মেশকাতুন নাহার
মানবসভ্যতার ইতিহাসে রাষ্ট্রকে আমরা প্রায়ই দৃশ্যমান শক্তির মানদণ্ডে পরিমাপ করি—অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি, প্রযুক্তির উৎকর্ষ, সামরিক সক্ষমতা কিংবা অবকাঠামোর বিস্তার দিয়ে। কিন্তু এসবই রাষ্ট্রের বহিরঙ্গ। প্রকৃত রাষ্ট্রচেতনা নির্মিত হয় অদৃশ্য এক অন্তঃসলিলায়—মানুষের মনন, নৈতিকতা ও মানবিকতার গভীর প্রবাহে। আর সেই অন্তঃসলিলার উৎস খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হয় জীবনের আদিগৃহে, মায়ের কোলে। মাতৃত্ব কেবল একটি সম্পর্ক নয়; এটি এক অনন্ত প্রতিষ্ঠান—যেখানে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নীরবে, অদৃশ্য হাতে, শব্দহীন প্রজ্ঞায় নির্মিত হয়।
মা মানে প্রথম স্পর্শ, প্রথম ভাষা, প্রথম আস্থা। শিশুর জন্য পৃথিবী কোনো ভৌগোলিক মানচিত্র নয়; তা হলো মায়ের চোখের আয়নায় প্রতিবিম্বিত এক অনুভূতির ভুবন। সে পৃথিবীকে চেনে মায়ের কণ্ঠস্বরের স্বরলিপিতে, মায়ের হাসির আলোয়, মায়ের শাসনের মৃদু কঠোরতায়। এখানেই রাষ্ট্রের মৌলিক বীজ রোপিত হয়। কারণ রাষ্ট্রের যে নাগরিক একদিন আইন প্রণয়ন করবে, বিচার করবে, নেতৃত্ব দেবে বা শ্রম দেবে—তার নৈতিক মানচিত্র প্রথম আঁকা হয় মায়ের অন্তর্লোকে।
দার্শনিক দৃষ্টিতে মাতৃত্ব একটি সৃজন-প্রক্রিয়া। যেমন প্রকৃতি নিজেকে নবায়িত করে ঋতুচক্রের ভেতর দিয়ে, তেমনি সমাজ নিজেকে নবায়িত করে মাতৃত্বের ধারাবাহিকতায়। একটি শিশু যখন মায়ের কাছ থেকে ভাষা শেখে, তখন সে কেবল শব্দ উচ্চারণ করতে শেখে না; সে শেখে অর্থের ভেতরে থাকা মূল্যবোধ। "সত্য বলো", "অন্যায় করো না", "মানুষকে কষ্ট দিও না"—এই সহজ বাক্যগুলোই রাষ্ট্রের সংবিধানের গভীরতম নৈতিক অনুচ্ছেদ হয়ে ওঠে। মায়ের শিক্ষায় জন্ম নেয় সহমর্মিতা; সহমর্মিতা থেকে জন্ম নেয় ন্যায়বোধ; আর ন্যায়বোধ থেকেই জন্ম নেয় সুস্থ রাষ্ট্রব্যবস্থা।
রাষ্ট্রতত্ত্বের আলোচনায় আমরা প্রায়ই সামাজিক চুক্তির কথা বলি, নাগরিক অধিকার ও কর্তব্যের ভারসাম্যের কথা বলি। কিন্তু নাগরিকের চেতনা নির্মাণের প্রথম অনুশীলন হয় গৃহে—মায়ের তত্ত্বাবধানে। একটি শিশু যখন খেলনা ভাগ করে নিতে শেখে, তখন সে ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক ন্যায্যতার পাঠ নিচ্ছে। যখন সে ভুল স্বীকার করতে শেখে, তখন সে ভবিষ্যতের বিচারব্যবস্থার ভিত্তি গড়ে তুলছে। যখন সে ভিন্নমতকে সহ্য করতে শেখে, তখন সে গণতন্ত্রের সহনশীলতা আয়ত্ত করছে। সুতরাং মা কেবল পরিবারের কেন্দ্র নন; তিনি রাষ্ট্রীয় নৈতিকতার আদিম শিক্ষক।
কিন্তু সমাজের নির্মম বৈপরীত্য হলো—যে শক্তি রাষ্ট্রকে নীরবে ধারণ করে, তাকে প্রায়ই প্রান্তে ঠেলে রাখা হয়। মাতৃত্বকে আবেগের অলংকারে বন্দি করা হয়, অথচ তার বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামাজিক ক্ষমতাকে অস্বীকার করা হয়। গৃহের অদৃশ্য শ্রম, সন্তানের মানসিক পরিচর্যা, নৈতিক শিক্ষা—এসবকে "স্বাভাবিক দায়িত্ব" বলে ধরে নেওয়া হয়; যেন তা কোনো স্বীকৃতি বা বিনিয়োগের দাবি রাখে না। এই দৃষ্টিভঙ্গি কেবল নারীর প্রতি অবিচার নয়; এটি রাষ্ট্রের আত্মবিরোধিতা। কারণ যে রাষ্ট্র তার ভবিষ্যৎ নির্মাতার বিকাশে বিনিয়োগ করে না, সে নিজের ভিত্তিকেই দুর্বল করে।
মাতৃত্বকে দার্শনিকভাবে বোঝার জন্য আমাদের আবেগের সীমা অতিক্রম করতে হবে। মা মানে শুধু ত্যাগের প্রতিমা নয়; তিনি বুদ্ধির উৎস, সিদ্ধান্তের অংশীদার, নীতিনির্ধারণের সম্ভাব্য কণ্ঠস্বর। তাঁর শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে কেবল একটি ব্যক্তির অধিকার রক্ষা করা নয়; তা মানে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নাগরিকদের মান উন্নত করা। একটি শিক্ষিত মা যখন সন্তানের প্রশ্নের উত্তর দেন, তখন তিনি যুক্তির অনুশীলন শেখান। একটি সচেতন মা যখন সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন, তখন তিনি সন্তানের মধ্যে সাহসের বীজ বপন করেন। একটি আত্মমর্যাদাশীল মা যখন নিজের অধিকার রক্ষা করেন, তখন তিনি প্রজন্মকে আত্মসম্মানের দর্শন শেখান।
ইতিহাসের গভীরে তাকালে দেখা যায়, যেসব সমাজ জ্ঞানভিত্তিক ও মানবিক উন্নয়নে অগ্রসর হয়েছে, তারা মাতৃত্বের শক্তিকে স্বীকৃতি দিয়েছে। শিক্ষিত ও ক্ষমতায়িত মায়েরা সমাজে প্রশ্ন তোলেন, পরিবর্তনের দাবি জানান, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণ করেন। তাঁদের চিন্তা পরিবার পেরিয়ে সমাজে প্রবাহিত হয়; সমাজ পেরিয়ে রাষ্ট্রে। এক্ষেত্রে মাতৃত্ব একটি নীরব বিপ্লব—যা অস্ত্র বা স্লোগান ছাড়াই সমাজকে রূপান্তরিত করে।
রাষ্ট্রের উন্নয়ন পরিকল্পনায় তাই মাতৃত্বকে কেন্দ্রীয় দর্শনে পরিণত করা জরুরি। বাজেটে মাতৃস্বাস্থ্য, শিক্ষায় নারীর সমান সুযোগ, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও মর্যাদা—এসব কেবল কল্যাণমূলক কর্মসূচি নয়; এগুলো রাষ্ট্রগঠনের কৌশলগত বিনিয়োগ। কারণ একজন অবদমিত ও অসুরক্ষিত মা কখনোই স্বাধীন ও সৃজনশীল নাগরিক গড়ে তুলতে পারেন না। আর স্বাধীন নাগরিক ছাড়া শক্তিশালী রাষ্ট্র কেবল কাগুজে কাঠামো।
মাতৃত্বের আরেকটি দার্শনিক মাত্রা হলো—অসীম সহনশীলতা ও ক্ষমাশীলতার অনুশীলন। মা সন্তানের ভুলকে সংশোধন করেন, ধ্বংস করেন না; পথ দেখান, পরিত্যাগ করেন না। রাষ্ট্র যদি এই মাতৃত্বের নীতি ধারণ করতে পারে—শাস্তির চেয়ে সংশোধন, প্রতিহিংসার চেয়ে পুনর্গঠন, বিভেদের চেয়ে সংহতি—তবে রাষ্ট্রও মানবিক হয়ে ওঠে। সুতরাং মাতৃত্ব কেবল পরিবারে নয়, রাষ্ট্রচিন্তায়ও এক আদর্শ রূপক।
অবশেষে বলা যায়, একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার নাগরিকের অন্তরলোকে নিহিত। আর সেই অন্তরলোকের প্রথম স্থপতি মা। তিনি নীরবে সময়ের বুকে ভবিষ্যৎ আঁকেন; তাঁর কোলে জন্ম নেয় ভাষা, তাঁর স্পর্শে জাগে আস্থা, তাঁর শিক্ষায় গড়ে ওঠে নৈতিক সাহস। মাকে যদি আমরা কেবল আবেগের আসনে বসাই, তবে তাঁর শক্তিকে ক্ষুদ্র করি; কিন্তু যদি তাঁকে রাষ্ট্রচেতনার কেন্দ্রে স্থান দিই, তবে রাষ্ট্র নিজেই আলোকিত হয়।
মাতৃত্ব তাই কোনো ব্যক্তিগত সম্পর্কের সীমা নয়; এটি এক মহাকাব্যিক প্রতিষ্ঠান—যেখানে জাতির আত্মা গঠিত হয়। মায়ের মর্যাদা, শিক্ষা ও স্বাধীনতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া মানে ভবিষ্যৎকে শক্তিশালী করা। কারণ রাষ্ট্রের প্রকৃত স্থপতি দৃশ্যমান প্রাসাদ নির্মাণ করেন না; তিনি নির্মাণ করেন মানুষ। আর মানুষ নির্মাণের সেই অনন্ত কারিগর—মা।
----------------------------
মেশকাতুন নাহার
প্রভাষক, সমাজকর্ম বিভাগ
কচুয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজ,
কচুয়া, চাঁদপুর।।

Comments
Post a Comment