Skip to main content

পুনঃপাঠ ।। যে-দেশে বহু ধর্ম বহু ভাষা ।। অন্নদাশঙ্কর রায়

যে-দেশে বহু ধর্ম বহু ভাষা

অন্নদাশঙ্কর রায় 

যে-দেশে বহু ধর্ম সেদেশের মূলনীতি কী হওয়া উচিত? এ প্রশ্নের উত্তর পাকিস্তান একভাবে দিয়েছে। ভারত দিয়েছে অন্যভাবে। পাকিস্তানের অধিকাংশের ইচ্ছা অনুসারে স্থির হয়ে গেছে পাকিস্তান হচ্ছে ইসলামি রাষ্ট্র।

সেই যুক্তি অনুসরণ করলে ভারত হতে পারত হিন্দু রাষ্ট্র। কিন্তু ভারত করল অপর একটি যুক্তি অবলম্বন। ভারতের মতে সব ধর্মই সমান, সব ধর্মই সত্য, সংখ্যাগুরুর মুখ চেয়ে একটি ধর্মকেই রাষ্ট্রধর্মে পরিণত করলে আর-সব ধর্মের ওপর অবিচার করা হবে, সুতরাং সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু নির্বিশেষে সর্বোদয়ের বিচারে সকলের প্রতি সমদর্শিতার খাতিরে ভারতকে হতে হবে সেকুলার স্টেট। যে রাষ্ট্র ধর্মের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ।

এই যুক্তি বর্মাও অবলম্বন করেছিল। কিন্তু কী যে দুর্বুদ্ধি হল উ নু এবং তার দলের, তাঁরা সাধারণ নির্বাচনে জিতেই আইন পাশ করিয়ে নিলেন যে বর্মা হবে বৌদ্ধ রাষ্ট্র। অধিকাংশের ইচ্ছায় কর্ম, কে বাধা দেবে? কিন্তু এর পরিণাম হল অশুভ। শান, কারেন প্রভৃতি পার্বত্য জাতির তরফ থেকে দাবি উঠল আংশিক স্বাতন্ত্র্যের। শেষে প্রধান সেনাপতি রাষ্ট্রীয়ক্ষমতা আত্মসাৎ করে শাসনতান্ত্রিক সরকার ধ্বংস করলেন। পাকিস্তানেও তাই হয়েছে। তবে ইসলামি রাষ্ট্র এখনও লোপ পায়নি, যেমন লোপ পেয়েছে বৌদ্ধ রাষ্ট্র। পাকিস্তানি জনগণ যদি কোনো গণতন্ত্রের মর্যাদা বোঝে তাহলে সেইসঙ্গে সেকুলার স্টেটের মর্যাদাও বুঝবে। যেখানে সেকুলার স্টেট নেই সেখানে গণতন্ত্র কেবলমাত্র অধিকাংশের ইচ্ছাসাপেক্ষ নয়, সর্বজনের ইচ্ছানির্ভর। গণতন্ত্রে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক থাকতে পারে না। যারা প্রতিবেশীকে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পর্যবসিত করে তারা ডিক্টেটরের পদানত হবেই। তারা আত্মকর্তৃত্বের যোগ্য নয়। কারণ তারা অপরের সমান অধিকার মানে না।

ভারত সেকুলার স্টেট হয়ে বর্মা ও পাকিস্তানের দশা এড়িয়েছে। সেকুলার স্টেট যতই দৃঢ় হবে গণতন্ত্রও ততই দৃঢ় হবে। অনেকেই এটা হৃদয়ঙ্গম করেছেন, কিন্তু সকলে এখনও করেননি। তাঁরা চান হিন্দু রাষ্ট্র, হলই-বা সেটা ফ্যাসিস্টশাসিত। ইতিহাস এঁদের বাসনা পূর্ণ করলে ভারতেরও দশা হবে পাকিস্তান বা বর্মার মতোই।

এ গেল ধর্মের কথা। ইতিমধ্যে ভাষার প্রশ্ন প্রবল হয়েছে। যেদেশে বহু ভাষা সেদেশের মূলনীতি কী হওয়া উচিত? এর উত্তর বেলজিয়াম ও সুইটজারল্যাণ্ড একভাবে দিয়েছে। ভারত দিয়েছে অন্যভাবে। কার উত্তরটা ঠিক? কারটা বেঠিক?

বেলজিয়াম বলে একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা হয় ১৮৩০ সালে। তার রাষ্ট্রভাষা হয় ফরাসি। দশটা বছর যেতে-না-যেতেই ফ্লেমিশদের দিক থেকে প্রতিবাদ ওঠে। তারাও তো বেলজিয়ান। তবে তাদের ভাষা কেন ফরাসির সমান মর্যাদা পাবে না? দীর্ঘকাল আন্দোলন চালানোর ফলে ১৮৯৮ সালে আইন করে ফরাসি ও ফ্লেমিশ উভয় ভাষাকেই বেলজিয়ামের ন্যাশনাল ভাষারূপে সমান স্থান দেওয়া হয়। এখন সেদেশের রাষ্ট্রভাষা এক নয়, দুই। সরকারি কাজকর্ম দুই ভাষায় চলে।

তেমনি সুইটজারল্যাণ্ডে ১৮৭৪ সালের শাসনতন্ত্রে মেনে নেওয়া হয় যে, তাদের ন্যাশনাল ভাষা হবে জার্মান, ফরাসি ও ইটালিয়ান। বলা বাহুল্য এ তিনটি ভাষা শুধু উপরের দিকের কাজকর্মের ভাষা। নীচের দিকের কাজকর্ম জেলা অনুসারে ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় চলে। জেলা স্তরে আরও দুটি ভাষারও অস্তিত্ব আছে। এ ছাড়া সর্বত্র ইংরেজির প্রচলন। সেটা অবশ্য বেসরকারিভাবে। সুইসরা একাধিক ভাষা শিখতে অভ্যস্ত।

একটা দেশের একটাই রাষ্ট্রধর্ম হবে এ ধারণা ইউরোপেও ছিল। তার দরুন প্রচুর রক্তপাত হয়েছে। সংখ্যাগুরুরা সংখ্যালঘুদের জ্বালিয়েছে। আজকাল আর সে-ধারণা নেই। কিন্তু একটা দেশের একটাই রাষ্ট্রভাষা হবে, এ ধারণা অত্যন্ত ব্যাপক। এর ফলে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলিতে যথেষ্ট অত্যাচার হয়েছে। আলসাস-লোরেনের লোক একবার জার্মানদের হাতে মার খেয়েছে, একবার ফরাসিদের হাতে।

এখন ভারতের কথা বলি। একটা দেশের একটাই রাষ্ট্রধর্ম হবে, এ ধারণা যাঁদের মধ্যে নেই তাঁরাও বিশ্বাস করেন যে, একটা দেশের একটাই রাষ্ট্রভাষা হবে। বেলজিয়ামের চেয়ে, সুইটজারল্যাণ্ডের চেয়ে বহুগুণ বৃহৎ যে-দেশ, যার ভাষাসংখ্যা খুব কম করে ধরলেও চোদ্দো-পনেরোটি, সে দেশ যখন পরাধীন ছিল তখন একটি মাত্র বিদেশি ভাষার দ্বারা একসূত্রে গাঁথা ছিল। তার থেকে একটা সংস্কার জন্মেছে যে রাষ্ট্রভাষা একাধিক হতে পারে না। আমি কিন্তু এই সংস্কারের স্বতঃসিদ্ধতা স্বীকার করিনি। এটার সত্যতা নির্ভর করছে সকলের সম্মতির ওপরে, সুবিধার ওপরে, ন্যায়বোধের ওপরে। অধিকাংশের ভোটের জোরে কোনো একটি ভারতীয় ভাষাকে আর সকলের ওপর চাপালে পাকিস্তানের ইসলামি রাষ্ট্রের মতো একটা অপরিণামদর্শী সমাধান হয়। সেরকম একটা সমাধান যখন বেলজিয়ামে বা সুইটজারল্যাণ্ডে টিকল না তখন ভারতেও টিকতে পারে না। ইতিমধ্যেই তামিলদের জন্যে স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের প্রস্তাব উঠেছে। মাত্র পনেরো বছর যেতে-না-যেতেই এই। এখনও তো অর্ধশতাব্দী কাটেনি। ভারত যদি ছত্রভঙ্গ হয় তবে ভাষার ইসুতেই হবে।

হিন্দির পিছনে সকলের সম্মতি নেই। সকলের তাতে সুবিধা হবে না। সকলের ন্যায়বোধ তার দ্বারা চরিতার্থ হবার নয়। তার পক্ষে একটি মাত্র যুক্তি—অধিকাংশ লোক হিন্দি চায়। অর্থাৎ অধিকাংশের ইচ্ছাই চূড়ান্ত। পাকিস্তানে যেমন ধর্মের ব্যাপারে অধিকাংশের ইচ্ছাই চূড়ান্ত, ভারতে তেমনি ভাষার ব্যাপারে অধিকাংশের ইচ্ছাই চূড়ান্ত। এরূপ ক্ষেত্রে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকত্বের আশঙ্কা জাগে। এমন কয়েকটি বিষয় আছে যা গায়ের জোরে বা ভোটের জোরে নিষ্পত্তি করা যায় না। ধর্ম তার একটি। ভাষা তার আরেকটি। ধর্মের বেলা আমরা বিজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছি। ভাষার বেলায়ও কি দিতে পারিনে?

তর্কটা হিন্দি বনাম ইংরেজি নয়। ইংরেজিকে সরানোর পরে ঘোরতর বিবাদ বেঁধে যাবে। তামিলরা হিন্দিকে মানবে না, নাগারা মানবে না, কাশ্মীরিরা মানবে না। বাঙালিরাও মানবে না। এমনই না মানার লক্ষণ চারদিকে। কংগ্রেস থাকতেই এই। কংগ্রেস কি চিরস্থায়ী? পরে যে দলটার হাতে ক্ষমতা পড়বে সে-দল যদি সব ক-টা রাজ্যের আস্থা না পায় তখন হিন্দির প্রতি বিরাগ হবে মানুষকে খেপিয়ে তোলার একটা উপায়। যেমন হিন্দুর ওপর বিরাগ হয়েছিল মুসলমানকে বিভ্রান্ত করার অব্যর্থ উপায়। সেইজন্যে তর্কটা হিন্দি বনাম ইংরেজি নয়। তর্কটা আসলে হচ্ছে হিন্দি বনাম তামিল-বাংলা-পাঞ্জাবি ইত্যাদি। হিন্দি হবে কেন্দ্রীয় সরকারের একমাত্র ভাষা, এর মানে হিন্দি হবে সারা ভারতের একচ্ছত্র ভাষা। যাদের মাতৃভাষা হিন্দি নয় তারা হিন্দি শিখতে গিয়ে দেখবে যে, প্রত্যেকটি হিন্দিভাষী শিশু জন্মত স্টার্ট পেয়ে এগিয়ে রয়েছে। যেমন জন্মত স্টার্ট পেয়ে এগিয়ে থাকত প্রত্যেকটি ইংরেজ শিশু। ইংরেজিকে যারা বিদায় করবে তারা কি ইংরেজির একমাত্র উত্তরাধিকারীকেও একদিন ঘাড় থেকে নামাতে চাইবে না?

হিন্দি যে ইংরেজির একমাত্র উত্তরাধিকারী হবার স্বপ্ন দেখছে, হিন্দি কি বুঝতে পারছে না যে আর সকলের সঙ্গে ভাগ না করে ভোগ করা যায় না? ভাগ করার নমুনা কি এই যে, হিন্দিই হবে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ও আর সব আঞ্চলিক ভাষা? সব ক-টা ভাষাকেই রাষ্ট্রভাষা করা চাই। সেটা যদি কাজের কথা না হয় তবে এমন একটি ভাষাকে হিন্দির সঙ্গে বন্ধনীভুক্ত করা চাই যার দ্বারা আর সকলের ন্যায়বোধ চরিতার্থ হবে। প্রতিযোগিতার বা পরীক্ষার ভাষা যদি হয় ইংরেজি, তাহলে আমাদের ন্যায়বোধ যতখানি চরিতার্থ হয় হিন্দি হলে ততখানি হয় না। বিদেশি ভাষা বলে ইংরেজিকে হটাতে চাও? বেশ। তার বদলে এমন একটি ভাষাকে হিন্দির সঙ্গে বন্ধনীভুক্ত করো, যে ভাষা আমাদের ন্যায়বোধকে পীড়া দেবে না। সে-ভাষাটি যে কোন ভাষা, অহিন্দিভাষীদের দ্বারাই সেটি স্থির হোক।

আর কোনো ভাষা ভারতের সকল প্রান্তে ইংরেজির মতো ব্যাপকভাবে প্রচলিত নয়, এটা একটা প্রত্যক্ষ সত্য। যেখানে হিন্দি চলে না সেখানেও ইংরেজি চলে। ইংরেজির অধিকারে না থাকলে সেসব অঞ্চল হিন্দির অধিকারেও আসত না। ইংরেজি নামক সত্যটির উৎপত্তিস্থল ইংল্যাণ্ড। তেমনি আরও অনেকগুলি সত্যেরও উৎপত্তি ইংল্যাণ্ডে বা ইউরোপে। আমাদের শাসনব্যবস্থা, সংবিধান, আইন-আদালত, পার্লামেন্ট, আর্মি, নেভি, পুলিশ, স্কুল-কলেজ, ল্যাবরেটরি, রেল, স্টিমার, ডাকঘর, ডাক্তারখানা, ব্যাঙ্ক, স্টক এক্সচেঞ্জ, ছাপাখানা, খবরের কাগজ, থিয়েটার, সিনেমা, রেডিয়ো, ট্রাম, বাস, মোটর—কোনোটিই-বা বিদেশাগত নয়? এমনকী কংগ্রেসও তো বিদেশি। হিন্দ, হিন্দু, হিন্দি এসবও তো বিদেশি ভাষার শব্দ। আজকাল স্বদেশি পারিভাষিক শব্দ দিয়ে শোধন করে নেওয়া চলেছে। ‘রাজভবন’ বললে স্বদেশিয়ানার একটা বিভ্রম সৃষ্টি হয়। কিন্তু যে বস্তুর নাম পালটে দেওয়া হয় তার বস্তুসত্তা অবিকল তেমনি রয়ে যায়। টেলিফোনকে কী-একটা বিকট হিন্দি নাম দেওয়া হয়েছে। তা সত্ত্বেও সেটা টেলিফোন নামক বিদেশি একটা যন্ত্রই। বিদেশি বলেই সেটা বর্জনীয় নয়।

তেমনি ইংরেজি। তার সঙ্গে পরাধীনতার সম্পর্ক একদা ছিল, এখন তো নেই। ভবিষ্যতেও সে-সম্পর্ক ফিরবে না। ইতিমধ্যেই স্থির হয়ে গেছে যে, সব ছাত্রকেই একটা স্তরে ইংরেজি শিখতে হবে। অবশ্যশিক্ষণীয় ভাষা হিসেবে ইংরেজিতে কারও আপত্তি নেই। তাই যদি হল তবে শিক্ষার শেষ ধাপে পরীক্ষা ও প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ইংরেজি হলে আপত্তির কী কারণ থাকতে পারে? তামিলরা ও বাঙালিরা জিতে যাবে, হিন্দিভাষীরা তাদের সঙ্গে পেরে উঠবে না, এই কারণ নয় তো? উপরের দিকে পরীক্ষা ও প্রতিযোগিতার মাধ্যম ইংরেজি যেমন ছিল তেমনি থাকাই রাষ্ট্রের স্বার্থ। সেইভাবেই রাষ্ট্র যোগ্যতম প্রার্থী বেছে নিতে পারে। করদাতার অর্থ সেইভাবেই সৎপাত্রে পড়বে। নিকট ভবিষ্যতে আমি এই ব্যবস্থার রদবদলের পক্ষপাতী নই। প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে সবাইকে সমান সুযোগ দেওয়াই যদি নীতি হয় তবে প্রতিযোগিতার মাধ্যম ইংরেজিই থাকবে, ইংরেজি ভিন্ন আর কোনো ভাষা হবে না। যদি হিন্দিকেও অন্যতম মাধ্যমে করো তবে বাংলাকেও করতে হবে, তামিল, তেলেগু, কন্নাডিগ, মালয়ালমকেও করতে হবে।

জাতীয় মর্যাদার খাতিরে হিন্দি ভারত রাষ্ট্রের সরকারি ভাষা হোক, কিন্তু আভ্যন্তরিক ন্যায়ের খাতিরে ইংরেজিই পরীক্ষা ও প্রতিযোগিতার মাধ্যমরূপে থাকুক। ইংরেজি মাধ্যম না থাকলে পরীক্ষা ও প্রতিযোগিতার মাধ্যম হোক বাংলা, উর্দু, মারাঠি, গুজরাতি ইত্যাদি চোদ্দো-পনেরোটি ভাষা—শুধু হিন্দি নয়। যেখানে হিন্দিকে বসালে অহিন্দিভাষীদের ক্ষতি সেখানে ইংরেজিকে রাখাই সমীচীন। বিদেশি বলে তাকে খেদিয়ে দিলে স্বদেশি বলে শুধু হিন্দিকে নয়, বাংলাকে, পাঞ্জাবিকে, তামিলকেও বসাতে হবে। যেখানে কারুর কোনো ক্ষতি নেই সেখানে হিন্দি আরাম করে বসুক। কিন্তু অপরের ক্ষতি যেখানে, সেখানে হিন্দির আরাম করে বসার অধিকার নেই। জাতীয়তার জন্যে তাকেও ত্যাগ স্বীকার করতে হবে।

একটা দেশের একটাই রাষ্ট্রভাষা হওয়া উচিত। এটা একভাষী দেশের বেলাই খাটে। ভারতের মতো বহুভাষী দেশে এটাকে খাটাতে যাঁরা চাইছেন তাঁরা মনে মনে ইংরেজিরই নজির অনুসরণ করছেন। ইংরেজি যেমন একচ্ছত্র ছিল তেমনি একচ্ছত্র হবে অন্য একটা ভাষা, অন্য একটি মাত্র ভাষা। সেই বিদেশি লজিকের জোরে হিন্দিকেও একচ্ছত্র করতে হবে। কিন্তু বিদেশি ভাষা বলে ইংরেজি যদি বিদায় হয় তবে তার নজিরটাকেই-বা মানতে যাব কেন? জাতীয় ঐক্য কি সুইসদেরও নেই? বেলজিয়ানদেরও নেই? একাধিক রাষ্ট্রভাষা কি তাদের ঐক্যহানি ঘটিয়েছে?

শেষপর্যন্ত তর্কটা দাঁড়ায় ইংরেজি হল বিদেশির ভাষা, বিজেতার ভাষা। তাকে বিদায় না দিলে স্বাধীনতা সম্পূর্ণ হবে না। বেশ, তাই হোক। তাহলে ইংরেজির নজিরটাকেও মন থেকে ঝেড়ে ফেলা যাক। ভারতের সব ক-টা ভাষাকেই হিন্দির সঙ্গে সমান মর্যাদা দিয়ে ভারতীয় ইউনিয়নের সরকারি ভাষা করা হোক। সেটা কাজের কথা নয় এ যুক্তি আর আমরা শুনতে চাইনে। একটা বহুভাষী দেশের রাষ্ট্রভাষা একটাই হবে এটাও কি কাজের কথা? ইংরেজরা তাদের নিজেদের সুবিধের জন্যে ওরকম করেছিল। মুষ্টিমেয় শিক্ষিত ভারতীয়েরও ওতে কিছু সুবিধে হয়েছিল। কিন্তু জনগণের দিক থেকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা—হিন্দি হলেও—কাজের কথা নয়। যতগুলি ভাষা ততগুলি রাষ্ট্রভাষা এইটেই কাজের কথা। আমরা যদি এই সত্যকে স্বীকার না করি, এই সত্যের সঙ্গে আপোশ রফা না করি তবে অমীমাংসিত সমস্যা একদিন আপনার পথ আপনি করে নেবে। বহুভাষী দেশ বহু রাষ্ট্র হবে।

ইউরোপীয়রা যদি না আসত তাহলে মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের পর ভারতবর্ষে বহুসংখ্যক স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হত। এরা যে-যার সুবিধামতো এক-একটা স্বদেশি ভাষাকেই রাষ্ট্রভাষা করত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একাধিক স্বদেশি ভাষাকে। হিন্দির সার্বভৌমত্ব সব হিন্দু মেনে নিত না। উর্দুর সার্বভৌমত্ব সব মুসলমান মেনে নিত না। হয়তো সবাই মিলে একদিন একটা ফেডারেশন বা কনফেডারেশন গড়ে তুলত। কিন্তু সেই সম্মিলিত রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা যে একমাত্র হিন্দি বা একমাত্র উর্দু হওয়া উচিত এটা সবাইকে দিয়ে মানিয়ে নেওয়া খুবই কঠিন হত। অতদূর যেতে হবে কেন? ধরুন ১৯৪৭ সালে যদি জিন্না সাহেব ক্যাবিনেট মিশনের পরিকল্পনায় রাজি হয়ে যেতেন, যদি অখন্ড ভারতবর্ষের হাতেই ক্ষমতা হস্তান্তর করা হত তাহলে সম্মিলিত রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা কি এক হত না একাধিক হত, না হিন্দি-উর্দুর যমজ রূপ হত? সকলেই জানেন যে, একমাত্র হিন্দির একচ্ছত্র দাবি কেউ স্বীকার করতেন না। না জিন্না, না গান্ধী। ঐক্যের খাতিরে হয় যমজ ভাষাকে সম্মিলিত রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা করতে হত, নয় ইংরেজিকেই অনির্দিষ্টকাল বহাল রাখতে হত।

দেশভাগ হয়ে গেছে বলেই একদিকে হিন্দি ও অন্যদিকে উর্দু একচ্ছত্র হবার ছাড়পত্র পেয়েছে। কিন্তু ইতিমধ্যেই পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি মুসলমান হাড়ে হাড়ে বুঝতে পেরেছে যে ওই ছাড়পত্রটা উর্দুভাষী মুসলমানদের শাসন-শোষণের সনদ। তাই তারা বাংলাকেও উর্দুর সমান অংশীদার করার জন্যে প্রাণপণ করছে। আক্ষরিক অর্থে প্রাণ দিয়েছেও। উর্দুই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে এটা তারা কোনোকালে মেনে নেবে না। তারা যেন বেলজিয়ামের ফ্রেমিশভাষী। লেগে থাকলে তাদের মাতৃভাষাও পাকিস্তানের প্রাদেশিক ভাষা হবে, শুধু পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক ভাষা নয়। উর্দুভাষীরা যদি তাতে নারাজ হয়, তবে রাষ্ট্র দু-ভাগ হয়ে যাবে। তার জন্যে দায়ী হবে উর্দুভাষীদের জেদ। আর নয়তো ইংরেজিকেই অনির্দিষ্টকাল বহাল রাখতে হবে। আপোশের আর কোনো উপায় নেই। ইংরেজি বিদেশি ভাষা, কিন্তু আপোশের একমাত্র উপায়।

উর্দুর বিরুদ্ধে নয়, উর্দুভাষীদের প্রচ্ছন্ন সনদের বিরুদ্ধেই পূর্ব পাকিস্তানিদের এ বিক্ষোভ। তেমনি হিন্দিভাষীরাও একটা সনদ পেয়ে গেছে। ভাবী ভারতের শাসক ও ধনিকশ্রেণি হবে হিন্দিভাষী এরকম একটা ইঙ্গিত দেখা দিয়েছে। মহাত্মাজি ভেবেছিলেন কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে অতি অল্প ক্ষমতা দেবেন, আর সব ছড়িয়ে দেবেন প্রদেশে প্রদেশে, গ্রামে গ্রামে। ঠিক উলটোটি হয়েছে। বিকেন্দ্রীকরণের ভরসা নেই। ইণ্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন বিকেন্দ্রীকরণের অন্তরায়। দেশ ইণ্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশনকেই বরণ করে নিয়েছে। অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত ক্ষমতাকে হিন্দিভাষীদের ধনাধিক্য ও ভোটাধিক্যের ওপর ছেড়ে দিলে সেটা গণতন্ত্রের মতো দেখায়, কিন্তু সেটা হয় উত্তর ভারতের দ্বারা ভারাক্রান্ত মাথাভারী গণতন্ত্র। তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ অবশ্যম্ভাবী। তামিলদের একদল এরই মধ্যে খেপেছে। হিন্দি নামক ভাষার বিরুদ্ধে ততটা নয়, যতটা হিন্দিভাষী শাসক ও ধনিকশ্রেণির সনদের বিরুদ্ধে। মিটমাট না হলে দেশ আবার ভাঙবে। আপোশের আর কী উপায় আছে—ইংরেজিকে সহচর ভাষারূপে অনির্দিষ্টকাল বহাল রাখা ভিন্ন?

আমাদের হাজার বছরের অভিজ্ঞতা বলছে যে, দেশ বহু খন্ড হলে স্বাধীনতা রক্ষা করা যায় না। বিপদের সময় দেশবাসী একজোট হয় না। সুতরাং শক্তিশালী কেন্দ্রীয় শাসন চাই। এতকাল পরে আমরা আমাদের নিজেদের একটি কেন্দ্রীয় সরকার পেয়েছি। কাশ্মীরি, কেরলি, বাঙালি, তামিল, অসমিয়া, গুজরাতি, পাঞ্জাবি প্রভৃতি নানা প্রান্তের লোক একবার কুরুক্ষেত্রে মিলিত হয়েছিল শুনেছি। সেটা কিন্তু মিলেমিশে দেশ-চালানোর জন্যে নয়। ইতিহাসে এই প্রথম বার আমরা একজোট হয়ে রাষ্ট্র চালাচ্ছি। এ জোট যদি ভেঙে যায় তবে আবার পরাধীনতা। একে অটুট রাখতেই হবে। অথচ একমাত্র রাষ্ট্রভাষার সনদ যে একে তলে তলে ভাঙছে। এটা এমন একটা ইসু যার একপ্রান্তে হিন্দিভাষীদের স্বার্থ, অপরপ্রান্তে অহিন্দিভাষীদের স্বার্থ, মাঝখানে ওই আপোশের প্রস্তাব। ওই সহচর ভাষা। ভাঙনকে রোধ করতে হলে ওর চেয়ে আর কোনো সহজ উপায় নেই। বিদেশি বলে ইংরেজিতে যাঁদের আপত্তি তাঁরা ইচ্ছে করলে ইংরেজির বদলে বাংলা তামিল মারাঠি ইত্যাদি চোদ্দো-পনেরোটি ভাষাকে সহচর ভাষা বানাতে পারেন। কিন্তু সেটার নাম আরও সহজ নয়, আরও জটিল।

‘বিদেশি’ এই বিশেষণটাই যদি যত নষ্টের গোড়া হয়ে থাকে তবে আমরা তার বদলে ‘আন্তর্জাতিক’ এই বিশেষণটি ব্যবহার করতে পারি। স্বাধীন রাষ্ট্র যদি কমনওয়েলথ নামক সংস্থার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে তো আন্তর্জাতিক ভাষা ব্যবহার করলে মহাভারত অশুদ্ধ হবে না। স্বাধীনতার সঙ্গে সেটা যদি খাপ খায়, তবে এটাই-বা বেখাপ হবে কেন? আগেকার দিনে বিদেশি ভাষার বিরুদ্ধে যতগুলি যুক্তি শোনা যেত ইদানীং স্বদেশি ভাষার বিরুদ্ধেও ততগুলি শোনা যাচ্ছে। তামিলরা তো সাফ বলে দিয়েছে যে, হিন্দিও ওদের পক্ষে বিদেশি। আমরাও তো দেখছি হিন্দি শিখতে ইংরেজির চেয়ে কম শক্তি খরচ হলেও হিন্দিতে শেখবার যোগ্য বিষয় অল্পই আছে, ইংরেজিতে বিস্তর। শব্দগুলো হয়তো চেনা, কিন্তু অর্থ এক নয়। আর ব্যাকরণ তো আরবির কাছাকাছি যায়। ‘মহাত্মা গান্ধীকি’ হল কেন? ‘কা’ হল না কেন? কারণ ‘জয়’ শব্দটা স্ত্রীলিঙ্গ। আর বিশেষ্য যদি স্ত্রীলিঙ্গ হয় তবে বিশেষণকেও স্ত্রীলিঙ্গ হতে হবে, ক্রিয়াপদকেও স্ত্রীলিঙ্গ হতে হবে। কিন্তু গোড়ায় গলদ, ‘জয়’ কেন স্ত্রীলিঙ্গ হবে। ‘ফতে’ স্ত্রীলিঙ্গ বলে?

যা-ই হোক, হিন্দি আমাদের দেশের সবচেয়ে বহুল প্রচলিত ভাষা। দেশের লোকের সঙ্গে কারবার করতে হলে হিন্দি আমাদের শিখতেই হবে। রাষ্টভাষা না হলেও শিখতুম। শিখেছি। ‘মহাত্মা গান্ধী কি জয়’ হেঁকেছি। হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়া হয়েছে বলে সুখীই হয়েছি। তাহলে বাধছে কোনখানে? বাধছে এইখানে যে, ভারত যেমন ধর্মের বেলা নিরপেক্ষ তেমনি নিরপেক্ষ ভাষার বেলা নয়। হিন্দু ধর্মের সঙ্গে সে তার রাষ্ট্রকে একাকার করেনি, কিন্তু হিন্দি ভাষার সঙ্গে তা করেছে। ভারত হিন্দু রাষ্ট্র নয়, কিন্তু সংবিধানের যদি সংশোধন না হয়, তবে ১৯৬৫ সালে হিন্দি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের দপ্তরে একমেবাদ্বিতীয়ম হওয়ামাত্র ভারতকে বলতে পারা যাবে হিন্দি-রাষ্ট্র। তখন হিন্দিভাষীরাই হবে প্রথম শ্রেণির নাগরিক। পাকিস্তানের হিন্দুরা যেমন দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক ভারতের বাংলাভাষী, তামিলভাষী, পাঞ্জাবিভাষীরাও তেমনি দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক বনবে। সংবিধান রচনার সময় কনস্টিটুয়েন্ট অ্যাসেমব্লির সদস্যেরা সর্বসম্মতিক্রমে হিন্দিকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করেননি। তাঁদের মধ্যে তখনই দ্বিমত দেখা দিয়েছিল। একপক্ষ ছিলেন হিন্দির সমর্থক। অপর পক্ষ ইংরেজির। বলা বাহুল্য, ইংরেজির সমর্থকরা জানতেন যে ইংরেজি একটি বিদেশি ভাষা। শুধু বিদেশির নয় বিজেতার ভাষা। ইংরেজির সমর্থন করেছিলেন বলে তাঁরা যে কম স্বদেশি বা কম স্বাধীনতাপ্রিয় ছিলেন তা নয়। তাঁরাও কংগ্রেসের লোক। ভোটে দিয়ে দেখা গেল দু-পক্ষের ভোটসংখ্যা প্রায় সমান সমান। হিন্দির সঙ্গে ইংরেজির সামান্য একটি মাত্র ভোটের ব্যবধান। এরূপ ক্ষেত্রে হিন্দি ইংরেজি দুটি ভাষাকেই রাষ্ট্রভাষা করা উচিত ছিল।

এখানে আর একটি কথা পরিষ্কার করে বলতে চাই। আমাদের সংবিধানে কোনো ভাষাকেই ‘রাষ্ট্রভাষা’ বা ‘জাতীয় ভাষা’ বলে আখ্যাত করা হয়নি। হিন্দিকে বলা হয়েছে ‘সরকারি ভাষা’। সংবিধান যদি সংশোধন করা হয়, তবে ইংরেজিকে বলা হবে ‘সহচর সরকারি ভাষা’। ‘রাষ্ট্রভাষা’, ‘জাতীয় ভাষা’ ইত্যাদি আখ্যা প্রকৃতপক্ষে সব ক-টি ভারতীয় ভাষারই পাওনা, কোনো একটি ভাষার নয়। হিন্দি যদি সেরকম একটা আখ্যা পেয়ে থাকে তবে সেটা বিধিসম্মতভাবে নয়, সেটা পাঁচজনের মুখে মুখে। যেমন সুবোধ মল্লিক মহাশয়কে লোকে ‘রাজা’ বলত। যেমন কংগ্রেস সভাপতিকে লোকে ‘রাষ্ট্রপতি’ বলত। রাষ্ট্রভাষা বলে হিন্দির একটা নামডাক হয়েছে। মন্ত্রীরাও তাকে রাষ্ট্রভাষা বলে চালিয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু সংবিধানে এর কোনো সমর্থন নেই। সুতরাং হিন্দি এমন কিছু হারাচ্ছে না, যা সংবিধান অনুসারে তার প্রাপ্য। আর ইংরেজিও এমন কিছু পাচ্ছে না যার বলে সে রাষ্ট্রভাষা বলে গণ্য হবে। লোকমুখে হিন্দিই থেকে যাবে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। কিন্তু সংবিধানে তার একটি সহচর সরকারি ভাষা জুটবে। সেটি যদি ইংরেজি না হয়ে উর্দু কিংবা তামিল হত তাতেও হিন্দি গোঁড়াদের আপত্তির তরঙ্গ উঠত। ইংরেজিকে যেমন তাঁরা ‘বিদেশি’ বলে অপাঙক্তেয় করতে চান, তেমনি তাকেও করতেন অন্য কোনো ছুতোয়। মোদ্দা কথা শরিক তাঁরা চান না, হলেই-বা সে স্বদেশি।

হিন্দি থাকছে, ইংরেজিও থাকবে, ভবিষ্যতে ভাব বিনিময়ের ভাষার অভাব হবে না। যাঁরা হিন্দিতে চান তাঁরা হিন্দিতে ভাব বিনিময় করবেন, যাঁরা ইংরেজিতে চান তাঁরা ইংরেজিতে। যদি বিনিময় করবার মতো ভাব থাকে। যদি সেরকম মনোভাব থাকে। সরকারের কাজকর্মের ভাষা ছাড়া কি ভাব বিনিময় হয় না? সংস্কৃতেও হতে পারে। উর্দুতেও।

গান্ধীজি সাধারণত হিন্দিতেই ভাব বিনিময় করতেন, কিন্তু জীবনের শেষ দিনও তাঁকে বাংলা হাতের লেখা তৈরি করতে দেখা গেছে। নোয়াখালিতে ফিরে বাংলায় ভাব বিনিময় করতেন। তামিলদের সঙ্গে ভাব বিনিময়ের জন্যে তিনি তামিল ভাষা শিখেছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকায় থাকতে। পশ্চিমা মুসলমানদের সঙ্গে ভাব বিনিময়ের জন্যে তিনি উর্দুতেও কথা বলতেন। রথীবাবুর সঙ্গে, আমার সঙ্গে তিনি ইংরেজিতে কথা বললেন ১৯৪৫ সালে। ভাব বিনিময় একটি মাত্র ভাষায় হবে—হিন্দিতে; এমন অদ্ভুত ধারণা তো গান্ধীজির ছিল না।

এই প্রসঙ্গে একটি মজার গল্প মনে পড়ল। বছর কয়েক আগে স্বাধীন ভারতের সংস্কৃতভাষী সুধীদের এক সম্মেলন হয়। আমাদের এক বিশিষ্ট অধ্যাপক গেছলেন যোগ দিতে। ফিরে এসে বললেন, আলোচনা হল—কোন ভাষায় বলুন তো? ইংরেজিতে!

আর একটা মজার গল্প বলি। পাঞ্জাবে সেদিন দারুণ বচসা বেঁধে গেল। খোঁপা আর এলোচুলে নয়, পাঞ্জাবিতে আর হিন্দিতে। তামাশা এই যে, দু-পক্ষেরই বাক্যবাণ বর্ষিত হল উর্দু সংবাদপত্রে। মামলার ভাষা হল উর্দু। মনে আছে, ছেলেবেলায় আমি একবার লালা লাজপৎ রায়ের বন্দে মাতরম পত্রিকার নমুনা চেয়ে পাঠাই। পত্রিকা দেখে আমার চক্ষুঃস্থির। হিন্দি নয়, ইংরেজি নয়, উর্দু। যেখানে উর্দু উভয়ের জানা সেখানে ভাব বিনিময়ের ভাষা উর্দু হওয়াই স্বাভাবিক। স্কুল-কলেজে যিনি যা-ই পড়ুন-না কেন দেখা হলে হিন্দুতে আর শিখে বাতচিৎ হয় উর্দুতেই।

সরকারি ভাষা বলে গণ্য না হলেও উর্দুতেই পশ্চিমা হিন্দু ও শিখদের স্বাচ্ছন্দ্য আমি অনেক বার লক্ষ করেছি। তেমনি সরকারি ভাষা হিসাবে স্বীকৃত না হলেও ইংরেজির কদর এদেশে দীর্ঘকাল থাকবে। কেন থাকবে তার একশো কারণ। জাতীয়তাবাদীরা যত সহজে ইংরেজকে হটিয়েছেন, তত সহজে ইংরেজিকে অচলিত করতে পারবেন না। কাজেই সে-চেষ্টা না করাই ভালো। স্বাধীনতার পরে আমাদের গ্রামে গ্রামে হাই স্কুল হয়েছে। লোকে চায় হাই স্কুল। টোল নয়, মাদ্রাসা নয়, বুনিয়াদি নয়, বিশুদ্ধ বাংলা বিদ্যালয় নয়, সেই সেকালের মতো হাই স্কুল। কিংবা টেকনিক্যাল স্কুল। কলেজের সংখ্যাও বাড়ছে। যেখানে মাধ্যম হিসাবে ইংরেজি উঠে যাচ্ছে সেখানেও বিষয় হিসাবে ইংরেজি থেকে যাচ্ছে। এটাও জনগণের ইচ্ছায়।

ইংরেজির কাজ হবে স্ট্যাণ্ডার্ড ঠিক করে দেওয়া বা ঠিক করতে সাহায্য করা, সে-কাজ হিন্দির দ্বারা হতে পারে না। সামনের দশ-বিশ বছরে তো নয়ই, এই শতাব্দীতে নয়। একবিংশ শতাব্দীর ভাবনা একবিংশ শতাব্দী ভাববে। আমরা যারা বিংশ শতাব্দীতে বাস করছি, তাদের ভাবনা বিংশ শতাব্দীকেই ঘিরে। যতদূর দেখতে পাচ্ছি ইংরেজির প্রয়োজন থাকবে। সে-প্রয়োজন প্রশাসনঘটিত নাও হতে পারে। বাংলাদেশ যদি স্বাধীন ও স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হত তাহলে আমরা কেউ ইংরেজিকে সরকারি ভাষা বা তার সহচর করতুম না। সব যুক্তিকে খারিজ করত সেন্টিমেন্ট। বাংলা ভাষাই হত রাষ্ট্রভাষা। কিন্তু সেরূপ ক্ষেত্রেও ইংরেজির প্রয়োজন ফুরোত না। লোকে ইংরেজিকে চাইত বাংলার স্ট্যাণ্ডার্ড ঠিক করে দেবার জন্যে। লেখার ও সমালোচনার আদর্শ চোখের উপর তুলে ধরার জন্যে। ইংরেজের যুগ গেছে, ইংরেজির যুগ যায়নি। আরও আধ শতাব্দী থাকবে।

কিন্তু তাই-বা কেমন করে বলি? খাস ইংরেজের দেশে ইংরেজি যদি পেছিয়ে পড়ে, তেমন বড়ো লেখক যদি না জন্মান, বইগুলো যদি হয় অন্তঃসারশূন্য, সাময়িকপত্রগুলো যদি হয় অন্তঃসারশূন্য, খবরের কাগজগুলো যদি হয় বিশেষত্বহীন, সেই জ্বলন্ত বিবেক যদি নিবে আসে, চিন্তার স্বাধীনতা যদি চোরাবালিতে ঠেকে যায়, তাহলে অর্ধশতাব্দীকাল কে একটা মরা সাহিত্য কাঁধে করে বেড়াবে? ইংরেজি যদি বাংলাকে বা হিন্দিকে এগিয়ে দিতে না পারে তবে ইংরেজির অবস্থানকাল আধ শতাব্দীও নয়। আরও আগে তার ওপর থেকে লোকের মন উঠে যাবে। মানুষকে জোর করে ইংরেজি শেখানোর আমি পক্ষপাতী নই। ইংরেজি যে অবশ্য শিক্ষণীয় বিষয় হয়েছে, এটাও আমার মতে অনুচিত। ছেলেরা যদি ইংরেজি শিখতে না চায় না শিখবে। না শিখলে পরে পস্তাবে। নিজেদের ছেলেমেয়ে হলে তাদের বলবে অমন ভুল না করতে। কতক লোকের পস্তানো দরকার। আজকাল মাড়োয়ারির ছেলেরা মন দিয়ে ইংরেজি শেখে। বাঙালির ছেলেরা ফাঁকি দেয়।

ইংরেজির পিছিয়ে পড়া যেমন অসম্ভব নয় হিন্দির এগিয়ে যাওয়াও তেমনি সম্ভবপর। এক পুরুষের মধ্যে হিন্দির অসাধারণ উন্নতি হতে পারে। ইচ্ছা করলে সে উর্দুকে আত্মসাৎ করতেও পারে। দেবনাগরী লিপি ছাড়া অন্যান্য লিপিতে কি হিন্দি লেখা যায় না, ছাপা যায় না? রোমক লিপিতে ছাপা হলে হিন্দি বই কাগজ আরও চলবে। বাংলা লিপিতে ছাপলে বাঙালিরা অনায়াসে পড়বে। কতক হিন্দি বই কাগজ একাধিক লিপিতে ছেপে পরীক্ষা করা উচিত পাঠকসংখ্যা কী পরিমাণ বাড়ে। অনেকে দেবনাগরীর ভয়ে হিন্দির দিকে ঘেঁষতে চায় না। তাদের ওপর জোরজুলুম করে যেটুকু ফল হবে তার চেয়ে ঢের বেশি হবে বিভিন্ন লিপিতে হিন্দি বই কাগজ ছেপে। তারপর হিন্দির ব্যাকরণ আরও সরল হওয়া চাই। পশুপাখির কার কী লিঙ্গ তাই আমাদের জানা নেই। শব্দ মাত্রেরই লিঙ্গ থাকবে ও আমরা তা জানব, এ কী জ্বালা!

শেষ কথা, ইংরেজির দীপশিখা নিভে গেলেই যে হিন্দির দীপশিখার, বাংলার দীপশিখার, অন্যান্য ভারতীয় ভাষাগুলির দীপশিখার দেওয়ালি হবে এটা একপ্রকার নঞর্থক চিন্তা। বরং ইংরেজির দীপ যতক্ষণ জ্বলছে জ্বলতে দাও, তার সাহায্যে নিজেদের দীপ জ্বালিয়ে নাও। ফুঁ দিয়ে তাকে অকালে নিবিয়ে দিলে পরে হয়তো দেখবে নিজেদের দীপও নিবু-নিবু। দেওয়ালি হবে, না কালী পুজো হবে কে এখন থেকে ভবিষ্যদ্বাণী করবে?

Comments

বিধিবদ্ধ স্বীকার্য :

লেখার বক্তব্যের দায়িত্ব লেখকের, পত্রিকার নয়। আমরা বহু মতের প্রকাশক মাত্র।

সাম্প্রতিক বাছাই

কবিতা ।। দি ওয়াল- রাহুল দ্রাবিড় ।। আনন্দ বক্সী

দি ওয়াল- রাহুল দ্রাবিড়  আনন্দ বক্সী  ঠান্ডা মাথা, সরল হাসি, ভদ্র আচরণ  যাঁর ব্যাটিং দক্ষতায় মজে সবার মন,  ধৈর্য আর একাগ্রতার যিনি নিদর্শন  ভারতবাসীগণের তিনি অতি আপনজন,  ইন্দোরে জন্ম হলেও কর্নাটকে বাস  ক্রিকেট খেলে ছড়িয়ে দেন ধরাধামে সুবাস, শরদ দ্রাবিড় পিতা তাঁর পেশায় কারবারি  মাতা পুষ্পা,গৃহবধূর ছেলে সে দরকারি, যাঁর ব্যাটিং দেখতে মাঠে জমতো সে কী ভিড় ক্রিকেটপ্রেমী জনের প্রিয়, সে রাহুল দ্রাবিড়। বারো বছর বয়সে তাঁর ক্রিকেটে হাতেখড়ি  স্কুলের হয়ে ভাসান প্রথম তাঁর ক্রিকেট তরি। বিশ্বনাথ ও তারাপোরে দেন ক্রিকেট-দীক্ষা  সঙ্গী হলো জীবনে তাঁর তাদের সে শিক্ষা। কর্নাটকের হয়ে তিনি ঘরোয়া খেলা খেলে  নির্বাচকের সামনে  প্রতিভা ধরেন মেলে। ওয়ানডের জাতীয়দলে পেলেন তিনি ডাক  কিন্তু যেন কোথায় একটা থেকেই গেল ফাঁক।  শুরুটা তাঁর হলোনা ভাল শ্রীলঙ্কার সাথে  বাড়ালেন সময় আরও নিজের কসরতে।  ইংল্যান্ডে ঘটল তাঁর টেস্ট-অভিষেক  এমন খেলা খেললেন যে পেলনা কেউ ঠেক। লর্ডস মাতিয়ে দিলেন তিনি দুর্দান্ত খেলে  আউট হয়ে ফ...

কবিতাঃ চন্দন ঘোষ

এক টুকরো রুটি বস্তির রাস্তায় একটা বৃদ্ধ মানুষ সারাদিন বসে আছে। উত্তরে দেখে দক্ষিনে দেখে বহুদূর কেউ একটুকরো রুটি দিয়েযায় পাছে। চক্ষু কোটোরা গত শরীর মাস হীন, হাড় মাত্র। হয়তো স্বাধিনতা আন্দোলনের বিপ্লবী! হয়তো কলেজের আদর্শ ছাত্র। হয়তো ব্রিটিশ গোরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল  তার ছোট্টো ঝুঁপরির উপর। সে বাধা দিয়েছিল প্রতীবাদী হাতে। হয়তো পঙ্গু হয়েছিল সেই রাতে। আমি এক প্রশ্ন তুলেছিলাম, কেমনে হইল এ অবস্থা? বাক সরেনা মুখে সরকার কেন করেনা কোনো ব্যাবস্থা?? শরীর বস্ত্রহীন এই রাতে। নিম্নাঙ্গে একটা নোংগরা ধুতি। কী জানি কত দিন খায়নি? কত দিন দেখেনি এক টুকরো রুটি! রাজধানী শহরের আকাশটা দেখছে। দেখছে নেতা মন্ত্রী গন। হাইরে কেউতো তারে উঠিয়ে তোলেনি। দেখেনি কোনো কোমল মন। আজ ভারতবর্ষ উন্নতশীল রাষ্ট্র!   কথাটা অতীব মিথ্যা মাটি। এমন কতযে মানুষ ক্ষুদার্থ, দেখেনা এক টুকরো রুটি। নতুন মন্ত্রী, নতুন রাষ্ট্রপতি সবাই আসে সবার হয় আবর্তন। হাইরে পিছিয়ে পড়া মানুষ গুলো! তাদের হয়না কোনো পরিবর্তন। আজ 71 বছর আজাদ হয়েও  বোধহয় যে...

উন্মুক্ত পাগলামি ।। আশরাফুল মণ্ডল

উন্মুক্ত পাগলামি আশরাফুল মণ্ডল আহা, অপরূপ নিজস্বতার দাহ! কুঁকড়ে যায় আবহমান, সজনে পাতার বোঁটায়! ভাপওঠা ভাতের কাছে মাছি সত্তায় কী নিপুণ! তবুও ঘোর লাগা বসন্তের ডাক, হাঁকে! খেদিয়ে দেয় পা দোলানো প্রস্তাব, ওই ধুনুরি চোখ! রাংতায় মোড়া ডাকের সাজ, দে দোল দোল! হুইসেল বাজিয়ে কে রুখে দ্যায় সেই নাকছাবির রুদালি কাঁপন! খালবিল ছেঁচে পাঁচসিকের  মানত কুড়িয়ে আনে, বাংলা বাজার। ঠ্যাং নাচানো সুরে চোখ মারছে, দ্যাখো ভ্যানতারা! মুখ খোলা মানেই পাঁজরের স্রোত ভাবা যেন উগরানো টালমাটাল! ঢিল মারা প্রশ্নের রোয়াকে বক্রচোখে যেন মেধাবী কবিতা! মুছে দিও তবে লাজুক গুপ্ত রোগ, দিনরাত্রি! ভালো থেকো তোমরা বাছাধন, রং মাস সে আর কতদিন... ================    ASRAFUL MANDAL Chandidas Avenue, B-zone, Durgapur, Paschim Bardhaman, Pin - 713205,  

গল্প ।। জাতিস্মর ।। আশীষ কুমার বিশ্বাস

    জাতিস্মর   আশীষ  কুমার   বিশ্বাস    গল্পের শুরুটা প্রায় ষাট বছর আগের কথা । যার নাম গৌতম, ডাক নাম ছিল বাবু ।  তার বছর তখন ছয়-সাত হবে । আমরা বা আমি তখন একটু বড় । এক সাথেই চলতো খেলা । গোল্লা ছুট, দাঁড়িয়া বান্দা, চোর-পুলিশ । যে মাঝে মাঝে খেলা থেকে বিরত থাকতো ; সে-ই জাতিস্মর । মাঠের পাশেই ছিল একটা খেঁজুর গাছ । তাতে হাত রেখে দূরের এক গ্রামের দিকে এক মনে তাঁকিয়ে থাকতো "বাবু" । গ্রামটির নাম "বিনয় পল্লী " । মাঝে বড়ো মাঠ । হাঁটা শুরু করলে তিরিশ - চল্লিশ মিনিট লাগবে । মাঝে জলে ভরপুর দেখে কখনো যাওয়া হয়নি । বাবু কে যখন বলতাম, ওপারে কি দেখছিস? ও বলতো, ওখানে আমার ছোট মা থাকে, দিদি থাকে, আমার ভুলু কুকুর থাকে । এ কথা আমাদের বিশ্বাস হতো না । আবার খেলায় ফিরে যেতাম, খেলতাম ।  কিন্তু ও বসে বসে , ওপারের গাছ পালা , বাড়ি ঘর দেখতো । কাছে গেলে বলতো , ওই যে সবুজ ,কচি কলাপাতা রঙের দালান বাড়ি, ওটাই আমাদের বাড়ি !  এই ভাবে মাস ছয়, বছর গড়াতে লাগলো । মনে প্রশ্ন জাগতে লাগলো, এ টা কি মন গড়া , বা বানিয়ে বানিয়ে বলছে? সত্যি প্রকাশ হোল এক দিন ।  সে বাড়িতে কিছু ...

ছোটগল্প ।। নীলিমার আত্মজাগরণ ।। পরেশ চন্দ্র মাহাত

নীলিমার আত্মজাগরণ পরেশ চন্দ্র মাহাত নীলিমা মাহাত, বয়স পঁচিশ প্লাস —তার বাবা মায়ের পঞ্চম তথা শেষ সন্তান। দুই দাদা —বড়দাদা শঙ্কর ও ছোটদাদা বিজয়। বড় দাদা শঙ্কর আর দুই দিদি তাদের কিন্তু বিয়ে হয়ে গেছে। একমাত্র নীলিমা আপাতত স্বামীর কোমল হাতের স্পর্শ ও সহানুভূতি থেকে বঞ্চিত এবং আদৌ কবে অথবা সেই সৌভাগ্য আসবে সেটা ঈশ্বরের নিকটই একমাত্র জ্ঞাত। সেই সঙ্গে দুবছরের সিনিয়র ছোটদাদা বিজয়েরও নীলিমার মতো অবস্থা। তারও জীবনসঙ্গিনী জুটেনি। মোট সাতজন সদস্য নিয়ে গঠিত সংসার নীলিমাদের পরিবার। মধ্যবিত্ত পরিবার —মধ্যবিত্ত পরিবার না বলে যদি নিম্নবিত্ত বলা হয় তবুও কোনো অত্যুক্তি করা হয় না। বাবার প্রত্যেকদিনের আয়ের উপর ভিত্তি করেই চলে সংসার। এই কঠোর এবং কঠিন পরিস্থিতিতেও নীলিমার মা শ্রীমতী মেনকা‚ সংসার সামলে তার ছেলেমেয়েদের পড়াশুনার প্রতি যথেষ্ট তৎপর ও সহানুভূতিশীল। তাদের পড়াশুনায় কোনো খামতি রাখেননি। যথা সময়ে তাদেরকে বিদ্যালয়ের মুখ দেখিয়েছে – টিউশনের বন্দোবস্ত করেছে। তাদের জীবন যাতে সুখকর হয় সেটাই প্রতিদিন ভগবানের কাছে প্রার্থনা করেছে। পাঁচ-পাঁচটি ছেলেমেয়ের মধ্যে সবাইকে উচ্চশিক্ষিত করে তোলা একপ...

পাঠ-প্রতিক্রিয়া ।। নবপ্রভাত বইমেলা 2023 সংখ্যা ।। সোমা চক্রবর্তী

পাঠ-প্রতিক্রিয়া : নবপ্রভাত বইমেলা ২০২৩ সংখ্যা সোমা চক্রবর্তী  (কালিকাপুর, বারাসাত,উত্তর চব্বিশ পরগনা) লিটিল ম্যাগাজিন মেলায় যাওয়া এবার সম্ভব হল না। কয়েকদিন আগে ডাক যোগে হাতে পেয়েছি নবপ্রভাত এর মুদ্রিত বইমেলা সংখ্যা। একটি অণুগল্প নিয়ে আমিও সেখানে রয়েছি অন্যান্য প্রিয় লেখকদের সঙ্গে। কাজেই, উৎসাহ একটু বেশিই রয়েছে। সম্পাদক মহাশয়ের অনুরোধ লিখিত পাঠ প্রতিক্রিয়া চাই। তাই আর অপেক্ষা না করে পড়ে ফেললাম বইটি। নবপ্রভাত এর যে ব্লগ বা ওয়েব ম্যাগাজিন (ব্লগজিন) এর সঙ্গে আগে থেকেই আমি পরিচিত, এ ক্ষেত্রে তার কথা একটু বলে নেওয়া প্রয়োজন। প্রতি বাংলা মাসের এক তারিখে প্রকাশিত প্রতিটি সংখ্যারই প্রবন্ধ অংশটি অত্যন্ত উন্নত মানের হয়ে থাকে। যেমন বিষয় নির্বাচন, তেমনই তথ্য সমৃদ্ধ। মুদ্রিত সংখ্যাটির ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। পাঁচটি প্রবন্ধের প্রত্যেকটিই উৎকৃষ্ট। বিষয় এবং তথ্য আমাদের ভাবায়। "যুদ্ধ-কবিতা এবং কবিতায় যুদ্ধবিরোধ" প্রবন্ধটি পড়তে পড়তে এবং উল্লিখিত কবিতার ভেতর দিয়ে আমরা দেখতে পাব, মধ্যযুগের বীরগাথামূলক কাব্য এবং মহাকাব্যের হাত ছেড়ে কেমন করে কবিতা ছোট পাকদন্ডী বেয়ে চল...

প্রচ্ছদ ও সূচিপত্র ।। ৯৮তম সংখ্যা ।। বৈশাখ ১৪৩৩ এপ্রিল ২০২৬

  শুভ নববর্ষ ১৪৩৩ নবপ্রভাতের পক্ষ থেকে সকলকে জানাই শুভ বাংলা নববর্ষের হার্দিক শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধা।  সকলের মঙ্গল হোক। পারস্পরিক সৌহার্দ্যে নন্দিত হোক জীবন। বাংলা নববর্ষকেন্দ্রিক লেখাগুচ্ছ এই সংখ্যায় রইল। অন্যান্য লেখা পরে প্রকাশিত হবে। —নিরাশাহরণ নস্কর, সম্পাদক, নবপ্রভাত।   সূচিপত্র পহেলা বৈশাখ : অদ্বিতীয় বাঙালির সর্বজনীন উৎসব ।। অলোক আচার্য বোশেখের ঘুড়ি ।। শাহ মতিন টিপু পয়লা বৈশাখ : বাঙালির প্রাণের উৎসব ।। উৎপল সরকার মাটি, বঁড়শি ও রক্তের আখ্যান ।। দিব্যেন্দু ঘোষ হালখাতা — বাঙালিয়ানা ।। শ্যামল হুদাতী বাংলা নববর্ষ : বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের প্রতীক ।। তপন মাইতি বাংলা পঞ্জিকার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ।। তুষার ভট্টাচার্য হালখাতা ।। চন্দ্রমা মুখার্জী নববর্ষের গৌরচন্দ্রিকা ।। অভীক চন্দ্র নববর্ষের সেকাল একাল ।। মিতা ভৌমিক নববর্ষের নবতম আশা ।। সমীর কুমার দত্ত দুই আকাশ, এক নববর্ষ ।। রাজদীপ মজুমদার আমার সন্ন্যাস ।। অংশুদেব পয়লা থেকে একলা হওয়া ।। সুকান্ত ঘোষ পহেলা বৈশাখে আনন্দ নগরের স্মৃতি ।। সারাবান তহুরা মৌমিতা বাংলা নববর্ষ ।। পার্থপ্রতিম দত্ত স্মৃতির পাতায় পয়লা ।। দেবশ্রী চক্রবর...

কবিতা ।। মনোজকুমার রায়

জল সিঁড়ি চেক বইয়ের পাতা ফুরিয়ে যেতে থাকে -- ঝরে পড়ে বৃদ্ধ গাছটির পত্রমুকুল কাঁচা গন্ধ বেয়ে চলে সময়ের স্রোতে  সারা ভোর জেগে থাকি ঘুমের টলে তাড়া দেয় একগ্রাস অবিশ্বাসী বায়ু দিন ফুরনো লাল সূর্যের টানে নেমে আসে পাড় ছোঁয়া জল সিঁড়ি ================= মনোজকুমার রায় দঃ ঝাড় আলতা ডাউকিমারী, ধূপগুড়ি জলপাইগুড়ি -৭৩৫২১০ মো ৭৭৯৭৯৩৭৫৬৬

মুদ্রিত নবপ্রভাত বইমেলা ২০২৬ সংখ্যার চূড়ান্ত সূচিপত্র

  মুদ্রিত নবপ্রভাত বইমেলা ২০২৬ সংখ্যার চূড়ান্ত সূচিপত্র প্রকাশিত হল।     যত লেখা রাখা গেল, তার দ্বিগুণ রাখা গেল না। বাদ যাওয়া সব লেখার 'মান' খারাপ এমন নয়। কয়েকটি প্রবন্ধ এবং বেশ কিছু (১৫-১৭টা) ভালোলাগা গল্প শেষ পর্যন্ত রাখা যায়নি। আমাদের সামর্থ্যহীনতার কারণে।     তবুও শেষ পর্যন্ত দশ ফর্মার পত্রিকা হয়েছে। গত দুবছরের মতো A4 সাইজের পত্রিকা।    যাঁদের লেখা রাখা গেল না, তাঁরা লেখাগুলি অন্য জায়গায় পাঠাতে পারেন। অথবা, সম্মতি দিলে আমরা লেখাগুলি আমাদের অনলাইন নবপ্রভাতের জানুয়ারি ২০২৬ সংখ্যায় প্রকাশ করতে পারি।    পত্রিকাটি আগামী ৯-১৩ জানুয়ারি ২০২৬ পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি আয়োজিত কলকাতা লিটল ম্যাগাজিন মেলায় (রবীন্দ্র সদন - নন্দন চত্বরে) পাওয়া যাবে।     সকলকে ধন্যবাদ। শুভেচ্ছা।

হালখাতায় বেহাল দশা ।। দীপক পাল

  হালখাতায় বেহাল দশা দীপক পাল পার্কের বেঞ্চে তিন মক্কেল সবে এসে বসেছে। তিন মক্কেল মানে বাবলা সৌম্য ও বিশ্বরূপ। তিনজনেই এবছর উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছে। সৌম্য আর বিশ্বরূপ স্টার পেয়েছে। কিন্তু বাবলা তিনবারের চেষ্টায় মোটামুটি ভাল নম্বর পেয়ে পাশ করেছে। তাই ওদের আনন্দ আর ধরে না। সৌম্য ও বিশ্বরূপ ভাল কলেজে ভর্তি হয়েছে আর বাবলা গড়িয়াহাটায় ইনিডাস্ট্রিয়াল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে ড্রাফ্টসম্যান ট্রেণিংর জন্য ভর্তি হয়েছে। বাবলা বললো, - ' এই শোন, কাল তো পয়লা বৈশাখ, নববর্ষ, এই দিনটাকে আমরা অন্য রকম করে পালন করতে পারি না?' বিশ্বরূপ বলে, - ' তুমিই বলো কি ভাবে আমরা নববর্ষটা পালন করতে পারি?' - ' এই ধর কাল বিকেলে যদি আমরা সবাই ধুতি পাঞ্জাবী পরে বেরোই তবে কেমন হয়?' - ' ও বুঝেছি, কাল আমরা নববর্ষ উপলক্ষে নিপাট বাঙালী সেজে বেরোব।' সৌম্য বলে। - ' অ্যায় একদম ঠিক বলেছিস তুই।' এবার ওরা বললো, - ' কিন্তু ধুতি পাঞ্জাবীতো আমাদের নেই, তবে?' - ' আরে বাবা সেতো আমারও নেই। শোন আ...

জনপ্রিয় লেখা

সাহিত্যের মাটিতে এক বীজ : "ত্রয়ী কাব্য" -- সুনন্দ মন্ডল

সাহিত্যের মাটিতে এক বীজ -- "ত্রয়ী কাব্য" ------------------------------------------------------------------------------ সুনন্দ মন্ডল নবীনচন্দ্র সেন সাহিত্যে তথা বাংলা কবিতার জগতে এক অবিস্মরণীয় নাম। তিনি চট্টগ্রাম জেলার নওয়াপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ১৮৪৭ সালে তাঁর জন্ম এবং মত্যু ১৯০৯ সালে। বঙ্কিমচন্দ্র তাঁকে 'বাংলার বায়রন' বলেছেন। ‎জীবৎকালীন যুগে আত্মপ্রত্যয়ের মধ্যে জাতীয় চরিত্র আত্মস্থ করে নতুন সংস্কারে প্রয়াসী হয়ে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেছেন।মধুসূদন-হেমচন্দ্র-নবীনচন্দ্র--এই তিন কবি বাংলা কাব্যধারায় প্রাণ সঞ্চার করেছিলেন। বিশেষত মহাকাব্য লেখার দুঃসাহস দেখিয়েছিলেন। এদিক থেকে মধুসূদন দত্ত একজন সফল মহাকাব্যিক। তাঁর 'মেঘনাদ বধ' কাব্যের মত গভীর ও ব্যঞ্জনাময় না হলেও নবীনচন্দ্র সেনের 'ত্রয়ী' কাব্য বিশেষ মর্যাদা দাবি করতেই পারে। তাছাড়া 'ত্রয়ী' কাব্যে ধর্মীয় ভাবধারার আবেগ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ‎ ‎নবীনচন্দ্র সেন বহু কাব্য লিখেছেন। যেমন- 'অবকাশরঞ্জিনী','পলাশীর যুদ্ধ', 'ক্লিওপেট্রা', 'রঙ্গমতী', 'খ্রীষ্ট', ...

প্রবন্ধ ।। লুপ্ত ও লুপ্তপ্রায় গ্রামীণ জীবিকা ।। শ্রীজিৎ জানা

লুপ্ত ও লুপ্তপ্রায় গ্রামীণ জীবিকা শ্রীজিৎ জানা "সময় চলিয়া যায় নদীর স্রোতের প্রায়"। স্রোতের ধারা তার দু'প্রান্তে রেখে যায় ভাঙাগড়ার চিহ্ন। কালের দৃশ্যপটেও পরিবর্তনের ছবি অনিবার্যভাবেই চোখে পড়ে। সমাজ সময়ের ছাঁচে নিজেকে গড়ে নেয় প্রতিনিয়ত।  সেখানে মনে নেওয়ায় বাধা থাকলেও,মেনে নেওয়ার গাজোয়ারি চলে না। ফলত কাল বদলের গাণিতিক হিসেবে জীবন ও জীবিকার যে রদবদল,তাকেই বোধকরি সংগ্রাম বলা যায়। জীবন সংগ্রাম অথবা টিকে থাকার সংগ্রাম।  মানুষের জীবনযাপনের ক্ষেত্রে আজকে যা অত্যাবশ্যকীয় কাল তার বিকল্প রূপ পেতে পারে অথবা তা অনাবশ্যক হওয়াও স্বাভাবিক। সেক্ষেত্রে উক্ত বিষয়টির পরিষেবা দানকারী মানুষদের প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হওয়া অস্বাভাবিক নয়। এক কালে গাঁয়ে কত ধরনের পেশার মানুষদের চোখে পোড়তো। কোন পেশা ছিল সম্বৎসরের,আবার কোন পেশা এককালীন।  সব পেশার লোকেরাই কত নিষ্ঠা ভরে গাঁয়ে  তাদের পরিষেবা দিত। বিনিময়ে সামান্য আয় হত তাদের। আর সেই আয়টুকুই ছিল  তাদের সংসার নির্বাহের একমাত্র উপায়। কালে কালান্তরে সেই সব পেশা,সেই সব সমাজবন্ধুরা হারিয়ে গ্যাছে। শুধুমাত্র তারা বেঁচে আছে অগ্রজের গল্পকথায়,আর বিভিন...

গ্রন্থ আলোচনা: শর্মিষ্ঠা দেবনাথ

প্রতিবাদ যখন অগ্নিবাণী বাংলাদেশে নারীমুক্তি ও নারী আন্দোলনের পুরোধা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ১৯৯তম জন্মদিনের শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদিত হল " আসিফা এবং.." কাব্য সংকলনটির মধ্যদিয়ে।সংকলনটির বিশেষত্ব হল,এটি উৎসর্গ করা হয়েছে নারীর সম্মান রক্ষার আন্দোলনের যোগ্যতম ব্যক্তি শহীদ শিক্ষক বরুন বিশ্বাসকে। সংকলক প্রকাশক সন্দীপ সাহু নিজে এবং বিশিষ্ট কবি সাহিত্যিকদের দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছেন এমন কিছু কবিতা, যা শুধুমাত্র শব্দ ও ছন্দের অনুবন্ধ নয়, এক একটি অগ্নিবাণী।আসলে জীবনকে দেখার স্বাতন্ত্র‍্যে কবিরা সব সময়ই অগ্রগণ্য এবং অনন্য।যুগ ও জীবন দ্বন্দ্বের কণ্ঠস্বরকে আশ্রয় করে,একদিকে মনের প্রবল দাহ ও অন্যদিকে  নির্যাতিতা শিশুকন্যা ও নারীর প্রতি মনের গভীর আকুলতা থেকে প্রকাশ পেয়েছে "আসিফা এবং" এর  কবিতাগুলি।এক অন্ধকার সময়ের মুখোমুখি আমরা,সেই অন্ধকার আমাদের নিয়ে এসেছে সামাজিক অবক্ষয়ের শেষধাপে যেখানে নৈতিকতা,পাপবোধ,গ্লানিকে সরিয়ে রেখে, সমাজের বানানো নিয়মকে তোয়াক্কা না করে,অনায়াস দক্ষতায় ও ক্ষিপ্রতায় নিজেরই ধর্মচেতনাকে জলাঞ্জলি দিয়ে কিছু মানুষ তার পশুত্বের পরিচয় দিয়েছে ধর্ষণ ও ন...

শ্যামাপদ মালাকারের কবিতা

চোখ """"""" নদী, অরণ্য, রাতের ফালি চাঁদ- সবেই তো আমার...স্বর্ণপিঁড়িটাও!। সেদিন, শুকতারাটার গা' মাপতে গিয়ে মনে হল, --ওরা আমার চেয়েও সুখী? দেখিনা একবার গাইতি-শাবল চালিয়ে... চালালাম। জল-মাটি ভেজা একটা 'চোখ' কুড়িয়ে ফিরলাম! সেই চোখদিয়ে দেখি-- শেষ বিকেলের নিরন্ন আঁচে ঝলসানো বুকে নীড়ে ফিরছে ধূলিমাখা কত কাল পা, কি শান্তি - কি তৃষ্ণা! পাতাক্ষোয়া কোদালেরর মাথায় ঝরেপড়া ললাটের ঘামে, কারা যেন জীবন শাণ দেয়! রুক্ষঠোঁটের আবরণে এক সময় নেমে আসে শিশিরস্নাত কালনিশি-- মাঝের ব্যবধান মুছে দেয় প্রতিশ্রুতির ভীড়- - পূর্বজনমের নিদর্শনচুম্বন শেষে হেরে যায় কার মমতাজ-- ম্লান হয়ে যায় কত পিঁড়ি! ... ম্লান হয়ে যায় কত পিঁড়ি! ... ম্লা...

লেখা-আহ্বান-বিজ্ঞপ্তি : মুদ্রিত নবপ্রভাত বইমেলা ২০২৫

   মুদ্রিত  নবপ্রভাত  বইমেলা ২০২৫ সংখ্যার জন্য  লেখা-আহ্বান-বিজ্ঞপ্তি মুদ্রিত  নবপ্রভাত  বইমেলা ২০২৫ সংখ্যার জন্য  প্রবন্ধ-নিবন্ধ, মুক্তগদ্য, রম্যরচনা, ছোটগল্প, অণুগল্প, কবিতা ও ছড়া পাঠান।  যে-কোন বিষয়েই লেখা যাবে।  শব্দ বা লাইন সংখ্যার কড়াকড়ি বাঁধন  নেই। তবে ছোট লেখা পাঠানো ভালো,  তাতে অনেককেই সুযোগ দেওয়া যায়।  যেমন, কবিতা/ছড়া ১২-১৬ লাইনের মধ্যে, অণুগল্প/মুক্তগদ্য কমবেশি ৩০০/৩৫০শব্দে, গল্প/রম্যরচনা ৮০০-৯০০ শব্দে, প্রবন্ধ/নিবন্ধ ১৫০০-১৬০০ শব্দে। তবে এ বাঁধন 'অবশ্যমান্য' নয়।  সম্পূর্ণ অপ্রকাশিত লেখা পাঠাতে হবে। মনোনয়নের সুবিধার্থে একাধিক লেখা পাঠানো ভালো। তবে একই মেলেই দেবেন। একজন ব্যক্তি একান্ত প্রয়োজন ছাড়া একাধিক মেল করবেন না।  লেখা  মেলবডিতে টাইপ বা পেস্ট করে পাঠাবেন। word ফাইলে পাঠানো যেতে পারে। লেখার সঙ্গে দেবেন  নিজের নাম, ঠিকানা এবং ফোন ও whatsapp নম্বর। (ছবি দেওয়ার দরকার নেই।) ১) মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখবেন 'মুদ্রিত নবপ্রভাত বইমেলা সংখ্যা ২০২৬-এর জন্য'।  ২) বানানের দিকে বিশেষ নজর দেবেন। ৩) য...

কোচবিহারের রাস উৎসব ও রাসমেলা: এক ঐতিহ্যবাহী অধ্যায় ।। পার্থ সারথি চক্রবর্তী

  কোচবিহারের রাস উৎসব ও রাসমেলা : এক ঐতিহ্যবাহী অধ্যায়  পার্থ সারথি চক্রবর্তী  কথায় বলে বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। রাজার শহর কোচবিহারের ক্ষেত্রে সংখ্যাটা আরো অনেক বেশি। দুর্গাপূজা আর দীপাবলির মতো দু'দুটো বিরাট মাপের উৎসবের রেশ কাটতে না কাটতেই, এ শহর ভাসে রাস উৎসবের উন্মাদনায়। মদনমোহন ঠাকুর কোচবিহারের প্রাণের ঠাকুর। তাঁকে নিয়ে সবার আবেগ আর শ্রদ্ধা ও ভালবাসা এখানে বাঁধনছাড়া। এক অপূর্ব মিলনোৎসবের চেহারা নেওয়া এই উৎসব ঐতিহ্যবাহী ও ঐতিহাসিক। জন, মত, সম্প্রদায়ের উর্ধে এই উৎসবের গ্রহণযোগ্যতা। সময়ের কষ্টি পাথরে পরীক্ষিত! এক প্রাণের উৎসব, যা বহুদিন ধরেই গোটা উত্তরবঙ্গের সর্ববৃহৎ উৎসবে পর্যবসিত।কোচবিহারের এই রাস উৎসবকে কেন্দ্র করে যে মেলা হয় তাও সময়ের হাত ধরে অনেক বদলে গেছে। এসেছে আধুনিকতার ছোঁয়া! শৈশবে বাবার হাত ধরে যে মেলা দেখেছি তা চরিত্র ও আকৃতি দু'দিক থেকেই বদলে গেছে। গত পঁচিশ বছর ধরে খুব কাছে থেকে এই উৎসব ও মেলা দেখা, অনুভব করার সুযোগ হয়েছে। যা দিনদিন অভিজ্ঞতা ও প্রাপ্তির ঝুলিকে সমৃদ্ধ করে গেছে প্রতি ক্ষেত্রেই।  খুব সংক্ষেপে এই উৎসবের ইতিহাস না জানাটা কিন্তু অবিচারই ...

মুদ্রিত নবপ্রভাত বইমেলা 2024 সংখ্যার জন্য লেখা-আহ্বান-বিজ্ঞপ্তি

লেখা-আহ্বান-বিজ্ঞপ্তি (লেখক ও সম্পাদকীয় দপ্তরের কথোপকথন আকারে) --কী পত্রিকা? --নবপ্রভাত। --মুদ্রিত না অনলাইন? --মুদ্রিত। --কোন সংখ্যা হবে এটা? --বইমেলা 2024। --কোন কোন ধরনের লেখা থাকবে? --প্রবন্ধ-নিবন্ধ, ছোটগল্প, অণুগল্প, কবিতা ও ছড়া। --বিশেষ কোন বিষয় আছে? --না। যে-কোন বিষয়েই লেখা যাবে। --শব্দ বা লাইন সংখ্যার কোন বাঁধন আছে? --না। নেই। তবে ছোট লেখা পাঠানো ভালো (যেমন, কবিতা 12-14 লাইনের মধ্যে, অণুগল্প কমবেশি 200/250শব্দে)। তাতে অনেককেই সুযোগ দেওয়া যায়। --ক'টি লেখা পাঠাতে হবে? --মনোনয়নের সুবিধার্থে একাধিক লেখা পাঠানো ভালো। --ফেসবুক বা অন্য কোন প্লাটফর্মে প্রকাশিত লেখা কি পাঠানো যাবে? --না। সম্পূর্ণ অপ্রকাশিত লেখা পাঠাতে হবে। --পত্রিকা কোন সময়ে প্রকাশিত হবে? --জানুয়ারি 2024-এর দ্বিতীয় সপ্তাহে। --লেখা পাঠানোর শেষতারিখ কত? -- 17 ডিসেম্বর 2023। --কীভাবে পাঠাতে হবে? --মেলবডিতে টাইপ বা পেস্ট করে পাঠাবেন। word ফাইলে পাঠানো যেতে পারে। --লেখার সঙ্গে কী কী দিতে হবে? --নিজের নাম, ঠিকানা এবং ফোন ও whatsapp নম্বর। (ছবি দেওয়ার দরকার নেই।) --বিশেষ সতর্কতা কিছু ? --১)মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখবেন '...

উৎসবের সৌন্দর্য: সেকালে ও একালে।। সৌরভ পুরকাইত

  উৎসবের সৌন্দর্য:  সেকালে ও একালে   সৌরভ পুরকাইত বাংলার উৎসব বাংলার প্রাণ। প্রতিদিনের জীবনযাপনের মধ্যে যখন মন ক্লান্ত হয়ে পড়ে তখন তাকে বেঁচে থাকার রসদ যোগায় এই উৎসব। কথায় বলে 'বারো মাসে তেরো পার্বণ'।মন আনন্দই চায়।তাই তাকে সজীবতা দিতে,পরিবারের,সমাজের ভালো-মন্দের কথা মাথায় রেখে মানুষ নিজেই সৃষ্টি করে নিয়েছে নানাবিধ উৎসবগুলিকে। একেবারে প্রাচীন কাল থেকে আজ পর্যন্ত মানুষ কখনোই উৎসব বিমুখ ছিল না।উৎসবই তাকে ঘর থেকে বাইরে টেনে এনেছে,চিনতে শিখিয়েছে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার আনন্দকে। উৎসব আসলে প্রাণের সাথে প্রাণের যোগ, হৃদয়ের সাথে হৃদয়ের যোগ।রবীন্দ্রনাথ বলেছেন 'সত্য যেখানেই সুন্দর হয়ে প্রকাশ পায় সেইখানেই উৎসব'।হৃদয়ের সেই সুকোমল বৃত্তির জাগরণ যেন ফুটে ওঠা ফুলেরই মতো সত্য ও সুন্দর।এই জাগরণই উৎসব। তাই নানা কিছুর মধ্য দিয়ে,নানা উপলক্ষ্যে এই উৎসব প্রকাশ পায়। প্রাচীনকালে মানুষের হাতে না ছিল পসার, না ছিল পসরা।ছিল মনের আন্তরিকতা,মানুষকে কাছে টেনে নেবার ক্ষমতা।সেটাই ছিল উৎসবের সৌন্দর্য। তাই সেদিনের উৎসবে ক্ষুদ্র,তুচ্ছ উপকরণও প্রাণের উচ্ছ্বাসে মহৎ হয়ে উঠত।সেকালের উৎসবে লোক দেখানো ব্যাপার কিছু ...

লেখা-আহ্বান-বিজ্ঞপ্তি : মুদ্রিত নবপ্রভাত বইমেলা ২০২৬

  লেখা-আহ্বান-বিজ্ঞপ্তি মুদ্রিত  নবপ্রভাত  বইমেলা ২০২৬ সংখ্যার জন্য  প্রবন্ধ-নিবন্ধ, মুক্তগদ্য, রম্যরচনা, ছোটগল্প, অণুগল্প, কবিতা ও ছড়া পাঠান।  যে-কোন বিষয়েই লেখা যাবে।  শব্দ বা লাইন সংখ্যার কড়াকড়ি বাঁধন  নেই। তবে ছোট লেখা পাঠালে  অনেককেই সুযোগ দেওয়া যায়।  যেমন, কবিতা/ছড়া ১২-১৬ লাইনের মধ্যে, অণুগল্প/মুক্তগদ্য কমবেশি ৩০০/৩৫০শব্দে, গল্প/রম্যরচনা ৮০০-৯০০ শব্দে, প্রবন্ধ/নিবন্ধ ১৫০০-১৬০০ শব্দে হলে ভালো। তবে এ বাঁধন 'অবশ্যমান্য' নয়।  সম্পূর্ণ অপ্রকাশিত লেখা পাঠাতে হবে। মনোনয়নের সুবিধার্থে একাধিক লেখা পাঠানো ভালো। তবে একই মেলেই দেবেন। একজন ব্যক্তি একান্ত প্রয়োজন ছাড়া একাধিক মেল করবেন না।  লেখা  মেলবডিতে টাইপ বা পেস্ট করে পাঠাবেন। word ফাইলে পাঠানো যেতে পারে। লেখার সঙ্গে দেবেন  নিজের নাম, ঠিকানা এবং ফোন ও whatsapp নম্বর। (ছবি দেওয়ার দরকার নেই।) ১) মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখবেন 'মুদ্রিত নবপ্রভাত বইমেলা সংখ্যা ২০২৬-এর জন্য'।  ২) বানানের দিকে বিশেষ নজর দেবেন। ৩) যতিচিহ্নের আগে স্পেস না দিয়ে পরে দেবেন। ৪) বিশেষ কোন চিহ্ন (যেমন @ # ...

কবিতা ।। বসন্তের কোকিল তুমি ।। বিচিত্র কুমার

বসন্তের কোকিল তুমি   বিচিত্র কুমার                      (০১) তোমার দু-আঁখির গহীন অরণ্যে একটা স্বপ্নের বহমান নদী রয়েছে, তারই রেশ ধরে আমি হেঁটে চলি অজানা বসন্তের পথে নীর উদ্দেশ্যে। সে চলার কোন শেষ সীমা নেই তাই আমার বিষণ্ণ একতারা সন্ন্যাস খুঁজে ফিরে , কবে তুমি বুঝবে অনুশ্রী মনের পর্দা খুলে একুশ বসন্ত তোমার রঙ ছিটিয়ে যাচ্ছে অচিনপুরে। এদিকে আমার দেহের প্রতিটি শিরা ধমনীতে প্রবাহিত হচ্ছে তোমার ভালোবাসার একটু উষ্ণতা পাবার জন্যে, শুধু অনুভবে তাণ্ডব উচ্ছাসিত হচ্ছে--- যেদিকে তাকাই --- ফুলে ফুলে ভ্রমর গুনগুনিয়ে উড়ে উড়ে পরে বসন্তের কোকিল গান গায় নব বসন্তে, তোমার দুই চোখে আমার একই ছায়া রয়ে যায় উতলা ভালোবাসার সীমান্তে।                 (০২)        এক রক্তাক্ত বসন্তের স্মৃতি কোন এক উতলা বসন্তের সকালে পুষ্পবনে ফুটেছিল একটি টকটকে লাল গোলাপ, তার সাথে হয়েছিলো দেখা প্রথম ফাগুনে হয়েছিল দুজনার এ জীবনের আলাপ।  তারপর প্র...

বছরের বাছাই

লেখা-আহ্বান-বিজ্ঞপ্তি : মুদ্রিত নবপ্রভাত বইমেলা ২০২৬

  লেখা-আহ্বান-বিজ্ঞপ্তি মুদ্রিত  নবপ্রভাত  বইমেলা ২০২৬ সংখ্যার জন্য  প্রবন্ধ-নিবন্ধ, মুক্তগদ্য, রম্যরচনা, ছোটগল্প, অণুগল্প, কবিতা ও ছড়া পাঠান।  যে-কোন বিষয়েই লেখা যাবে।  শব্দ বা লাইন সংখ্যার কড়াকড়ি বাঁধন  নেই। তবে ছোট লেখা পাঠালে  অনেককেই সুযোগ দেওয়া যায়।  যেমন, কবিতা/ছড়া ১২-১৬ লাইনের মধ্যে, অণুগল্প/মুক্তগদ্য কমবেশি ৩০০/৩৫০শব্দে, গল্প/রম্যরচনা ৮০০-৯০০ শব্দে, প্রবন্ধ/নিবন্ধ ১৫০০-১৬০০ শব্দে হলে ভালো। তবে এ বাঁধন 'অবশ্যমান্য' নয়।  সম্পূর্ণ অপ্রকাশিত লেখা পাঠাতে হবে। মনোনয়নের সুবিধার্থে একাধিক লেখা পাঠানো ভালো। তবে একই মেলেই দেবেন। একজন ব্যক্তি একান্ত প্রয়োজন ছাড়া একাধিক মেল করবেন না।  লেখা  মেলবডিতে টাইপ বা পেস্ট করে পাঠাবেন। word ফাইলে পাঠানো যেতে পারে। লেখার সঙ্গে দেবেন  নিজের নাম, ঠিকানা এবং ফোন ও whatsapp নম্বর। (ছবি দেওয়ার দরকার নেই।) ১) মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখবেন 'মুদ্রিত নবপ্রভাত বইমেলা সংখ্যা ২০২৬-এর জন্য'।  ২) বানানের দিকে বিশেষ নজর দেবেন। ৩) যতিচিহ্নের আগে স্পেস না দিয়ে পরে দেবেন। ৪) বিশেষ কোন চিহ্ন (যেমন @ # ...

সূচিপত্র ।। ৮৯তম সংখ্যা ।। শ্রাবণ ১৪৩২ জুলাই ২০২৫

সূচিপত্র   প্রবন্ধ ।। বাংলা যাত্রা ও নাট‍্যশিল্পে অবক্ষয় ।। মাখনলাল প্রধান প্রবন্ধ ।। শ্রমিকের অধিকার ।। চন্দন দাশগুপ্ত প্রবন্ধ ।। ভিনগ্রহীদের সন্ধানে ।। শ্যামল হুদাতী প্রবন্ধ ।। নারীমর্যাদা ও অধিকার ।। হিমাদ্রি শেখর দাস কবিতা ।। মশালের রং তুলি ।। তূণীর আচার্য কবিতা ।। জললিপি ।। রূপক চট্টোপাধ্যায় গুচ্ছকবিতা || শিশির আজম নিবন্ধ ।। পূনর্জন্ম ।। শংকর ব্রহ্ম মুক্তভাবনা ।। কোলাহল তো বারণ হলো ।। মানস কুমার সেনগুপ্ত গল্প ।। গানের হাড় ।। শুভজিৎ দত্তগুপ্ত গল্প ।। শিকড়ের খোঁজে ।। সমীর কুমার দত্ত সুপ্রভাত মেট্যার পাঁচটি কবিতা গ্রন্থ-আলোচনা ।। আবদুস সালামের কাব্যগ্রন্থ 'অলীক রঙের বিশ্বাস'।। তৈমুর খান অণুগল্প ।। হরিবোল বুড়ো ।। সুমিত মোদক রম্যরচনা ।। গোয়েন্দা গোলাপচন্দ আর প্রেমের ভুল ঠিকানা ।। রাজদীপ মজুমদার দুটি গল্প ।। মুহাম্মদ ফজলুল হক দুটি কবিতা ।। তীর্থঙ্কর সুমিত কবিতা ।। মেঘমুক্তি ।। বন্দনা পাত্র কবিতা ।। ব্যবচ্ছিন্ন শরীর ।। কৌশিক চক্রবর্ত্তী কবিতা ।। শমনচিহ্ন ।। দীপঙ্কর সরকার কবিতা ।। ভালোবাসার দাগ ।। জয়শ্রী ব্যানার্জী কবিতা ।। ফণীমনসা ।। বিবেকানন্দ নস্কর ছড়া ।। আজও যদি ।। বদ্রীন...

মুদ্রিত নবপ্রভাত বইমেলা ২০২৬ সংখ্যার চূড়ান্ত সূচিপত্র

  মুদ্রিত নবপ্রভাত বইমেলা ২০২৬ সংখ্যার চূড়ান্ত সূচিপত্র প্রকাশিত হল।     যত লেখা রাখা গেল, তার দ্বিগুণ রাখা গেল না। বাদ যাওয়া সব লেখার 'মান' খারাপ এমন নয়। কয়েকটি প্রবন্ধ এবং বেশ কিছু (১৫-১৭টা) ভালোলাগা গল্প শেষ পর্যন্ত রাখা যায়নি। আমাদের সামর্থ্যহীনতার কারণে।     তবুও শেষ পর্যন্ত দশ ফর্মার পত্রিকা হয়েছে। গত দুবছরের মতো A4 সাইজের পত্রিকা।    যাঁদের লেখা রাখা গেল না, তাঁরা লেখাগুলি অন্য জায়গায় পাঠাতে পারেন। অথবা, সম্মতি দিলে আমরা লেখাগুলি আমাদের অনলাইন নবপ্রভাতের জানুয়ারি ২০২৬ সংখ্যায় প্রকাশ করতে পারি।    পত্রিকাটি আগামী ৯-১৩ জানুয়ারি ২০২৬ পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি আয়োজিত কলকাতা লিটল ম্যাগাজিন মেলায় (রবীন্দ্র সদন - নন্দন চত্বরে) পাওয়া যাবে।     সকলকে ধন্যবাদ। শুভেচ্ছা।

প্রবন্ধ ।। নারীমর্যাদা ও অধিকার ।। হিমাদ্রি শেখর দাস

নারীমর্যাদা ও অধিকার হিমাদ্রি শেখর দাস  নারীর মর্যাদা বলতে বোঝায় নারীর সম্মান, অধিকার, এবং তার ব্যক্তিগত স্বাধীনতা। এটি সমাজে নারীর অবস্থান এবং তার প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিকে নির্দেশ করে। নারীর প্রতি সম্মানজনক আচরণ করা হয় এবং তাদের অধিকার গুলি সুরক্ষিত থাকে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে এই শ্রেণি সংগ্রাম শুরু হয়েছিল অনেক আগে।  একদিকে শ্রেণী বৈষম্য অপরদিকে নারী পুরুষের বৈষম্য এই দুটি ছিল শ্রেণীবিভক্ত সমাজের অন্যতম দুটি মূল ভিত। নারীর অধিকারহীনতা বা দাসত্ব শুরু হয় পরিবার ও সম্পত্তির উদ্ভাবনের ফলে। বহু যুগ ধরে নারী সমাজকে পারিবারিক ও সামাজিক দাসত্বের বোঝা বহন করতে হয়েছে বিনা প্রতিবাদে। সভ্যতার ক্রম বিকাশের সাথে সাথে নিপীড়ন ও নির্যাতনের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে - দাস সমাজব্যবস্থা এবং সামন্ততান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় নারীরা পুরুষ ও পরিবারের অধীনতা স্বীকার করে নিতে বাধ্য হয়েছে। সামাজিক উৎপাদনের কাজে নারীদের বঞ্চিত রেখেই তাদের পরাধীন জীবন যাপনের মধ্যে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। নারীর অধিকারহীনতার বিরুদ্ধে সংগ্রামের সূচনা হয় ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লবের পরবর্তী সময়ে। নতুন করে নারীদের সামাজিক উৎপাদনের কাজে ...

প্রবন্ধ ।। বাংলা যাত্রা ও নাট‍্যশিল্পে অবক্ষয় ।। মাখনলাল প্রধান

বাংলা যাত্রা ও নাট‍্যশিল্পে অবক্ষয় মাখনলাল প্রধান বাংলার শিল্প-সংস্কৃতির জগতে যাত্রা শিল্প তথা নাট‍্যশিল্পে মড়ক নেমে এসেছে । যাত্রা শিল্পের মড়কে শুধু কোভিড নয় তার বহুপূর্ব থেকেই অর্থনৈতিক বিপর্যয় , শিক্ষাক্ষেত্রে বন্ধ‍্যাত্ব এবং গ্ৰাম বাংলার পটপরিবর্তন শেষ পেরেক ঠুকে দিয়েছে। যাত্রা-শিল্পের লীলাভূমি ছিল গ্ৰাম বাংলা। গ্ৰামে প্রচুর যাত্রাপালা হত নানা উৎসবকে কেন্দ্র করে । জমিদারি ব‍্যবস্থা লুপ্ত হওয়ার পর গ্ৰামীণ মানুষের উদ‍্যোগে শীতলা পূজা,  কালীপূজা, দুর্গাপূজা, কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা, চড়ক ইত‍্যাদিকে উপলক্ষ‍্য করে যাত্রাপালার আয়োজন না হলে কেমন যেন ম‍্যাড়ম‍্যাড়ে লাগতো। সেই সঙ্গে কলকাতার বড়বড় কোম্পানির যাত্রাপালা ঘটা করে, টিকিট সেল করে হত মাঠে। খুব বড় মাপের খেলার মাঠ যেখানে ছিল না সেখানে ধানের মাঠ নেওয়া হত ‌। ত্রিশ-চল্লিশ হাজার মানুষ দেখতে আসত। স্পেশাল বাস পাঠাত  আয়োজক কর্তৃপক্ষ। বিনা ভাড়ায় বাসে যাতায়াত করত যাত্রার দর্শকেরা। কিন্তু বিকল্প ধানচাষ শুরু হলে জমিগুলো সময় মতো ফাঁকা পাওয়া গেল না । প্রথম দিকে ব‍্যাপকহারে ধান শুরু না হওয়ায় খুব একটা অসুবিধা হত না। বহুক্ষেত্রে  ধান কা...

গল্প ।। জাতিস্মর ।। আশীষ কুমার বিশ্বাস

    জাতিস্মর   আশীষ  কুমার   বিশ্বাস    গল্পের শুরুটা প্রায় ষাট বছর আগের কথা । যার নাম গৌতম, ডাক নাম ছিল বাবু ।  তার বছর তখন ছয়-সাত হবে । আমরা বা আমি তখন একটু বড় । এক সাথেই চলতো খেলা । গোল্লা ছুট, দাঁড়িয়া বান্দা, চোর-পুলিশ । যে মাঝে মাঝে খেলা থেকে বিরত থাকতো ; সে-ই জাতিস্মর । মাঠের পাশেই ছিল একটা খেঁজুর গাছ । তাতে হাত রেখে দূরের এক গ্রামের দিকে এক মনে তাঁকিয়ে থাকতো "বাবু" । গ্রামটির নাম "বিনয় পল্লী " । মাঝে বড়ো মাঠ । হাঁটা শুরু করলে তিরিশ - চল্লিশ মিনিট লাগবে । মাঝে জলে ভরপুর দেখে কখনো যাওয়া হয়নি । বাবু কে যখন বলতাম, ওপারে কি দেখছিস? ও বলতো, ওখানে আমার ছোট মা থাকে, দিদি থাকে, আমার ভুলু কুকুর থাকে । এ কথা আমাদের বিশ্বাস হতো না । আবার খেলায় ফিরে যেতাম, খেলতাম ।  কিন্তু ও বসে বসে , ওপারের গাছ পালা , বাড়ি ঘর দেখতো । কাছে গেলে বলতো , ওই যে সবুজ ,কচি কলাপাতা রঙের দালান বাড়ি, ওটাই আমাদের বাড়ি !  এই ভাবে মাস ছয়, বছর গড়াতে লাগলো । মনে প্রশ্ন জাগতে লাগলো, এ টা কি মন গড়া , বা বানিয়ে বানিয়ে বলছে? সত্যি প্রকাশ হোল এক দিন ।  সে বাড়িতে কিছু ...

কবিতাঃ চন্দন ঘোষ

এক টুকরো রুটি বস্তির রাস্তায় একটা বৃদ্ধ মানুষ সারাদিন বসে আছে। উত্তরে দেখে দক্ষিনে দেখে বহুদূর কেউ একটুকরো রুটি দিয়েযায় পাছে। চক্ষু কোটোরা গত শরীর মাস হীন, হাড় মাত্র। হয়তো স্বাধিনতা আন্দোলনের বিপ্লবী! হয়তো কলেজের আদর্শ ছাত্র। হয়তো ব্রিটিশ গোরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল  তার ছোট্টো ঝুঁপরির উপর। সে বাধা দিয়েছিল প্রতীবাদী হাতে। হয়তো পঙ্গু হয়েছিল সেই রাতে। আমি এক প্রশ্ন তুলেছিলাম, কেমনে হইল এ অবস্থা? বাক সরেনা মুখে সরকার কেন করেনা কোনো ব্যাবস্থা?? শরীর বস্ত্রহীন এই রাতে। নিম্নাঙ্গে একটা নোংগরা ধুতি। কী জানি কত দিন খায়নি? কত দিন দেখেনি এক টুকরো রুটি! রাজধানী শহরের আকাশটা দেখছে। দেখছে নেতা মন্ত্রী গন। হাইরে কেউতো তারে উঠিয়ে তোলেনি। দেখেনি কোনো কোমল মন। আজ ভারতবর্ষ উন্নতশীল রাষ্ট্র!   কথাটা অতীব মিথ্যা মাটি। এমন কতযে মানুষ ক্ষুদার্থ, দেখেনা এক টুকরো রুটি। নতুন মন্ত্রী, নতুন রাষ্ট্রপতি সবাই আসে সবার হয় আবর্তন। হাইরে পিছিয়ে পড়া মানুষ গুলো! তাদের হয়না কোনো পরিবর্তন। আজ 71 বছর আজাদ হয়েও  বোধহয় যে...

প্রবন্ধ ।। ভিনগ্রহীদের সন্ধানে ।। শ্যামল হুদাতী

ভিনগ্রহীদের সন্ধানে  শ্যামল হুদাতী  ইতিহাসের শুরু থেকে বারবার মানুষকে একটা প্রশ্ন কুঁড়ে কুঁড়ে খায় – এই মহাবিশ্বে আমরা কি একা? পৃথিবীর মতো আরও গ্রহ রয়েছে, যেখানে মানুষের মতো বুদ্ধিমান প্রাণীরা বাস করে – এই সম্ভাবনা বরাবর মানুষকে মুগ্ধ করেছে। আমাদের প্রত্যেকের জীবনের কখনও না কখনও এই ভাবনা এসেছে। দীর্ঘ কয়েক দশকের গবেষণার পরও, এই বিষয়ে কোনও নিশ্চয়তা দিতে পারেননি বিজ্ঞানীরা। জেমস ওয়েব মহাকাশ টেলিস্কোপ, বহু দূরের এমন কিছু গ্রহের সন্ধান দিয়েছে, যেগুলিতে প্রাণ থাকতেই পারে। তবে, নিশ্চিত কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে, আমেরিকার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সাম্প্রতিক গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, ভিনগ্রহীদের খুঁজতে বহু দূরে যাওয়ার কোনও দরকার নেই। তারা এই পৃথিবীতেই মানুষের ছদ্মবেশে মানুষের মধ্যেই বসবাস করতে পারে। আমরা ভিনগ্রহীদের যেমন কল্পনা করি, এরা তার থেকে আলাদা। এরা অনেকটাই, দেবদূতদের মতো। মানব জগতের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক প্রযুক্তিগত নয়, বরং জাদুকরি। মহাকাশে সৌরজগতের গ্রহ পৃথিবী ছাড়া অন্য কোথায় প্রাণ রয়েছে কি না তা নিয়ে চলছে বিস্তর গবেষণা। একই সঙ্গে পৃথিবী ছাড়া অন্য কোনো গ্রহে মানুষ বসবাস ক...

ছোটগল্প ।। নীলিমার আত্মজাগরণ ।। পরেশ চন্দ্র মাহাত

নীলিমার আত্মজাগরণ পরেশ চন্দ্র মাহাত নীলিমা মাহাত, বয়স পঁচিশ প্লাস —তার বাবা মায়ের পঞ্চম তথা শেষ সন্তান। দুই দাদা —বড়দাদা শঙ্কর ও ছোটদাদা বিজয়। বড় দাদা শঙ্কর আর দুই দিদি তাদের কিন্তু বিয়ে হয়ে গেছে। একমাত্র নীলিমা আপাতত স্বামীর কোমল হাতের স্পর্শ ও সহানুভূতি থেকে বঞ্চিত এবং আদৌ কবে অথবা সেই সৌভাগ্য আসবে সেটা ঈশ্বরের নিকটই একমাত্র জ্ঞাত। সেই সঙ্গে দুবছরের সিনিয়র ছোটদাদা বিজয়েরও নীলিমার মতো অবস্থা। তারও জীবনসঙ্গিনী জুটেনি। মোট সাতজন সদস্য নিয়ে গঠিত সংসার নীলিমাদের পরিবার। মধ্যবিত্ত পরিবার —মধ্যবিত্ত পরিবার না বলে যদি নিম্নবিত্ত বলা হয় তবুও কোনো অত্যুক্তি করা হয় না। বাবার প্রত্যেকদিনের আয়ের উপর ভিত্তি করেই চলে সংসার। এই কঠোর এবং কঠিন পরিস্থিতিতেও নীলিমার মা শ্রীমতী মেনকা‚ সংসার সামলে তার ছেলেমেয়েদের পড়াশুনার প্রতি যথেষ্ট তৎপর ও সহানুভূতিশীল। তাদের পড়াশুনায় কোনো খামতি রাখেননি। যথা সময়ে তাদেরকে বিদ্যালয়ের মুখ দেখিয়েছে – টিউশনের বন্দোবস্ত করেছে। তাদের জীবন যাতে সুখকর হয় সেটাই প্রতিদিন ভগবানের কাছে প্রার্থনা করেছে। পাঁচ-পাঁচটি ছেলেমেয়ের মধ্যে সবাইকে উচ্চশিক্ষিত করে তোলা একপ...

প্রচ্ছদ ও সূচিপত্র ।। ৯৮তম সংখ্যা ।। বৈশাখ ১৪৩৩ এপ্রিল ২০২৬

  শুভ নববর্ষ ১৪৩৩ নবপ্রভাতের পক্ষ থেকে সকলকে জানাই শুভ বাংলা নববর্ষের হার্দিক শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধা।  সকলের মঙ্গল হোক। পারস্পরিক সৌহার্দ্যে নন্দিত হোক জীবন। বাংলা নববর্ষকেন্দ্রিক লেখাগুচ্ছ এই সংখ্যায় রইল। অন্যান্য লেখা পরে প্রকাশিত হবে। —নিরাশাহরণ নস্কর, সম্পাদক, নবপ্রভাত।   সূচিপত্র পহেলা বৈশাখ : অদ্বিতীয় বাঙালির সর্বজনীন উৎসব ।। অলোক আচার্য বোশেখের ঘুড়ি ।। শাহ মতিন টিপু পয়লা বৈশাখ : বাঙালির প্রাণের উৎসব ।। উৎপল সরকার মাটি, বঁড়শি ও রক্তের আখ্যান ।। দিব্যেন্দু ঘোষ হালখাতা — বাঙালিয়ানা ।। শ্যামল হুদাতী বাংলা নববর্ষ : বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের প্রতীক ।। তপন মাইতি বাংলা পঞ্জিকার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ।। তুষার ভট্টাচার্য হালখাতা ।। চন্দ্রমা মুখার্জী নববর্ষের গৌরচন্দ্রিকা ।। অভীক চন্দ্র নববর্ষের সেকাল একাল ।। মিতা ভৌমিক নববর্ষের নবতম আশা ।। সমীর কুমার দত্ত দুই আকাশ, এক নববর্ষ ।। রাজদীপ মজুমদার আমার সন্ন্যাস ।। অংশুদেব পয়লা থেকে একলা হওয়া ।। সুকান্ত ঘোষ পহেলা বৈশাখে আনন্দ নগরের স্মৃতি ।। সারাবান তহুরা মৌমিতা বাংলা নববর্ষ ।। পার্থপ্রতিম দত্ত স্মৃতির পাতায় পয়লা ।। দেবশ্রী চক্রবর...

মাসের বাছাই

প্রচ্ছদ ও সূচিপত্র ।। ৯৮তম সংখ্যা ।। বৈশাখ ১৪৩৩ এপ্রিল ২০২৬

  শুভ নববর্ষ ১৪৩৩ নবপ্রভাতের পক্ষ থেকে সকলকে জানাই শুভ বাংলা নববর্ষের হার্দিক শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধা।  সকলের মঙ্গল হোক। পারস্পরিক সৌহার্দ্যে নন্দিত হোক জীবন। বাংলা নববর্ষকেন্দ্রিক লেখাগুচ্ছ এই সংখ্যায় রইল। অন্যান্য লেখা পরে প্রকাশিত হবে। —নিরাশাহরণ নস্কর, সম্পাদক, নবপ্রভাত।   সূচিপত্র পহেলা বৈশাখ : অদ্বিতীয় বাঙালির সর্বজনীন উৎসব ।। অলোক আচার্য বোশেখের ঘুড়ি ।। শাহ মতিন টিপু পয়লা বৈশাখ : বাঙালির প্রাণের উৎসব ।। উৎপল সরকার মাটি, বঁড়শি ও রক্তের আখ্যান ।। দিব্যেন্দু ঘোষ হালখাতা — বাঙালিয়ানা ।। শ্যামল হুদাতী বাংলা নববর্ষ : বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের প্রতীক ।। তপন মাইতি বাংলা পঞ্জিকার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ।। তুষার ভট্টাচার্য হালখাতা ।। চন্দ্রমা মুখার্জী নববর্ষের গৌরচন্দ্রিকা ।। অভীক চন্দ্র নববর্ষের সেকাল একাল ।। মিতা ভৌমিক নববর্ষের নবতম আশা ।। সমীর কুমার দত্ত দুই আকাশ, এক নববর্ষ ।। রাজদীপ মজুমদার আমার সন্ন্যাস ।। অংশুদেব পয়লা থেকে একলা হওয়া ।। সুকান্ত ঘোষ পহেলা বৈশাখে আনন্দ নগরের স্মৃতি ।। সারাবান তহুরা মৌমিতা বাংলা নববর্ষ ।। পার্থপ্রতিম দত্ত স্মৃতির পাতায় পয়লা ।। দেবশ্রী চক্রবর...

ছোটগল্প ।। নীলিমার আত্মজাগরণ ।। পরেশ চন্দ্র মাহাত

নীলিমার আত্মজাগরণ পরেশ চন্দ্র মাহাত নীলিমা মাহাত, বয়স পঁচিশ প্লাস —তার বাবা মায়ের পঞ্চম তথা শেষ সন্তান। দুই দাদা —বড়দাদা শঙ্কর ও ছোটদাদা বিজয়। বড় দাদা শঙ্কর আর দুই দিদি তাদের কিন্তু বিয়ে হয়ে গেছে। একমাত্র নীলিমা আপাতত স্বামীর কোমল হাতের স্পর্শ ও সহানুভূতি থেকে বঞ্চিত এবং আদৌ কবে অথবা সেই সৌভাগ্য আসবে সেটা ঈশ্বরের নিকটই একমাত্র জ্ঞাত। সেই সঙ্গে দুবছরের সিনিয়র ছোটদাদা বিজয়েরও নীলিমার মতো অবস্থা। তারও জীবনসঙ্গিনী জুটেনি। মোট সাতজন সদস্য নিয়ে গঠিত সংসার নীলিমাদের পরিবার। মধ্যবিত্ত পরিবার —মধ্যবিত্ত পরিবার না বলে যদি নিম্নবিত্ত বলা হয় তবুও কোনো অত্যুক্তি করা হয় না। বাবার প্রত্যেকদিনের আয়ের উপর ভিত্তি করেই চলে সংসার। এই কঠোর এবং কঠিন পরিস্থিতিতেও নীলিমার মা শ্রীমতী মেনকা‚ সংসার সামলে তার ছেলেমেয়েদের পড়াশুনার প্রতি যথেষ্ট তৎপর ও সহানুভূতিশীল। তাদের পড়াশুনায় কোনো খামতি রাখেননি। যথা সময়ে তাদেরকে বিদ্যালয়ের মুখ দেখিয়েছে – টিউশনের বন্দোবস্ত করেছে। তাদের জীবন যাতে সুখকর হয় সেটাই প্রতিদিন ভগবানের কাছে প্রার্থনা করেছে। পাঁচ-পাঁচটি ছেলেমেয়ের মধ্যে সবাইকে উচ্চশিক্ষিত করে তোলা একপ...

কবিতাঃ চন্দন ঘোষ

এক টুকরো রুটি বস্তির রাস্তায় একটা বৃদ্ধ মানুষ সারাদিন বসে আছে। উত্তরে দেখে দক্ষিনে দেখে বহুদূর কেউ একটুকরো রুটি দিয়েযায় পাছে। চক্ষু কোটোরা গত শরীর মাস হীন, হাড় মাত্র। হয়তো স্বাধিনতা আন্দোলনের বিপ্লবী! হয়তো কলেজের আদর্শ ছাত্র। হয়তো ব্রিটিশ গোরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল  তার ছোট্টো ঝুঁপরির উপর। সে বাধা দিয়েছিল প্রতীবাদী হাতে। হয়তো পঙ্গু হয়েছিল সেই রাতে। আমি এক প্রশ্ন তুলেছিলাম, কেমনে হইল এ অবস্থা? বাক সরেনা মুখে সরকার কেন করেনা কোনো ব্যাবস্থা?? শরীর বস্ত্রহীন এই রাতে। নিম্নাঙ্গে একটা নোংগরা ধুতি। কী জানি কত দিন খায়নি? কত দিন দেখেনি এক টুকরো রুটি! রাজধানী শহরের আকাশটা দেখছে। দেখছে নেতা মন্ত্রী গন। হাইরে কেউতো তারে উঠিয়ে তোলেনি। দেখেনি কোনো কোমল মন। আজ ভারতবর্ষ উন্নতশীল রাষ্ট্র!   কথাটা অতীব মিথ্যা মাটি। এমন কতযে মানুষ ক্ষুদার্থ, দেখেনা এক টুকরো রুটি। নতুন মন্ত্রী, নতুন রাষ্ট্রপতি সবাই আসে সবার হয় আবর্তন। হাইরে পিছিয়ে পড়া মানুষ গুলো! তাদের হয়না কোনো পরিবর্তন। আজ 71 বছর আজাদ হয়েও  বোধহয় যে...

উন্মুক্ত পাগলামি ।। আশরাফুল মণ্ডল

উন্মুক্ত পাগলামি আশরাফুল মণ্ডল আহা, অপরূপ নিজস্বতার দাহ! কুঁকড়ে যায় আবহমান, সজনে পাতার বোঁটায়! ভাপওঠা ভাতের কাছে মাছি সত্তায় কী নিপুণ! তবুও ঘোর লাগা বসন্তের ডাক, হাঁকে! খেদিয়ে দেয় পা দোলানো প্রস্তাব, ওই ধুনুরি চোখ! রাংতায় মোড়া ডাকের সাজ, দে দোল দোল! হুইসেল বাজিয়ে কে রুখে দ্যায় সেই নাকছাবির রুদালি কাঁপন! খালবিল ছেঁচে পাঁচসিকের  মানত কুড়িয়ে আনে, বাংলা বাজার। ঠ্যাং নাচানো সুরে চোখ মারছে, দ্যাখো ভ্যানতারা! মুখ খোলা মানেই পাঁজরের স্রোত ভাবা যেন উগরানো টালমাটাল! ঢিল মারা প্রশ্নের রোয়াকে বক্রচোখে যেন মেধাবী কবিতা! মুছে দিও তবে লাজুক গুপ্ত রোগ, দিনরাত্রি! ভালো থেকো তোমরা বাছাধন, রং মাস সে আর কতদিন... ================    ASRAFUL MANDAL Chandidas Avenue, B-zone, Durgapur, Paschim Bardhaman, Pin - 713205,  

গল্প ।। জাতিস্মর ।। আশীষ কুমার বিশ্বাস

    জাতিস্মর   আশীষ  কুমার   বিশ্বাস    গল্পের শুরুটা প্রায় ষাট বছর আগের কথা । যার নাম গৌতম, ডাক নাম ছিল বাবু ।  তার বছর তখন ছয়-সাত হবে । আমরা বা আমি তখন একটু বড় । এক সাথেই চলতো খেলা । গোল্লা ছুট, দাঁড়িয়া বান্দা, চোর-পুলিশ । যে মাঝে মাঝে খেলা থেকে বিরত থাকতো ; সে-ই জাতিস্মর । মাঠের পাশেই ছিল একটা খেঁজুর গাছ । তাতে হাত রেখে দূরের এক গ্রামের দিকে এক মনে তাঁকিয়ে থাকতো "বাবু" । গ্রামটির নাম "বিনয় পল্লী " । মাঝে বড়ো মাঠ । হাঁটা শুরু করলে তিরিশ - চল্লিশ মিনিট লাগবে । মাঝে জলে ভরপুর দেখে কখনো যাওয়া হয়নি । বাবু কে যখন বলতাম, ওপারে কি দেখছিস? ও বলতো, ওখানে আমার ছোট মা থাকে, দিদি থাকে, আমার ভুলু কুকুর থাকে । এ কথা আমাদের বিশ্বাস হতো না । আবার খেলায় ফিরে যেতাম, খেলতাম ।  কিন্তু ও বসে বসে , ওপারের গাছ পালা , বাড়ি ঘর দেখতো । কাছে গেলে বলতো , ওই যে সবুজ ,কচি কলাপাতা রঙের দালান বাড়ি, ওটাই আমাদের বাড়ি !  এই ভাবে মাস ছয়, বছর গড়াতে লাগলো । মনে প্রশ্ন জাগতে লাগলো, এ টা কি মন গড়া , বা বানিয়ে বানিয়ে বলছে? সত্যি প্রকাশ হোল এক দিন ।  সে বাড়িতে কিছু ...

কবিতা ।। সোনালি অতীত ।। প্রবোধ কুমার মৃধা

সোনালি অতীত  প্রবোধ কুমার মৃধা   সুশীতল ছায়াঘেরা স্নেহময়ী মাটি মা।   সে আমার জন্মভূমি সপ্তপুরুষের গাঁ।   প্রকৃতির বুক থেকে প্রাণের রসদ নিয়ে।   ফিরিতাম নদীতীরে হৃদয়ের গান গেয়ে।   সন্ধ্যাতারা উঁকি দিত গোধূলি লগনে।   প্রত্যুষে ভাঙিত ঘুম বিহঙ্গ কূজনে ।   আষাঢ়ের নব মেঘে ঘিরিত গগন।   বাদলের ছায়া ঢাকা কদম্ব কানন।   দলবেঁধে মাঠে-বাটে বেতালা-বেছন্দে।   কেটে যেত সারাদিন ভালো কভু মন্দে।   ডাক দেয় শিশুকাল, বাল্য ও কৈশোর।   অফুরন্ত প্রাণোচ্ছ্বল, আনন্দে বিভোর।   করমের স্রোতে ভেসে সংসারের হাটে।   ভিড়িল জীবনতরী নগরের ঘাটে।   ফিরিবার সাধ্য নাই ফেলে আসা পথে।   বাল্য রোমন্থন করি অতীত স্মৃতিতে।                    __________ 

কবিতা ।। মনোজকুমার রায়

জল সিঁড়ি চেক বইয়ের পাতা ফুরিয়ে যেতে থাকে -- ঝরে পড়ে বৃদ্ধ গাছটির পত্রমুকুল কাঁচা গন্ধ বেয়ে চলে সময়ের স্রোতে  সারা ভোর জেগে থাকি ঘুমের টলে তাড়া দেয় একগ্রাস অবিশ্বাসী বায়ু দিন ফুরনো লাল সূর্যের টানে নেমে আসে পাড় ছোঁয়া জল সিঁড়ি ================= মনোজকুমার রায় দঃ ঝাড় আলতা ডাউকিমারী, ধূপগুড়ি জলপাইগুড়ি -৭৩৫২১০ মো ৭৭৯৭৯৩৭৫৬৬

লেখা-আহ্বান-বিজ্ঞপ্তি : মুদ্রিত নবপ্রভাত বইমেলা ২০২৬

  লেখা-আহ্বান-বিজ্ঞপ্তি মুদ্রিত  নবপ্রভাত  বইমেলা ২০২৬ সংখ্যার জন্য  প্রবন্ধ-নিবন্ধ, মুক্তগদ্য, রম্যরচনা, ছোটগল্প, অণুগল্প, কবিতা ও ছড়া পাঠান।  যে-কোন বিষয়েই লেখা যাবে।  শব্দ বা লাইন সংখ্যার কড়াকড়ি বাঁধন  নেই। তবে ছোট লেখা পাঠালে  অনেককেই সুযোগ দেওয়া যায়।  যেমন, কবিতা/ছড়া ১২-১৬ লাইনের মধ্যে, অণুগল্প/মুক্তগদ্য কমবেশি ৩০০/৩৫০শব্দে, গল্প/রম্যরচনা ৮০০-৯০০ শব্দে, প্রবন্ধ/নিবন্ধ ১৫০০-১৬০০ শব্দে হলে ভালো। তবে এ বাঁধন 'অবশ্যমান্য' নয়।  সম্পূর্ণ অপ্রকাশিত লেখা পাঠাতে হবে। মনোনয়নের সুবিধার্থে একাধিক লেখা পাঠানো ভালো। তবে একই মেলেই দেবেন। একজন ব্যক্তি একান্ত প্রয়োজন ছাড়া একাধিক মেল করবেন না।  লেখা  মেলবডিতে টাইপ বা পেস্ট করে পাঠাবেন। word ফাইলে পাঠানো যেতে পারে। লেখার সঙ্গে দেবেন  নিজের নাম, ঠিকানা এবং ফোন ও whatsapp নম্বর। (ছবি দেওয়ার দরকার নেই।) ১) মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখবেন 'মুদ্রিত নবপ্রভাত বইমেলা সংখ্যা ২০২৬-এর জন্য'।  ২) বানানের দিকে বিশেষ নজর দেবেন। ৩) যতিচিহ্নের আগে স্পেস না দিয়ে পরে দেবেন। ৪) বিশেষ কোন চিহ্ন (যেমন @ # ...

হালখাতায় বেহাল দশা ।। দীপক পাল

  হালখাতায় বেহাল দশা দীপক পাল পার্কের বেঞ্চে তিন মক্কেল সবে এসে বসেছে। তিন মক্কেল মানে বাবলা সৌম্য ও বিশ্বরূপ। তিনজনেই এবছর উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছে। সৌম্য আর বিশ্বরূপ স্টার পেয়েছে। কিন্তু বাবলা তিনবারের চেষ্টায় মোটামুটি ভাল নম্বর পেয়ে পাশ করেছে। তাই ওদের আনন্দ আর ধরে না। সৌম্য ও বিশ্বরূপ ভাল কলেজে ভর্তি হয়েছে আর বাবলা গড়িয়াহাটায় ইনিডাস্ট্রিয়াল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে ড্রাফ্টসম্যান ট্রেণিংর জন্য ভর্তি হয়েছে। বাবলা বললো, - ' এই শোন, কাল তো পয়লা বৈশাখ, নববর্ষ, এই দিনটাকে আমরা অন্য রকম করে পালন করতে পারি না?' বিশ্বরূপ বলে, - ' তুমিই বলো কি ভাবে আমরা নববর্ষটা পালন করতে পারি?' - ' এই ধর কাল বিকেলে যদি আমরা সবাই ধুতি পাঞ্জাবী পরে বেরোই তবে কেমন হয়?' - ' ও বুঝেছি, কাল আমরা নববর্ষ উপলক্ষে নিপাট বাঙালী সেজে বেরোব।' সৌম্য বলে। - ' অ্যায় একদম ঠিক বলেছিস তুই।' এবার ওরা বললো, - ' কিন্তু ধুতি পাঞ্জাবীতো আমাদের নেই, তবে?' - ' আরে বাবা সেতো আমারও নেই। শোন আ...

হালখাতা ।। সেখ জিয়াউর রহমান

  হালখাতা সেখ জিয়াউর রহমান সবারই বুকের বাঁ পকেটে একটা হালখাতা রাখা থাকে সেখানে লেখা -  মিনুর মা'কে চার চামচ নুন, ছোট জা বোনের বিয়েতে মিনাকরা বড়ো নেকলেসটা নিয়ে একমাস পর ফেরত দিয়েছিলো, কেউ লিখে রাখে - "ঠাকুরপো ওই দিকেই তো যাবে তোমার দাদার খাবারটা একটু নামিয়ে দেবে!" আরও কত কী- রামুর ভূষিমাল দোকানে একশো টাকা বাকি সেও হালখাতার কার্ড পাঠিয়েছে,মলিন কাগজে গণেশের ছবি ছাপা, দেবে তো সেই দশ বারোটা বোঁদে একটা নিমকি আর একটা গজা সবই হিসাবে বাঁধা! আচ্ছা মেঘ তো কোনোদিন কার্ড পাঠায়নি! চুড়ুই পাখি,  নাম না জানা ওই ফুলটা সন্ধেবেলা মন ফুরফুরে করে দেয় যে  বা ওই সাঁওতালি বাঁশিওয়ালা! হিসেবের খাতায় কত পাওনা জমা হলো   কে জানে! তোমার-আমার হিসেব খোলা খাতা — পাতা উল্টালেই দেখি কত না-দেওয়া, কত না-পাওয়া এই খাতা কখনো যেন বন্ধ  না-হয়, নইলে কোনো একদিন তুমি খাতা ছুঁড়ে ফেলে বলবে— "আমার জন্যে কী করেছো?" তখন— সমস্ত না-লেখা ভালোবাসা, সব গোপন স্পর্শ, সব নিঃশব্দ পাশে থাকা— হাওয়ায় ভেসে যাবে, আর আমরা দাঁড়িয়ে থাকবো একটি শূন্য হিসেবের সামনে... ................................... সেখ জিয়াউর রহমান...