সেই লাল ফ্রকটা
সৈকত প্রসাদ রায়
বৃদ্ধাশ্রমের পশ্চিম দিকের জানলাটা বিকেলের রোদে একটু লালচে হয়ে থাকে। সেই জানলায় ঠেস দিয়ে বসে থাকেন এক অশীতিপর বৃদ্ধা, তাঁর নাম জবা, কিন্তু এখানে সবাই তাঁকে 'বোবা মা' বলে ডাকে। আজ কুড়ি বছর হলো একটি দুর্ঘটনায় সে কথা বলার শক্তি চিরতরে হারিয়েছে । তাঁর ডান হাতটা অসাড়, পক্ষাঘাতে কুঁচকে গেছে আঙুলগুলো। কিন্তু তাঁর বাম হাতটি সবসময় বুকের কাছে একটি পুরনো, বিবর্ণ পলিথিন জাপটে ধরে থাকে। কেউ জানে না ওই পলিথিনের ভেতরে কী এমন মহার্ঘ্য বস্তু লুকিয়ে রেখেছেন তিনি।
জবার স্মৃতিগুলো আজ বড় বেশি জীবন্ত হয়ে উঠছে। ক্যালেন্ডারের পাতায় আজ পঁচিশে বৈশাখ হতে পারে, কিন্তু জবার মনের ক্যালেন্ডারে আজ তাঁর মেয়ে 'খুশি'র জন্মদিন।
ফিরে যাওয়া যাক পঁচিশ বছর আগের এক বসন্তের রাতে। জবা তখন টগবগে তরুণী, তবে কপালটা তাঁর পোড়া। স্বামী মারা গেছেন খুশির জন্মের ছ'মাসের মাথায়। লোকের বাড়িতে বাসন মেজে, ধান সেদ্ধ করে জবা বড় করছিলেন তাঁর একমাত্র প্রাণভ্রমরা খুশিকে। খুশির বয়স তখন সাত। বায়না ধরেছিল, "মা, দোকানে ওই যে লাল ফ্রকটা ঝুলে আছে, ওটা আমায় কিনে দেবে?"
জবা সেদিন কথা দিয়েছিলেন। টানা তিন মাস রাতের ঘুম বিসর্জন দিয়ে বাড়তি জামাকাপড় সেলাই করেছিলেন তিনি। পঁচিশে বৈশাখ খুশির জন্মদিন। জবা সারাদিন উপোস থেকে বিকেলের দিকে বাজারে গিয়েছিলেন। আঁচলের খুঁটে পাঁচটা একশো টাকার নোট আর কিছু খুচরো পয়সা নিয়ে যখন সেই লাল ফ্রকটা কিনলেন, জবার চোখে তখন জল। ভাবছিলেন, তাঁর রাজকন্যাকে আজ কেমন অপার্থিব সুন্দর লাগবে!
কিন্তু গ্রাম অভিমুখে ফেরার পথেই আকাশ কালো করে ধোঁয়া উঠতে দেখলেন। চিৎকার শুনতে পেলেন— "আগুন! আগুন লেগেছে পাড়ায়!" জবার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। তাঁর কুঁড়েঘরটা যে একদম খড়ের গাদার পাশে!
পাগলের মতো দৌড়ে যখন পাড়ায় পৌঁছালেন, দেখলেন চারদিকে আগুনের লেলিহান শিখা। তাঁর জীর্ণ কুটিরটি তখন আগুনের গ্রাসে। পাড়ার লোক তাঁকে আটকে ধরল, "যাস না জবা! সব শেষ হয়ে গেছে!" কিন্তু জবা কারো কথা শোনেননি। তাঁর কানে শুধু বাজছিল খুশির আর্তনাদ। তিনি জানতেন না খুশি তখন পাশের বাড়ির বারান্দায় ভয়ে লুকিয়ে আছে। জবা ভাবলেন খুশি ভেতরে আটকা পড়েছে।
আঁচল মুখে চাপা দিয়ে জবা ঝাঁপিয়ে পড়লেন আগুনের অন্দরে। আগুনের উত্তাপে তাঁর চামড়া ফোসকা পড়তে শুরু করল। ঠিক তখনই ঘরের একটি জ্বলন্ত কাঠ হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল জবার পিঠের ওপর। তিনি আর্তচিৎকার করতে চাইলেন, কিন্তু গরম ধোঁয়া আর ছাই তাঁর শ্বাসনালী জ্বালিয়ে দিল। মুহূর্তেই জবার কণ্ঠস্বর স্তব্ধ হয়ে গেল । চৈতন্য হারানোর আগে তিনি শুধু অনুভব করেছিলেন, তাঁর বুকের নিচে সেই নতুন লাল ফ্রকটি সযত্নে আগলে রেখেছেন তিনি। ফ্রকটা পুড়তে দেননি তিনি।
হাসপাতালে যখন জ্ঞান ফিরল, জবা দেখলেন তাঁর পিঠ আর ডান হাতটা কুৎসিতভাবে ঝলসে গেছে। ডাক্তার জানালেন, তিনি আর কোনোদিন কথা বলতে পারবেন না। কিন্তু জবার চোখে তখন জল ছিল না, ছিল তৃপ্তি। কারণ খুশি বেঁচে আছে। খুশিকে জড়িয়ে ধরে তিনি শুধু ফুপিয়ে কেঁদেছিলেন, শব্দহীন সেই কান্না ভগবানের ঘর পর্যন্ত পৌঁছেছিল কি না কেউ জানে না। বছর ঘুরল, জবা তাঁর সেই পঙ্গু শরীর নিয়ে লড়াই করে খুশিকে পড়ালেন। বড় করলেন। খুশির রূপ ছিল দেখার মতো, আর মেধা ছিল তুখোড়। জবা নিজের খাওয়া কমিয়ে খুশির জন্য দুধ কিনতেন। খুশি শহরের বড় কলেজে পড়তে গেল, তারপর এক ধনী পরিবারের ছেলের সাথে খুশির বিয়ে ঠিক হলো।
বিয়ের দিন জবা এক কোণে ঘোমটা টেনে বসেছিলেন। পাছে তাঁর এই বিকৃত শরীর আর কুৎসিত মুখ দেখে জামাইবাড়ির লোক ভয় পায় বা লজ্জা পায়। খুশি এসে মায়ের কানে কানে বলেছিল, "মা, আজ অন্তত তুমি বাইরে এসো না। ওরা আধুনিক মানুষ, তোমার এই অবস্থা দেখলে কী ভাববে বলো তো?" জবা কথা বলতে পারেননি। কেবল মাথা নিচু করে নিজের ইষ্টদেবতাকে স্মরণ করেছিলেন। মেয়ের সুখের জন্য তিনি নিজেকে অন্ধকার ঘরে বন্দি করে রেখেছিলেন সেই উৎসবের রাতেও।
বিয়ের বছর দুয়েক পর একদিন খুশি এল একটা গাড়ি নিয়ে। জবার আনন্দ আর ধরে না। ভেবেছিলেন মেয়ে তাঁকে নিয়ে যেতে এসেছে। কিন্তু খুশি তাঁকে নিয়ে এল এক শহরে, এক বড় ফটকের সামনে। উপরে লেখা ছিল— 'শান্তিনিবাস বৃদ্ধাশ্রম'।
খুশি জবার হাতে সেই পুরনো লাল ফ্রকটা ধরিয়ে দিয়ে বলল, "মা, বাড়িতে জায়গা খুব কম। তা ছাড়া আমার শাশুড়ি তোমার এই বোবা কান্না আর পঙ্গুত্ব মেনে নিতে পারবেন না, এখানে তুমি ভালো থাকবে, সময় পেলে আসব।"
জবা হাত নেড়ে কিছু বলতে চেয়েছিলেন। হয়তো বলতে চেয়েছিলেন, "খুশি, তোর হাতের ছোঁয়া ছাড়া মা বাঁচবে না রে!" কিন্তু তাঁর কণ্ঠস্বর তো পঁচিশ বছর আগেই পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। গাড়িটা ধুলো উড়িয়ে চলে গেল, জবা অপলক চোখে চেয়ে রইলেন পথের দিকে।
আজ খুশির জন্মদিন। জবা বৃদ্ধাশ্রমের আঙিনা থেকে কুড়িয়ে আনা কয়েকটি জবা ফুল দিয়ে একটি ছোট মালা গেঁথেছেন। তিনি জানেন খুশি আসবে না, তবুও মা এর মন তো! হঠাৎ গেটের সামনে একটা দামী গাড়ি এসে থামল। জবা কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়ালেন। জানলার কাঁচ নামিয়ে খুশি উঁকি দিল, কিন্তু সে নামল না। বৃদ্ধাশ্রমের কেয়ারটেকারকে ডেকে খুশি একটা প্যাকেট দিল। বলল, "ভিতরে মাকে এটা দিয়ে দেবেন। আমরা নতুন বাড়িতে শিফ্ট হচ্ছি, পুরনো ন্যাকড়া কাপড় রাখার জায়গা নেই ওখানে। মা যেন এগুলো আর না পাঠায়।"
কেয়ারটেকার প্যাকেটটি নিয়ে জবার কাছে এলেন। জবা থরথর করে কাঁপা হাতে প্যাকেটটি খুললেন। ভেতরে ছিল খুশির মেয়ের জন্য পাঠানো কিছু নিজে হাতে তৈরী করা কাঁথা আর সেই পুরনো লাল ফ্রকটি। সেই পঁচিশ বছর আগেকার লাল ফ্রক, যার জন্য জবা নিজের রূপ, কণ্ঠস্বর আর সুস্থ শরীর বিসর্জন দিয়েছিলেন। ফ্রকটি এখন ছিঁড়ে গেছে, রঙ চটে গেছে। কিন্তু ওই কাপড়ের ভাজে ভাজে জবার রক্তের আর ঘামের গন্ধ লেগে আছে।
জবা দেখলেন ফ্রকটির সাথে একটা চিরকুট - "মা, এগুলো আগলে রাখার দিন শেষ, স্মৃতি দিয়ে পেট ভরে না, নিজের খেয়াল রেখো।"
জবা স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। তাঁর চোখের জল আজ আর বাঁধ মানছে না। তিনি সেই বিবর্ণ লাল ফ্রকটি আর নিজের হাতে গাঁথা জবা ফুলের মালাটি বুকের সাথে চেপে ধরলেন। তিনি আকাশের দিকে মুখ তুললেন, তাঁর কোনো অভিযোগ নেই মেয়ের প্রতি, তিনি কেবল তাঁর অস্ফুট আর্তনাদে ঈশ্বরকে বলছেন— "হে ঠাকুর, আমার খুশিকে তুমি ভালো রেখো। ওর মেয়ে যেন বড় হয়ে ওর মাকে কোনোদিন এমন করে পুরনো স্মৃতি ফেরত না দেয়।"
বিকেলের আলো ফুরিয়ে এল, বৃদ্ধাশ্রমের অন্ধকার বারান্দায় বসে রইলেন এক মা, যাঁর কাছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদ এখন এক টুকরো পোড়া ত্যাগের স্মৃতি।
==================
সৈকত প্রসাদ রায়
রানাঘাট, নদীয়া, পশ্চিমবঙ্গ।

Comments
Post a Comment