যোগ্যতা
সায়ী
অবশেষে, মাঝরাতেই বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল অম্বিকা বসু ,সাথে তার তিন বছরের ছোট্ট মেয়ে পাখি ।দীর্ঘ ছয় বছরের সংসার ছেড়ে আজ রাস্তায় নামল অম্বিকা।অশান্তি আর সইতে পারছে না সে । অথচ সম্বন্ধ করেই তাঁর বিয়ে হয়েছিল পঙ্কজ বসুর সাথে , কিন্তু বিয়ের পর অম্বিকা বুঝতে পারল যে স্বপ্ন আর বাস্তবের আকাশ পাতাল তফাৎ।
অম্বিকা বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান। তাদের বিয়ের সম্বন্ধটা এনেছিলেন এক পাড়াতুতো কাকিমা । বিয়ে হওয়ার পরে অম্বিকা কে তাঁর এল্ .এল্ . বি -এর পড়ায় ইতি টানতে হয় কারণ ,ঘরের বউ বিয়ের পরও কলেজ যাবে সেটাতে তাঁর শ্বশুরবাড়ির লোকজনের ঘোর অমত ছিল । অম্বিকা প্রতিবাদ করতে গেলে তাঁর মা তাঁকে বোঝায় যে বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ির সব কথা মেনে চলাই মেয়েদের ধর্ম।
সেইদিন থেকেই শুরু হল অম্বিকার মেয়েধর্ম পালন। বিয়ের কিছু দিন পর সে জানতে পারে তাঁর স্বামীর অন্য আরও একটি মেয়ের সাথে সম্পর্ক আছে। সবটা জেনে যখন অম্বিকা প্রতিবাদ করতে যায়, তাঁর স্বামী বলে -"মাথা গোঁজার মতো বাড়ি পেয়েছো, দুবেলা পেট ভরে খেতে পারছো, জামাকাপড়ের অভাব নেই , সুখে থাকতে একটা মেয়ের আর কী লাগে? ,তোমার যোগ্যতা যেটুকু তার চেয়ে অনেক বেশি পেয়েছো " । সেইদিন খুব অবাক হয়ে গিয়েছিল অম্বিকা। তাঁর মা বাবাকে জানাতে তাঁরা বলেন -"ছেলেরা হল সোনার আংটি , আর সোনার আংটি বাঁকা হলেও সোনাই থাকে, তাছাড়া এখন বিয়েভাঙলে লোকে কী বলবে? তাই Adjust করে নে "। সেই থেকেই লড়ছে অম্বিকা ।আজও তাঁর কানে বাজে মায়ের বলা সেই কথাটা "লোকে কী বলবে? " কিন্তু আর পারল সে ,বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হল । লোকে কী বলবে সেটা জানার ইচ্ছা তাঁর মনে আজ প্রবল।
রাস্তায় দাঁড়িয়ে কোথায় যাবে বুঝতে পারছিল না অম্বিকা , বাপের বাড়ি আর যাবে না সেটা সে বাড়ি ছাড়ার সময়ই ঠিক করেনিয়েছিল।এমন সময় একটা গাড়ি এসে দাঁড়ায় তাঁর সামনে।হঠাৎ ফাঁকা রাস্তায় গাড়ি দেখে ভয়ে অম্বিকা সেখানে থেকে পালাতে লাগল ,তখনই একটা চেনা গলায় কে যেন তাঁর নাম ধরে ডাকল ।অম্বিকা দেখল তাঁর ছোটবেলায় বন্ধু সুপ্তি গাড়ি থেকে মুখ বার করে ডাকছে। একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে গাড়ির সামনে যেতেই সুপ্তি অম্বিকাদের গাড়ি তে তুলে নেয়।গাড়িতে যেতে যেতে সবটা খুলে বলে সুপ্তিকে।
শেষে সুপ্তির বাড়িতেই আশ্রয় হয় তাদের। সেইদিন রাতে আর ঘুম আসেনি অম্বিকার ,পাখি কে ঘুম পাড়িয়ে সারারাত ধরে ভাবল সে ভুল টা ঠিক কবে করেছিল? শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে নাকি শ্বশুরবাড়ির খুশির জন্য পড়াশোনা টা ছেড়ে? কী পেল সে মেয়ে হওয়ার ধর্ম পালন করে? মানুষ হতেই ভুলে গেল ।শুধু মেয়ে বলেই কেন দিনের পর দিন সমাজের যাতাকলে পেষাই হতে হয়?অন্যের সুখের জন্য নিজের স্বপ্নটাকে গলা টিপে মেরে ফেলতে হয়?কেন সমাজ চিরকালই মেয়েরদের কাছ থেকে বলিদান চায়?
অম্বিকার যেদিন মেয়ে হল আনন্দে আত্মহারা হয়েগিয়েছিল সে। কত না স্বপ্ন সাজিয়ে ফেলেছিল ।অথচ সে ভুলে গিয়েছিল মেয়েদের স্বপ্ন দেখতে নেই ।সন্তান নিয়ে বাড়ি ফিরতেই শাশুড়ি নাক সিঁটকে বলেছিল -"ইস একটা ছেলের জন্ম দিতে পারলে না!শ্বশুরবাড়ির জন্য সামান্য কর্তব্য টুকু পালন করতে পারলে না?" তাঁর স্বামী বলেছিল -"useless, দু টাকা রোজগারের ক্ষমতা নেই , মেয়ের জন্ম দিয়ে খরচ বাড়াল "। এসব ভাবতে ভাবতে সকাল হয়ে যায়। এমন সময় পাখি এসে জড়িয়ে ধরে অম্বিকাকে আদো গলায় বলে -"মা, তুমি কেঁদো না আমি তো আছি"।কথাটা শুনে যেন এক ঐশ্বরিক ক্ষমতা পেয়েছিল।
অম্বিকা বুঝতে পেরেছিল যে আমার নিজেরাই নিজেদের দুঃখের কারণ । ছোট্ট থেকেই আমাদের রক্তে মিশিয়ে দেওয়া হয় আমরা মেয়ে ।যাদের জীবনের যেন একটাই লক্ষ্য অন্যকে খুশিকরা। সবাই কে খুশি করতে করতে আমরা বাঁচাতেই ভুলে যাই।সবাই কে খুশি করতে হবে কারণ তুমি মেয়ে।অথচ তোমার নিজের খুশি হওয়ার কোনো অধিকার নেই ।প্রতি মুহূর্তে মেয়দের যাতাকলে পেশা হয়। এতকিছুর পরও মেয়েদের কপালে অবজ্ঞাই জোটে।এমনকী নিজের অভিভাবকত্ব সে নিজে পায় না।যেন পায়ে লোহার অদৃশ্য শেকল পরানো।
এইসব অনেক ভাবল অম্বিকা ।তারপর সিদ্ধান্ত নিল বাঁচবে সে নিজের জন্য নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য ।শুরু হল নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার লড়াই ।
এইভাবে 23বছর কেটে গেল। বয়স আর অভিজ্ঞতার ছাপ আজ স্পষ্ট তার চোখেমুখে । আজ সে নামকরা Criminal Lawyer ।শহরে তাঁকে চেনেনা এমন লোক খুব কমই আছে । যে কেস হাতে নেয় সেই কেস না জিতে যায় না।
হঠাৎ একটা কেস আসে তাঁর কাছে সম্পত্তির জন্য বাবাকে খুন করার চেষ্টা । মক্কেলের নাম টা দেখে একটা ব্যঙ্গের হাসি ফুটে ওঠে অম্বিকার মুখে। মক্কেলের নাম প্রমিলা বসু তাঁর স্বামী পল্লব বসু কে তাঁর ছেলে সম্পত্তির জন্য খুন করার চেষ্টা করেছিল ।
প্রমিলা অম্বিকাকে চিনতে না পারলেও অম্বিকা প্রথম দেখাতেই প্রমিলাকে চিনতে পারে। অম্বিকা বাড়ি ছাড়ার পর পল্লব তাঁর সেই প্রেমিকা প্রমিলা কে বিয়ে করেছিল। সব খবর অম্বিকা জানতে পারত। সত্যি ভাগের কী পরিহাস ।যে পরিবারের জন্য অম্বিকা জীবনটা একদিন শেষ হতে বসেছিল আজ তাঁর সেই গুনধর স্বামী কে বাঁচানোর দায়িত্ব পড়েছে তাঁরই উপর।খুব হাসি পাচ্ছিল অম্বিকার।কোনও মতে নিজেকে সামলে নেয়।
কেসটা নেয় অম্বিকা । প্রমিলা বসু কে কথা দেয় যে সে কেস টা লড়বে। মামলার দিন আদালতে পল্লব বসু তাদের Lawyer কে দেখে স্তম্ভিত হয়ে যায়।চোখের সামনে অম্বিকা কে দেখে আকাশ থেকে পড়ে পল্লব বসু। সে ভাবতেও পারেনি ছেলের জন্ম দিতে না পারায় অযোগ্য বলে তাচ্ছিল্য করা মেয়েটাই একদিন তাঁর জীবনের শেষ আশার আলো হয়ে উঠবে।।
সমাপ্ত

Comments
Post a Comment