গর্ভধারিণী যখন অসুরনাশিনী
সমীর কুমার দত্ত
সুন্দরবনের অনতিদূরে ঘন বনাঞ্চলের বহিরঙ্গ থেকে একটা সদ্যজাত মনুষ্য সন্তানের ক্ষীণ কান্নার আওয়াজ শুনতে পায় ফরেস্টারের অধস্তন কর্মচারী অনিল বিশ্বাস গাড়ি নিয়ে বন পরিদর্শণ কালে । সে বিষয়টিকে তার ঊর্ধ্বতন অফিসার মিঃ দেবেশ দোস্তিদারের গোচরে আনে। গাড়ী থেকে যতদূর দৃষ্টি যায় তারা লক্ষ্য করে এক গর্ভবতী মহিলা জঙ্গলের মধ্যে সদ্য সন্তান প্রসব করে অচৈতন্য হয়ে পড়ে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার এক সিংহী সদ্য জাতককে চাটতে থাকে আর মাঝে মাঝে কিছুটা এগিয়ে এসে দেখে যাতে তার সঙ্গীরা ওই দিকে আসতে না পারে। আবার বাচ্চা ও তার মায়ের কাছে এগিয়ে যায়।তাদের হাত থেকে রক্ষাকরার জন্য তাদের আশপাশে ঘোরাফেরা করতে থাকে।
গর্ভবতী মহিলা তসলিমা আক্তার তার স্বামী, সরি,স্বামী বললে ভুল হবে, যার রক্ষিতা,নাম করিম শেখ ,তার হাত থেকে জঠরস্থ সন্তান বা সন্ততিকে বাঁচাবার জন্যে চুপিসারে গৃহত্যাগ করতে গেলে সদা সতর্ক পুরুষটি তাকে ধরে ফেলে এবং বলে, " কি ভেবেছিলি, আমি দেখতে পাবোনা? আমি তো সবসময় তোকে নজরে নজরে রেখেছি। কোথায় আর যাবি? যাওয়ার কি জায়গা আছে?
— না, আমি এবার এটা করতে দেবো না।
— তুই কি দিবি না। আমার অন্যথা করলে তোকে বাঘ সিংহের মুখে ফেলে তোর ভবলীলা সাঙ্গ করে তোর বাবা মায়ের কাছে পাঠিয়ে দেবো। বাপ মা মরা সমর্থ মেয়ে, তোকে নিয়ে এসেছি কি এমনি। তোকে বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াবো বলে? আমাকে সে বান্দা পাসনি।
" কোন কাজ কর্ম করতে পারো না? সব পুরুষই তো কিছু না কিছু করে। ঠায় ঘরে বসে আছো আর আমায় জ্বালিয়ে খাচ্ছো। আমি আর পারছি না। বছরের পর বছর সন্তান জন্ম দিচ্ছি , অথচ কাউকেও ধরে রাখতে পারছি না। বছর বছর ছেলেমেয়ে বিয়চ্ছি। একটু ভালোমন্দ খেতে পাইনা। শরীর দুর্বল লাগে।আমার বেঁচে থেকে কী লাভ? এর চেয়ে মরাই ভালো ছিলো।", তসলিমা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অসহায়ের মতো কাঁদতে কাঁদতে কথা গুলো বলে চলে।
"মরে যাবি কি? মরে গেলে আমার চলবে কী করে? এমন ডিম পাড়া হাঁস, মরে গেলে চলবে? সে নয়, তোকে আমি মাঝে মধ্যে ভালো মন্দ এনে খাওয়াবো। কিন্তু মরার কথা মুখে আনিস নি। তোর বাবা মা মারা যাবার পর মরতে তো যাচ্ছিলি। আমি না বাঁচালে, এতোদিনে মরেই যেতিস ।"
—মরে গেলে ভালোই হতো। এ পাপের কাজ তো করতে হতো না। তখন তো সোহাগ দেখিয়ে প্রতিবেশীদের সামনে বলেছিলে আমারে নিকা করবে। এই বলে আমায় নিয়ে এসেছিলে। এখানে লোকের কাছে বিবি বলে পরিচয় দাও। লোক তো আমায় তোমার রক্ষিতা ভাবে। আমারে রক্ষিতা করে রেখে আমার ওপরে দিনের পর দিন অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছো। আমি আর পারছি না।
তসলিমা ভাবলো একে না মারা পর্যন্ত একটাও গর্ভজাতককে সে বাঁচাতে পারবে না।আর এই অন্যায় কাজ থেকে ওকে বিরত করতে পারবে না। এবারের গর্ভজাতককে সে বাঁচাবেই বাঁচাবে । যে কোন একটা কাজ জুটিয়ে সে বাচ্চাটাকে মানুষ করবে।তাই সে অনন্য উপায় হয়ে হাতের সামনে একটা শাবল পেয়ে মাথায় সজোরে আঘাত করে ওখান থেকে পালিয়ে আসতে গিয়ে লেবার পেন অনুভব করলো জঙ্গলের মুখে। তাই প্রাণের মায়া ত্যাগ করে নিকটবর্তী জঙ্গলে সন্তান প্রসব করলো। এদিকে করিম রক্তাক্ত অবস্থায় মৃত্যু বরণ করলো।সন্তান স্নেহ কি জিনিস তা এতো দিনেও মেয়েটি বুঝে উঠতে পারেননি। কারণ তার স্বামী বিগত কয়েক বছরে পরপর তিনটি বাচ্চা জন্মের পরে পরেই বিক্রি করে দিয়েছে। তসলিমা বাধা দিয়েও কিছু করতে পারেনি।বাচ্চা বিক্রির চক্র ওই অঞ্চলে ঘোরাফেরা করে। এইসব বাচ্চা পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে পাচার হয়ে যায়।
এক মুমুর্ষ বিধবার মৃত্যুর পর চারপাশের ক্ষুধার্ত নেকড়ে বাঘেদের দ্বারা অত্যাচারিত হয়ে রেললাইনে মাথা দিয়ে মরতে চেয়ে ছিলো। পিতৃমাতৃ হারা অল্প বয়স্কা কন্যাকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে নিকা করবে বলে ফুসলিয়ে নিয়ে এসে ঘরে রক্ষিতার মতো রেখে দিনের পর দিন ধর্ষণ করে সন্তান জন্ম দেওয়ার যন্ত্রে পরিণত করে দেয় এই অলস অপদার্থ মানুষটা। কোন কাজকর্ম করে না, শুধু বসে বসে খায় আর কালো ধান্ধা করে বেড়ায়। সন্তান বিক্রির মোটা টাকায় বছর খানেক চালিয়ে দেয়। টাকা ফুরিয়ে এলে আবার ঘুরঘুর করে সন্তান জন্ম দেওয়ার। তসলিমা রাজি হয় না। আর পেরে উঠে না। তবুও তাকে জোর করে ধর্ষণ করতে শুরু করে। কিন্তু এবার এই শয়তান লোকটা কৃতকার্য হতে পারে নি শুধু তসলিমার মনের জোরে। অনেকবার যখন পেটে বাচ্চা থাকে না,তসলিমা ভেবেছিলো পালিয়ে যাবে। কিন্তু কোথায় পালাবে? ওর মতো হতভাগির যাবার জায়গা নেই কোথায়ও। বাবা রোজাউল আক্তার চটকলে কাজ করতো। মোটামুটি ভাবে সংসারটা চলে যেতো। কিন্তু অনেক দিন চটকলে ধর্মঘট চলছিলো। তখন থেকেই সংসারের টালমাটাল অবস্থা। তারপর একদিন মালিক পক্ষ লোকসানে চলার অজুহাত দেখিয়ে ব্যবসা বন্ধ করে দেয়।
মালিক বকেয়া টাকার কিছুটা মিটিয়েছিলো । তারপর আর উচ্চবাচ্য করে নি। একদিন সংসারের চরম অভাবের দিনে রেজাউল গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করলো। মা আমিনা বিবি অপুষ্টিতে ভুগে যক্ষ্মা রোগ বাঁধিয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিলো। তসলিমা একা হয়ে পড়লো।
ফরেস্টের কর্মচারীরা জাল ফেলে সিংহীটিকে আটক করে সদ্যজাত সন্তান ও তার মাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়। সুস্থ হয়ে উঠলে ফরেস্টার তসলিমার স্বীকারোক্তিতে সব কথা জানতে পেরে বাচ্চাটিকে এক অনাথ আশ্রমে রাখার ব্যবস্থা করে দিয়ে এবং তসলিমাকে নিজেকে এবং তার বাচ্চাকে বাঁচাবার নিমিত্তে করিমকে খুন করার অপরাধে আইনের হাতে তুলে দেন। যেখানে একটা হিংস্র জানোয়ারের মাতৃসুলভ মমত্ব থাকার জন্য তসলিমা ও তার সন্তান প্রাণ রক্ষা করতে পারলো , সেখানে একজন মনুষ্য জন্ম গ্রহণ করেও পিতৃত্বের মমত্ব টুকু অর্জন করতে পারে নি,এতই যে অপদার্থ, অমানুষ ! ওর মতো অপদার্থের পিতৃত্বের পাঠ নেওয়ার জন্য হিংস্র পশুদের মাঝে জায়গা হওয়া উচিত।।
==================
Samir Kumar Dutta
Pune, Maharashtra

Comments
Post a Comment