গল্প
প্রতিশোধ
কাবেরী মিত্র
তু আমার প্রাণ পাখি তুর লেগে আমি জীবন টোও দিতে পারি এ ভাবেই রতন তার বউ চন্দনাকে আদর করে।
রতনের ভালোবাসা আদর সোহাগের কাছে চন্দনা একদম হারিয়ে যায়। চন্দনা আর রতনের বিয়ে হয়েছে প্রায় পাঁচ মাস। সেই দিক দিয়ে দেখলে বলা যায় একদম নতুন দম্পতি। রতন খুব গরিব, পরের জমিতে চাষ করে সংসার চালায়। কিন্তু চন্দনাকে বেশ যত্নেই রেখেছে। চন্দনারও এই পাঁচ মাস দিব্বি সুখে শান্তিতে রতনের সোহাগে একেবারে স্বপ্নের মত কেটে গেছে। চন্দনা সারাদিন রতনের মনের মত করে নিজেকে সাজাতেই ব্যস্ত থাকে।
আর হবে নাই বা কেন? কি এমন বয়েস চন্দনার আঠারো পূর্ণ হয়ে উনিশে পরেই তো বিয়ে হয়ে গেলো। এই বয়েসে সাধ আল্লাদ তো থাকবেই আর সেখানে যদি রতনের মত ভালোবাসার মানুষ থাকে।
সেদিন রাতে রতনের সোহাগ খেতে খেতে চন্দনা আবদার করলো। "তু কাল আমাকে মেলা দিখাতে লিয়ে যাবি তো? রতন চুপ করে থাকে কারণ এই মুহূর্তে তার কাছে মেলা ঘোরার মতো টাকা নেই। বিয়ের সময় মোড়ল খুড়ার থেকে অনেক গুলো টাকা সুদে ধার নিয়েছে। কদিন থেকে মোড়ল তাকে টাকা দেবার জন্য তাগাদা দিচ্ছে। তাই কিছু টাকা এবার মোড়ল খুড়াকে দেবে বলে তুলে রেখেছে। তাই চন্দনার কথার উত্তরে বললো "শুন ই বার লয় পরের বার তুকে ঠিক মেলায় লিয়ে যাবো।" কিন্তু চন্দনা অভিমান করে পাস ফিরে শোয়। এটা দেখে রতন বোঝে আজ চন্দনাকে কাছে পেতে গেলে ওর ইচ্ছে পূরণ করতেই হবে। তাই অগত্যা বলে "ঠিক আছে বাবা লিয়ে যাবো এখন তো গুসা করে থাকিন না। লয় তো আমিও ঘর হতে বিরাইন ওই চন্ডী তলায় জেঁয়ে পরে শুয়ে রইবো।" চন্দনা মেলা যাবার কথা শুনে হেসে অভিমান ভুলে যায়।
পরেরদিন চন্দনা সকাল সকাল উঠে সব কাজ সেরে সুন্দর করে সাজে। বিয়ের সময় পাওয়া একটা লাল তাঁতের শাড়ি আর ম্যাচ করে লাল ব্লাউস পরে। পায়ে আলতা, কোমরে তার মার দেওয়া সরু রুপোর বিছে, কানে কান পাশা, হাতে লাল কাঁচের চুড়ি, ঠোঁট জোড়া লাল রঙে রঙ্গীন করেছে,কপালে লাল টিপ। এই ভাবে নিজেকে সুন্দর করে সাজিয়ে রতনের অপেক্ষায় বসে আছে।
রতন ও আজ তাড়াতাড়ি কাজ থেকে চলে আসে তবে আসার সময় চন্দনার জন্য এক গাছা ফুলের মালা কিনে আনে। চন্দনা খুশি হয়ে বলে, "তুই যখন আ্যনেছিস্ তখন তুইয়েই লাগাইন দে কেনে"।
রতন পরম যত্ন করে বউ এর খোঁপায় মালা টা লাগিয়ে দিয়ে দুজনে হাত ধরে মেলা দেখতে বেরিয়ে যায়
মেলায় নানান জিনিস দেখে চন্দনা তো কত কিছুই কিনতে চায়। কিন্তু রতনের পক্ষে এতো কিনে দেওয়া সম্ভব হয় না। তাই নাগরদোলায় ওঠা টুকটাক জিনিস কিনে,চন্দনার ইচ্ছে মতো জিলাবি খাইয়ে বাড়ি যাবে বলে যেই মেলা থেকে বের হতে যায় ওমনি, মোড়ল খুড়োর মুখোমুখি হয়ে যায়। এই মোড়ল খুড়ো যে যথেষ্ট লম্পট ও চরিত্র হীন এটা এই গায়ের সবাই প্রায় জানে। এ হেনো লোকের সামনে চন্দনাকে নিয়ে দাঁড়াতেই রতনের বুক কেঁপে ওঠে। কিন্তু ততক্ষনে মোড়লের চোখ কিন্তু চন্দনার দিকে পরে যায়। সে চন্দনাকে ঠিক দেখছে না, বলা যায় দু চোখ দিয়ে চন্দনার সারা শরীর গিলছে। মনে মনে ভাবছে এই রতনের এমন ডবকা পারা বউ হইনছে। যে করেই হোক ইয়াকে আমার বিছানায় আনতেই হবেক লয় তো জীবন আমার বিথাই গেল। তাই এবার রতন কে বলতে থাকে। "কিরে শালা রতনা, খুব তো বউ লিয়ে ঘুরে বুলছিস বলি আমার টাকা গুলান কবে দিবি? আমি কি দান ছত্তর খুলি বসেছি লাকি রে শালা,কবে হতে টাকা গুলান দিবার লাম ই নাই । কবে দিবি বুল? " রতন ভয়ে হাত জোর করে বলে খুড়া তোমার সব টাকা দিয়ে দিবো তুমি আর কিছু মাস সময় দাও কেনে খুড়া । আমি মা মনসার দিব্বি খ্যায়ে বুলছি সব শোধ কইরে দিবো খুড়া। এখন আমা দিগে জ্যাতে দাও, কেনে "। এবার মোড়লের সাগরেদ কালু বলে ওঠে " ই বাবা যাবি মানে তু কি লিজের ইচ্ছায় যাবি লাকি। দাড়া খুড়া কি বলে শুনে তা বাদে যাবি কি খুড়া ঠিক বললুম কিনা? " মোড়ল তখন বলে "ঠিক, ঠিক, আগে তুর সথে আমার ফয়সালা হবেক তা বাদে তুই ইখান হতে লড়তে পারবিক, দুদিন তুকে টাইম দিছি ইয়ার মধ্যেই তুকে সব টাকা মিটাইন দিতে হবেক লয় তো আমি অন্য ভাবে মিটাই লিব কি বলিস কালু ঠিক কি না" "বলেই চন্দনার দিকে লোলুপ দৃষ্টি তে চেয়ে থাকে। রতন মোড়লের পায়ে পরে বলে "খুড়া এমন কথা ছিল লাই, তুমি তো এক বছরের ল্যাগে টাকা টো সুদে দিইনছিলে,তবে দুদিন হাঁকাছো কেনে, আমি দু দিনে কুথা হতে এতো গুলান টাকা লিয়ে আসবো বলো খুড়া?" মোড়ল এই সবে একটুও নরম হয় না। সেও জানে একবছরের জন্যই ধার দিয়েছে কিন্তু এখন তার নজর পড়েছে চন্দনার দিকে তাই কোনো মায়া দয়া দেখালে চলবে না। তাই বলে ওঠে " উ সব আমি কিছু জানি নাই তুকে দুদিন টাইম দিছি ইয়ার মধ্যে দিবি লয় তো তুর বউ টোকে আমার খামার বাড়ি পাঠাইন দিবি তুর সব মুকুব কইরে দিবো। " বলে আবার চন্দনার শরীরের দিকে একটা নোংরা দৃষ্টি দিয়ে দল বল নিয়ে চলে গেলো।
এতক্ষণ যা হোলো চন্দনার সব দেখে শুনে ভয়ে হাতপা ঠান্ডা হয়ে গেছে। কোনোরকমে রতন ও দুজনে প্রায় একরাশ যন্ত্রনা নিয়ে বাড়ি ফিরে আসে। কত আনন্দ করে গেছিল সব আনন্দে ওই মোড়ল জল ঢেলে দিয়ে গেলো। রতনের তো সারারাত ঘুম হয় না। খালি ভাবে কোথায় এতো গুলো টাকা পাবো। পরের দিন খুব ভোর ভোর রতন উঠে পরে টাকার খোঁজে বের হয়ে যায়। কিন্তু হাজার চেষ্টা করেও কিছুই জোগাড় করতে পারে না। চন্দনাও ভালো নেই নানান ভয় তাকে ঘিরে ধরেছে। কি করবে কি হবে কিছুই যেন তার মাথায় ঢুকছে না। দুদিন ধরে দুটি প্রাণীর নাওয়া খাওয়া সব প্রায় বন্ধ। ওদিকে দুদিন হতেই সন্ধ্যে বেলা মোড়ল এসে হাজির। বলে " কি রে রতনা টাকা টো জোগাড় হইনছে আমি লিতে আলুম" রতন মোড়লের পায়ে পরে বলে " মোড়ল আমি জোগাড় করতে লারলুম গো খুড়া। তুমি আমার মাই বাপ্ আছো ইবার কার পারা ছ্যারে দাও কেনে", শুনে মোড়ল একটা শয়তানের হাসি হেসে বলে শুন টাকা যখন লাই তবে যেটো আছে উটই লিয়ে যাই।" রতন কিছুই বলে না চুপ করে থাকে। এবার মোড়লের নির্দেশে কালু চন্দনার হাত ধরে টানে চন্দনা প্রানপন চেষ্টা করে নিজেকে ছাড়িয়ে পালিয়ে যাবার কিন্তু মোড়লের সাগরেদ দের কাছে তার কোনো চেষ্টাই সফল হয় না। জোর করে চন্দনাকে তুলে নিয়ে যায়। যাবার সময় চন্দনা চিৎকার করে রতন কে ওদের হাত থেকে বাঁচাবার জন্য বার বার বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পরে, কিন্তু রতন চুপ করে দাঁড়িয়েই থাকে।
সেই দিন রাতের অন্ধকারে মোড়লের খামার বাড়িতে চন্দনার উনিশ বছরের যৌবন, এক নারী মাংস লোভী খাদকের হাতে পরে একেবারে দলিত মথিত হয়ে যায়। মোড়ল প্রায় সারারাত ধরে চন্দনার দেহ টা খুবলে খেতে থাকে। চন্দনার সারা শরীর আঁচড়ানো কামড়ানোর যন্ত্রনায় নীল হয়ে যায়।।
রাতের অন্ধকার তখনো একটু ছিল এই অবস্থায় যখন ক্লান্ত মোড়ল ঘুমিয়ে পরে, চন্দনা ধীরে ধীরে উঠে শাড়ি কাপড় ঠিক করে বিছানা থেকে নিচে নেমে আসে। এরপর ওই ঘরেই একটা ছোট আলমারি ছিল। চন্দনা ওটা খুলে দেখে ওর মধ্যে অনেক মদের বোতল আছে। সেগুলো নিয়ে খুব সন্তর্পনে সব বোতল থেকে মদ সারা ঘরে ছড়িয়ে দেয়। সেই সঙ্গে মোড়লের বিছানার চার দিকেও ছড়িয়ে দেয়। এরপর সামনে একটা টুলের ওপর দেখে দেশলাই বাক্স আর কটা বিড়ি পরে আছে। চন্দনা সে গুলো হাতে নিয়ে খুব সাবধানে দরজা খুলে বাইরে বের হয়ে আসে। এসে একটা বিড়ি ধরায় তারপর ধীরে সেটাতে একটা টান দিয়ে মুখ দিয়ে ধোয়া বার করে, দেশলাই কাঠি টা মোড়লের ঘরে মধ্যে ফেলে দিয়ে বাইরে থেকে দরজায় শিকল তুলে দেয়। নিমেষে দাও দাও করে আগুন জ্বলে ওঠে।ঘুম ভেঙে মোড়ল চিৎকার করতে থাকে। কিন্তু কেউ আর শুনতে পায় না। চন্দনা হাসতে হাসতে ওই অন্ধকারে অজানা উদ্দেশ্যে পা বাড়ায়। কোথায় যাবে চন্দনা? সে নিজেও জানে না। তবে স্বামীর বাড়ি আর না, যে স্বামী স্ত্রীর লজ্জা বাঁচাতে পারে না, পর পুরুষ ভোগের জন্য নিয়ে যাচ্ছে দেখেও চুপ করে থাকে, তার কাছে আর না । এ যুগে কোনো কৃষ্ণ এসে দ্রৌপদী কে বাঁচাবে না দুর্যোধনের হাত থেকে বাঁচতে নিজেকেই অস্ত্র তুলে নিতে হবে। নয় তো প্রতিশোধ আর নেওয়া হবে না। চন্দনার কান্নাজড়ানো অট্টহাসি চারিদিকে খান খান হয়ে ছড়িয়ে পড়লো।

Comments
Post a Comment