শিক্ষকের দোয়া ও বদদোয়ার ফল
আশা মনি
জনাব মাহাবুব আলম পেশায় ছিলেন একজন প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক।তার একমাত্র ছেলে রবিন। ছোটবেলা থেকেই রবিনকে তার বাবা -মা নম্র, ভদ্র ও আদর্শ সন্তান হিসেবে গড়ে তুলেছেন।রবিন বড়দের সম্মান করেন ছোটদের স্নেহ করেন। সর্বদা সত্য কথা বলেন। কাউকে কষ্ট দেয় না।ধীরে ধীরে রবিন প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় জিপিএ-ফাইভ পেয়ে উত্তীর্ণ হলো। রবিনের বাবা-মা তাকে একটি মাধ্যমিক স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিল। রবিনের সহপাঠী এবং শিক্ষকমণ্ডলী সবাই তার আচরণে মুগ্ধ হয়েছিল। তার বাবা সবসময় তাকে বলতো,বাবা! শিক্ষকদের সাথে কখনো বেয়াদবি করবা না। পিতা-মাতার পরে শিক্ষক হলো তোমার সম্মান পাওয়ার অধিক যোগ্য। তাদের মনে কখনো আঘাত দিবে না।রবিন তার বাবার কথাগুলো মন দিয়ে শুনতো।দেখতে দেখতেই রবিন নবম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হলো। একদিন ক্লাসে সবাই খুব চিৎকার চেঁচামেচি করছিল। রবিন চুপচাপ বসে ছিল।তখন হঠাৎ বাংলা ক্লাসের স্যার জনাব আশরাফুল আলম লম্বা একটা বাঁশের ব্যাট হাতে নিয়ে ক্লাসে ঢুকলেন। এবং কিছু বুঝে ওঠার আগেই রবিনের উপর ব্যাটটা প্রয়োগ করলেন । যেহেতু রবিন প্রথম বেঞ্চে বসেছিল তাই রবিনের হাতেই পড়লো একটা শক্ত মাইর । রবিনের হাত ছিল নরম ও চামড়া ছিল পাতলা তাই সাথে সাথেই রক্ত ঝরতে শুরু করলো। কিন্তু রবিন কোনো দোষ- ই করে নাই। রবিনের সহপাঠী তাকে বিশ্রামাগার নিয়ে গিয়ে দ্রুত ফাস্ট বাক্ম থেকে ব্যান্ডেজ করে দিল। ক্লাস শেষ করে আশরাফুল স্যার রবিনের কাছে এসে বসলেন। অত্যন্ত মোলায়েম কণ্ঠে বললেন, বাবা! আমি তোমাকে মারতে চাইনি।ক্লাস টাকে শান্ত করার জন্য হঠাৎ -ই তোমার উপর মাইরটা পড়ছে। তুমি কষ্ট পাওনা কেমন।এই বলে রবিনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।রবিন মুচকি হেসে সমর্থন জানালেন। বিষয়টি যখন রবিনের বাবা জানতে পারলেন; তখন তিনি সেই স্যারের সাথে দেখা করলেন এবং বললেন, আপনি কি ভাবছেন স্যার? আমি অভিযোগ নিয়ে আসছি? না। আমি আরো আপনাদেরকে সমর্থন করছি।রবিন কোনো ভুল করলে তাকে তার উপযুক্ত শাস্তি দিবেন। শিক্ষক রবিনের বাবার কথা শুনে খুব খুশি হলেন। এবং বললেন, আমি জানি এবং দোয়া করি, রবিন একদিন অনেক বড়ো হবে। সবার মুখ উজ্জ্বল করবে । রবিনের বাবা স্যারের সাথে আন্তরিক কুশল বিনিময় করে প্রস্থান করলেন।
অন্যদিকে রবিনের এক সহপাঠী বন্ধু তার নাম রাতুল।সে খুবই দুষ্টু ও উদাসীন ছিলেন। বড়দের সম্মান করতেন না। এছাড়াও মেয়েদের উত্ত্যক্ত করছিল রোজ।পথে বিভিন্ন কথা বলে এবং চিঠি দিয়ে মেয়েদের বিরক্ত করছিল।রাতুলের সহপাঠী মেয়েরা স্যারের কাছে অভিযোগ করলো। এবং বিচার করার দায়িত্ব আসলো বাংলার শিক্ষক আশরাফুল স্যারের উপর। স্যার যখন রাতুল কে শাসনমূলক একটা মারলেন তখন সে স্যারের উপর ক্রুদ্ধ হয়ে ক্লাস থেকে বেরিয়ে সোজা বাড়িতে চলে গেল এবং তার বাবাকে নিয়ে আসলো। রাতুলের বাবা সব কথা শুনার পর ও তার ছেলেকে শাসন না করে উল্টো শিক্ষকের বিরুদ্ধে কথা বললেন। কেন তার ছেলেকে মারা হলো? রাতুলের বাবার কথা শুনে স্যার খুবই লজ্জিত হলেন। এবং মনে বড়ো আঘাত পেলেন। স্যার ব্যথিত হৃদয়ে বিরহ কণ্ঠে রাতুলের বাবাকে বললেন, আপনি আমাকে থামিয়ে বড়ো ভুল করলেন।ওর জীবনটা এখানেই থমকে দাঁড়ালো। কিন্তু রাতুল ও তার বাবা নিজেদের আত্মঅহংকারকে বড়ো করে সেখানে থেকে প্রস্থান করলেন।
কয়েক বছর পর রবিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেলো। পড়াশোনা শেষ করে সে কৃতিত্বের সাথে বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশনে চাকরি পেল। রবিনের বাবা -মা রবিনের জন্য গর্বিত হলেন। অন্যদিকে রাতুলের জীবন সত্যিই সেখানেই থেমে গেছে।সে আর পড়াশোনা করতে পারেনি। কয়েকবার ফেইল করে পড়াশোনা বাদ দিয়ে দেয়।আজ সে বাড়ির সামনে একটা মুদি দোকান দিয়ে উপার্জন করে কোনরকম সংসার চালায়। রাতুল সেদিনের কথা মনে করে অনুশোচিত হয়।আফসোস করে হায়! আমি যদি মন দিয়ে পড়াশোনা করতাম, স্যারের মনে আঘাত না দিতাম,তাহলে আজকে আমিও রবিনের মতো বড়ো অফিসার হতে পারতাম। কিন্তু রাতুলের সেই জীবন আর ফিরে আসবে না।
শিক্ষার্থী -সরকারি করিম উদ্দিন পাবলিক কলেজ।
কালীগঞ্জ, লালমনিরহাট, বাংলাদেশ।
(০১৯৮০৭৩৮৪৪৬)
Comments
Post a Comment