পল গগ্যাঁর চিত্রে নারী
ড. সবুজ সরকার
পল গগ্যাঁ ( ১৮৪৮ - ১৯০৩) ছিলেন ঊনবিংশ শতাব্দীর একজন প্রতিভাবান ও প্রভাবশালী ফরাসি চিত্র শিল্পী। গগ্যাঁ তাঁর শিল্পচর্চার শুরুতে একজন Impressionist শিল্পী হিসেবে চিত্র অঙ্কন শুরু করলেও ( ১৮৮০ র দশকে) পরবর্তীতে পরিচিতি এবং খ্যাতি পেয়েছিলেন একজন বিশিষ্ট Post- Impressionist চিত্র শিল্পী হিসেবে।
নিজের জীবন দর্শন এবং তাঁর শিল্পকলা গগ্যাঁর কাছে চিহ্নিত হয়েছিল বন্য " savage" হিসেবে।
গগ্যাঁ তাঁর রেখায় এবং রঙে বারে বারে ফিরে যেতে চেয়েছেন আদিমতার কাছে। একাত্ম হতে চেয়েছেন প্রকৃতির সাথে। মিশে যেতে চেয়েছেন প্রকৃতির সম্মোহনী সত্ত্বায়। ১৮৮০ র পরে সময় যত এগিয়েছে গগ্যাঁ ততই আধুনিক সভ্য সমাজের যান্ত্রিকতা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে গেছেন। বারংবার আঁকতে চেয়েছেন কল্পনার সাম্রাজ্যের স্বর্গীয় অনুভূতিগুলিকে, আর তাঁর ছবিগুলো হয়ে উঠেছে অকৃত্রিম, খাঁটি এবং আদিম।
জীবনের প্রকৃত সত্য ও আদিম চেতনার সন্ধানে গগ্যাঁ ১৮৯১ সালে ফরাসি পলিনেশিয়ার তাহিতি দ্বীপে চলে যান। এই দ্বীপে সাধারণ মানুষের জীবন যাপন তাঁকে আকৃষ্ট করে। এবং নারীদের সৌন্দর্য তাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে। এবং তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ কাজগুলো তিনি এখানেই সম্পন্ন করেন। চিত্র নিয়ে তিনি অসাধারণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। রং ব্যবহারে হয়ে ওঠেন বেপরোয়া। গাঢ় রঙের ব্যবহার এবং অসাধারণ তুলির টানে তিনি হয়ে ওঠেন অদ্বিতীয়। তিনি নির্দ্বিধায় এঁকে ফেলেন যেখানে ঘাসের রং হয়ে উঠে নীল আর আকাশের রং হলুদ।
গগ্যাঁর ছবিতে আমরা তাহিতি দ্বীপের নারীদের যে ছবি পাই সেখানে সে নারীরা আদিম নিলিপ্ততার ঐশ্বর্যে আত্মমগ্ন। যেমন " Tahitian Women on the Beach" তাঁর অন্যতম উল্লেখযোগ্য একটি ছবি। দুই নারী পাশাপাশি বসে আছেন। হাঁটু মুড়ে একজন সামনের দিকে তাকিয়ে। অথচ দৃষ্টি সামনাসামনি নয়। কিছু একটা ভাবছেন। চোখের দৃষ্টিতে এক নির্লিপ্ততা। এখানে কোন তাড়া নেই। এ যেন অনন্ত বসে থাকা। তার পাশে অন্য এক নারী। হয়তোবা কোন সঙ্গী। যে বসে আছে বাঁকা হয়ে। সে নারীর শুধু একটি দিক দেখা যাচ্ছে। দুজনেই বসে আছে সমুদ্রের কিনারায়। পাশে সমুদ্রের সবুজাভ জল। দুই নারী আত্মমগ্ন। বিভোর। যেন এভাবে বসে থাকা যায় হাজার বছর ধরে।
আরো একটি বিখ্যাত ছবি " Two Tahitian Women" ; যেখানে আমরা দেখতে পাই স্বল্প বসনা দুই নারী। উন্মুক্ত বক্ষ। অথচ তাদের চোখে কোনো সংকোচ নেই। নেই দ্বিধা। দুজনেই দাঁড়িয়ে আছো অত্যন্ত সাবলীল। স্বাভাবিক তাদের শরীরী ভঙ্গিমা। গগ্যাঁ অত্যন্ত দক্ষতার সাথে আমাদের পৌঁছে দেন এই ক্রান্তীয় স্বর্গীয় পিঠস্থলে। তুই নারীর হাতে ধরা নিষিদ্ধ ফুল নাকি ফল ? এক আশ্চর্য আমন্ত্রণ যেন।
একইভাবে প্রাসঙ্গিক " Three Tahitian Women" চিত্রটিও। একটি উডকাট এর প্রসঙ্গ না উল্লেখ করলেই নয়, সেটি হল " Le Sourire" যেখানে দেখতে পাই একের পর এক ভাবনার কোলাজ। এবং একাধিক নারী চরিত্র ও মুখাবয়বকে পাশাপাশি রেখে শিল্পী এক গভীর জীবন বোধের পরিচয় দিচ্ছেন।
এই স্বল্প দৈর্ঘ্যের নিবন্ধের পরিশেষে এ কথা বলতে হয়, গগ্যাঁ র চিত্রে নারীরা কেবল রক্ত মাংসের মানুষ নন, বরং তারা জীবন ও মৃত্যুর রহস্যের ধারক ও বাহক। তার নারী চরিত্ররা কখনো আদিম মানবী, কখনও ইভের মত উপস্থিত হন ক্যানভাসে। কখনো তারা রহস্যময়ী দেবী। ঠিক যেমন " la Orana Maria" ছবিতে তিনি খ্রিস্টীয় মেরিকে তাহিতির এক নারী হিসেবে উপস্থাপন করেন। তাঁর চিত্রে নারী এক অখন্ড সত্ত্বা, মায়াবী এবং নন্দন তত্ত্বের গভীর প্রতীক।
==================
Sabuj Sarkar, Ph.D.
Assistant Professor,
Department of English,
University of Gour Banga,
P.O. Mokdumpur,
Malda, West Bengal-732103
INDIA
Email: sabuj.ugb@gmail.com
Assistant Professor,
Department of English,
University of Gour Banga,
P.O. Mokdumpur,
Malda, West Bengal-732103
INDIA
Email: sabuj.ugb@gmail.com

Comments
Post a Comment