গল্প
অক্ষরের আলো
জয় মণ্ডল
মমতার বিয়ে হয়েছিল যখন সে সবে স্কুলের গণ্ডি পেরিয়েছে। স্বপ্ন ছিল পড়াশোনা করার, কিন্তু শ্বশুরবাড়ির লোহার শিকল আর "মেয়েদের বেশি পড়ে কাজ নেই" সুলভ কটাক্ষে সেই স্বপ্ন তাসের ঘরের মতো ভেঙে যায়। মমতার স্বামী রতন সামান্য দিনমজুর। অভাবের সংসারে মমতার দিন কাটত হাড়ভাঙা খাটুনি আর গঞ্জনা সয়ে।
কয়েক বছর পর মমতার কোলে এল এক কন্যা সন্তান— 'দিয়া'। দিয়া জন্মানোর পর থেকেই সংসারে অশান্তি বাড়ল। রতনের আক্ষেপ ছিল ছেলে হলো না কেন। মমতা মুখ বুজে সব সইত, কিন্তু একটা বিষয়ে সে ছিল পাথরের মতো শক্ত— সে তার মেয়েকে নিজের মতো অশিক্ষিত রাখবে না।
দিয়া যখন স্কুলে যাওয়ার বয়সে পৌঁছাল, রতন সাফ জানিয়ে দিল, "মেয়ে মানুষ পড়ে কী হবে? তার চেয়ে বরং বড় হোক, অন্যের বাড়িতে কাজে লাগিয়ে দেব।" মমতা সেদিন প্রথম গলার স্বর উঁচিয়ে বলেছিল, "আমার রক্ত বেচে হলেও আমি ওকে পড়াব।"
শুরু হলো মমতার এক নতুন লড়াই। ভোর চারটেয় উঠে রান্নাবান্না শেষ করে সে লুকিয়ে মানুষের বাড়িতে ধুনুচি তৈরির কাজ শুরু করল। দুপুরে যখন পাড়ার সবাই ঘুমাত, মমতা তখন সেলাই মেশিনে মুখ গুঁজে বসে থাকত। রাতের বেলা কুপি জ্বালিয়ে মেয়েকে নিয়ে অক্ষর চিনত। দিয়া যখন অ-আ-ক-খ শিখত, মমতার চোখের কোণে তখন জল চিকচিক করত। সে নিজের অপূর্ণ স্বপ্নগুলো মেয়ের চোখের তারায় দেখতে পেত।
বছর যায়। অভাব আর অপুষ্টিতে মমতার শরীর ভেঙে পড়েছিল। কিন্তু দিয়ার স্কুলের বেতন আর বইয়ের টাকা সে কোনোদিন কম হতে দেয়নি। রতন যখন মাতাল হয়ে ফিরে মমতাকে মারধর করত, মমতা শুধু মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বলত, "তুই শুধু পড়ে যা দিয়া, তোকে অনেক দূরে যেতে হবে।"
দশ বছর পর। দিয়া আজ স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে শহরে নার্সিং পড়তে যাচ্ছে। যাওয়ার দিন মমতা তার পুরনো আঁচলের খুঁটে বাঁধা জমানো কিছু টাকা মেয়ের হাতে গুঁজে দিল। দিয়া মায়ের সেই খসখসে, কড়া পড়া হাতদুটো ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
"মা, তুমি নিজের জন্য একটাও নতুন শাড়ি কিনলে না সারা জীবনে?"
মমতা ম্লান হেসে বলল, "তোর ওই নার্সের সাদা পোশাকটা যখন দেখব দিয়া, সেদিনই আমার নতুন শাড়ি পরা হবে রে।"
আজ দিয়া শহরের এক নামী হাসপাতালের সিনিয়র নার্স। সে তার মাকে নিজের কাছে নিয়ে এসেছে। মমতা এখন আর মানুষের বাড়িতে কাজ করে না, কিন্তু সে আজও প্রতিদিন রাতে দিয়ার ফেলে আসা পুরনো বইগুলো হাতড়ায়। সমাজ মমতাকে কেবল একজন সাধারণ 'গৃহবধূ' বা 'মা' হিসেবে দেখলেও, দিয়ার কাছে সে এক জ্যান্ত যুদ্ধজাহাজ। যে নারী নিজে অন্ধকারে থেকেও আগামীর জন্য প্রদীপ জ্বালিয়ে যায়, সেই তো প্রকৃত নীলকণ্ঠী।
নারীর ত্যাগ কেবল দুর্বলতা নয়, এটি একটি নীরব বিপ্লব যা আগামী প্রজন্মকে বদলে দেয়।
-------------------
জয় মণ্ডল,
কালীমন্দির পূর্বপাড়া, কালিকাপুর, পোস্ট - কালিকাপুর, সোনারপুর, পশ্চিমবঙ্গ - ৭৪৩৩৩০

Comments
Post a Comment