[কিছু কথা : ছোটগল্পের সম্রাট মঁপাসার Useless Beauty পড়ে মোহিত হয়ে গিয়েছিলাম একসময়ে । মানবচরিত্র চিত্রণে তাঁর কলমের জাদু আমায় প্রলুব্ধ করেছে গল্পটিকে ভাবান্তরে ।
স্হান,কাল পাত্র বদলে গেলেও কাহিনিটির মূল সুরই বজায় রাখার প্রয়াস আমার। প্রশংসনীয় হলে সেটা সেই মহাজনেরই প্রাপ্য । নিন্দনীয় হলে তা নেহাতই বামনের চন্দ্রাস্পর্শাভিলাষ হেতু ক্ষমার্হ ।]
মন্দিরা গাড়িতে উঠে চাবি দিয়ে স্টার্ট করতেই কাঁচে টোকা পড়লো। অরিন্দম এ সময় আবার কি বলতে চায়! অধৈর্য অরিন্দম আবার টোকা মারার আগেই একরাশ বিরক্তি নিয়ে দরজা খুললো মন্দিরা।
' আমায় একটু লিফ্ট দাও তো ! দরকার আছে, জলদি কর! আমি না হয় স্টিয়ারিং এ বসছি! '
'তোমার তো আজ ব্যাঙ্গালোর যাওয়ার কথা ছিল তো! গেলে না?' মন্দিরা অবাকমিশ্রিত বিরক্তিতে জিজ্ঞাসা করে। 'গেলে তোমার সুবিধা খুব হত তাই না ! ইচ্ছে করেই গেলাম না ধরে নাও !'
কুটিল গলায় অরিন্দম বলে। 'তোমার সাথে কথা আছে আমার!' হিস্ হিসে গলায় বলে সে। মন্দিরা ততক্ষণে স্টিয়ারিং ছেড়ে পাশের সিটে চলে এসেছে। ' কি বলার আছে বল ! আমার এক জায়গায় যাওয়ার আছে, দেরী হয়ে যাচ্ছে ! তুমি আমায় রাসবিহারী মোড়ে নামিয়ে দাও ! আই ক্যান হায়ার আ ক্যাব দেন !' মন্দিরার গলায় নিস্পৃহতা।
ফ্লাইওভার থেকে নামতেই একটা বাইকের সঙ্গে ধাক্কা লাগত একটু হলে। বড্ড রেকলেসলি ড্রাইভ করে অরিন্দম চিরদিন। 'তুমি তাহলে এবারও এ্যাবর্ট করবেই! ইউ সিলি বিচ্' ! হাউ ক্যুড আ মাদার ক্যান থিংক সাচ্?'
মন্দিরা বলে 'সেই একই বোরিং প্রশ্ন অরি ! উত্তরটা তুমিও জান। রণ আর সুমি বড় হচ্ছে ! আই নেভার ট্রিট দেম লাইক টিপিক্যাল আ সৎমা। ওরা আমার কাছে গ্রেসফুলি ব্লেসড্। আমার কনসিভ্ করার ইচ্ছা নেই ! হলে তোমায় বলব না হয়।'
অরিন্দম চুপ করে সামনের রাস্তায় চোখ রাখে। তার প্রথম বিয়ের স্মৃতি একদম সুখকর নয়। আর্সিয়া বাচ্চা দুটোকে একরকম ফেলেই ফ্রান্স চলে যায়। বাধ্য হয়ে অরিন্দম আবার বিয়ে করে। প্রতিষ্ঠিত ফার্মা কোম্পানির মালিক যার গ্যারাজের দুটো গাড়ি র একটা অডি আর অন্যটা বি এম ডব্লু, তার কি আর পাত্রীর অভাব। মন্দিরা তখন দিল্লীতে। ফ্যাশান ডিজাইন কোর্স করে সবেমাত্র একটা অ্যাড এ্যাসাইনমেন্ট পেয়েছে। পেজ থ্রির পার্টিতে অরিন্দমের সঙ্গে আলাপ। একটু এজেড ম্যাচিওর্ড লুকের পুরুষমানুষের প্রতি ক্রাশ খাওয়া ওর অভ্যেস, ফলতঃ আলাপ থেকে ডেটিং তারপর বিয়ে। এই তিন বছরে দুবার প্রেগনেন্ট হয়েও এ্যাবরশান করিয়ে নিয়েছে মন্দিরা। কোনওমতেই আর একটা প্রাণের দায়িত্ব নিতে ও রাজী নয়।
অরিন্দম বাঁহাতে জোর করে মন্দিরা হাত চেপে ধরে। ককিয়ে ওঠে মন্দিরা। ' তুমি আর বাচ্চাটা ফেলবে না মণি। আর দিস্ ইজ ফাইন্যাল নাউ ! ' আহত সর্পিনীর মত মন্দিরা বলে ' তোমার মতলব আমি জানি। ইউ আর জেলাস অফ মাই এ্যাডমেয়ারার্স। প্রেগনেন্সি আর টিপিক্যাল মাদারহুডের প্রেশারে আমার মডেলিং কেরিয়ার তুমি শেষ করে দিতে চাও ! বাচ্চা মানুষ করার মেশিন বানাতে চাও আমায়! তাই না ? '
অরিন্দম ততক্ষণে লেক কালিবাড়ির সামনে গাড়ি পার্ক করে ফেলেছে। মন্দিরা বাধ্য হয় অরিন্দমের সঙ্গে নামতে। অরিন্দম ইমোশনাল ব্ল্যাকমেল করে মন্দিরাকে বলে ' প্লিজ এবার বল! উইথড্র ইওর ডিসিশন। ' মন্দিরা ধীর গলায় বলে 'তুমি আমায় বিশ্বাস করো তো?' অরিন্দম চাপা গলায় বলে 'ক্যারি অন!' মন্দিরা আরও শান্ত গলায় ব্রহ্মাস্ত্র নিক্ষেপ করে। ' দিস টাইম বস, দ্য বেবী ইজ নট ইওর্স!'
ফেরার পথটা দুজনেই পাথর হয়ে বসে থাকে। ঝড়ের পূর্বাভাসের মত থমথমে। অরিন্দম অসম্ভব জোরে ড্রাইভ করে বাড়ি আসে। মন্দিরাও রোজকার মত বাচ্চাদের ঘরে ঢোকে নির্জনতার নির্মম আবর্ত বুকে চেপে।
ডিনার টেবিলে অরিন্দম টিপ্পনী ছোঁড়ে মন্দিরার উদ্দেশ্যে। আমি জানি দ্যাট কালপ্রিট ইজ 'মিলিন্দ' ! আদি' দের পার্টিতে যে তোমার সাথে ফ্লার্ট করছিল তো। ফেসবুকে যার পিকচার গ্লসারিতে তোমার ফোটো ভর্তি থাকে ! দ্যাট সান অফ আ হোর আমার লাইফটা বরবাদ করতে পারবে না জানু! আই উইল স্ক্রু হিজ অ্যাস নাউ!' চিকেন স্যুপটা শেষ করে একই রকম শীতল গলায় মন্দিরা বলে, ' আমার সিদ্ধান্তে তুমি খুশী তো এবার ! গুডনাইট!'
তিনদিন অফিস যায়নি অরিন্দম। খালি ড্রিঙ্ক করেছে একলা ! এক তীব্র যন্ত্রণা ওকে আহত করছে বারবার। হি ইজ আ মিলিয়নিয়ার ! শেষে কিনা একটা পাতি ফ্যাশন ফোটোগ্রাফার এসে মাঝখানে ক্ষীর খেয়ে চলে যাবে। এটা হতে দেওয়া যায়না। টলতে টলতে মন্দিরার সাজঘরে ঢোকে সে।
মোলায়েম জঙ্ঘা ছুঁয়ে মন্দিরার হাত তখন বডিলোশন মাখা পেলব মসৃণ পা দুটোকে ম্যাসেজ করছিল পরম যত্নে। রাজহংসের ডানার মতো নিয়মিত পেডিকিওর করা পা দুটি সত্যি মনোরম।হঠাৎ অরিন্দমের ছায়া পড়ে ড্রেসিংটেবিলের বেলজিয়ান গ্লাসের আয়নায়। ঈষৎ বিস্রস্ত পোশাক সামলে মন্দিরা স্বাভাবিক স্বরে বলে 'বলো!'
অরিন্দম বসে পড়ে মাটিতে। 'মণি ! আই ক্যান নট টেক দিস এনি মোর! তুমি বল ! ইটস্ আ লাই ! জাস্ট আ প্র্যাকটিক্যাল জোক ! প্লিজ মণি, আমি আর সত্যি পারছি না ! '
এই তিনদিনেই আর একটু বয়েস বেড়ে গেছে অরিন্দমের। একটা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়া পাহাড়ের অবশেষ যেন। মন্দিরা অবাক হয়, এই মানুষটার একাকীত্ব তাকে কখনো স্পর্শ করেছিল।আরও অবাক করে যে সেই স্পর্শ এই তিনটি বছরে সেটা সম্পূর্ণভাব মিলিয়ে যেতে গিয়েও বেশ খানিকটা রয়ে গেছে। অরিন্দমের মাথাটা কোলের ওপর রাখে মন্দিরা। ' আমি আর মা হতে চাইনা অরি। যারা আছে ওদের নিয়ে আমার কোনও প্রবলেম নেই। ছিলওনা। মেয়েরা যে শুধু মা হবার জন্যই পৃথিবীতে আসে না ! একটা জীবনে একবুক নিঃশ্বাস নিয়ে বাঁচার জন্যেও আসে ! সেটা তুমি বুঝতে এত সময় লাগালে ! তোমার বিশ্বাসটুকুও এতো ঠুনকো ! '
অরিন্দম কোল থেকে মন্দিরাকে যেন নতুন দেখে। কি অপার জ্যোৎস্নার মায়া যেন মন্দিরার মুখে এসে জমেছে আজ। সে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে শুধু। তার করুণ মুষ্ঠি শিশুর মত আঁকড়ে থাকে মন্দিরার আঙুল গুলো। পরম নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ার আগে সে অস্ফূটে বলে 'উই আর ফ্রেন্ডস ! ইয়েসসসসস্ উই আর.. !'
কাঁচাপাকা চুলের সেই অসহায় শিশুটিকে আর একবার বুকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছা করে মন্দিরার,ভীষণই।
..........................

Comments
Post a Comment