আধুনিক সমাজ ও সক্রেটিস: প্রশ্নের ভেতর দিয়ে মানুষের যাত্রা
✍️ শিবাশিস মুখার্জী
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোর। রাত প্রায় সাড়ে দশটা। আলো জ্বলছে শুধু দর্শন বিভাগের এক কোণে। একজন ছাত্র বসে আছে টেবিলের সামনে, বই খুলে। তার সামনে প্লেটোর Apology। সক্রেটিসের বিচার চলছে। ছাত্রটি হঠাৎ থেমে যায়। তার মনে প্রশ্ন জাগে—
দুই হাজার পাঁচশো বছর আগে একজন মানুষ প্রশ্ন করেছিল বলে মৃত্যুদণ্ড পেলেন।
আজ?
আজ কি প্রশ্ন করা নিরাপদ?
আজ কি সক্রেটিস বেঁচে থাকতে পারতেন?
এই প্রশ্ন থেকেই আমাদের আলোচনার সূচনা।
সক্রেটিস কোনো বই লিখে যাননি। তিনি রেখে গেছেন এক পদ্ধতি—প্রশ্নের পদ্ধতি। তাঁর মূল শক্তি ছিল তাঁর অজ্ঞতার ঘোষণা: "আমি জানি যে আমি জানি না।" এই স্বীকারোক্তি ছিল জ্ঞানের সূচনা। তিনি মানুষের বিশ্বাস, নৈতিকতা, রাজনৈতিক ধারণা—সবকিছুকে যুক্তির আলোয় পরীক্ষা করতেন।
আধুনিক সমাজে আমরা প্রায়ই তথ্যকে জ্ঞান বলে ভুল করি। গুগল আমাদের তথ্য দেয়, কিন্তু প্রজ্ঞা দেয় না। সক্রেটিস আমাদের শেখান—তথ্য নয়, পরীক্ষা জরুরি। প্রশ্ন ছাড়া জ্ঞান অন্ধ।
আজকের যুগে এই পদ্ধতি আগের চেয়ে প্রাসঙ্গিক। কারণ আজ আমরা তথ্যের চাপে আক্রান্ত, কিন্তু সত্যের অভাবে ভুগছি।
আমরা প্রযুক্তির যুগে বাস করছি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সোশ্যাল মিডিয়া, বিশ্বায়ন—সবকিছু দ্রুত বদলাচ্ছে। কিন্তু মানুষের মৌলিক প্রশ্ন কি বদলেছে?
আমি কে?
আমার জীবনের অর্থ কী?
ন্যায় কী?
সত্য কী?
এই প্রশ্নগুলো আজও একই রকম তীক্ষ্ণ।
আধুনিক সমাজ বাহ্যিকভাবে উন্নত, কিন্তু ভেতরে গভীর অস্থির। মানসিক উদ্বেগ, পরিচয় সংকট, নৈতিক বিভ্রান্তি—এই সমস্যাগুলো ক্রমেই বাড়ছে। সক্রেটিস বলেছিলেন, "পরীক্ষিত জীবনই মূল্যবান।" আধুনিক সমাজের সংকট এই যে, আমরা জীবন যাপন করি, কিন্তু পরীক্ষা করি না।
আধুনিক সমাজ মতাদর্শে বিভক্ত। রাজনৈতিক, ধর্মীয়, সামাজিক বিশ্বাস মানুষকে গোষ্ঠীতে ভাগ করে। কিন্তু সক্রেটিস কোনো গোষ্ঠীর ছিলেন না। তিনি প্রশ্ন করতেন—নিজেদের বিশ্বাসের ভিত কতটা দৃঢ়?
আজকের সোশ্যাল মিডিয়া যুগে মানুষ প্রায়ই নিজের মতের বিপরীত মত শুনতে চায় না। আমরা echo chamber-এ বাস করি। সক্রেটিস এই পরিবেশে অত্যন্ত অস্বস্তিকর হতেন। কারণ তিনি প্রতিটি বিশ্বাসকে প্রশ্ন করতেন।
এই প্রশ্ন-সংস্কৃতি গণতন্ত্রের প্রাণ। কিন্তু প্রশ্ন যখন অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে, তখন সমাজ তাকে প্রত্যাখ্যান করতে চায়। সক্রেটিসের বিচার আমাদের মনে করিয়ে দেয়—গণতন্ত্রও কখনো কখনো প্রশ্নকে সহ্য করতে পারে না।
আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা প্রায়ই তথ্য সরবরাহে ব্যস্ত। কিন্তু সক্রেটিস দেখিয়েছিলেন—শিক্ষা মানে জ্ঞান ঢেলে দেওয়া নয়, বরং জ্ঞানের জন্ম দিতে সাহায্য করা। তিনি নিজেকে বলতেন "midwife of ideas"।
আজ যদি শিক্ষা কেবল পরীক্ষামুখী হয়, তবে তা সক্রেটীয় নয়। সক্রেটিসের শিক্ষা মানুষকে চিন্তা করতে শেখায়, নিজের অবস্থান যাচাই করতে শেখায়। বিশ্ববিদ্যালয় যদি প্রশ্নকে ভয় পায়, তবে তা সক্রেটিসের আদর্শ থেকে বিচ্যুত।
সক্রেটিসের মৃত্যুই তাঁর দর্শনের চূড়ান্ত প্রমাণ। তিনি পালিয়ে যেতে পারতেন। তাঁর বন্ধুরা সুযোগ দিয়েছিল। কিন্তু তিনি আইনের প্রতি সম্মান দেখিয়ে মৃত্যুকে গ্রহণ করলেন।
এই সিদ্ধান্ত আধুনিক সমাজে নৈতিকতার আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। আজকের বিশ্বে ব্যক্তি প্রায়ই ব্যক্তিস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়। সক্রেটিস দেখিয়েছেন—নৈতিক সততা ব্যক্তিগত নিরাপত্তার চেয়ে বড় হতে পারে।
তিনি আমাদের শেখান, নাগরিক হওয়া মানে শুধু অধিকার ভোগ করা নয়; সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোও নাগরিকতার অংশ।
আধুনিক মানুষ প্রযুক্তিগতভাবে সংযুক্ত, কিন্তু মানসিকভাবে একাকী। ভোগবাদ মানুষকে বাহ্যিক সাফল্য দেয়, কিন্তু ভেতরের শূন্যতা পূরণ করে না। এখানেই সক্রেটিসের "নিজেকে জানো" আহ্বান গভীর অর্থ পায়।
আত্মপরীক্ষা মানে নিজেকে প্রশ্ন করা—আমি যা করছি তা কি সত্যিই আমার? আমি কি সমাজের প্রত্যাশা অনুযায়ী বাঁচছি, না নিজের সত্য অনুযায়ী?
এই আত্মজিজ্ঞাসা মানুষকে অস্থির করতে পারে। কিন্তু এই অস্থিরতাই জাগরণের সূচনা। সক্রেটিসের প্রাসঙ্গিকতা এখানেই—তিনি উত্তর দেন না; তিনি প্রশ্ন জাগান।
আধুনিক প্রযুক্তি মানুষের ক্ষমতা বাড়িয়েছে। কিন্তু নৈতিকতা ছাড়া ক্ষমতা বিপজ্জনক। সক্রেটিসের নৈতিক অনুসন্ধান আমাদের মনে করিয়ে দেয়—জ্ঞান যদি নৈতিক না হয়, তবে তা বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
আজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জিন সম্পাদনা, নজরদারি প্রযুক্তি—এসবের নৈতিক প্রশ্ন অত্যন্ত জটিল। সক্রেটিসের পদ্ধতি আমাদের শেখায়, প্রতিটি প্রযুক্তিগত অগ্রগতিকে নৈতিকভাবে পরীক্ষা করা জরুরি।
সক্রেটিস আরামদায়ক নন। তিনি মানুষকে অস্বস্তিতে ফেলেন। কিন্তু এই অস্বস্তিই উন্নতির চালিকা শক্তি। আধুনিক সমাজ যদি স্থবির না হতে চায়, তবে তাকে প্রশ্নকে গ্রহণ করতে হবে।
সক্রেটিস আমাদের শেখান—সমাজের স্থিতাবস্থা চিরস্থায়ী নয়। সত্যের অনুসন্ধান অবিরাম।
সক্রেটিসের প্রাসঙ্গিকতা দ্বিমাত্রিক—ব্যক্তিগত ও সামাজিক।
ব্যক্তিগত স্তরে:
তিনি আত্মজ্ঞান ও নৈতিক সততার পথ দেখান।
সামাজিক স্তরে:
তিনি সমালোচনামূলক চিন্তা ও গণতান্ত্রিক সংলাপের ভিত্তি স্থাপন করেন।
এই দুই স্তর মিলেই আধুনিক সমাজে তাঁর গুরুত্ব প্রতিষ্ঠিত।
রাতের সেই ছাত্রটি বই বন্ধ করে। তার মনে হয়—সক্রেটিস হয়তো আজও বেঁচে থাকতেন, কিন্তু জনপ্রিয় হতেন না। তিনি হয়তো ট্রোলড হতেন, বিতর্কিত হতেন, কিন্তু প্রশ্ন থামাতেন না।
আধুনিক সমাজে সক্রেটিসের প্রাসঙ্গিকতা এখানেই—
তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন, সভ্যতার অগ্রগতি প্রশ্নের উপর দাঁড়িয়ে।
তিনি শেখান, জ্ঞান মানে তথ্য নয়; আত্মপরীক্ষা।
তিনি দেখান, নৈতিক সাহস ব্যক্তিগত নিরাপত্তার চেয়ে বড়।
যতদিন মানুষ সত্য, ন্যায় ও আত্মপরিচয়ের সন্ধান করবে,
ততদিন সক্রেটিস আধুনিক সমাজের ভেতর এক অদৃশ্য শিক্ষক হয়ে থাকবেন।
কারণ শেষ পর্যন্ত—
সক্রেটিস কোনো ব্যক্তি নন,
তিনি এক চেতনা।
এক প্রশ্ন।
এক জাগরণ।
.................................
শিবাশিস মুখার্জী
ফ্যাকাল্টি, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়
২৫৬, এন এস সি বস রোড,
এটলাস মোড়, কলকাতা ৭০০ ১৪৬
Comments
Post a Comment