অদিতি চ্যাটার্জি
হলদে এলবামের মাঝে উঁকি মারে কিশোরী মা, দুই বিনুনি, সামনে এসে পড়া কিছু কুচো চুল ঝকঝকে দুটো চোখ। শাড়িটা কী লাল পাড় ছিল? মনে করাতে চেষ্টা করি কিন্তু মা-র আজকাল অনেক কথাই মনে পড়ে না। ভুলে যান, এই যেমন দেখুন কখন থেকে বারান্দায় বসে আছে, এক দৃষ্টে তাকিয়ে নিম গাছটার দিকে। কী দ্যাখো মা? গাছের ঐ কচি পাতা গুলো কি? নাকি গাছের নিচে পড়ে থাকা শুকনো, কালচে সবুজ পাতা গুলো? মা ও মা...
আমার মামা বাড়ি ছিল ফরিদ পুরে কিন্তু দাদু যেহেতু সরকারি চাকরি করতেন দেশ ভাগের জন্য 'উদ্বাস্তু ' নামটা মামা বাড়িকে কিনতে হয়নি, কলকাতার যাদবপুরে চলে এসেছিলেন হাওয়া বুঝে। তবে বিশাল পরিবারটা ভেঙে গিয়েছিল টুকরো টুকরো করে, যেমন এই দেশটাকে ভাঙার ফলে কত মানুষের স্বপ্ন, সম্পত্তি এমনকি শরীরও টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছিল সেই রকম আর কি।
দাদুর মূলধন বলতে ছিল সরকারি চাকরি আর 'পরম করুণাময়ের' কৃপায় পরিবারটি ছিল ছোট । শখ-আহ্লাদও প্রায় নেই ফলে এদের তিনটে সন্তানের শিক্ষা-পুষ্টিতে কার্পণ্য তাঁরা করেননি। মোটের ওপর আরামেই তাঁদের ছেলেবেলা, কিশোর বেলা কেটেছিল , বলতে পারেন ।
মা-কে একটু হাঁটতে পাঠালাম সবিতা দিদির সাথে, সামনের মাঠে। বিকালের দিকে বেশ সুন্দর হাওয়া উঠেছে । ঐ যে রাস্তাটা মা এক পা এক পা করে হেঁটে পার হচ্ছেন , আজ কমলা ছাপা শাড়িতে। মা কে এইভাবে ধীরে ধীরে হাঁটতে দেখবো সত্যি ভাবিনি । আসলে কি জানেন মা খুব ভালো দৌড়াতো স্কুলে পড়ার সময়, সাইকেল চালানোতে তো ওস্তাদ । পরে ঘর সংসারের কাজে সব কিছুতেই মা -কে দৌড়াতেই দেখি। তাই আরকি মনটা খারাপ হয়। সে যাই হোক, সাতষট্টি সালে মা স্কুল ফাইনাল পাশ করেন, অঙ্ক নিয়ে পড়াশোনা করেতে চান। মা-র রেজাল্ট ছিল দেখার মতো, মা-র মাস্টার মশাইরা চেয়েছিলেন মা অঙ্ক নিয়ে গবেষণা করুক এবং অধ্যাপক হোক। মা-ও সেই স্বপ্নটাকে নিজের মধ্যে বুনে ছিল। তাই খাবার টেবিলে মা বলেছিল অঙ্ক নিয়ে পড়াশোনা করবে প্রেসিডেনসি কলেজে ।
সাতষট্টি সাল পশ্চিমবঙ্গ তখন ' আগুন ' ভাত দুবেলা জোটে না সামর্থ্য থাকলেও, খাদ্য সংকট রে বাবা। তার সাথে মাথা চাড়া দিচ্ছে অন্য এক অতি বাম রাজনীতি, বোমা , খুন শুরু হয়ে গেছে । কলোনি গুলোতে রাতের অন্ধকারে চাপা ফিসফাস ...
হোক মেয়ে আমার মেধাবী, দরকার নেই কলেজ স্ট্রিটে পড়তে যাওয়ার। সিদ্ধান্ত নিলেন মামা । তখন মামা রেলে চাকরি করছে, তিনিই বাড়ির 'গার্জেন '। দাদু ব্যাক ফুটে চলে যাচ্ছে ধীরে ধীরে, যদিও দাদু রিটায়ার করেননি নিয়মিত মাইনে পান। তবুও ...
অঙ্ক নিয়ে গবেষণা, অধ্যাপক হওয়ার স্বপ্ন মামা এক নিমেষে ভেঙে দিলেন, আসলে সময় সাপেক্ষ পড়াশোনা, খরচাপাতি এবং কলকাতার পরিবেশ, নাঃ দায়িত্বশীল পুরুষের ভূমিকা পালন করেছিলেন সেই রবিবার দুপুরে খাওয়ার টেবিলে তিনি । তবে মা অবাক হয়ে গিয়েছিল দাদু কে দেখে, ছেলে কে এতো ভয়! একবারও প্রতিবাদ করলেন না।
আচ্ছা মা, তোমার কি সেই রবিবার দুপুরে খাওয়ার টেবিলের কথা এখনো মনে পড়ে? আমাকে আর ভাইয়া কে কতবার শুনিয়েছো । আমরা দেখতাম তোমার আগুন ভরা চোখে দাদু আর মামার প্রতি কি তাচ্ছিল্য ।
মা আর কোথাও অঙ্ক নিয়ে পড়াশোনা করলেন না, কাছাকাছি একটা কলেজে বাংলা নিয়ে পড়ে সাধারণ ভাবে পাশ করে জুটিয়ে নিলেন টেলিফোন অফিসের চাকরি । আকাশে ওড়ার জন্য পাখি এইবার রেডি।
তাই কি তুমি বাবা কে বিয়ে করলে ? ঘটি বাড়িতে বিয়ে তাও আবার প্রেম করে , কাগজে সই করে আবার লোক-ও খাওয়াওনি। বাপ্ রে ! পঁচাত্তরের মধ্যবিত্ত কলকাতার কোনো বাড়ির মেয়ের পক্ষে এই পদক্ষেপ গ্রহণ করা ... নাঃ বড্ড বেশি সাহস ছিল মা তোমার। আচ্ছা এটা কি মামা-র প্রতি তোমার প্রতিশোধ ছিল? সেই যে রোজগারের খোঁটা দিয়েছিল, ভাত খাওয়ার সময় ।
মামা বাড়ি, ঠাকুরদাদা বাড়ি আমার আর ভাইয়ার কাছে দূরেই রয়ে গেল। বেহালার ভাড়া বাড়িটার কথা আজকাল খুব মনে পড়ে। মা তুমি ওখানেই বাবার কাছে পড়াশোনা করে ব্যাঙ্কে চাকরিটা পেলে। পড়ার টেবিল , তোমার অঙ্কের খাতা আমাদের দেখাতে।
আরো মনে পড়ে, পড়ালেখার ফাঁকি তুমি একদম সহ্য করতে পারতে না । কী মার খেয়েছি। কেন এতো মারতে মা ?
রেজাল্ট দেখে আদর যেন কবে করলে? মাধ্যমিকের ? নাকি উচচমাধ্যমিকের ? উচচমাধ্যমিকের ই তো । একটা মিশনের বাংলা মাধ্যম স্কুলের ছাত্রী ছিলাম আমি । আমার আর ভাইয়ার পড়ালেখা, নাচ, আঁকা সবের খেয়াল তুমি রাখতে। এখন বুঝি আমরা বিশেষ করে আমি তোমার ছিলাম 'প্রজেক্ট ওয়ার্ক ' বা' প্রেজেনটটেশান' । সে যাই হোক উচচমাধ্যমিকের ঐ অসম্ভব ভালো রেজাল্টের পর আমরা মামা বাড়িতে গেছিলাম, মনে আছে?
তুমি তো নিয়ম রক্ষা ছাড়া মামা বাড়িতে যেতে না, সেদিন নিজে হাতে মামা, দাদু কে মিষ্টি খাইয়ে দিলে ।
ভাইয়া না মা , আমি জীবনে এক একটা সিঁড়ি সাফল্যের সাথে উঠেছি, মামা কে গিয়ে তুমি নিজের হাতে মিষ্টি খাইয়েছো। সব মনে আছে আমার ।
তোমার 'মধুর' প্রতিশোধের ঠেলায় আমি সাংবাদিক না হয়ে অঙ্কের অধ্যাপক আজ। শব্দের সাথে খেলার খুব শখ ছিল, যাক্ সংখ্যার সাথে খেলাটাও মোটেই আর খারাপ লাগে না ।
ঘরের সব আলো গুলো জ্বালিয়ে দিলাম, বাড়িতে এসে মা এখন বাবার রজনী গন্ধার মালা পড়া ছবিটার সামনে দাঁড়িয়ে আপন মনে মৃদু হাসছে । বাবার সাথে প্রথম আলাপ কী মনে পড়ছে তোমার? তোমার নীরব যুদ্ধের নীরব সৈনিক।
পঞ্চাশে পা দেব মা এই এপ্রিলে, ছোটবেলায় সত্যি তোমাকে বুঝতে পারিনি। তবে এখন বুঝি একজন মেয়ে হয়ে, মাথা উঁচু করে নিজের ভাঙা স্বপ্ন গুলো কে জড়ো করে এইভাবে জোড়া লাগতে ক'জন মেয়ে পারে! ভাগ্যিস তোমার মধ্যে ' আগুন ' ছিল মা।
==================
Aditi Chatterjee
Ranaghat, Nadia

Comments
Post a Comment