নিঝুম রাতের পদধ্বনি
জলি সরকার ( চারুলতা )
শহরের কোলাহল থেকে অনেক দূরে, পাহাড়ের খাঁজে অবস্থিত এই পুরনো বাংলোটা আজ অনিমেষের একমাত্র আশ্রয়। বাইরে প্রবল বৃষ্টি আর ঝোড়ো হাওয়ার দাপট। অনিমেষ ডাইনিং টেবিলের ওপর রাখা ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে ছিল, কিন্তু তার মনোযোগ বারবার চলে যাচ্ছিল জানালার দিকে। এই নির্জনতায় সে এসেছে নিজের পরবর্তী উপন্যাসের কাজ শেষ করতে, কিন্তু গত দুদিন ধরে তার মনে হচ্ছে, এই বাড়িতে সে একা নেই।
রাত তখন এগারোটা। বাংলোর কেয়ারটেকার রতন কাকা সন্ধ্যার পরই চলে গেছে নিচের গ্রামে। যাওয়ার সময় সে অদ্ভুত একটা কথা বলেছিল— "দাদাবাবু, যা-ই হোক না কেন, বারান্দার দিকের ওই নীল রঙের দরজাটা আজ খুলবেন না।"
অনিমেষ তখন কথাটা হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু এখন এই নিঝুম রাতে ওই নীল দরজাটার কথা মনে পড়তেই তার শিরদাঁড়া দিয়ে একটা হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল। হঠাৎ ওপরতলার করিডোরে একটা ভারী কিছুর পতনের শব্দ হলো।
'ধুপ!'
শব্দটা খুব একটা জোরে নয়, কিন্তু এই নিস্তব্ধতায় তা কামানের গোলার মতো শোনাল। অনিমেষ হাতের কফি কাপটা টেবিলের ওপর রাখল। তার হাত কাঁপছে। সে নিজেকে বোঝাল, হয়তো কোনো ইঁদুর বা বিড়াল হবে। কিন্তু সে ভালো করেই জানে, এই বাংলোয় কোনো প্রাণী নেই।
অনিমেষ একটা টর্চ আর রান্নাঘর থেকে একটা ছোট ছুরি হাতে নিয়ে ধীর পায়ে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে লাগল। কাঠের সিঁড়িগুলো প্রতিটি পদক্ষেপে গোঙানির মতো শব্দ করছে। ওপরতলায় পৌঁছাতেই সে দেখল, করিডোরের একদম শেষে ওই নীল দরজাটা আধখোলা অবস্থায় আছে।
তার স্পষ্ট মনে আছে, রতন কাকা যাওয়ার সময় দরজাটা তালাবন্ধ করে গিয়েছিল। তাহলে এখন খুলল কে?
অনিমেষ দরজার দিকে এগোতে লাগল।নিজের হৃদপিণ্ডের ধকধকানি এখন কানে তালা লাগিয়ে দিচ্ছে। ঠিক দরজার সামনে পৌঁছাতেই সে শুনতে পেল একটা অস্ফুট ফিসফিসানি। মনে হচ্ছে কেউ যেন নিচু স্বরে কাঁদছে।
"আমাকে যেতে দাও... ওরা আসছে..."
অনিমেষের কপালে ঘাম জমেছে। সে সাহসে ভর করে দরজাটা ধাক্কা দিয়ে পুরোটা খুলে দিল। টর্চের আলো ফেলতেই তার রক্ত হিম হয়ে গেল। ঘরের ভেতর কেউ নেই, কিন্তু মেঝের ওপর চাপ চাপ রক্ত। আর সেই রক্ত দিয়ে লেখা একটা নাম: 'অনিমেষ'।
ঠিক সেই মুহূর্তে নিচের তলায় সজোরে মেইন দরজা খোলার শব্দ হলো। ঝড়ের ঝাপটায় নয়, কেউ যেন সজোরে লাথি মেরে দরজাটা ভেঙে ঢুকেছে। অনিমেষ দ্রুত ঘরের কোণে আলমারির আড়ালে লুকিয়ে পড়ল।
নিচ থেকে ভারী বুটের আওয়াজ ওপরে উঠে আসছে। প্রতিটা ধাপ যেন মৃত্যুর ঘণ্টা বাজাচ্ছে। সিঁড়ির শেষ মাথায় এসে শব্দটা থামল। করিডোরে একটা ছায়া দীর্ঘ হয়ে পড়ছে।
অনিমেষ বুঝতে পারল, এটা কোনো ভূত নয়। এটা রক্ত-মাংসের কোনো বিপদ। তার মনে পড়ে গেল তিন বছর আগের সেই ঘটনা। তার উপন্যাসের সাফল্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সেই কালো সত্যিটা। সেদিন এক নিরপরাধ মানুষের আইডিয়া চুরি করে সে বিখ্যাত হয়েছিল, আর সেই মানুষটি অপমানে আত্মহত্যা করেছিল। আজ কি তবে তারই প্রতিশোধ?
ভারী বুটের আওয়াজ এখন ঠিক দরজার বাইরে। লোকটা ঘরে ঢুকল। অন্ধকারে তার চেহারা দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু তার হাতে একটা চকচকে দা। লোকটা ধীর গলায় হেসে বলল ----
"অনিমেষবাবু, গল্প লেখা শেষ হলো? আজ আপনার গল্পের শেষ পাতাটা আমি লিখব।"
অনিমেষ আর চুপ করে থাকতে পারল না। সে আলমারির আড়াল থেকে বেরিয়ে এসেই লোকটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ধস্তাধস্তি শুরু হলো অন্ধকারে। ছুরি আর দায়ের সংঘর্ষে স্ফুলিঙ্গ ঠিকরে বেরোচ্ছে। লোকটার গায়ে অমানুষিক শক্তি।
এক পর্যায়ে অনিমেষকে ধাক্কা দিয়ে লোকটা দেওয়ালে চেপে ধরল। লোকটার মুখ এখন অনিমেষের খুব কাছে। টর্চের অবশিষ্ট আলোয় অনিমেষ দেখল, লোকটার মুখটা ঝলসানো। এই তো সেই সমীরণ, যে তিন বছর আগে মারা গিয়েছিল বলে সবাই জানত!
------"তুমি... তুমি তো বেঁচে আছ?" অনিমেষ অতিকষ্টে বলল।
-----"বেঁচে আছি, কিন্তু নরকের আগুনে পুড়ে। আজ তোমাকেও সেই আগুনে নিয়ে যাব," সমীরণ দা উঁচিয়ে ধরল।
ঠিক সেই মুহূর্তে জানালার বাইরে এক প্রবল বজ্রপাত হলো। ঘরের ভেতরটা মুহূর্তের জন্য আলোয় ভরে উঠল। সেই সুযোগে অনিমেষ তার হাতের ছুরিটা সমীরণের পেটে আমূল বসিয়ে দিল। সমীরণ চিৎকার করে পিছিয়ে গেল।
অনিমেষ আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে জানালার কাঁচ ভেঙে নিচে ঝোপের ওপর ঝাঁপ দিল। বৃষ্টির জল আর কাদায় মাখামাখি হয়ে সে পাগলের মতো দৌড়াতে লাগল নিচের গ্রামের দিকে। পেছনে শোনা যাচ্ছিল সমীরণের সেই পৈশাচিক চিৎকার।
পরদিন সকালে পুলিশ আর রতন কাকার সাথে যখন অনিমেষ বাংলোয় ফিরল, সেখানে কেউ ছিল না। নীল দরজাটা আগের মতোই তালাবন্ধ। মেঝের সেই রক্তের দাগ বা সেই নাম— কিছুই নেই। যেন কাল রাতের ঘটনাটা কেবল একটা দুঃস্বপ্ন ছিল।
রতন কাকা শুধু ধীর গলায় বলল, ------"দাদাবাবু, আমি বলেছিলাম ওই দরজাটা খুলবেন না। ওই ঘরে যা আছে, তা বাইরের কেউ দেখতে পায় না, শুধু যার পাপ আছে সে-ই পায়।"
অনিমেষ নিজের কাঁপাকাঁপা হাতের দিকে তাকাল। তার হাতে এখনো সেই কালকের রাতের ক্ষতের চিহ্ন। সে বুঝতে পারল, সমীরণ মানুষ ছিল, না কি আত্মা, সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হলো, তার নিজের অতীত তাকে কোনোদিন মুক্তি দেবে না।
পুলিশ বাংলো তন্নতন্ন করে খুঁজল, কিন্তু ধস্তাধস্তির কোনো চিহ্ন বা রক্তের ছিটেফোটাও পাওয়া গেল না। ইন্সপেক্টর চ্যাটার্জি বিদ্রূপের হাসি হেসে বললেন, -------"অনিমেষবাবু, অতিপ্রাকৃত গল্প লিখতে লিখতে আপনার কল্পনাশক্তি বোধহয় একটু বেশিই ডানা মেলেছে। পাহাড়ে একলা থাকলে এমন হ্যালুসিনেশন হওয়া অস্বাভাবিক নয়।"
অনিমেষ কিছু বলল না। সে জানে সে কী দেখেছে। রতন কাকা এককোণে দাঁড়িয়ে অদ্ভুত এক দৃষ্টিতে অনিমেষের দিকে তাকিয়ে ছিল। সেই দৃষ্টিতে ভয় নয়, বরং এক ধরনের করুণা ছিল।
বাংলো ছেড়ে অনিমেষ যখন নিজের গাড়িতে উঠল, তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। সে ঠিক করেছে এই অভিশপ্ত পাহাড় সে আজই ছাড়বে। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ দিয়ে সে গাড়ি ছুটিয়ে দিল। কিন্তু মাইল পাঁচেক যাওয়ার পর হঠাৎ তার নজরে এল গাড়ির ব্যাক-ভিউ মিররটাতে ।
পেছনের সিটে একটা কালো ডায়েরি পড়ে আছে।
অনিমেষের বুকটা ধক করে উঠল। এটা তার ডায়েরি নয়। সে সাবধানে হাত বাড়িয়ে ডায়েরিটা তুলে নিল। প্রথম পাতা খুলতেই তার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে এল। সেখানে একদম টাটকা কালিতে লেখা:
"তুমি কি ভেবেছিলে,ছুরিটা আমায় মারলে? ওটা তো ছিল তোমার বিবেকের ওপর শেষ আঘাত। এখন থেকে আমি তোমার কলমে থাকব, তোমার চিন্তায় থাকব... চিরকাল।"
হঠাৎ গাড়ির ভেতরের এসিটা অস্বাভাবিক ঠান্ডা হয়ে গেল। অনিমেষ অনুভব করল, তার পাশের খালি সিটটা যেন কারোর ভারে সামান্য দেবে গেল। অথচ সেখানে কেউ নেই। স্টিয়ারিং ধরা অনিমেষের হাত দুটো জমে পাথর হয়ে যাচ্ছে।
ঠিক তখনই তার মোবাইলে একটা মেসেজ টোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল তার পাবলিশারের মেসেজ:
"অনিমেষ, তোমার নতুন উপন্যাসের শেষ চ্যাপ্টারটা মেইল করার জন্য ধন্যবাদ। জাস্ট অসাধারণ হয়েছে! সমীরণের মৃত্যুর ওই টুইস্টটা আগে কেউ ভাবেনি। কিন্তু তুমি মেইলটা পাঠালে কখন? ভোর চারটেয়?"
অনিমেষের হাত থেকে ফোনটা পড়ে গেল। ভোর চারটেয় সে প্রাণের ভয়ে জঙ্গলে দৌড়াচ্ছিল, ল্যাপটপ ছিল বন্ধ। তাহলে মেইলটা করল কে?
সে আবার লুকিং গ্লাসের দিকে তাকাল। এবার সেখানে কোনো ছায়া নেই, কিন্তু কাঁচের ওপর বাষ্প জমেছে, আর সেই বাষ্পে আঙুল দিয়ে কেউ লিখে দিয়েছে— 'গল্প মাত্র শুরু।'
রাস্তার ঠিক সামনেই একটা তীব্র বাঁক। অনিমেষ ব্রেক কষার চেষ্টা করল, কিন্তু প্যাডেলটা একদম আলগা। গাড়িটা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পাহাড়ের গিরিখাতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। শেষ মুহূর্তে অনিমেষ পাশে তাকাতেই দেখল, সমীরণ তার পাশেই বসে আছে। তার ঝলসানো মুখে এবার এক তৃপ্তির হাসি।
পাহাড়ের নির্জনতায় একটা বিকট শব্দ হলো, তারপর সব নিস্তব্ধ।
পরদিন খবরের কাগজে ছোট করে একটা খবর বেরোল— "বিখ্যাত লেখক অনিমেষের রহস্যমৃত্যু। গাড়ি দুর্ঘটনায় খাদে পড়ে প্রাণ হারালেন তিনি। আশ্চর্যের বিষয়, দুর্ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ একটি পাণ্ডুলিপি উদ্ধার করেছে, যার শেষ লাইনে লেখা ছিল: 'পাপের কোনো শেষ নেই, শুধু রূপান্তর থাকে'।"
*******
জলি সরকার ( চারুলতা )
রাজচন্দ্রপুর সুকান্ত পল্লী -১
নিশ্চিন্দা ঘোষপাড়া, বালি হাওড়া
পিন ----711227
Comments
Post a Comment