছে আসে। পল্টন বাবাকে প্রণাম করে ধীরে বলে, “একটা উপহার চাই।”
বাবা একটু হেসে জিজ্ঞেস করে, “কি উপহার?”
পল্টন শান্ত গলায় উত্তর দেয়, “কাকুর সঙ্গে ভাব।”
বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর নিঃশব্দে ফোনটা তুলে নেয়—ভাইকে কল করে।
সেই মুহূর্তে পল্টন যেন নিজের ভেতরেই নতুন একটা নববর্ষের শুরু করে।
সব শেষে বলতে গেলে, গ্রাম আর শহরের নববর্ষ দুটোই সুন্দর, তবে তাদের সৌন্দর্য আলাদা। গ্রাম শেখায় সরলতা, আর শহর শেখায় আধুনিকতা। একটায় আছে মাটির গন্ধ, আরেকটায় আছে কংক্রিটের ছোঁয়া।
তুমি কোথায় আছো, সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো তুমি কীভাবে নববর্ষটাকে অনুভব করছো। কারণ পান্তা হোক বা পাস্তা, আসল স্বাদটা তো হৃদয়ের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে।


Comments
Post a Comment