এক সাহসিনী সিন্ধু কন্যার কথা
জয়শ্রী ব্যানার্জি
কিছুদিন আগেই চলে গেলো আন্তর্জাতিক নারী দিবস। একদা International Women's Day শুরু হয়েছিল মূলত নারীদের শ্রম অধিকার, ভোটাধিকার ও সমান মর্যাদার দাবিকে সামনে এনে।
১৯০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে নারী শ্রমিকদের বড় আন্দোলন এই দিবসের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
১৯১০ সালে সমাজতান্ত্রিক নেত্রী Clara Zetkin আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালনের প্রস্তাব দেন।
এরপর ধীরে ধীরে এটি বিশ্বজুড়ে নারীর অধিকার ও সমতার সংগ্রামের প্রতীকী দিবস হয়ে ওঠে।
কিন্তু এর সাথে আরেকটি বিষয় না বললেই নয়, তা হলো নারীদের সত্যিকারের সাহসিকতা । নিজের এবং সমাজের অনেক মেয়েদের উপযুক্ত ভাবে গড়ে তোলার জন্য যে সাহসিকতা ও পরিশ্রমের দরকার হয় সেই সাহসিকতা ।
যদিও বর্তমানে এই সাহসিকতা বলতে নারীবাদীরা অন্য অর্থ ধরে নিয়েছে । ঔদ্ধত্য আর অশ্লীলতা কেই এখনকার যুগে সাহসিকতা বলে মনে করছেন আজকের বহু নারী ।
যায় হোক তাদের কথা ছেড়ে আজ এক সাহসিনীর কথা বলব ।তিনি এক প্রাচীন ভারতীয় নারী। সিন্ধুবাসিনী কন্যা। তাঁর নাম সূর্য দেবী ।
তাঁর পিতা ছিলেন ব্রাহ্মণ রাজা চাচের পুত্র সিন্ধুর শেষ হিন্দু নরপতি রাজা দাহির এবং সিন্ধুর রাই রাজবংশের পর ব্রাহ্মণ রাজবংশ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অরোর থেকে শাসন করতেন ।তিনি তাঁর পিতার জ্যেষ্ঠা কন্যা ছিলেন । মা রানী বাই ।তাঁর অপর দুই বোন ছিলেন পিরমল দেবী ও যোধা দেবী ।
৭১১ খ্রিস্টাব্দে মহম্মদ বিন কাসিমের নেতৃত্বে উমাইয়া খিলাফত রাজ্য আক্রমণ করে । তাঁর বাবা আরব সেনাপতি মহম্মদ বিন কাসিমের হাতে সিন্ধু নদীর তীরে তার রাজবংশ এবং আরবদের মধ্যে সংঘটিত অরোরের যুদ্ধে নিহত হন ।
রাজার বিধবা স্ত্রী রানী বাই রাওয়ার দুর্গে আক্রমণকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। যখন তিনি বুঝতে পারেন যে তিনি জয় করতে পারবেন না, তখন তিনি জওহর রীতিতে আত্মহত্যা করেন। ব্রাহ্মণবাদ শহর পতনের পর, মৃত রাজার দ্বিতীয় রানী রানী লাদি দাহিরের দুই কন্যা, রাজকন্যা সূর্য দেবী এবং পরিমল দেবীর সাথে বন্দী হন। বিজয়ী মুহাম্মদ বিন কাসিম যৌতুক হিসেবে রাণী লাদি কে নিজের জন্য গ্রহণ করেন, তখন দুই রাজকন্যা, সূর্য দেবী ও পিরমল দেবী অবিবাহিতা তরুণী কুমারী ছিলেন তাই তাঁদের কে খলিফার ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছিল ।
এবং দামেস্কের রাজধানীতে ওনার হারেমে খলিফা সুলায়মান ইবনে আবদুল মালিকের কাছে উপহার হিসেবে পাঠানো হয়েছিল ।
এই অপমান অত্যাচার আর পিতার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে সূর্য দেবী প্রতিজ্ঞা নেন ।তিনি মনোবল হারাননি । তিনি কাসিমের বিরুদ্ধে মনে মনে একটি পরিকল্পনা নেন ।
চাচনামায় একটি বর্ণনা দেওয়া হয়েছে যেখানে মহম্মদ বিন কাসিমের মৃত্যুতে সূর্য দেবীর ভূমিকা ছিল। বিবরণ অনুসারে, খলিফা যখন সূর্য দেবীকে ধর্ষণ করতে চেয়েছিলেন, তখন তিনি তাকে বলেছিলেন যে তিনি আর কুমারী নন, কারণ মহম্মদ বিন কাসিম তাকে এবং তার বোনকে আগেই ধর্ষণ করেছিলেন। এর জবাবে, খলিফা রেগে মহম্মদ কাসিম কে গরুর চামড়ায় মুড়িয়ে সিরিয়ায় পাঠানোর নির্দেশ দেন, এবং এর ফলে সেখানে শ্বাসরোধে কাসিমের মৃত্যু হয়।
এই বর্ণনায় তাঁদের পিতার মৃত্যুর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য এই ছলনা করার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। খলিফা যখন খলিফার অসম্মান বা অবাধ্যতাকারীদের পরিণতি বর্ণনা করার জন্য সূর্য দেবীকে মহম্মদ বিন কাসিমের মৃতদেহ দেখান, তখন তিনি উত্তর দেন যে তিনি মহম্মদ বিন কাসিমের সম্পর্কে মিথ্যা বলেছিলেন, কারণ তিনি চাননি যে তিনি বা তার বোন খলিফার উমাইয়া হারেমে দাসী হন এবং তিনি তাঁর পিতার হত্যাকারীর উপর প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিলেন ।
এই ছলনা আবিষ্কার করার পর, খলিফা অনুতপ্ত হয়েছিলেন এবং বোনদের দেয়ালে জীবন্ত কবর দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে লিপিবদ্ধ আছে।
সেটা ৭১৫ সালে ঘটেছিল ।
ওই সময় শত্রু দের সামনে দাঁড়িয়ে যেভাবে তিনি নিজের সাহসিকতা দেখিয়েছিলেন তা ভাবলে কাঁটা দেয় । ইতিহাসে এমন অনেক সাহসিনী আছে সবার কথা আমরা হয়তো জানি না বা কখনও শুনলেও ভুলে গেছি হয়তো কিন্তু তাঁদের সেই সব সাহসের চমক প্রদ ঘটনা গুলো আজও রোমাঞ্চ এনে দেয় । তাঁদের কে কুর্নিশ । হিন্দু নারী সূর্য দেবীর কথাও তেমনি ইতিহাসের পাতায় উজ্জ্বল থাকবে চিরকাল ।

Comments
Post a Comment