হাতানিয়া- দোয়ানিয়া নদী পেরোলে আর এক নদীর নাম চিনাই। হ্যাঁ, চিনাই নদী সরাসরি বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে যুক্ত । যেন নারায়ণের পদ্মনাভি ।
খড়্গের ন্যায় ধারালো নীলাভ জলতরঙ্গ। গভীরতা ভালোই । উথালপাথাল ঢেউ সদাহাস্য খল খল আওয়াজে মুখরিত । বুকে শুশুক আর হাঙর চরে বেড়াচ্ছে । যেন ঘুমন্ত মায়ের আঁচল সরিয়ে কোলের সন্তান স্তন -দুগ্ধ পান করছে । কত অনাবিল স্বচ্ছন্দ্য সাবলীল । পরন্তু জিনলোকের সুপ্তি সজ্জা থেকে শতকোটি প্রেতাত্মা ভরা কোটালে দানবের বেশে জেগে ওঠে । নদী বাঁধের ঘেরাটোপে জনবসতি । ওদের ভয়ে ভয়ে দিন কাটে বসতভিটা যাদের অর্থাৎ কিষাণ- জেলেরা অপমৃত্যুর আশঙ্কায় শঙ্কিত বছরের চব্বিশটা কোটালে স্থানীয়দের ধমনীর রক্ত চলকে ওঠে আতঙ্কে । রোদ ভরা সকাল মাঝে মাঝে স্বস্তির শ্বাসে পরিণত হতে চাইলেও দিনের অন্তিম লগ্নে সোনালী রোদের সঙ্গে জলভরা বসতভিটায় নাস্তানাবুদ করে ছাড়ে । সোঁ সোঁ শব্দে ঢেউয়ে ঢেউয়ে গিলে খাচ্ছে মাটি । তলিয়ে যাচ্ছে বসতভিটা, কত পুরাতন মন্দির -মসজিদ গাছ-গাছড়া, সরকারি দয়া দাক্ষিণ্যের পানে চেয়ে সানুগ্রহে এলাকার মানুষ বাঁচে বাড়ে আর প্রকৃতির ইচ্ছা -অনিচ্ছার কোলে মাথা রেখে ঘুমায়।
এক মাল্লাই- ডিঙিগুলো নদীর ঢেউয়ে বেপরোয়া উল্লাসে নাচে । মেঘের সামিয়ানা সজ্জিত আকাশে স্পর্শ করতে বলে-- না ছুঁয়ে আবার কোলে ধরে নেয় । এ যেন কোলের শিশুকে দু'বাহুতে শূন্যে ছুঁড়ে আবার বাহুতে ধরে বুকে ধরে জাপটে রাখা।
বারো মাস পড়ে থাকত যে মানুষটা সে তো গত সাড়ে তিন মাস আগে মারা গেছে। ইসমাইল মাঝি শৈশবের অভাব অনটনের মধ্য দিয়ে মাঝি হয়েছে। লোকটা খুবই ভালো মানুষ । কাউকে ঠকাতে তার বিবেকে লাগে । সে যে মরে যাবে কেউ ভাবেনি। আসলে ভালো মানুষ বেশি দিন বাঁচে না উপরওয়ালার লক্ষ্য থাকে তাকে টেনে নেবার। দীর্ঘদিন ইসমাইল পড়শী ভাই গৌরাঙ্গকে সঙ্গে নিয়ে এযাবৎ মাছ কাঁকড়া ধরে আসছে । কিন্তু কি যে সেদিন হলো বাড়িতে খাবার মাছ পাঠাতে দিয়ে এবং মাছ বিক্রি করতে পাঠিয়ে গৌরাঙ্গর আসতে দেরি হয়েছে। ততক্ষণে ইসমাইল কাঁঠাল কাঠের হাল ধরে গলুইর উপর মাথা গুঁজে মরে পড়ে আছে । কেউ কেউ স্ট্রোক বলছে ।
সবেমাত্র ক'মাস শাদি হয়েছে । বাল -বাচ্চা কিছু হয়নি । পোয়াতিও নয় গোলাপিবিবি । খসম হারা বিষম যন্ত্রণা বুকে নিয়ে গৌরাঙ্গের মতো ভাগীর বিশ্বাস আর উদারতার উপর নির্ভর করে বেঁচে আছে। কি নেই -- কি ছিল না তার -- শরীর রূপ যৌবন অঢেল স্থিতি আর ভালোবাসার মতো অগাধ সমুদ্র সমান হৃদয় । শিশু মনের মত উদার-সহজ-সরল- নিষ্পাপ ।
গত দিন গৌরাঙ্গ ডিঙি আর বেঁউতি জাল নিয়ে ফাঁড়ে বসিয়েছে। সঙ্গে ওই পাতিবুনিয়ার বাসিন্দা সলমন চাচা । লোকটা সুবিধাজনক নয় জেনেও গৌরাঙ্গের নৌকায় ভাগী হিসেবে থাকে। কাজের কাজ করার ফাঁকে গৌরাঙ্গ ভাগিদার হয়েও অনেক বেশি দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করে। কিন্তু কাজ হাসিল করে।
কবুতরের বুকের মত সুকোমল ওষ্ঠ যুগল। আব্বার ঘরে শাদিতে পাওয়া হার , কান ফুল, পৈছা, বেসর, সানিয়া মির্জা, বাজু, কঙ্কন , নুপুর ইত্যাদি সবই ইসমাইলের মাঝিগিরির সুনামে প্রাপ্তি।
গোলাপীর আব্বার মাছের ব্যবসা । মসনদ -ই- আলা ফিস্ সেন্টার - এর স্বত্বাধিকারী অর্থাৎ আড়ৎদার । ফলে গৌরাঙ্গ মাছ নিয়ে ওখানে বিক্রি করে আসে । অন্য কোথাও দেওয়ার অধিকার নেই। গৌরাঙ্গের আচরণ গোলাপীর ও আব্বার মন সন্তুষ্ট রাখে। পূর্ব পরিচিতও। নিজেকে বিশ্বাসের মধ্যে রাখতে মাছ এনে ওই আড়তে তুলে দেয় । যখন যা লাগে আব্বা দেখভাল করে এবং গৌরাঙ্গও প্রয়োজন মতো টাকা নেয়। সেও একা । আইলার ঝড়ে মা - বাপ মরেছে । গোলাপি একলা হয়ে যাবার পর গৌরাঙ্গকে আর নিজের বাড়িতে থাকতে হয়নি । সেই আগের মতই ইসমাইলের ঘরের বারান্দায় খাটে থাকতে হয় । এটা গোলাপীর আব্বার পরামর্শ।
বিষাদগ্রস্ত গোলাপী আমুদি মাছের তেঁতুল টক রান্না করছে । গৌরাঙ্গ দুই খানা ব্লাউজ আর শাড়ী নিয়ে মাছ বিক্রি ঘরে পৌঁছাল।
--- হাতে ওইটা কি ?
---- তোমার ব্লাউজ আর শাড়ি ।
--- আব্বায় দিল বুঝি ?
--- না না । আমি ক'দিন দেখছি তোমায় ছেঁড়া শাড়ি পরে ঘুরতে। তাই আনলাম ।
--- আছে তো গুছানো । বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ার পর আবার বলল , এসব আর কার জন্যে? নেই যখন কেউ ---
গৌরাঙ্গ বোঝে এসব কথা । সমবয়সী ইসমাইলের জাতপাতের কোনো বাছ বিচার ছিল না। উভয়ের বন্ধুত্ব কত না নিবিড় ছিল । শেষ বেলায় যাবার সময় মনের কথা যদি কিছু বলে যেত ; তাও বলা হয়ে ওঠেনি । গৌরাঙ্গ জানে যৌবনের সমুদ্র গোলাপীর অঙ্গ -আভরণে। এসব কথার মানে কি বুঝে উঠতে সময় যায় না।
--- তুমি দোস্ত একটা ; শাদী করো --
--- বিয়ে !! গৌরাঙ্গ যেন আকাশ থেকে পড়ল।
---- কেন পুরুষ মানুষ শাদী করতে লজ্জা কী ?
--- না দোস্ত। বন্ধুর বউ হলেও ওই সম্বোধনে ডাকে।
---- আমি একটা ভালো মেয়ে দেখেছি ।
--- কে সে ?
সে অবাক হয়ে মুখের দিকে তাকায় ।
--- সরমা । ওই যে তালদিঘির পাড় আছে না ? বালিয়াড়িতে তার বাপের চায়ের দোকান । সাবাড়ের খুঁটিতে সে মাছের কাজ করতে যায় । খুব ছটফটে চোস্ত কিন্তু সুন্দরী । আমার মনকে ধরেছে ।
--- তা জানি না । তাহলে তোমার কি হবে ? একা--
এভাবে ঐদিন কথাগুলো বললেও পড়শির লোকেরা চায়ের দোকানে, বউয়েরা কলতলায় গোলাপি আর গৌরাঙ্গকে নিয়ে নানান অশালীন কথায় ফিসফিস করে। ঝোপে - ঝাড়ে ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকে ; রাত - চরা শিয়ালের গলায় আর পেঁচা শ্বাপদের নিঃশ্বাসে অনেকগুলো প্রহর ঘোষিত হয়ে গেল । মাঝে মাঝে লতিফ - মোসলেম - কুতুবরা কোমল শ্মশ্রুর উপর দিয়ে আফসোসের জিভটা বের করে লালসার আভাস দেয় গোলাপীকে রাস্তায় দেখে । বাপের দৌরাত্ম্যে আর আত্মমর্য্যাদার দিকে তাকিয়ে কেউ " টুঁ "শব্দটি করতে পারেনি । আব্বার প্রভাব প্রতিপত্তির কথা কে না জানে । গোলাপীর মর্য্যাদা রক্ষার জন্য মনে মনে গৌরাঙ্গকে ঠিক রেখেছে। কিন্তু ভিন্ন জাতের বলে নিজের সম্প্রদায়ের কাছে কৈফিয়ৎ কেমন দেবে । নিজে না বলে অথবা উদ্যোগ না নিয়ে গৌরাঙ্গ বা গোলাপিকে একটা অলিখিত সুযোগ দিয়েছিল । বিচক্ষণ হলেও ধর্মভীরুতা নিয়ে তার জাতগোষ্ঠী কথা তুলুক সেও চায় না । মেয়ের মুখের পানে তাকালে অশ্রু-বিগলিত হয় । তাই সে কিংকর্তব্যবিমূঢ় ।
এতদিনে নাতি-নাতনি নিয়ে ঘর উঠানে খোশ মেজাজে থাকার কথা। গোলাপি সেদিন থেকে আব্বার বাড়ি যায়নি । খসম কবরস্থ হওয়ার পর গৌরাঙ্গকে অনেকদিন কিছু বলার জন্য সুযোগ দিয়েছে । আর পারে না । তাই সে বাধ্য সরমার কথা বলেছে ।
মরা কোটালে আসন্ন বর্ষার নিমিত্তে নৌকার পাটাতন ও লগির জন্য ঝাড়ের বাঁশ কেটে বাখারি চাঁছছে। সরমা এসে হাজির ।
--- ভাবী -- ও ভাবী-- বল কি জন্য ডাকথল ? --- ও মা আসতে না আসতেই এত তাড়া?
---- হাঁগো ভাবী। ছেলি- গরুকে জল খাইতে যেতে হবে । মা কালনু দিদির দ্বোরে যেছে ।
--- তোদের ও পোদালি ভাষা ছাড় না ?
--- কেনি ? তুমি কি বুঝতে পার নি ? যা কইব কও।
--- আরে বলেছিলাম, তোমার মা বলেছিল-- একটা ভালো বর ঘর দেখতে।
----তা ওউ কথা?? আমি মনে করছি অন্য কিছু । তা কও সে বর ঘরটি কাইনু লিয়া আসস ?
---- আমার ঘরে ; ওই যে বর বাইরে হাঁসুয়া দিয়ে বাখারি চাঁছে ।
আড়ে আড়ে দেখল তার বলিষ্ঠ শরীর।
---- তুমি মার কাছে কইব । আমি পালি যাইটি।
যাবার সময় পেয়ারার ডালে পেয়ারা খুঁজে দুটো পেয়ারা পেড়ে কোঁচড়ে রাখল । গৌরাঙ্গ নিজের কাজে ব্যস্ত দেখেও যেন দেখল না ।
সে দেখে গেল ছৈতান গাছের নিবিড় ছায়ায় ইসমাইলের চার চালা ঘরে টালির ছাউনি । আর মনে আকাশের পটভূমিতে ফুলের ন্যায় স্তবকে স্তবকে মেঘ জমেছে । কানাঘুঁষো অনেকে অনেক কথায় তার কান ভারি করলেও মায়ের কথায় ও জেদাজেদিতে গৌরাঙ্গকে বিয়ে করল । কর্মঠ বর -তাখড়াই যুবক- উজ্জ্বল শ্যাম বর্ণ -মাথায় ঝাঁকড়া চুল দেখে অপছন্দের কারণ নেই । বলিষ্ঠ - মেদ বহুল সুস্বাস্থ্যের অধিকারী ।
বিয়ের দিন মন্দিরে বিয়ে হল। শুরু হলো গোলাপীর মনে শান্তি ও স্বস্তি রচনার পালা। রাঙা ঠোঁটে পটল চেরা চোখের দৃষ্টি দিয়ে মধুর প্রত্যাশার বদলে কালকেউটের বিষ বেরিয়ে এলো । গোলাপীর কান্না থামেনা । কারণ তো সরমা যে ভাষায় শুরু করল ; --- তোমার নিজস্ব ঘর নেই ? এই মোল্লানির ঘরে তুমি পড়িয়া রও কেনি ?
--- নাঃ। আমাকে এইখানেই থাকতে হবে । আমি অসহায় ছিলাম । দোস্ত আমাদের কত গভীরভাবে ভালবাসে। আমারও সাত কুলে কেউ নেই। দোস্তরও না । আমি চলে গেলে কোত্থাও পাবো কার নৌকা ? কী- ইবা খাবো ? ওদের নৌকা - জাল -টাকা পয়সা সঅব । ওকে ছেড়ে গেলেই গুনাহ হবে । ইসমাইল আমার বন্ধু । ভাবীর আশ্রয় -প্রশ্রয়ে সবকিছু । আমার ভালো না চাইলে তোমাকে বিয়ে করিয়ে আনত না।
--- হুম ! আমানকের ভালো না চাইলে ওর ভালোটা হবে কি করিয়া ? সব বুঝি । রথ দেখা কলা বেচা, দুটুয়াই হবে । না হলে --
--- মানে !! আমাকে হারামির বাচ্চার মতো --
--- যাও । তোমার সোহাগের ভাবী। আমার ঘরে কেনি ? ছাড়িয়া যেতে যখন কষ্ট হটে ---
গায়ের কোপ গায়ে মেরে গৌরাঙ্গ বিমর্ষভাবে বেরিয়ে গেল নৌকার কাছে । আড়ালে থেকে গোলাপী সরমার সব কথা শুনে মলিন মুখের কারণ খুঁজতে খুঁজতে আপন কাজে ব্যস্ত । পোড়া কপালির চোখ যেদিকে যায় সেদিকে সুখের সাগর শুকিয়ে যায়। ভালোবাসার সম্পর্ক ছাড়া আর কিছুই না। সুখ শান্তি নিবিড় বিশ্বের যে আকাশে রামধনুর রঙে রঙে
প্লাবিত কোমল পরশ পাবার জন্য অপেক্ষায় ছিল সেই আকাশে ঘন কালো মেঘের সঞ্চারে দুঃসহ অনিবার্য অশুভ সংকেত শাণিত হচ্ছে।
কৃষ্ণা চতুর্দশীর চাঁদ পান্ডুর হ'বার পথে । শিশিরমুক্ত পাতারা ঘুমে আচ্ছন্ন । ধানি ঘাস বরাবর জল নেমেছে । ডিঙিতে মাছের ছলা তুলে বাছাই চলছে । সলমন বুম্বার বাতিটা উস্কে দিল। দু'চারটে সমুদ্র কাঁকড়া, লাল গুলে, আমুদি, চিংড়ি , তপসে, ফেসা, সালফিশ মিলিয়ে দুই আড়াই ঝুড়ি বিভিন্ন পতের মাছ সাজিয়ে নিল ক্রেটে । তারপর নৌকা ঘাটে ভিড়িয়ে ভ্যানে করে নিয়ে গেল গোলাপীর আব্বার আড়তে । বাইশ শ' টাকার নীট বিক্রি। সেদিন আর কোনও প্রয়োজনীয় জিনিস না নিয়ে বাড়িতে এসে গোলাপীর হাতে টাকা দিতেই চক্ষু চড়ক গাছ। সরমা তখন কথা বলছে ফোনে কারও সঙ্গে। ---- জীবনটা বরবাৎ করি দিছে রে ভাই ! আমাকে ঘরে রাখিয়া নদিয়ে যায় মাছ ধরতে । অনেক ভালই থেলা ভাড়ায় যাওয়া। দৈনিক পাঁচ-সাতশ হলে অনেক ভালো । লতুন লতুন খদ্দার ।
---- শুনলে দোস্ত ? তোমার ঠিক করা ভালো মেয়ের ঠিকানা কি ? কোথায় যায় ?
গোলাপী থমকে গেল ।
--- কোথায় ? কোথায় যায় ?
---- কেন বকখালীর হোটেলে ?
---- মাফ করো ভাই । আমাকে মাফ করো।
---- থামো। আমি আর এখানে থাকব না। ওকে নিয়ে আর আমি ঘরও করব না।
---- আমরা যাব কেন ? ওকেই বাপের বাড়ি দিয়ে আসো । তুমি যদি কিছু মনে না করো তোমার জন্য আমি --- সবকিছুতে রাজী আছি ।
মিঞা বিবি রাজী তো কিয়া করে গা কাজী ?
.............................
খড়্গের ন্যায় ধারালো নীলাভ জলতরঙ্গ। গভীরতা ভালোই । উথালপাথাল ঢেউ সদাহাস্য খল খল আওয়াজে মুখরিত । বুকে শুশুক আর হাঙর চরে বেড়াচ্ছে । যেন ঘুমন্ত মায়ের আঁচল সরিয়ে কোলের সন্তান স্তন -দুগ্ধ পান করছে । কত অনাবিল স্বচ্ছন্দ্য সাবলীল । পরন্তু জিনলোকের সুপ্তি সজ্জা থেকে শতকোটি প্রেতাত্মা ভরা কোটালে দানবের বেশে জেগে ওঠে । নদী বাঁধের ঘেরাটোপে জনবসতি । ওদের ভয়ে ভয়ে দিন কাটে বসতভিটা যাদের অর্থাৎ কিষাণ- জেলেরা অপমৃত্যুর আশঙ্কায় শঙ্কিত বছরের চব্বিশটা কোটালে স্থানীয়দের ধমনীর রক্ত চলকে ওঠে আতঙ্কে । রোদ ভরা সকাল মাঝে মাঝে স্বস্তির শ্বাসে পরিণত হতে চাইলেও দিনের অন্তিম লগ্নে সোনালী রোদের সঙ্গে জলভরা বসতভিটায় নাস্তানাবুদ করে ছাড়ে । সোঁ সোঁ শব্দে ঢেউয়ে ঢেউয়ে গিলে খাচ্ছে মাটি । তলিয়ে যাচ্ছে বসতভিটা, কত পুরাতন মন্দির -মসজিদ গাছ-গাছড়া, সরকারি দয়া দাক্ষিণ্যের পানে চেয়ে সানুগ্রহে এলাকার মানুষ বাঁচে বাড়ে আর প্রকৃতির ইচ্ছা -অনিচ্ছার কোলে মাথা রেখে ঘুমায়।
এক মাল্লাই- ডিঙিগুলো নদীর ঢেউয়ে বেপরোয়া উল্লাসে নাচে । মেঘের সামিয়ানা সজ্জিত আকাশে স্পর্শ করতে বলে-- না ছুঁয়ে আবার কোলে ধরে নেয় । এ যেন কোলের শিশুকে দু'বাহুতে শূন্যে ছুঁড়ে আবার বাহুতে ধরে বুকে ধরে জাপটে রাখা।
বারো মাস পড়ে থাকত যে মানুষটা সে তো গত সাড়ে তিন মাস আগে মারা গেছে। ইসমাইল মাঝি শৈশবের অভাব অনটনের মধ্য দিয়ে মাঝি হয়েছে। লোকটা খুবই ভালো মানুষ । কাউকে ঠকাতে তার বিবেকে লাগে । সে যে মরে যাবে কেউ ভাবেনি। আসলে ভালো মানুষ বেশি দিন বাঁচে না উপরওয়ালার লক্ষ্য থাকে তাকে টেনে নেবার। দীর্ঘদিন ইসমাইল পড়শী ভাই গৌরাঙ্গকে সঙ্গে নিয়ে এযাবৎ মাছ কাঁকড়া ধরে আসছে । কিন্তু কি যে সেদিন হলো বাড়িতে খাবার মাছ পাঠাতে দিয়ে এবং মাছ বিক্রি করতে পাঠিয়ে গৌরাঙ্গর আসতে দেরি হয়েছে। ততক্ষণে ইসমাইল কাঁঠাল কাঠের হাল ধরে গলুইর উপর মাথা গুঁজে মরে পড়ে আছে । কেউ কেউ স্ট্রোক বলছে ।
সবেমাত্র ক'মাস শাদি হয়েছে । বাল -বাচ্চা কিছু হয়নি । পোয়াতিও নয় গোলাপিবিবি । খসম হারা বিষম যন্ত্রণা বুকে নিয়ে গৌরাঙ্গের মতো ভাগীর বিশ্বাস আর উদারতার উপর নির্ভর করে বেঁচে আছে। কি নেই -- কি ছিল না তার -- শরীর রূপ যৌবন অঢেল স্থিতি আর ভালোবাসার মতো অগাধ সমুদ্র সমান হৃদয় । শিশু মনের মত উদার-সহজ-সরল- নিষ্পাপ ।
গত দিন গৌরাঙ্গ ডিঙি আর বেঁউতি জাল নিয়ে ফাঁড়ে বসিয়েছে। সঙ্গে ওই পাতিবুনিয়ার বাসিন্দা সলমন চাচা । লোকটা সুবিধাজনক নয় জেনেও গৌরাঙ্গের নৌকায় ভাগী হিসেবে থাকে। কাজের কাজ করার ফাঁকে গৌরাঙ্গ ভাগিদার হয়েও অনেক বেশি দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করে। কিন্তু কাজ হাসিল করে।
কবুতরের বুকের মত সুকোমল ওষ্ঠ যুগল। আব্বার ঘরে শাদিতে পাওয়া হার , কান ফুল, পৈছা, বেসর, সানিয়া মির্জা, বাজু, কঙ্কন , নুপুর ইত্যাদি সবই ইসমাইলের মাঝিগিরির সুনামে প্রাপ্তি।
গোলাপীর আব্বার মাছের ব্যবসা । মসনদ -ই- আলা ফিস্ সেন্টার - এর স্বত্বাধিকারী অর্থাৎ আড়ৎদার । ফলে গৌরাঙ্গ মাছ নিয়ে ওখানে বিক্রি করে আসে । অন্য কোথাও দেওয়ার অধিকার নেই। গৌরাঙ্গের আচরণ গোলাপীর ও আব্বার মন সন্তুষ্ট রাখে। পূর্ব পরিচিতও। নিজেকে বিশ্বাসের মধ্যে রাখতে মাছ এনে ওই আড়তে তুলে দেয় । যখন যা লাগে আব্বা দেখভাল করে এবং গৌরাঙ্গও প্রয়োজন মতো টাকা নেয়। সেও একা । আইলার ঝড়ে মা - বাপ মরেছে । গোলাপি একলা হয়ে যাবার পর গৌরাঙ্গকে আর নিজের বাড়িতে থাকতে হয়নি । সেই আগের মতই ইসমাইলের ঘরের বারান্দায় খাটে থাকতে হয় । এটা গোলাপীর আব্বার পরামর্শ।
বিষাদগ্রস্ত গোলাপী আমুদি মাছের তেঁতুল টক রান্না করছে । গৌরাঙ্গ দুই খানা ব্লাউজ আর শাড়ী নিয়ে মাছ বিক্রি ঘরে পৌঁছাল।
--- হাতে ওইটা কি ?
---- তোমার ব্লাউজ আর শাড়ি ।
--- আব্বায় দিল বুঝি ?
--- না না । আমি ক'দিন দেখছি তোমায় ছেঁড়া শাড়ি পরে ঘুরতে। তাই আনলাম ।
--- আছে তো গুছানো । বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ার পর আবার বলল , এসব আর কার জন্যে? নেই যখন কেউ ---
গৌরাঙ্গ বোঝে এসব কথা । সমবয়সী ইসমাইলের জাতপাতের কোনো বাছ বিচার ছিল না। উভয়ের বন্ধুত্ব কত না নিবিড় ছিল । শেষ বেলায় যাবার সময় মনের কথা যদি কিছু বলে যেত ; তাও বলা হয়ে ওঠেনি । গৌরাঙ্গ জানে যৌবনের সমুদ্র গোলাপীর অঙ্গ -আভরণে। এসব কথার মানে কি বুঝে উঠতে সময় যায় না।
--- তুমি দোস্ত একটা ; শাদী করো --
--- বিয়ে !! গৌরাঙ্গ যেন আকাশ থেকে পড়ল।
---- কেন পুরুষ মানুষ শাদী করতে লজ্জা কী ?
--- না দোস্ত। বন্ধুর বউ হলেও ওই সম্বোধনে ডাকে।
---- আমি একটা ভালো মেয়ে দেখেছি ।
--- কে সে ?
সে অবাক হয়ে মুখের দিকে তাকায় ।
--- সরমা । ওই যে তালদিঘির পাড় আছে না ? বালিয়াড়িতে তার বাপের চায়ের দোকান । সাবাড়ের খুঁটিতে সে মাছের কাজ করতে যায় । খুব ছটফটে চোস্ত কিন্তু সুন্দরী । আমার মনকে ধরেছে ।
--- তা জানি না । তাহলে তোমার কি হবে ? একা--
এভাবে ঐদিন কথাগুলো বললেও পড়শির লোকেরা চায়ের দোকানে, বউয়েরা কলতলায় গোলাপি আর গৌরাঙ্গকে নিয়ে নানান অশালীন কথায় ফিসফিস করে। ঝোপে - ঝাড়ে ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকে ; রাত - চরা শিয়ালের গলায় আর পেঁচা শ্বাপদের নিঃশ্বাসে অনেকগুলো প্রহর ঘোষিত হয়ে গেল । মাঝে মাঝে লতিফ - মোসলেম - কুতুবরা কোমল শ্মশ্রুর উপর দিয়ে আফসোসের জিভটা বের করে লালসার আভাস দেয় গোলাপীকে রাস্তায় দেখে । বাপের দৌরাত্ম্যে আর আত্মমর্য্যাদার দিকে তাকিয়ে কেউ " টুঁ "শব্দটি করতে পারেনি । আব্বার প্রভাব প্রতিপত্তির কথা কে না জানে । গোলাপীর মর্য্যাদা রক্ষার জন্য মনে মনে গৌরাঙ্গকে ঠিক রেখেছে। কিন্তু ভিন্ন জাতের বলে নিজের সম্প্রদায়ের কাছে কৈফিয়ৎ কেমন দেবে । নিজে না বলে অথবা উদ্যোগ না নিয়ে গৌরাঙ্গ বা গোলাপিকে একটা অলিখিত সুযোগ দিয়েছিল । বিচক্ষণ হলেও ধর্মভীরুতা নিয়ে তার জাতগোষ্ঠী কথা তুলুক সেও চায় না । মেয়ের মুখের পানে তাকালে অশ্রু-বিগলিত হয় । তাই সে কিংকর্তব্যবিমূঢ় ।
এতদিনে নাতি-নাতনি নিয়ে ঘর উঠানে খোশ মেজাজে থাকার কথা। গোলাপি সেদিন থেকে আব্বার বাড়ি যায়নি । খসম কবরস্থ হওয়ার পর গৌরাঙ্গকে অনেকদিন কিছু বলার জন্য সুযোগ দিয়েছে । আর পারে না । তাই সে বাধ্য সরমার কথা বলেছে ।
মরা কোটালে আসন্ন বর্ষার নিমিত্তে নৌকার পাটাতন ও লগির জন্য ঝাড়ের বাঁশ কেটে বাখারি চাঁছছে। সরমা এসে হাজির ।
--- ভাবী -- ও ভাবী-- বল কি জন্য ডাকথল ? --- ও মা আসতে না আসতেই এত তাড়া?
---- হাঁগো ভাবী। ছেলি- গরুকে জল খাইতে যেতে হবে । মা কালনু দিদির দ্বোরে যেছে ।
--- তোদের ও পোদালি ভাষা ছাড় না ?
--- কেনি ? তুমি কি বুঝতে পার নি ? যা কইব কও।
--- আরে বলেছিলাম, তোমার মা বলেছিল-- একটা ভালো বর ঘর দেখতে।
----তা ওউ কথা?? আমি মনে করছি অন্য কিছু । তা কও সে বর ঘরটি কাইনু লিয়া আসস ?
---- আমার ঘরে ; ওই যে বর বাইরে হাঁসুয়া দিয়ে বাখারি চাঁছে ।
আড়ে আড়ে দেখল তার বলিষ্ঠ শরীর।
---- তুমি মার কাছে কইব । আমি পালি যাইটি।
যাবার সময় পেয়ারার ডালে পেয়ারা খুঁজে দুটো পেয়ারা পেড়ে কোঁচড়ে রাখল । গৌরাঙ্গ নিজের কাজে ব্যস্ত দেখেও যেন দেখল না ।
সে দেখে গেল ছৈতান গাছের নিবিড় ছায়ায় ইসমাইলের চার চালা ঘরে টালির ছাউনি । আর মনে আকাশের পটভূমিতে ফুলের ন্যায় স্তবকে স্তবকে মেঘ জমেছে । কানাঘুঁষো অনেকে অনেক কথায় তার কান ভারি করলেও মায়ের কথায় ও জেদাজেদিতে গৌরাঙ্গকে বিয়ে করল । কর্মঠ বর -তাখড়াই যুবক- উজ্জ্বল শ্যাম বর্ণ -মাথায় ঝাঁকড়া চুল দেখে অপছন্দের কারণ নেই । বলিষ্ঠ - মেদ বহুল সুস্বাস্থ্যের অধিকারী ।
বিয়ের দিন মন্দিরে বিয়ে হল। শুরু হলো গোলাপীর মনে শান্তি ও স্বস্তি রচনার পালা। রাঙা ঠোঁটে পটল চেরা চোখের দৃষ্টি দিয়ে মধুর প্রত্যাশার বদলে কালকেউটের বিষ বেরিয়ে এলো । গোলাপীর কান্না থামেনা । কারণ তো সরমা যে ভাষায় শুরু করল ; --- তোমার নিজস্ব ঘর নেই ? এই মোল্লানির ঘরে তুমি পড়িয়া রও কেনি ?
--- নাঃ। আমাকে এইখানেই থাকতে হবে । আমি অসহায় ছিলাম । দোস্ত আমাদের কত গভীরভাবে ভালবাসে। আমারও সাত কুলে কেউ নেই। দোস্তরও না । আমি চলে গেলে কোত্থাও পাবো কার নৌকা ? কী- ইবা খাবো ? ওদের নৌকা - জাল -টাকা পয়সা সঅব । ওকে ছেড়ে গেলেই গুনাহ হবে । ইসমাইল আমার বন্ধু । ভাবীর আশ্রয় -প্রশ্রয়ে সবকিছু । আমার ভালো না চাইলে তোমাকে বিয়ে করিয়ে আনত না।
--- হুম ! আমানকের ভালো না চাইলে ওর ভালোটা হবে কি করিয়া ? সব বুঝি । রথ দেখা কলা বেচা, দুটুয়াই হবে । না হলে --
--- মানে !! আমাকে হারামির বাচ্চার মতো --
--- যাও । তোমার সোহাগের ভাবী। আমার ঘরে কেনি ? ছাড়িয়া যেতে যখন কষ্ট হটে ---
গায়ের কোপ গায়ে মেরে গৌরাঙ্গ বিমর্ষভাবে বেরিয়ে গেল নৌকার কাছে । আড়ালে থেকে গোলাপী সরমার সব কথা শুনে মলিন মুখের কারণ খুঁজতে খুঁজতে আপন কাজে ব্যস্ত । পোড়া কপালির চোখ যেদিকে যায় সেদিকে সুখের সাগর শুকিয়ে যায়। ভালোবাসার সম্পর্ক ছাড়া আর কিছুই না। সুখ শান্তি নিবিড় বিশ্বের যে আকাশে রামধনুর রঙে রঙে
প্লাবিত কোমল পরশ পাবার জন্য অপেক্ষায় ছিল সেই আকাশে ঘন কালো মেঘের সঞ্চারে দুঃসহ অনিবার্য অশুভ সংকেত শাণিত হচ্ছে।
কৃষ্ণা চতুর্দশীর চাঁদ পান্ডুর হ'বার পথে । শিশিরমুক্ত পাতারা ঘুমে আচ্ছন্ন । ধানি ঘাস বরাবর জল নেমেছে । ডিঙিতে মাছের ছলা তুলে বাছাই চলছে । সলমন বুম্বার বাতিটা উস্কে দিল। দু'চারটে সমুদ্র কাঁকড়া, লাল গুলে, আমুদি, চিংড়ি , তপসে, ফেসা, সালফিশ মিলিয়ে দুই আড়াই ঝুড়ি বিভিন্ন পতের মাছ সাজিয়ে নিল ক্রেটে । তারপর নৌকা ঘাটে ভিড়িয়ে ভ্যানে করে নিয়ে গেল গোলাপীর আব্বার আড়তে । বাইশ শ' টাকার নীট বিক্রি। সেদিন আর কোনও প্রয়োজনীয় জিনিস না নিয়ে বাড়িতে এসে গোলাপীর হাতে টাকা দিতেই চক্ষু চড়ক গাছ। সরমা তখন কথা বলছে ফোনে কারও সঙ্গে। ---- জীবনটা বরবাৎ করি দিছে রে ভাই ! আমাকে ঘরে রাখিয়া নদিয়ে যায় মাছ ধরতে । অনেক ভালই থেলা ভাড়ায় যাওয়া। দৈনিক পাঁচ-সাতশ হলে অনেক ভালো । লতুন লতুন খদ্দার ।
---- শুনলে দোস্ত ? তোমার ঠিক করা ভালো মেয়ের ঠিকানা কি ? কোথায় যায় ?
গোলাপী থমকে গেল ।
--- কোথায় ? কোথায় যায় ?
---- কেন বকখালীর হোটেলে ?
---- মাফ করো ভাই । আমাকে মাফ করো।
---- থামো। আমি আর এখানে থাকব না। ওকে নিয়ে আর আমি ঘরও করব না।
---- আমরা যাব কেন ? ওকেই বাপের বাড়ি দিয়ে আসো । তুমি যদি কিছু মনে না করো তোমার জন্য আমি --- সবকিছুতে রাজী আছি ।
মিঞা বিবি রাজী তো কিয়া করে গা কাজী ?
.............................
সুদামকৃষ্ণ মন্ডল
গ্রাম: পুরন্দর পুর (অক্ষয় নগর)
পোস্ট : অক্ষয় নগর
থানা : কাকদ্বীপ
জেলা : দঃ চব্বিশ পরগণা
পিন কোড :743347
গ্রাম: পুরন্দর পুর (অক্ষয় নগর)
পোস্ট : অক্ষয় নগর
থানা : কাকদ্বীপ
জেলা : দঃ চব্বিশ পরগণা
পিন কোড :743347

Comments
Post a Comment