বাংলার কথা : একটি আলোচনা
আবদুস সালাম
যে বাংলা নিয়ে আমাদের এত গর্ব এত অহংকার সেই বাঙলা কিন্তু একদিনে গড়ে ওঠেনি। বহু বিবর্তনের পথ ধরে বাংলা রূপ নিয়ে আজ আমাদের সম্মুখে বিরাজমান। আচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে--" মৌর্য বিজয় থেকে আরম্ভ করে গুপ্ত রাজবংশের রাজত্ব পর্যন্ত খ্রিস্টীয় পূর্ব ৩০০ বছর থেকে খ্রীষ্টিয় ৮০০ বৎসর ধরে বাংলার অস্ট্রিক ও দ্রাবিড় ভাষাভাষী জনগণ নিজ অনার্য ভাষা ত্যাগ করিয়া ধীরে ধীরে আর্যভাষা অর্থাৎ মগধের প্রাকৃত ভাষা গ্রহণ করিল। উত্তর ভারতের ব্রাহ্মণ্য ধর্ম সভ্যতা ও ঐতিহ্য অর্থাৎ সংস্কৃত ভাষার সত্তা হারিয়ে আর্য-অনার্য ইতিহাস পুরাণ এবং উত্তর ভারতের আর্য অনার্যে ইতিহাস পুরাণ বঙ্গদেশের অধিবাসীরাও গ্রহণ করে। বৌদ্ধ ও জৈন মতবাদ আসিল, তাহাও বাংলায় গৃহীত হইল।"
এভাবেই দ্রাবিড় অস্ট্রিক ও উত্তর ভারতের মিশ্র আর্য জাতির মিলনে সৃষ্টি হলো বাঙালি জাতি।
দু হাজার বছর ধরে বহিঃস্থ শক্তি সমূহ মৌর্য,গুপ্ত ,পাল, চন্দ্র,বর্মন, দেব, কোল,সেন, তুর্কি, মুঘল, ইংরেজ প্রভৃতি জাতির আক্রমণে বিধ্বস্ত হয়ে নিজের সত্তাকে বিসর্জন দিয়ে শংকর জাতি হয়ে জীবন যাপন করছে। এদিক দিয়ে দেখতে গেলে রক্ত ও ভাষায় বাঙালি ছিল অনার্য । আর্য রক্ত যেটুকু মিশে ছিল সেটুকুও মৌলিক না যৌগিক তার নিয়ে বিস্তর সন্দেহ আছে। পাল রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ার দুশো বছরের মধ্যে প্রচলিত মাগধী ও প্রাকৃতে অপভ্রংশ থেকে সংপৃক্ত হয়ে জন্ম হয় বাংলা ভাষার। খ্রীষ্টিয় দশম শতকে প্রথম বাংলা ভাষায় গান ও সাহিত্য সৃষ্টির নমুনা পায় ।
সর্বপ্রথম ঐতরেয় আরণ্যকে বঙ্গ নামে একটি জাতির উল্লেখ পাওয়া যায় ।মহাকবি কালিদাসের রঘুবংশ কাব্যে পূর্ববঙ্গ অধিবাসীদের সুহ্ম অর্থাৎ ভীরু এবং পশ্চিমবঙ্গের অধিবাসীদের সাহসী বলে উল্লেখ করেন। মহাভারত অনুযায়ী অঙ্গ ,বঙ্গ , কলিঙ্গ পুন্ড্র ও সুহ্মএই পাঁচটি পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতাগণ একই বংশের সন্তান ছিলেন বলে অনুমান করা হয়(রাজাবলি)। গৌতম দীরঘতমাস নামে এক ঋষির ঘরে নাকি তিনি জন্মগ্রহণ করেন ।
প্রাচীনকালে বঙ্গদেশ বা বাংলাদেশ বলে কোন নির্দিষ্ট সীমানা ছিলনা । যুগে যুগে এর সীমানা ও আয়তন পরিবর্তন হয়েছে ।বর্তমানকালে যে অঞ্চলে আমরা বসবাস করি সেটাই অধুনা বাংলা নামে খ্যাত। প্রাচীন হিন্দু যুগে সমগ্র বাংলাদেশের বিশিষ্ট কোন নির্দিষ্ট সীমানা ও নাম ছিল না । ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত ছিল। উত্তরবঙ্গে পুন্ড্র ও বরেন্দ্র, পশ্চিমবঙ্গে রায় ও তাম্রলিপ্ত ,দক্ষিণ ও পূর্ব বঙ্গে বঙ্গ, সমতট , হরিকেল ও বাঙাল প্রভৃতি দেশ নামে পরিচিত ছিল। উত্তর ও পশ্চিম বঙ্গের কিছু কিছু অংশ আবার গৌড় নামেও পরিচিত ছিল ।বিশাল এই সীমানার সঠিক ও বাস্তবতা নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি।
বাঙালি জাতি মৌলিক কোনো জাতি নয় । এটি একটি সংকর জাতি ।প্রায় ১৫শো বছর আগে আর্য- অনার্য মিশ্রিত প্রাকৃত ভাষা থেকে বিবর্তনের মাধ্যমে বাংলা ভাষার উদ্ভব। ব্রাহ্ম লিপি থেকে সিদ্ধম লিপির মাধ্যমে আধুনিক বাংলা ভাষার সৃষ্টি হয় ।চর্যাপদ এই ভাষার আদি নিদর্শন ।অষ্টম শতক থেকে বাংলায় রচিত সাহিত্যের বিশাল ভান্ডার এর মধ্য দিয়ে অষ্টাদশ শতকে বাংলা ভাষার বর্তমান রূপ ধারণ করে।
বাঙালি জাতি চিরকাল নিম্নবিত্ত, অচ্ছুত এবং অবজ্ঞেয় বৃত্তিজীবী ।কামার, কুমোর , হাঁড়ি, ডোম ,মুচি ,মেথর, চন্ডাল ,কোল, মুন্ডা ,সাঁওতাল প্রভৃতি ৩৬ জাতির পরিচয় নিয়ে বাংলার বিভিন্ন জনপদ ছড়িয়ে আছে। বাঙালি জাতির আজ ও তার কৌলিন্য ফুটে ওঠেনি ।এইসকল শুদ্র জাতি বাংলায় সংখ্যাগরিষ্ঠ ।এদের কিছু অংশ গুপ্ত ও পাল আমলে শাসকগোষ্ঠীর সান্নিধ্যে এসে বৈদ্য ও ব্রাহ্মণ স্তরে উন্নীত হয়। নৃতাত্ত্বিক বিশ্লেষকগণ মনে করেন বাঙালির রক্তে নিষাদও কিরাত রক্তের মিশ্রণ ঘটেছে। ব্রাহ্মণ ও আর্য রক্তের মিশ্রণ কম। এদিক দিয়ে দেখতে গেলে রক্ত ও ভাষায় বাঙালি ছিল অনার্য আর্য রক্ত যেটুকু মিশেছিল সেটুকুও মৌলিক না যৌগিক।
পাল রাজত্ব প্রতিষ্ঠা হওয়ার দুশো বছরের মধ্যে প্রচলিত ও প্রাকৃতিক অপভ্রংশ থেকে উদ্ভূত হয়ে বাংলা ভাষার জন্ম হয়।* খ্রিস্টীয় দশম শতকে বাংলা ভাষায় গান ও সাহিত্য সৃষ্টির নমুনা পাওয়া যায়। স্বভাবতই বাংলার রাষ্ট্রক্ষমতা বারবার বিদেশিদের দ্বারা চালিত হয়েছে। দেশীয় সংস্কৃতিকে ও বারবার নাকানি-চুবানি খেতে হয়েছে। লক্ষ্য করা যায় বাঙালির ভাষা সংস্কৃতিতেও বিদেশি সম্পদের সংমিশ্রণ বেশি । এক্ষনে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ধর্মীয় বিশ্বাস ,লোকাচার প্রভৃতিতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ধারকদের প্রচ্ছন্ন মদতে ( ব্রাহ্মণ কায়স্থ বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষ) ধর্ম ঠাকুর, শীতলা ,মনসা প্রভৃতি দেবদেবীর লোকাচার মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে । শাসকগণ বুঝতে পেরেছিলেন এদের চটালে রাজ্য চালানো মুশকিল হয়ে পড়বে । তাই বিভিন্ন মঙ্গলকাব্যে পরিলক্ষিত হয় নিম্ন জাতের দেবদেবীকে উচ্চবর্ণের সমর্থনের জন্য বহু সংগ্রাম করতে হয়েছে। যেমন মনসাদেবীকে নিজের মাহাত্ম্য প্রতিষ্ঠিত করার জন্য কিভাবে চাঁদ সওদাগরকে ব্যবহার করতে হয়েছে। নিতে হয়েছে ছলনার আশ্রয় ।
বাঙলা লিপি:-
বাংলা লিপি একটি লিখন পদ্ধতি। এটা মনিপুরী ,বাকবরক, অসমীয়া ভাষা লেখার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। পূর্ব নাগরী লিপি থেকে নাকি এই লিপির উদ্ভব বলে ভাষা বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন। অনেকে আবার সিদ্ধং লিপি থেকে উদ্ভূত হয়েছে বলেও মত প্রকাশ করেন। বর্তমানে এই ভাষা পঞ্চম সর্বাধিক ব্যবহৃত লিখন পদ্ধতি। খ্রীষ্টিয় একাদশ শতক থেকে এর প্রচলন হয় বলে বিশেষজ্ঞগণ মত প্রকাশ করেন।পালি -প্রাকৃত, অপভ্রংশ,অবহঠঠ এবং পরে প্রাচীন বাংলার জন্ম হয়। প্রায় ১৫শো বছর আগে আর্য-অনার্য মিশ্রিত প্রাকৃত ভাষা থেকে বিবর্তনের মাধ্যমে এই বাংলা ভাষার উদ্ভব ।ব্রাহ্মী লিপি থেকে সিদ্ধং লিপির মাধ্যমে আধুনিক বাংলা লিপির সৃষ্টি। চর্যাপদ এ ভাষার আদি নিদর্শন। অষ্টম শতকে বাংলায় রচিত সাহিত্যের বিশাল ভান্ডারের মধ্য দিয়ে অষ্টাদশ শতকের বাংলা ভাষা তার বর্তমান রূপ ধারণ করে আছে ।
এই ভাষা একটি ইন্দো-আর্য ভাষা। যা দক্ষিণ এশিয়ার বাঙালি জাতির লিখিত ও কথ্য ভাষা । ভারতের পশ্চিমবঙ্গ , ত্রিপুরা, আন্দামান- নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ, উড়িষ্যা ,মেঘালয় ঝাড়খন্ড এবং দক্ষিণ আসামের বরাক উপত্যকার লোকের লেখা ও মুখের ভাষা।
বাংলাদেশ বহুদিন প্রাগার্য জাতি দ্বারা অধ্যুষিত ছিল ।পুন্ড্র -সুহ্ম-বঙ্গ- রাঢ়- পুলিন্দ ও শবর জাতির ছিল পৈত্রিক বাসভূমি। এই সূত্রে বাংলার ধর্ম-কর্ম ও সাহিত্যের মূলে প্রতিষ্ঠিত লৌকিক সংস্কার। মাতৃতান্ত্রিক সমাজের প্রভাব এদেশের মর্মমূলে প্রসারিত হয়ে আছে। মাতৃ- দেবতা কে কেন্দ্র করে গ্রাম বাংলার আনাচে কানাচে বুড়িমা, রঙ্কিনী, বিবিধ চন্ডীদেবী ,মা মনসা,মা- শীতলা মা- ষষ্টি স্থান -বা থান ইত্যাদি পরিলক্ষিত হয় । বাংলা মঙ্গলকাব্যে এই লৌকিক সংস্কারের পূর্ণ পরিচয় আমরা দেখতে পাই ।বাংলার অধিকাংশ দেব-দেবতা লৌকিক। ঘর জামাই ভিখারী শিব,কোপনচন্ডী , গোয়ার গোবিন্দ মহারানী কাহ্ন প্রভৃতি লোক চরিত্র আমরা দেখতে পাই। বৃক্ষ পাথর, জীবজন্তুকে দেবতা কল্পনার ভাবটি প্রবল । লৌকিক বাংলা কাব্যে জাত -ধর্ম ও দর্শন, বিবাহ, স্ত্রী আচার ইত্যাদি বর্ণনাতে লৌকিক সংস্কারে প্রাধান্য দেখতে পাই ।এই লৌকিক সংস্কার একদিন জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মের অঙ্গীভূত হইয়া বাঙালি সংস্কৃতিতে
মিশে যায় ।বাঙালির ব্রত, পার্বণে কঠোর কৃচ্ছ সাধনায় , দেবতার নামে" হত্যা "দেওয়া জৈনধর্মের প্রভাবের ফল ।বাংলা রথযাত্রায়, স্নানযাত্রায় বৌদ্ধ দেবতাদের প্রভাব পড়েছে। এই সকল লৌকিক ভাবের উপর আর্য- ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রভাব প্রতিষ্ঠায় বাংলার ধর্ম সাহিত্য বিকাশের মূল সূত্র।
বাঙালির মানুষ চিন্তাই প্রাচীন সাহিত্যের প্রভাব কোনক্রমেই অনস্বীকার্য নয় ।
সারাবিশ্বে প্রায় 26 কোটিরও বেশি লোক বাংলা ভাষা ব্যবহার করে। বাংলার নবজাগরণ ও বাংলার সাংস্কৃতিক বিবিধতাকে এক সূত্রে গঠিত করে ।বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ তথা বাংলাদেশ গঠনে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে 1947থেকে 1952 খ্রিস্টাব্দে পূর্ব বাংলার সংগঠিত ও অসংগঠিত সংস্থা বাংলা ভাষা আন্দোলনে সামিল হয় । এই আন্দোলন বাঙালির অস্তিত্ব রক্ষার যোগসুত্র স্থাপন করে 1 952 খ্রিস্টাব্দে একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে প্রতিবাদী আন্দোলনকারীরা মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেন । 1987 সালে পূর্ববাংলা বর্তমানে বাংলাদেশে বাংলা ভাষা প্রচলন আইনচালু হয় । 1 952 সালের ভাষা শহীদদের সংগ্রামের স্বীকৃতি স্বরূপ হাজার 1999 সালে ইউনেস্কো 21শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করার ঘোষণা দেয় ।
তথ্য সূত্র:-
গৌড়রাজমালা --রমা প্রসাদ চন্দ ১৯০৯
রাজতরঙ্গ-----মৃত্যুঞ্জয় শর্মা ,অধ্যাপক (ফোর্টউইলিয়ম কলেজ)১৮০৮
বাংলাদেশ জাতীয় বিশ্বকোষ--- ২য় সংস্করণ ঢাকা
বাঙালি সংস্কৃতি--- গোলাম মুরশিদ
বাংলার ইতিহাস ---রাখালদাস বন্দোপাধ্যায়
বাংলাদেশের ইতিহাস প্রাচীন যুগ--শ্রী সমরেশ মজুমদার
রিয়াজুস সালেতিন এ হিস্ট্রি অফ বেঙ্গল -গোলাম হোসেন সেলিম ১৯০২
################
আবদুস সালাম
প্রয়াস শ্রীকান্তবাটি মাদারল্যান্ড
ডাক রঘুনাথগঞ্জ
মুর্শিদাবাদ ৭৪২২২৫
প্রয়াস শ্রীকান্তবাটি মাদারল্যান্ড
ডাক রঘুনাথগঞ্জ
মুর্শিদাবাদ ৭৪২২২৫
Comments
Post a Comment