লোকজ সুর থেকে আধুনিক নাগরিক কবিতা : আজিজুর রহমানের সৃজনযাত্রা
উৎপল সরকার
বাংলা গান ও কবিতার ইতিহাসে
আজিজুর রহমান এমন এক নাম, যিনি লোকজ অনুভব, নাগরিক যন্ত্রণা এবং মানবিক বোধকে একই সুরে বেঁধেছিলেন।
তাঁর লেখা গান কিংবা কবিতায় বারবার ফিরে আসে মানুষ, সমাজ ও জীবনের অন্তর্গত টানাপোড়েন। সহজ ভাষা, গভীর জীবনবোধ আর অন্তর থেকে উঠে আসা সুর—এই ছিল তাঁর
শিল্পীসত্তার মূল পরিচয়।
১৯১৭ সালের ১৮ অক্টোবর
তৎকালীন পূর্ববঙ্গের নদীয়া জেলার (বর্তমান বাংলাদেশ) কুষ্টিয়া থানার হাটশ হরিপুর
গ্রামে এক জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আজিজুর রহমান। পিতা বশির উদ্দিন
প্রামানিক ও মাতা সবুরুন নেছা। শৈশবেই পিতৃহারা হওয়ার ফলে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক
শিক্ষাজীবন বাধাগ্রস্ত হয়। তবে সেই অভাবই তাঁকে জীবনের অন্য এক পাঠশালায় নিয়ে
যায়—লোকজ যাত্রা, নাটক ও গ্রামীণ সংস্কৃতির জগতে।
শৈশব ও কৈশোরে স্থানীয়
যাত্রা ও নাট্যদলে যুক্ত হয়ে আজিজুর রহমান অভিনয়, গান ও মঞ্চভাষার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হন। কুষ্টিয়ায় তিনি নিজ উদ্যোগে
একটি নাট্যদল গঠন করেন এবং শিলাইদহের ঠাকুরবাড়িতে নাটক মঞ্চস্থ করেন।
রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবাহী সেই প্রাঙ্গণে নাট্যচর্চা তাঁর শিল্পীজীবনে এক বিশেষ
মাত্রা যোগ করেছিল।
১৯৩৮ সাল থেকে শুরু হয় তাঁর
নিয়মিত সাহিত্যচর্চা। কবিতা ও গান লিখে তিনি পাঠাতে থাকেন তৎকালীন গুরুত্বপূর্ণ
পত্রিকাগুলিতে—সওগাত, মোহাম্মদী, আজাদ, নবশক্তি, আনন্দবাজার, ভারতবর্ষ, বুলবুল, শনিবারের চিঠি প্রভৃতি পত্রিকায় নিয়মিত প্রকাশ পেতে থাকে
তাঁর লেখা। এই সময়েই তিনি নিজস্ব কণ্ঠস্বর তৈরি করেন—যেখানে লোকজ ভাবনার সঙ্গে যুক্ত হয় আধুনিক নাগরিক সংবেদন।
১৯৫৪ সালে আজিজুর রহমান ঢাকা
বেতারে (বর্তমান বাংলাদেশ বেতার) নিজস্ব শিল্পী হিসেবে যোগ দেন। বেতার তাঁর গানের
জন্য একটি বৃহৎ শ্রোতৃমণ্ডলী তৈরি করে দেয়। তাঁর গান হয়ে ওঠে মানুষের মুখের কথা—সহজ অথচ গভীর, আধ্যাত্মিক অথচ
মানবিক। ‘ভবের নাট্যশালায় মানুষ চেনা
দায় রে’, ‘কারো মনে তুমি দিও না আঘাত’, ‘পৃথিবীর এই পান্থশালায়’—এই গানগুলো আজও শ্রোতার মনে মানবিক সতর্কবার্তা হিসেবে ধ্বনিত হয়।
আজিজুর রহমান প্রায় দুই
হাজারেরও বেশি গান রচনা করেছেন। প্রেম,
সমাজ, আত্মোপলব্ধি, দেশ ও মানুষের প্রতি
দায়বদ্ধতা—সবকিছুই তাঁর গানে স্থান
পেয়েছে। ‘পলাশ ঢাকা কোকিল ডাকা আমারই
দেশ ভাই রে’ কিংবা ‘দেখ ভেবে তুই মন,
আপন
চেয়ে পর ভালো’—এই গানগুলো কেবল সুরের আনন্দ
নয়, মূল্যবোধের পাঠও বয়ে আনে।
গানের পাশাপাশি কবিতাতেও তাঁর
অবদান অনস্বীকার্য। তিনি প্রায় তিনশোর বেশি কবিতা রচনা করেন। ‘নৈশনগরী’, ‘মহানগরী’, ‘ফুটপাত’, ‘বুড়িগঙ্গার তীরে’, ‘সোয়ারীঘাটের সন্ধ্যা’,
‘ঢাকাই
রজনী’—এই কবিতাগুলিতে ফুটে ওঠে শহরের
শ্রমজীবী মানুষ, নদীর পাড়ের
নিঃসঙ্গতা, নাগরিক জীবনের ক্লান্তি ও
স্বপ্নভঙ্গের ছবি। তাঁর কবিতা একদিকে যেমন সময়ের দলিল, অন্যদিকে তেমনই ব্যক্তিগত বেদনাবোধের শিল্পরূপ।
শিশু-কিশোর সাহিত্যেও তিনি
উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন। ‘ডাইনোসরের রাজ্যে’, ‘জীবজন্তুর কথা’,
‘ছুটির
দিনে’—এই গ্রন্থগুলি শিশুদের
কল্পনাজগৎকে সমৃদ্ধ করেছে। এছাড়া ‘এই দেশ এই মাটি’ ও ‘উপলক্ষের গান’-এর মতো গ্রন্থে তিনি দেশ, সমাজ ও মানুষের সঙ্গে শিল্পীর সম্পর্ককে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছেন।
ব্যক্তিগত জীবনে আজিজুর রহমান
ছিলেন নির্লোভ ও কর্মনিষ্ঠ। ১৯৩১ সালে ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা উপজেলার ফুলহরি
গ্রামের ফজিলাতুন নেছার সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। তাঁদের সংসারে ছিল তিন ছেলে ও চার
মেয়ে। দীর্ঘ সৃজনশীল জীবনের ইতি ঘটে ১৯৭৮ সালের ৯ সেপ্টেম্বর।
আজিজুর রহমানের শিল্প আজও
প্রাসঙ্গিক, কারণ তিনি মানুষের কথা বলেছেন—সহজ ভাষায়, গভীর বিশ্বাসে। লোকজ
সুর থেকে নাগরিক কবিতা—এই দুইয়ের
সেতুবন্ধনেই তাঁর স্থায়ী মূল্য। বাংলা সংস্কৃতির মানচিত্রে তিনি রয়ে গেছেন এক
নীরব কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠস্বর হিসেবে।
আজিজুর রহমানের সৃষ্টির
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তাঁর ভাষা-চেতনা। তিনি ইচ্ছে করেই দুর্বোধ্যতা
এড়িয়ে গেছেন। মনে করতেন, সাহিত্য ও গান
মানুষের কাছে পৌঁছনোর মাধ্যম, দূরত্ব তৈরির উপকরণ
নয়। তাই তাঁর লেখায় যেমন রয়েছে গ্রামীণ জীবনের সহজ শব্দভাণ্ডার, তেমনই আছে শহুরে জীবনের ক্লান্ত উচ্চারণ। এই দ্বৈত
অভিজ্ঞতাই তাঁকে সমকালীন অনেক স্রষ্টার থেকে আলাদা করে তোলে।
সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক
পরিবর্তনও তাঁর সৃষ্টিকে প্রভাবিত করেছিল। দেশভাগ-পরবর্তী বাস্তবতা, উদ্বাস্তু জীবনের যন্ত্রণা কিংবা দ্রুত বদলে যাওয়া নগরজীবন—সবই তাঁর কবিতা ও গানে প্রতিফলিত হয়েছে, কিন্তু কখনও উচ্চকিত ভাষায় নয়। নীরব সংবেদনা ও মানবিক
দৃষ্টিভঙ্গিই ছিল তাঁর প্রধান শক্তি।
আজকের সময়ে দাঁড়িয়েও
আজিজুর রহমানের গান ও কবিতা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—শিল্পের আসল কাজ মানুষকে আরও মানবিক করে তোলা।
=================
উৎপল সরকার, নিউটাউন, আলিপুরদুয়ার, জেলা :- আলিপুরদুয়ার।বর্তমানে কর্মসূত্রে শিলিগুড়ির বাসিন্দা।
ইমেইল আইডি:-utpalwbmo@gmail.com.
Comments
Post a Comment