Skip to main content

গল্প ।। সামান্য মেয়ে ।। রণেশ রায়


সুন্দরবনের এক প্রান্তিক গ্রাম। ছোট্ট একটা দ্বীপ। সুন্দরী গাছ আর গরান গাছে ঘেরা যেন এক সবুজ বনানী। সেখানে গড়ে উঠেছে কিছু মানুষের বাস। জমিতে চাষ, জঙ্গল থেকে মধু সংগ্রহ আর মাছ ধরাই প্রধান জীবিকা। শাক সবজি ধান যা উৎপাদন হয় তা দিয়ে পরিবারের পেট চলে। যারা মধু সংগ্রহ করে বা মাছ ধরে তারা তা ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে। উৎপাদন কাজ চালিয়ে নেওয়ার জন্য মহাজনের ঋণের কারবার চালু থাকে। এখানে হরবছর ঝড় বন্যা লেগেই থাকে। সাগরের নোনা জল ঢুকে জমির চাষের বারোটা বাজিয়ে দেয়। মানুষের খাওয়া পড়ার অভাব চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছয়। আর তখন গরিব মানুষকে খাওয়া পড়ার জন্য মহাজনের দ্বারস্ত হতে হয়। গ্রামের চল্লিশ পঞ্চাশটি পরিবারের মধ্যে কেউ কেউ  যথেষ্ট বর্ধিষ্ণু। তাদের জমিজমা বেশি থাকায় উদ্বৃত্ত উৎপাদন সম্ভব হয় যা তাদের বাড়তি লাভ। এছাড়া এরা ব্যবসা মহাজনী কারবারের সঙ্গে যুক্ত। মহাজনী কারবার ব্যবসাই এদের  সমৃদ্ধির কারণ। এ গ্রাম ছাড়াও এদের শহরে ব্যবসা ঘর বাড়ি সম্পত্তি আছে।  ধরুন এই অজ পাড়াগাঁয়ের নাম অমাবস্যার চাঁদ। ভ্রমণ রসিক মানুষের কাছে এই গ্রাম থেকে দেখা জ্যোৎস্না রাতের চাঁদ এই ছোট্ট দ্বীপের সবুজ বনানী নদীর কলোকল যতই মনোরম যতই সুন্দরী রহস্যময়ী মনে হোক না কেন এখানে বসবাসকারী রোজ জীবিকার জন্য যুদ্ধরত মানুষগুলোর কাছে ব্যাপারটা এক নয়। বোধ হয় এটা উপলব্ধি করেই কোন কালে কোন পরিব্রাজক বা সাহিত্যিক এই গ্রামের আপাত সৌন্দর্যের মধ্যে বেশিরভাগ মানুষের ভয়াভয় দারিদ্রের জীবন দেখে এই গ্রাম সমাজকে তিনি এ ভাবেই দেখেছিলেন যেখানে পূর্ণিমার জ্যোৎস্নার নীচে মানুষের জীবনটা অন্ধকারে ঢাকা থাকে। ঠিক যেমন কবি সুকান্ত দেখেছিলেন: পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।


এই অজপাড়াগাঁয়ের এক সামান্য মেয়েকে নিয়েই আমাদের এই উপাখ্যান। মেয়েটির বয়স হয়তো বছর কুড়ি হবে । হয়তো বলতে হল কারণ এ ধরণের গ্রামে গরিব মানুষের ঘরে জন্মানো  সন্তানের জন্ম দিন লিপিবদ্ধ থাকে না। অনেক সন্তানের সবার নাম বাবা মায়ের মনে থাকে না। যদি জন্মের পর থেকে জন্মদিন পালনের রেওয়াজ থাকত তবে জন্মদিনটা মনে থাকত। সেটা এই গ্রামীণ জীবনে গরীব ঘরে তেমন চালু নেই।তাও গ্রামে  একটা স্কুল থাকায় একটা দিনকে জন্মদিন বলে নথিভুক্ত করার রীতি চালু হয়েছে এখন। গরিব বাবা আমাদের গল্পের এই মেয়েকে আদর করে বুড়ি বলে ডাকে। ওই ডাকেই সবাই ওকে  চেনে। আর ওদের অপর্ণা বা সুপর্ণার মত মন ধরানো ভালো নাম দিয়ে কি হবে! যারা স্কুলের গন্ডি টপকাবার সুযোগ পায় না গ্রামের বাইরের জগৎটা যারা চেনে না তাদের ভালো নামে কাদের সঙ্গে পরিচিতি ঘটবে! তার চেয়ে গাঁয়ের মেয়ের গেঁয়ো নামে পরিচিতিটাই ভালো। সেটা অনেক আন্তরিক। বুড়ির বছর কুড়ি বয়স। পড়াশুনার ইচ্ছে থাকলেও বেশিদূর এগোতে পারে নি। স্কুলের বেড়া ডিঙানো সম্ভব হয় নি। সামান্যের মধ্যে যদি অসামান্য কিছু  থাকে তার তা হল মিষ্টি মুখ, মুখে লেগে থাকা হাসি আর  শরীরের ছিপছিপে গঠন। সে যখন হাসে কাশ ফুল ফোটে। সে যখন হাটে কবিতার ছন্দ তাতে। কবির ভাষায় কালো মেয়ের কালো হরিণ চোখ। তবু সে সুন্দরী নয়। ঘরে অভাব, সে অভাবের ছায়া চেহারায়। তেমন চাকচিক্য নেই। ঘরে বাইরে তার কাজ। মায়ের সাথে ঘরে সংসার আগলানো। ছোট ভাই বোনেদের দেখাশুনা। দোকান পাট সবই। তারপর বাড়তি কাজ বাবাকে সামলানো। একজন দিন মজুর বাবা সারাদিন  খেটে খুটে বেসামাল হয়ে ঘরে ফেরে। তখন মাকে পাহারা দেওয়ার কাজ মেয়ের। বাবা বাড়িতে মেয়েকেই ভয় করে। ভয় বললে হয়তো ভুল বলা হয়। স্নেহবশত সমীহ করে। মেয়ে বাবার আদরের দুলালী। অন্ধ স্নেহ তার প্রতি। মায়ের ওপর বাবার যত হম্বি তম্বি। কিন্তু মেয়ের চোখে চোখ রেখে কথা বলার সাহস তার নেই। বেসামাল অবস্থাতেও নিজেকে মেয়ের সামনে সামলে রাখে। মেয়ে ঘরে বাইরে এত সামাল দেওয়ার মুখে নিজে বেসামাল হয়ে পড়ে যার ছোঁয়া লাগে শরীরে মুখে। তাও যা অবশিষ্ট তাতে চেহারার ওই মাধুর্য। হলপ করে বলা যায় জীবনযাপনের এই বেয়ারাপনা না থাকলে সে সুন্দরী বলে খ্যাতি পেত। তবে তাতে তার কিছু আসে যায় না। বরং গরিব মানুষের সে খ্যাতি বিড়ম্বনার কারণ হতে পারত গ্রামের উচ্চবিত্ত ভদ্রলোকদের কল্যানে। মানুষের চোখে পড়ার ভয় থাকত। তাও যে মধ্যে মধ্যে সে গ্রহে পড়তে হয় না তা নয়। তবে তাকে এড়িয়ে চলার কায়দা সে বাস্তবের ঘাত প্রতিঘাতে শিখে গেছে।


সুন্দরবনে বিদ্যাধরি নদী থেকে দক্ষিণে বয়ে যাওয়া একটা খারির মুখে বুড়িদের গ্রাম। সেই গ্রামে কয়েকটি বিত্তশালী পরিবারের বাস। শহরে ব্যবসা আর গাঁয়ে জমির মালিকনার দৌলতে তাদের বিত্ত।এরকমই একটা বিত্তশালী পরিবারের কর্তার নাম কুশল মানি। ভদ্রলোক নিজে গ্রামের স্কুলের হেডমাস্টার ছিলেন। গ্রামে তার যথেষ্ট প্রতিপত্তি। কুশল বাবুর ছেলে মেয়েরা কেউ কেউ ভিন প্রদেশে চাকুরীরত আর কেউ কেউ শহরে থাকে চাকুরী বা ব্যবসা সূত্রে। মেয়েরা যার যার শশুর বাড়িতে। ছয় ছেলের মধ্যে দুজন কুশলবাবুর সঙ্গে থাকে। এখানকার ব্যবসা জমি জমা দেখাশোনা করে। তাদের যথেষ্ট বয়স হয়েছে। তাদের ছেলেমেয়েরা হোস্টেলে থেকে পড়াশুনা করে। কুশলবাবু রামকৃষ্ণ মিশনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় ছেলেদের বা নাতীদের মিশনে ভর্তিতে অসুবিধে হয় না। পড়াশুনার দৌলতে প্রায় সবাই প্রতিষ্ঠিত। কুশলবাবুর বড় মেয়ে কলকাতার দক্ষিণ প্রান্ত গড়িয়ায় থাকে। স্বামী প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। মেয়ের ঘরের নাতিটি কুশলবাবুর নেওটা। দাদুর কাছে ছোট বেলা থেকে আসাযাওয়া। একটু ভাবুক প্রকৃতির ভালো ছেলে। ছেলেটির নাম নীলাশীষ,  সবাই নীলু বলে ডাকে। লেখাপড়ায় ভালো। এখন ইংরেজি নিয়ে এম এ পড়ে। এই গ্রামের জীবনের প্রতি একটা টান আছে। মধ্যে মধ্যে চলে আসে। একুশ বাইশ বছর বয়স। প্রকৃতি ওকে টানে। ওর প্রকৃতি প্রেম ওকে লেখার উপাদান যোগায়। আর প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক বজায় রাখা এখানকার মানুষের জীবন যাপন সম্পর্কে ওর উৎসাহ। তবে প্রকৃতির প্রাচুর্য আর তার মধ্যে মানুষের কঠিন জীবন যাপন, এই বৈপরীত্য তাকে পীড়িত করে।প্রকৃতি একদিকে যেমন উদার অন্যদিকে তেমনি নিষ্ঠুর। আর তার নিষ্ঠুরতার শিকার প্রধানত গরিব মানুষ। প্রকৃতির দানের সবটাই লুট করে নেয় বিত্তশালী মানুষ। গরিব মানুষ প্রকৃতিকে ছেঁচে যে সম্পদ সৃষ্টি করে তার কণামাত্র গরিব মানুষ পায় না। দিনে দিনে একদিকে প্রকৃতি ধ্বংস হচ্ছে আর তার ফলে একটা ক্ষুদ্র অংশ লাভবান হচ্ছে। অপরদিকে মানুষের জীবনযাপন আরও কঠিন হচ্ছে। প্রকৃতির রোষের শিকার হয় গরিব মানুষ। তাদের খাদ্য বস্ত্র শিক্ষা স্বাস্থ্য সবই নাগালের বাইরে। নীলুর ভাবুক মন এই স্ববিরোধতার কারণ খোঁজার চেষ্টা করে। এর প্রতিকারই বা কি ভেবে পায় না।


বুড়িদের বাড়ির কাছেই একটা পুকুর। জ্ঞান হওয়ার পড় থেকে এ গ্রামের সবচেয়ে কাছের কিছুর মধ্যে বুড়ির কাছে পুকুরটাই সবচেয়ে আপন জন। পুকুরের কাছেই সে তার যা কিছু নির্দ্বিধায় সমর্পণ করে। সেই শিশুকাল থেকে তার শরীর মন উৎসর্গ করেছে এই পুকুরকে। তার কাছে বুড়ির কোন লজ্জা নেই। বুড়ির সুখ দুঃখের সাথী এই পুকুর। নিজের নগ্ন শরীর সে এই পুকুরের বুকে ভাসিয়ে দিতে কখনও কার্পণ্য করে নি। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে সে তার নারীত্বকে আবিষ্কার করেছে পুকুরের সঙ্গে জলকেলিতে। পুকুর তার সব চাহিদা মেটায়। পুকুরের জলই তার জীবন। পুকুরের জলে তার জ্বলন্ত শরীর শীতল হয় মন শান্ত হয় পিপাসা মেটে। বাসন বসন ধোয়া মোছা সবেতেই পুকুর তার বন্ধু। তাই দিনের একটা বড় সময় বুড়ির কাটে পুকুরে, কখনও জলে কখনও  পুকুর পাড়ে। সে পুকুরের সঙ্গে নিভৃতে সুখ দুঃখের কথা বলে। পুকুর তাকে তার বারোমাস্যার কথা তুলে ধরে। গ্রীষ্মের দহনে তার ভরাট বুক ক্ষীণকায় হয়ে যায়। সে চেহারায় তাকে চেনাই যায় না। বর্ষায় তার ভরা যৌবন। শীতে সে আবার মজে যায়। ঝড় তুফান পুরুষাকারে ঝাঁপিয়ে পড়ে কখনো কখনো। ক্ষত বিক্ষত করে তাকে। সমুদ্রের নোনা জল যেন তাকে ধর্ষণ করে। আবার বসন্তের সবুজ বনানী তাকে হাতছানি দেয়। পুকুরের এই সুখ দুঃখের বারোমাস্যার সঙ্গে বুড়ির নাড়ীর যোগ।


বুড়ি আর কারও চোখে না পড়লেও নীলুর চোখে পড়ে। পুকুরের পর বুড়িও বাবা মা ছাড়া আর যাকে আপন করে চিনেছে এই গ্রামে সে হল নীলু। এই পুকুরকে সাক্ষী রেখেই দুজনের আলাপ। এক অসম বন্ধুত্ব। কি আর্থিক অবস্থা কি সামাজিক মর্যাদা কি বিদ্যা বুদ্ধি সব কিছুর বিচারেই এ এক অসম সম্পর্ক। তাও সম্পর্কটা গড়ে ওঠে। প্রথমে সহায়তার হাত বাড়িয়ে বন্ধুত্ব, বন্ধুত্ব থেকে প্রেম।  বন্ধুত্ব গড়ে ওঠার আগেই নীলু বুড়িকে আবিষ্কার করেছে তার রূপে তার সৌন্দর্যে। শরীরের রূপে চলন বলনের সৌন্দর্যে। এই অসম দুই কিভাবে একে রূপান্তরিত হলো সেটা জেনে নেওয়া যাক। বিকেলে বুড়ি যখন সব কাজকর্ম ছেড়ে পুকুর পাড়ে বসে পুকুরের সাথে গল্প করে তখন নীলুকে প্রায়ই দেখা যায় উদাস মনে পুকুর পাড়ে। পুকুর ঘাট থেকে অদূরে সুন্দরী গাছ আর গরান গাছে আচ্ছাদিত রূপসী দ্বীপটার  দিকে তাকিয়ে। মাঝে মাঝে আড়চোখে বুড়ির দিকে তাকায়। উদাস মনে কি যেন ভাবে। বোধহয় ঋজু দাঁড়িয়ে থাকা সুন্দরী গাছ তার কাছে বুড়ির ছিমছাম দেহ বৈশিষ্ট্য। আর সবুজে সবুজে গরানের গুল্ম যেন তার মুখাবয়ব যা হাসির চ্ছটায় প্রস্ফুটিত। নীলুর রোমান্টিক মনে মান্না দের একটা গানের কলি ভেসে আসে: সে কেন এত সুন্দরী হল---

নীলু আবিষ্কার করে বুড়িকে কেবল দেহ সৈষ্ঠবে নয় তার মানসিক সৌন্দর্যেও সে তাকে চিনেছে। বুড়িও উদাসিন এই যুবকের মধ্যে এক প্রেমিককে যেন খুঁজে পায়। যে শুধু দেহের নয় মনেরও পিয়াস। 


কিছুদিনের জন্য নীলু এসেছে এ গ্রামে। গ্রীষ্ম কাল। বৈশাখ শেষ হয়ে জৈষ্ঠ। গ্রীষ্মের দহনে শরীরে জ্বলন। এ জ্বালা শুকোতে সময় লাগে। যতক্ষণ না বর্ষা নামে। দিনের শেষ বেলাতে তাপ কিছুটা কম। পুকুর পাড়ে বাতাসের শীতল হাওয়ায় শরীরের জ্বালা মেটে। সঙ্গে মনের জ্বালাও কমে। বিকেলে যথারীতি বুড়ি এসেছে তার সইয়ের কাছে। এরই মধ্যে বুড়ি লক্ষ্য করেছে নীলুও এসেছে। এখন নীলু শুধু যে প্রকৃতির টানে আসে তা নয়। তার মানসে এক মানস সুন্দরী। সেই হয়তো এখন তার প্রকৃতি। সে টান সে উপেক্ষা করতে পারে না। কিন্তু হঠাৎ এক বিপত্তি। আকাশ অন্ধকার হয়ে আসে। আকাশে ধূমায়িত মেঘ যেন আছড়ে পড়বে। সুন্দরবনের গ্রীষ্মের এই বিকেলটাকে নীলু চেনে না। মাতাল হয়ে ওঠে বাতাস। আছড়ে পড়ে ঝড়। সব যেন লন্ড ভন্ড। এখান থেকে কুশলবাবুর বাড়ি বেশ দূরে। এদিকে নীলু পুকুরের পাড়ে ঢালের কাছে। বুড়ি প্রকৃতির এই চরিত্র জানে। এরপর কি হতে পারে সে আন্দাজ করে। এই অবস্থায় নীলু টাল মাটাল হয়ে যেতে পারে। ঝড়ের ধাক্কায় হয়তো পড়ে যাবে পুকুরের জলে। ভালো সাঁতার না জানলে বিপদ। এর মধ্যে অন্ধকার হয়ে এসেছে। বিপদ বুঝে বুড়ি এগিয়ে আসে। সে আসতে আসতে যে ভয় পাচ্ছিল তাই হয়। নীলু নিজেকে সামলাতে না  পেরে পড়ে যায়। বুড়ি এগিয়ে এসে ওকে ধরে। নীলু বুড়িকে ধরে ওঠে। খুব জোড়ে বৃষ্টি নামে। দুজনে কাছেই একটা ছাউনিতে আশ্রয় নেয়। এই প্রথম দুজনে দুজনের চোখাচুখি । কথা বলার সুযোগ।বর্ষণ সিক্ত বসনে বুড়ি আনত মুখে নীলুর কথার উত্তর দেয়।পরস্পরকে আনুষ্ঠানিকভাবে চেনা। কার কি নাম কে কি করে কোথায় থাকে ইত্যাদি। তবে এতে পরস্পরকে চেনার আগ্রহের তেষ্টা কারও মেটে না। এরই মধ্যে বৃষ্টি ভেজা নারী দেহ নীলুকে চিনিয়ে দেয় বুড়ির দেহ সৈষ্ঠব। নামের সঙ্গে চেহারার কি অমিল। নামটা যেখানে তাকে নিয়ে যায় আকাশ পারে চরকা কাটা বুড়ির দুয়ারে তেমনি এই বৃষ্টি ভেজা নারী শরীর তাকে  সুযোগ করে দেয় সেই বর্ষা রাতে  বিরোহিনীর ঘরে উঁকি মারতে। এ যেন পুকুরের ছায়ায় দেখা এক যুবতী।সিক্ত স্নিগ্ধ। দিনের রোদের দহন আর পরিশ্রমের ক্লান্তিতে রিক্ত শরীরটা বৃষ্টিতে ভিজে আর স্নিগ্ধ বাতাসে সিক্ত হয়ে ওঠে।আর ওর কথাবার্তা সম্ভ্রব বোধ নীলুকে আকৃষ্ট করে।বুড়ি বোঝে নিলু শিক্ষিত মার্জিত এক পুরুষ। সে কৃতজ্ঞ তার সাহায্য পেয়ে।  সে বার বার বলে আজ বুড়ি তার প্রাণ রক্ষক। তবে দুজনেই এই প্রথম আলাপে মনের টানটা যতটুকু অনুভব করে শরীরের টানটা ততটা নয়। সংযত দুই পুরুষ নারীর প্রথম পরিচয়টা  জনমানব শূন্য এই রহস্যময়ী আলো আঁধারেও মানসিক যোগাযোগের মধ্যেই সীমিত থাকে। বেশ কিছু পর বৃষ্টি থামলে প্রায় অন্ধকারের মধ্যেই একজনকে আরেকজনের কাছ থেকে বিদায় নিতে হয়। দুজনেই সঙ্গে নিয়ে যায় শরীর ও মনের এক অচেনা অথচ কাঙ্খিত স্পর্শের রেশ।


এরপর থেকে দুজনকে দেখা যায় গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিরালা খুঁজতে। নীলুর এখানে আসার আকর্ষণ বেড়ে যায়। ও এলে ওরা দুজন দেখা করে। নির্জনে বসে গল্প করে। কখনও বনে বাদারে কখনও পুকুর পাড়ে। দুজনের শিক্ষা দীক্ষা চাল চলনে ব্যাপক ফারাক থাকলেও যখন ওরা আলাপে প্রলাপে তখন এই আনুষ্ঠানিক বৈপরীত্য দূর হয়ে যায়। একজন আরেকজনকে কাছে টেনে নেয়। পরিবেশের বন্যতা তাদের সভ্য সমাজের কৃত্রিমতাকে দূরে সরিয়ে রাখতে সাহায্য করে। সুন্দর বনের আদিমতা তাদের আঁধারে ঢেকে দেয়। সুযোগ করে দেয় একজনকে আরেকজনের কাছে পেতে। দুজনের একান্ত আলাপে সব সময় যে প্রেমের জোয়ার বয় তা নয়। মত পার্থক্য দেখা যায়, সংশয়ের কালো মেঘ উঁকি মারে। বিশেষ করে আলোচনা প্রসঙ্গে উভয়ের পরিবারের সামাজিক মর্যাদার প্রশ্ন যখন ওঠে। বাড়িতে কে কি করে সে সব আলোচনা হয়। বুড়ি সবসময় যেন দ্বিধাগ্রস্ত শঙ্কিত থাকে। একেই সে গাঁয়ের মেয়ে। গাঁয়ের আঁচার আচরণ চাল চরণ শহরের শিক্ষা সংস্কৃতি থেকে আলাদা। দুটো পরিবারের আর্থিক সঙ্গতি শিক্ষা দীক্ষা দুজনকে সামাজিক মর্যাদায় দুই প্রান্তে দাঁড় করিয়েছে। এই অবস্থায় সমস্যাটা মেয়েদের বেশি বিশেষ করে অর্থে শিক্ষায় সামাজিক মর্যাদায় মেয়েরা  যদি বুড়ির মত শতছিন্ন পরিবার ভুক্ত হয়। ছেলের পরিবার যদি বিত্তশালী হয় তবে সাধারণত সেই বিত্তশালী পরিবার থেকে চাহিদাটা আকাশ প্রমান। বিয়ের যৌতুক যদি থাকে তবে তো প্রশ্নই ওঠে না। সাধ্যাতীত। তাছাড়া লেখাপড়া চাল চলন কিছুতেই খাপ খায় না। এসব ভেবে বুড়ি শঙ্কিত হয়। প্রাথমিক আবেগটা কেটে গেলে নীলু কি ওকে সেভাবে গ্রহণ করতে পারবে? নীলু পারলেও ওর পরিবার। বুড়ি জানতে চায়। এতে নীলু বিড়ম্বনায়। সত্যি কথাটা পুরো বলতে পারে না। জানে বাড়ি মানিয়ে নিতে পারবে না। ও নিজেও কি পারবে? উত্তরটা সবটা জানা নেই। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী সমাজে মর্যাদাসম্পন্ন একজনের পক্ষে বাস্তবে ব্যাপারটা এত সহজ নয়। নীলু সেটা জানে। জানে বলেই আলাপ চারিতায় তার ব্যবহারে অসঙ্গতি ধরা পড়ে। আর বুড়ির মত মেয়েদের বাস্তব বোধ অতি তুখোড় কারণ বাস্তবকে তাদের মত মেয়েদের মুখোমুখি প্রাত্যহিক জীবনে মোকাবিলা করতে হয়। তাই সে সেটা বোঝে। তাও প্রেমের আমেজে বিষয়গুলো চাপা থাকে। এক ধরণের স্পর্ধা মাথা চাড়া দেয়। স্পর্ধা নিয়েই বুড়িরা বেঁচে থাকে। কিন্তু নিলুরা কি পারবে শেষ রক্ষা করতে, প্রেমের নিগড় আঁকড়ে ধরে রাখতে। নাকি আর দশটার মধ্যে নয়টায় যা ঘটে তারই এখানে পুনরাবৃত্তি ঘটবে।  সেই বিচ্ছেদ বিরহের সেই খেলা!


ওদের এই মেলামেশায় অসম সম্পর্কে গ্রামের মানুষের মধ্যে আলোড়ন ওঠে নি যে তা নয়। ব্যাপারটা আর এখন গোপন নয়। ওরা দুজন চলা ফেরা মেলা মেশায় আগের থেকে অনেক বেশি স্পর্ধিত। অনেকটাই খোলা মেলা। বলতে গেলে বুড়ো আঙুল দেখিয়েই চলে। এটা যে সবাই মেনে নেয় তা নয়। তবে এ ধরণের অজপাড়াগাঁয়েও আজ শহরের ছোঁয়া। ছেলে মেয়েরা আগের তুলনায় অনেকটাই লাগাম ছাড়া। ছেলে মেয়েরা একসঙ্গে স্কুলের পড়ে। মেয়েদের উপস্থিতি স্কুলে রাস্তা ঘাটে খেলার মাঠে বেড়েছে। পরস্পর  বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে । তাই এসব নিয়ে এখন আর তেমন হৈ চৈ হয় না। ঘরে ঘরে এর প্রভাব। অন্যের ঘরের আলোচনা আনতে গেলে সবারই নিজের ঘরে চোখ পড়ে। তাই  এ ধরণের সম্পর্ক নিয়ে আসর বসিয়ে তা নিয়ে গুলতানি হয় না আগের মত। তবে এ নিয়ে আড়ালে আগডালে কথা হয়। বিব্রত হয় বাড়ির অভিভাবকরা। যেমন মানি মাস্টারমশায়ের কাছে নাতি নিয়ে নালিশ এসেছে। তিনি রীতিমত অস্বস্তিতে। আজকের দিনে প্রেম ভালোবাসা আর কারও অভিভাবকের অভিভাবকত্ব মেনে চলে না। সেটা মাস্টারমশাই জানেন। এ নিয়ে তিনি নাতিকে শাসন করতে ভরসা পান না। আবার চিন্তা আছে ব্যাপারটা মেয়ে জামাই কিভাবে নেবে। আর এই অসম সম্পর্কটা তিনি জানেন জামাই মেনে নেবে না। তাদের যে আর্থিক অবস্থা আর জীবন ধারণ তাতে দুস্থ  প্রায় অশিক্ষিত পরিবার আর সে বাড়ির মেয়েকে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। উনার স্ত্রী বেঁচে নেই যে সে ব্যাপারটা সামাল দেবে। এর জন্য তাকেই দায় নিতে হবে। তিনি যে কি করবেন ভেবে পান না। ওদিকে বুড়ির বাবার অবস্থা আরও খারাপ। তিনি জানেন ব্যাপারটা একদম মানান সই নয়। সমাজ একে গ্রহণ করে না। অনেকে ইতিমধ্যে বলা শুরু করেছে যে মানু বাবু মানে বুড়ির বাবা সুযোগ নিয়ে মেয়েকে এক বোকা ভালো ছেলের ঘারে চাপিয়ে দিতে চাইছে। অথচ মানু বাবু কিন্তু মেয়ের বিয়ের কথা ভাবছেন। দুচারজনের সঙ্গে কথাও বলেছেন। তবে একটা গরিব পরিবারে মেয়ের বিয়ে ব্যাপারটা অত সহজ নয়। তিনি মেয়ের এই বিষয়টা একেবারেই পছন্দ করেন না। বরং তাঁর মধ্যে একটা অনিশ্চয়তা কাজ করে। ধনি  পরিবারের সুখী ছেলে। সেখানে মেয়ের সুখ কি সইবে? ওদের কখন কি মর্জি হয়। ঘোর ভাঙলে ছেলে সরে যেতে পারে। এর মধ্যে কোন অঘটন না ঘটে! উনার নানা দুশ্চিন্তা। তিনি মেয়েকেও বকাবকি করেছেন। কিন্তু তার আর কি করার আছে ? আরও একটা ব্যাপার তলায় তলায় পাকাচ্ছে। সে আর এক সমস্যা। এ গ্রামের এক মহাজন নিধিবাবু তাঁর ছেলের জন্য বুড়িকে পাত্রী হিসেবে পেতে চান। মহাজন মানুষটাকে মানুবাবুর একেবারেই পচ্ছন্দ নয়। শুধু টাকা বোঝে। আর গরিব মানুষকে পায়ের তলায় রাখতে চেষ্টা করে। ছেলেটাও তথৈ বচ। গুণের শেষ নেই। জুয়া মদ তো আছেই। তাছাড়াও অনেক। মানুবাবু নিজেও একজন মাতাল। কিন্তু মেয়ের সঙ্গে মাতালের বিয়ে দিতে আপত্তি। আবার গ্রামের এরকম এক প্রভাবশালী ব্যক্তির প্রস্তাব মুখের ওপর অস্বীকার করা মুশকিল। অথচ জানেন  এমন জামাইয়ের সঙ্গে মেয়ে বেশিদিন ঘর করতে পারবে না।


গ্রামীন সমাজে মানুষগুলোর মধ্যেকার বাদ বিবাদ হিংসা প্রতিহিংসা পরস্পর সহযোগিতা আনন্দ নিরানন্দ কোন আভিজাত্যের আড়ালে আড়াল থাকে না। তা খোলাখুলি অনেকসময় দৃষ্টিকটুভাবে প্রকাশ পায়। সভ্য সমাজে যা একধরনের অসভ্যতা। এই গ্রামের পারস্পরিক সম্পর্কেও এটা ব্যতিক্রম নয়। সেই জন্যই দেখি মানি মাস্টারমশাইকে তার নাতিকে নিয়ে নানা রকম বিড়ম্বনার মধ্যে পড়তে হয়। মাস্টারমশাই এর সঙ্গে নিধিবাবুর বিরোধটা প্রকাশ্যে আসে। গ্রামের মানুষের যে শ্রদ্ধা মাস্টারমশাই পান সেটা নিধিবাবু পান না। যদিও নিধিবাবুর আর্থিক প্রতিপত্তি মানি বাবু থেকে কম নয়। আর মাস্টারমশাই দারিদ্রের সুযোগ নিয়ে নিধিবাবুর মহাজনী কারবার ফেঁপে ওঠাটাকে পছন্দ করেন না। সে নিয়ে পরষ্পর দ্বন্দ্ব বিদ্বেষ। নিধিবাবুর মধ্যে একটা প্রতিহিংসা স্পৃহা কাজ করে। মাষ্টার মশাইয়ের নাতির বুড়ির সঙ্গে সম্পর্কটা নিয়ে নিধিরাম ঘোট পাকানো শুরু করেন। তার দুটো উদ্দেশ্য। মাষ্টার মশাইকে অপদস্ত করা আর একই সঙ্গে নাতিকে বুড়ির থেকে দূরে সরিয়ে বুড়ির বাবাকে বাধ্য করা ছেলের সাথে বিয়ে দিতে। উনু জানেন উনার পরিচয়ে আর ছেলের গুণের জন্য এখানে সক্ষম পরিবারগুলোর ঘরের মেয়েকে বউ হিসেবে পাওয়া মুশকিল। আবার উনার ছেলে তার নিজ গুনেই আসে পাশে গ্রামে পরিচিত হয়ে গেছে। আর উনি তো তার বড় পরিবারের জন্য একজন বউ একই সঙ্গে বাদী চান যে তাঁর ঘরে দিনরাত মুখ বন্ধ রেখে গতরে খেটে যাবে আর একই সঙ্গে ছেলের সব অপকীর্তি মেনে নিয়ে তার রাতের সঙ্গিনী হবে।সেটা সম্ভব মানুর মত গরিব মানুষের মেয়েকে বউ হিসেবে পেয়েই। নিধিবাবু তার এই দ্বিমুখী লক্ষ্য অর্জনের জন্য বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। বলে বেড়াচ্ছেন মানিবাবুর প্ৰশ্রয়ে গরিব অশিক্ষিত মানুষগুলো বেড়ে উঠছে। তাদের ঘরের মেয়েরা বেপরোয়া। এটাকে আটকাতে না পারলে গ্রামের জীবনে উশৃঙ্খলা দানা বাঁধবে। গ্রামের বেশ কিছু মানুষ নিধিরামের আসল উদ্দেশ্য বুঝতে না পেরে তাকে সমর্থন করে। মানি মাস্টারের সামাজিক সম্মানের হানি ঘটতে থাকে বলে উনি আশংকিত হয়ে ওঠেন। উনি গরীব মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হলেও উনার আর্থিক প্রতিপত্তি সামাজিক মর্যাদা উনাকে নাতির সঙ্গে বুড়ির প্রেম ঘটিত ব্যাপারটা মন থেকে মেনে নিতে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে। তাই নাতি এ পথ থেকে সরে আসুক সেটা তিনি চান। আর তার একটা উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ আছে যার সঙ্গে মানুবাবুর পরিবারের আত্মীয়তা সম্পর্কটা মেনে নেওয়া যায় না। তাই তিনি বুঝেও নিধিরামের আক্রমণের মুখে নিজেকে কম জোরি বলে মনে করেন। তার কাছে এ লড়াই নিজের সন্মান রক্ষার লড়াই বলে মনে হয় যেটাতে জয় সম্ভব ওদের বিচ্ছেদে। যদি নাতি সরে আসে তবে তা নির্বিগ্নে ঘটে যায়। নিধিরামের মত একটা লোকের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষে যেতে হয় না। নিজের সন্মান বাঁচিয়ে এ যুদ্ধে জয় সম্ভব।


ইদানিং এ গ্রামে বুড়ি আর নীলুকে আগের মত দেখা যায় না। আগে প্রতি শনি রবিবার ছুটিতে নিলু যেমন নিয়মিত আসত এখন তেমন আর আসতে পারে না। হয়ত ওর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনার চাপ বেড়েছে অথবা কুশলবাবু নাতির বেশি আসাটা পছন্দ করেন না তাই। বুড়িকে নিলু জানিয়েছে এ নিয়ে দাদু বিরূপ। আর নীলুর বাবা মা ব্যাপারটা জানায় জটিলতা বেড়েছে। তবে কি নিলু আসতে আসতে সরে যাচ্ছে। বাড়ির চাপের কাছে নতি স্বীকার করতে চলেছে! প্রশ্ন ওঠে বুড়ির মনে। এ ব্যাপারটা আগে বুড়ি নীলুর কাছে তুলেছিল। এরকম একটা অমিলের মেলবন্ধন কি সম্ভব। এতটা অসম সম্পর্ক বাস্তবে কার্যকরী হওয়া ততটা সম্ভব নয় বলে সে সংশয় প্রকাশ করেছিল। কিন্তু নিলু সেটা গ্রাহ্য করে নি। তাকে যথেষ্ট আত্মপ্রত্যয়ী মনে হয়েছিল। আর নীলুর একার কেন বুড়িরও তো একটা সমস্যা ছিল। ও বাবাকে ভীষণ ভালোবাসে। জানত নিধিবাবুর চাপ দিন দিন বাড়ছে। বাবাকে রাজি হতে বাধ্য করানোর চেষ্টা চলছে। আর গ্রামের কেউ কেউ তাতে সায় দিচ্ছে। নিধিরাম এর প্রস্তাবটা বুড়ির বাবা যখন বুড়িকে জানায় তখন বুড়ি সেটাতে আপত্তি জানায়। কিন্তু ও যথেষ্ট বুদ্ধিমতী। জানত নিধিবাবুরা পয়সার প্রতিপত্তি খাটিয়ে বাবার ওপর চাপ সৃষ্টি করে এ কাজটা সম্পন্ন করতে চাইবে। আর বাবার পয়সা নেই, সেই গরিমা নেই যে ইচ্ছেমত মেয়ের জন্য পাত্র ঠিক করবে। ওদিকে এটাও সত্যি যে সে নীলুর ও তার পরিবারের কাছে তেমন মানানসই নয়। আর বিয়েটা তো মানানসই দুজনের মধ্যে গাঁট বন্ধনের মাধ্যমে দুটি পরিবারের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনের সামাজিক স্বীকৃতি। প্রেম সেখানে পরের প্রশ্ন। প্রেম থাক বা না থাক মানিয়ে চলার বিষয়টি প্রধান। আর মেয়েদের কাছে মানিয়ে চলাটা বাধ্যবাধকতা। তার নিজের সত্তা আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে হলেও। প্রেমে পড়ে নিলু নিজেকে প্রত্যয়ী বলে যতই মনে করুক না কেন বিয়ে আর প্রেম সব সময় একই প্রবাহে বয় না। বিয়ের পর জটিলতা তৈরী হয়। সেও হয় তো ও বাড়িতে শেষ পর্যন্ত বান্দায় পরিণত হবে। যেভাবে নিধিরাম ওকে উনার বাড়িতে বউ হিসেবে পেতে চায় সেটাই নীলুর বাড়িতে ওর পরিণতি। বিশেষ করে ও যেখানে পড়াশুনা জানে না। আচার আচরণে একটা বৈপরীত্য। এই সব সাথ পাঁচ ভেবে বুড়ি একেক সময় ভাবে এই সম্পর্কটা না তৈরী হলেই ভালো হত। ওদের মত গরীব ঘরের মেয়ের কাছে এটা দিবাস্বপ্ন। নিধি বাবুদের খোয়ারেই ওদের স্থান। আর বাবা এই নিয়ে যদি আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয় তবে বাবাকে দোষ সে দিতে পারে না। দারিদ্রই এর জন্য দায়ী। গরীব বলেই ওর পড়াশুনা হয়নি সামাজিক মর্যাদা সে পেতে পারে না । তাই এটাই যেন বিধাতার বিধান। তাকেও হয়তো মেনে নিতে হবে।


নীলু বিশ্ববিদ্যালয়ে বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে পড়াশুনা আর অন্য কিছু কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে। বাড়িতে বুড়িকে নিয়ে বিশেষ করে বাবার সঙ্গে দূরত্ব বেড়েছে।  সম্পর্কটা জানা জানি হবার পর বাবা রীতিমত খড়গ হস্ত। এর জন্য দাদুকে যথেষ্ট অপমানিত হতে হয়েছে। সেটা নীলু মেনে নিতে পারে নি। মাও ব্যাপারটা যে মেনে নিয়েছেন তা নয়। তবে তিনি নিলুকে বোঝাবার চেষ্টা করেছেন যে এ ধরণের সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা শক্ত। এই সমাজে মায়ের এই প্রতিক্রিয়া স্বাভাবিক বলে মনে হলেও বাবার সঙ্গে তার বিরোধ কারণ বুড়ির পরিবার গরিব বলে তারা বাবার কাছে মানুষই নন। তাছাড়া আনুষ্ঠানিক বিচারে অশিক্ষিত। পরিবারের সাথে বিরোধ নিলুকে পরিবার থেকে যেন বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। সে বন্ধুবান্ধব নিয়ে সময় কাটায়। অনেক সময় বাড়ি ফেরে না, বাড়িতে থাকলে পড়াশুনা নিয়ে থাকে। আর সে একটা সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যারা দেহ ব্যবসায়ী মেয়েদের অধিকার সামাজিক স্বীকৃতি নিয়ে লড়াই করে, তাদের মুক্তির কথা ভাবে। সেই সূত্র ধরে নিষিদ্ধ পল্লীতে তাদের যাতায়াত। তার এম এতে অধ্যয়নের বিশেষ বিষয় এইসব মেয়েদের শিল্প সাহিত্য প্রতিভা। এই নিয়ে সে লেখালেখি করে। এদের বাস্তব জীবন যেন ওকে জীবনটাকে দেখার ব্যাপারে নতুন একটা চোখ দিয়েছে। সে আমাদের স্বীকৃত সমাজের সঙ্গে এই সমাজটার পার্থক্য বোঝে।একটু গভীরে ঢুকে বুঝতে চেষ্টা করলে চমকে ওঠে। আমাদের সমাজটা স্বীকৃত কিন্তু এই সমাজটা ব্রাত্য যদিও আমাদের সমাজের শিক্ষিত অশিক্ষিত গরিব বড়লোক সব স্তরের মানুষের জৈবিক চাহিদা মেটাবার  জন্যই অর্থের মাধ্যমে লেনদেনে গড়ে উঠেছে এই বাজার। এটাও পণ্যের বাজার। মেয়েরা এই বাজারে মাছ মাংস শাক সবজির মত পণ্য। ফল ফুল সবজি এমন কি বিশেষ ক্ষেত্রে মাছ মাংস দেবতার প্রাঙ্গনে উৎসর্গের দ্রব্য হলেও তা বাজার থেকে এনে ঘরে তুললেও একটা জ্যান্ত মানুষ একই সেবা করেও অর্থাৎ মানুষের চাহিদা মেটালেও এই সমাজে অস্পৃশ্য ব্রাত্য হয়ে যায়। মূল সমাজে তার জায়গা হয় না। সভ্য জগতে এ এক অদ্ভুত স্ববিরোধিতা। এই দেহব্যবসায়ী  মেয়েদের সঙ্গে তাদের ছেলেমেয়েরাও ব্রাত্য।


অনেকদিন পরে নীলু সুন্দরবনের সে গ্রামে। দিদিমা বেশ কিছুদিন মারা গেছেন। তখন পরীক্ষা থাকায় আসতে পারে নি। তাছাড়া বুড়ির সঙ্গে সম্পর্কটা নেই। ওর বিয়ে হয়ে গেছে সেই নিধিরামের ছেলের সঙ্গে। বলতে গেলে অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাবাকে বাঁচাতে।  দু বছর আগে যে ভয়ঙ্কর ঝড় তুফান তাতে ওদের ঘর ভেঙে যায়। বাবাকে নিধিরাম টাকা দেয় ঘর করে নিতে। সে টাকা শোধ দিতে পারে না বাবা। তারপর চাপে পড়ে বাধ্য হয় মেয়েকে ও বাড়িতে সমর্পণ করতে। নীলুর খুব ইচ্ছে জানতে ও কেমন আছে। কিন্তু কি করে জানবে। এদিকে দাদুর শরীর ভালো না। তার দুই ছেলে এখন আলাদা থাকে। দাদু বড় ছেলের সঙ্গে ওর স্ত্রী আর তিন ছেলে মেয়ে নিয়ে থাকে। এখানে নীলুর আর আগের মত টান নেই। তাও দাদুর স্নেহ ধন্য সে। দাদুর কাছে বুড়ি আর বুড়ির পরিবারের খবর পায়। বুড়ি শ্বশুর বাড়িতে ভালো নেই। পরিবারের সব কাজ। তার ওপর জামাইয়ের উশৃঙ্খল জীবন। বুড়িকে মদ্য অবস্থায় কুৎসিত গালাগালি আর মারধর করে। এই নিয়ে গ্রামের মানুষজন বিরক্ত। ওকে সাবধান করলেও কিছু আসে যায় না ওদের। শুনে নীলুর মন খারাপ। নিজেকে দায়ী করে। ও যদি ওর ব্যাপারে যত্নশীল হত ওর নিজের সিদ্ধান্তে কঠিন থাকত তবে মেয়েটার এই পরিণতি হত না। ওর ইচ্ছে করে ওকে একবার দেখার।


বিকেল না হতেই নীলু সেই পুকুর পাড়ে। অতীত স্মৃতি তাকে তাড়া করে। এখানেই বুড়ির সাথে আলাপ। সেই ঝড় তুফান। বৃষ্টিস্নাতা বুড়ি যেন সামনে দাঁড়িয়ে। সেই দুর্যোগে ওই ওর অভয়। বুড়ির জন্য জলে তলিয়ে যায় নি। মনে পড়ে এই সবুজ বনানী। নিটোল পুকুর যে পুকুরের জলের ছায়ায় সে আবিষ্কার করেছিল বুড়ির শরীরের সৌন্দর্য রাশি। তা আজ কেমন ধূসর। এই শীতের বিকেলে সূর্যের রেশমিতে পাতা ঝরে গেছে। গাছের মাথা ন্যাড়া মাথা । প্রকৃতি কেমন বিষণ্ণ। তার প্রকৃতি প্রেম যেন আজ বিরহ বেদনায়। অন্যমনস্ক নীলুর হঠাৎ চোখে পড়ে কে এক মহিলা কাপড় কাঁচছে। মনে পড়ে এই সময় বুড়ি কাপড় কাঁচত বাসন মাঝতো তারপর শরীরটাকে পুকুরের জলে ভাসিয়ে দিত কোন যেন পরিচিত এক ভঙ্গিতে। কিছুক্ষণের মধ্যেই নীলুর মন বলে এই তো সেই বুড়ি। কেমন যেন বুড়িয়ে গেছে। সেই টান টান শরীর ভেঙে পড়েছে। মাত্র দু বছরে এ কি চেহারা হয়েছে! দাদু বলেছেন বুড়ি ভালো নেই। এই ভালো না থাকার প্রত্যক্ষ নিদর্শন। ওদিকে বুড়িও নিলুকে লক্ষ্য করেছে। না চেনার কিছু নেই কারণ নীলু একই রকম আছে। দুবছরটা কোন সময় নয়। এরপর কোন ভনিতা না করে বুড়িই এগিয়ে আসে। জানতে চায় ওর খবর কি। তারপর দুজন পাশাপাশি আগের মত। বুড়ি জানায় ওর অবস্থা। ও বাধ্য হয়েছিল বিয়ে করতে। তারপর সেই অত্যাচার। কিছুদিন হল তার বাবা মারা গেছে। সে শ্বশুর বাড়ি থেকে চলে এসেছে আর ফেরার ইচ্ছে নেই। ছোট তিন ভাইবোন আর মা। মা বাবুদের বাড়িতে কাজ করে। সেও সকালে একবেলা কাজ করে। তার আর ফেরার ইচ্ছে নেই। শ্বশুরবাড়ি জোর করছে ফেরার জন্য। তারা বিনে পয়সায় পাওয়া এরকম এক বাদিকে হারাতে রাজি না যে সংসারের কাজ করে আবার অপদার্থ একটা মানুষের কামনা চরিতার্থ করে। তার বাড়ির আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ। রোজগার বাড়াতে কি করবে ভেবে পায় না। এক এক সময় ভাবে মায়ের কাছে ভাই বোনকে রেখে নিজে শহরে গিয়ে একটা কাজ বেছে নেবে। বুড়ি জানতে চায় নীলু কি করছে। নীলু জানায় ওর পড়াশুনা শেষ হয়ে গেছে। একটা চাকরি খুঁজছে। ভেঙে সবটা বলে না। নিজের সংগঠনের কাজ বা বাড়ির সঙ্গে বনিবনা না হওয়ার ব্যাপারটা এড়িয়ে যায়। কথা বার্তা শেষে দুজনে ঘরে ফিরে আসে। বুড়ি তাকে অনুরোধ করে এখান থেকে নিয়ে যেতে। কিন্তু বুড়ি পরস্ত্রী বলে সেটা নীলুর পক্ষে সম্ভব নয় বলে সে জানায়।


বছর পনের কেটে গেছে। এখন নীলুর বয়স চল্লিশ বা তার কাছে। সুন্দরবনে দাদু মারা গেছে। তার সেখানে আর যাওয়া হয় না। খবর পেয়েছে বুড়ি কলকাতায় কোথাও কাজ করে। তার রোজগারে সংসার চলে। কলকাতায় নীলুর অলিতে গলিতে যাতায়াত হলেও এই লোক অরণ্যে কোথায় বুড়িকে খুঁজে পাবে? তাও ভাবে কখনও যদি দেখা হয়। আর দেখা হলেই বা কি! ও কি করতে পারবে। নীলু মগ্ন থাকে দেহব্যবসায়ীদের সগঠনের কাজ নিয়ে। সমাজ সেবা হিসেবে জীবনটা কাটিয়ে দেওয়াই তার ইচ্ছে। মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক থাকলেও বাবার সঙ্গে তেমন সম্পর্ক নেই। আর দেহ ব্যবসায়ীদের স্বার্থে কাজ সেটা তো সভ্য সমাজে পাতে পড়ে না। আর ওতে একটা অস্পৃশ্যতার ছোঁয়া আছে যেটা বাবার সংস্কৃতিতে ব্রাত্য। তাই সে একটা ঘর ভাড়া নিয়ে উত্তর শহরতলিতে থাকে। টিউশনি করে নিজের ভালোই চলে যায়। আর ওর পড়ানোতে যথেষ্ট সুনাম। তাই অসুবিধে হয় না। বিয়ে করে নি। এরই মধ্যে জীবনের একটা পর্যায় সে পার হয়ে এসেছে যেটা আমাদের অজানা। এম এ পড়তে পড়তে নীলু যখন মেয়েদের এই সংগঠনের সঙ্গে কাজ শুরু করে তখন ওর ক্লাশের রিনা বলে একটি মেয়ে ওই সংগঠনে কাজ করত। তখন নীলুর বুড়ির সঙ্গে সেই সম্পর্ক। মেয়েটি কাজকর্মে দক্ষ। ও নিলুকে পছন্দ করত। বিষয়টা যেন আর না গড়ায় তাই নীলু রিনাকে বুড়ির কথা বলে। রিনা বোধ হয় এই অসম সম্পর্ক টিকবে না বলে অনুমান করে। নীলুর সংগ ধরে থাকে। নীলু ওকে যথাসম্ভব এড়িয়ে চলে। তারপর বুড়ির সঙ্গে সম্পর্কে ছেদ পড়লে ওর বিয়ে হয়ে গেলে রিনারর সঙ্গে নীলুর সম্পর্কটা গড়ে ওঠে। দুজনে একসঙ্গে কাজ এগিয়ে নিয়ে যায়। নীলু ভাবে ওর সঙ্গে বিবাহিত জীবনটা গড়ে তুলবে যেটা দুজনকে সংগঠনের কাজে সাহায্য করবে। কিন্তু এম এ পরীক্ষায় রিনা খুব ভালো ফল করে। বিদেশে গিয়ে পড়াশুনা করার জন্য স্কলারশিপ পায়। সে সেটা গ্রহণ করে। বিদেশে যাওয়ার পর কিছুদিন দুজনের মধ্যে চিঠিতে যোগাযোগ থাকে। রিনা ওখানে ডক্টরেট করে চাকরি পায়। আর দেশে ফেরে না। শোনা যায় ও পিএইচ ডির গাইডকে বিয়ে করে অক্সফোর্ডের স্থায়ী বাসিন্দা হয়েছে। আর নীলু এখানে বুড়ির স্মৃতি নিয়ে আর সংগঠন নিয়ে দিন যাপন করছে। রিনার পাট চুকে যায়।


নীলুর চিন্তাজগতে একটা বিষয় বার বার ঘুরে ফিরে আসে। এই নিয়ে একসঙ্গে কাজ করা বন্ধুদের সঙ্গে বিবাদ হয়। প্রশ্ন জাগে এই সংগঠনের কাজ দেহব্যবসায়ীদের কতদূর সাহায্য করতে পারে? নীলুর মনে হয় এই পিছিয়ে পড়া সমাজে বঞ্চিত বিচ্ছিন্ন মেয়েদের মধ্যে একটা অধিকার বোধ জাগিয়েতো লা  যায় এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। বিভিন্ন সরকারি সুবিধা আদায় করা যায়। এদের সন্তানদের সুযোগ দেওয়ার ব্যবস্থা করা যায়। নীলু মনে করে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এটা করা যায়। শান্তিপূর্ণ পথে আন্দোলনকে অস্বীকার  করা যায় না। সীমাবদ্ধতা থাকলেও গণতন্ত্রের পরিসরে এটা করা প্রয়োজন। আবার অনেকে মনে করে এই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত এগিয়ে নেওয়া যায় না। নিপীড়িত মানুষের মুক্তির লড়াইয়ের পথে এই সংগ্রাম একটা সমঝোতার পথ মাত্র। সমাজ পরিবর্তনের লড়াই ছাড়া এই আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নেই। শ্রেণীসংগ্রামের সঙ্গে একে যুক্ত হতে হয়। কিন্তু দেহ ব্যবসায়ীরা শ্রমিক শ্রেণী নয় তাই তাদের লড়াইকে ঠিক  শ্রেণীসংগ্রাম সেটা সঠিক অর্থে বলা চলে না যদিও এটা শোষণ নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াই। কিন্তু এক শ্রেণীর দ্বারা অন্য এক শ্রেণীকে উৎখাতের লড়াই এটা নয়। এই নিয়ে বিতর্ক চলে।


নীলু মধ্য কলকাতায় একটি নিষিদ্ধ পল্লীতে সংগঠনের কাজ করে। ওদের আন্দোলন গতি পেয়েছে। দেহব্যবসায়ীদের নানা সমস্যা নিয়ে আন্দোলন গড়ে ওঠে। এখন নতুন করে তাদের ছেলেমেয়েদের সামাজিক স্বীকৃতি দেওয়া তাদের মূল স্রোতের শিক্ষাব্যবস্থায় যে কোন প্রতিষ্ঠানে বিনা খরচায়  শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ দেবার দাবি ওঠে। এতদিন ওদের জন্য পৃথক কয়েকটা স্কুলে দায়সারা ভাবে শিক্ষার ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু তাকে সার্বজনীন করার দাবি ওঠে। সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সুযোগ না দিলে তাদের সামাজিক স্বীকৃতি কার্যত অস্বীকার করা হয়। এ ব্যাপারে হাওড়ার একটা নিষিদ্ধ পল্লীতে ফুলকি নামে এক মহিলার নেতৃত্বে আন্দোলনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ওদের সঙ্গে একত্রে নিলুরাও নিজেদের  কর্মস্থলে আন্দোলন গড়ে তুলতে চায়। যে ব্যাপারে ফুলকির সঙ্গে আলোচনার দায়িত্ব পরে নীলুর ওপর। ফুলকিকে নীলু চেনে না। শুনেছে ও নাকি খুব ভালো সংগঠক। নিজে একজন দেহ ব্যবসায়ী ছিলেন এখন সর্বক্ষনের সংগঠক। নীলু হাওড়ায় নিষিদ্ধ পল্লীতে যায়। ঠিকানা ধরে ফুলকিকে খুঁজে পায়। যে নিয়ে যায় সে ফুলকির দরজায় নিলুকে পৌঁছে দেয়। নীলু দরজায় কড়া নাড়ে। এক মহিলা দরজা খুলে দাঁড়ায়। সুন্দর ছিমছাম চেহারা। দেখেই নীলু চেনে। সেই বুড়ি দাঁড়িয়ে তার নিজস্ব ভঙ্গিতে। অবাক হয় নীলু। ও এখানে! ওর মনে পড়ে বুড়ি বলেছিল শ্বশুর বাড়ি থেকে রেহাই পাবার জন্য আর সংসার খরচ টানার জন্য ও কলকাতায় কোন কাজ ধরবে। তবে এটাই কি এই  সেই কাজ। কে এর সন্ধান দিল! বুড়িও নিলুকে চেনে। একটু শ্লেষের ভঙ্গিতে বলে: কি তুমি? পরস্ত্রীর দুয়ারে!


নীলুর মনে পড়ে সেই পুকুর ঘাটে যখন শেষ দেখা বুড়ি তাকে তার দুরবস্থা থেকে বাঁচাতে অনুনয় করেছিল তাদের পরস্পর সম্পর্কের দাবিতে। নিলু সেই সম্পর্ককে মূল্য দেয়নি l তখন সে বুড়িকে বলেছিল বুড়ি পরস্ত্রী। তাকে সে কিভাবে সাহায্য করবে? আইনে আটকাবে। নীলু বোঝে আজ সঠিক মুহূর্তে সঠিক জবাবটা দিয়েছে বুড়ি। আজ এটা তার প্রাপ্য। সে রাগ করে না। বরং বুড়ির প্রতি অনুরাগে যেন সিক্ত হয়। হাসতে হাসতে বলে, 


" আমাকে বসতে দেবে তো? অনেক কিছু আলোচনার আছে। তুমিই তো ফুলকি? তোমার সঙ্গে সংগঠনের হয়ে কথা বলতে এসেছি।" এরই মধ্যে ও লক্ষ্য করে বুড়িকে শেষ দেখায় যে বুড়িয়ে যেতে দেখেছিল সেটা আজ আর নেই। শরীরে মাংস লেগেছে। মুখে চাকচিক্য। সে সেই যৌবনের বুড়ি।


ফুলকি নীলুকে নিয়ে ঘরে বসে। কে কেমন আছে জানতে চেয়ে কথা শুরু হয়। বুড়ি জানায় বছর বারো তের হল সে এখানে আসে। এক দালাল চাকরি দেবে বলে আনে। তবে চাকরি নয় এই  ব্যবসার সুযোগ করে দেয়। আর এই ব্যবসার আয়ে এতদিন তার সংসার চলত। নিজের হেসে খেলে চলে যায়। এখন ভাইরা বড় হয়ে কিছু না কিছু করে। সংসারের খরচ ওরাই চালায়। বুড়িকে আর টাকা পাঠাতে হয় না। বুড়ি ফুলকি নামে এখানে এখন এই মেয়েদের সংগঠক। নিজে দেহ ব্যবসার কাজ ছেড়ে দিয়ে এই সংগঠন নিয়েই আছে। মেয়েদের দেখাশোনা করে। এখান থেকে ও আর বাড়ি ফেরে না। আর সমাজে সে এখন ব্রাত্য । সন্মান নিয়ে থাকতে পারবে না। সব শুনে নীলু বলে:


তুমি আমার সঙ্গে চল। এখন আর তুমি পরস্ত্রী নও। এই সংগঠনে কাজ করে আমি অনেক শিখেছি। জেনেছি কে পরস্ত্রী আর কে নিজের স্ত্রী। তুমি চল আমার সঙ্গে থাকবে। দুজনেই সংগঠনের কাজ করব।"


বুড়ি বলে:


"সেটা আজ সম্ভব নয়। আমি জানি এই মেয়েদের আমি মুক্তি দিতে পারব না। কিন্তু ওদের ছেড়ে চলে গেলে আমার বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে। এখানে আমি স্বাধীনভাবে সম্মানের সঙ্গে আছি। আর এই মেয়েরা এদের ছেলেমেয়েরা আমাকে যে সন্মান দেয় সে সন্মান স্বীকৃতি আমি কোনদিন তোমাদের সমাজে পাই নি পাব না। বলত শ্বশুর বাড়িতে বউয়ের পরিচয়ের আড়ালে আমি কে ছিলাম।একজন বিনা পয়সার বান্দি যাকে দাসী ছাড়া কিছুই বলা যায় না। ক্রীতদাসকেও পয়সা দিয়ে কিনতে হয়, দেহ ব্যবসায়ীকে দেহের সেবা দেওয়ার বিনিময়ে পয়সা দেওয়া হয়। কাজের লোককে মাইনে দেওয়া হয়। কিন্তু আমাকে কিছু না দিয়ে সব করিয়ে নেওয়া হত। নামে মাত্র বাড়ির বউ। অনিচ্ছা সত্বেও এক দুশ্চরিত্র লম্পটকে দেহ দিতে হত। সেটাও কার্যত এক ধরণের ধর্ষণ। এমন কি তোমার সঙ্গে বিয়ে হলেও তোমার বাড়ি আমাকে কি দিত? আজ সমাজ আমাকে যাই বলুক আমি জানি আমি আমিই। আমার নিজস্ব সত্তা আছে। এমনকি খদ্দেররাও আমাকে সমীহ করে। আর মেয়েদের মুক্তির জন্য আন্দোলনে নেমেছি। জানি এই ব্যবস্থার বদল না হলে এদের মুক্তি সম্ভব নয়। তবে সেতু বানাতে কাঠবেড়ালির কাজটা তো করতে পারি।"


সব শুনে নীলু থ বনে যায়। জীবন সম্বন্ধে কি গভীর বোধ। মেয়েদের অধিকার তাদের সম্মানের সম্পর্কে এ কি প্রত্যয়! আর সবটাই জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া। কথা না বাড়িয়ে কিছুটা সংগঠনের কথা কিছুটা আন্দোলনের কথা বলে ফেরার জন্য নীলু উঠে দাঁড়ায়। মনে হয় দুজনের মধ্যেকার এতদিনের অসম সম্পর্ক যেন সমতা অর্জন করেছে।আজ সত্যিকারের সামাজিক মর্যাদার নিরিখে দুজনে একই আসনে। কাঁধে কাঁধ রেখে লড়াইয়ের ময়দানে। সেখানেই তাদের প্রেমের সার্থকতা। একজন আরেকজনকে চিনে নেওয়া।


======০০০======

Comments

বিধিবদ্ধ স্বীকার্য :

লেখার বক্তব্যের দায়িত্ব লেখকের, পত্রিকার নয়। আমরা বহু মতের প্রকাশক মাত্র।

সাম্প্রতিক বাছাই

প্রচ্ছদ ও সূচিপত্র ।। ৯৯তম সংখ্যা ।। জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ মে ২০২৬

লেখা-আহবান-বিজ্ঞপ্তি   আগামী মাসে প্রকাশিত হবে নবপ্রভাত ওয়েব ম্যাগাজিনের ১০০তম সংখ্যা ।   কোনো বিশেষ বিষয় থাকছে না। শব্দ বা লাইন সংখ্যার কোনও বাঁধন নেই।     বিভাগ-১: প্রবন্ধ-নিবন্ধ-ফিচার, বিভাগ-২: সব ধরনের গল্প, বিভাগ-৩: ভ্রমণকাহিনি-মুক্তগদ্য-রম্যরচনা, বিভাগ-৪: কবিতাগুচ্ছ (ন্যূনতম ৩টি)-ছড়াগুচ্ছ (ন্যূনতম ৩টি) পাঠাতে পারেন।   নির্বাচিত লেখাগুলি (সর্বোচ্চ ৯৯টা) প্রকাশিত হবে এবং প্রতি বিভাগ থেকে একটি করে সেরা লেখার লেখককে মানপত্র ও নবপ্রভাত প্রকাশনীর বই উপহার দিয়ে সম্মান জানানো হবে। সম্ভব হলে সংখ্যাটির মুদ্রিত সংস্করণও হতে পারে। সুতরাং মানসম্মত ভালো লেখা পাঠান।   e-mail: nabapravatblog@gmail.com   পাঠানোর শেষদিন : 12/06/2026 পত্রিকা প্রকাশ : ১লা আষাঢ় ১৪৩৩ ( 15/06/2026) সূচিপত্র দেবাশিস সাহার গুচ্ছকবিতা ভবরোগবৈদ্যম ।। শ‍্যামাপ্রসাদ সরকার ছড়াকারের পরিচয়-সঙ্কট ।। জাহাঙ্গীর আলম জাহান Gen Z-এর প্রভাব : সমাজতাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ।। শিবশিস  মুখার্জী আধুনিক সমাজ ও সক্রেটিস: প্রশ্নের ভেতর দিয়ে মানুষের যাত...

যুদ্ধের দামামা ।। সুবিনয় হালদার

যুদ্ধের দামামা সুবিনয় হালদার যুদ্ধের দামামা ওই দেখো বেজেছে সাইরেনের শব্দ শুনতে কি পাচ্ছো ? লাল বাতি নীল বাতি ছোটাছুটি করছে , সুস্থ অসুস্থ নয় তো বা অন্য কিছু যাচ্ছে ফিসফাস চুপচাপ কানাঘুষো কত কথা হচ্ছে ; যুদ্ধের দামামা ওই দেখো বেজেছে । ঢং ঢং আওয়াজে- রাত জাগে মানুষে- (২) চারিদিকে স্তব্ধ ঘরে ঘরে নিঃশব্দ ভেসে আসে কোলাহল- কারা করে চিৎকার- ? ধুমধাম গর্জন মনে হয় কম্পন আলোর রোশনাই সব হলো পুড়ে ছাই ; তাই শুনি বলতে বারুদে লাগাও তবে সলতে ভনিতা অনেক এবার হয়েছে লাশের পাহাড় দেখি জমেছে যুদ্ধের দামামা ওই দেখো বেজেছে । শুধু দেখি হায়- ভয়ের চাপে সরে যায় জয় কে ধরবে হাল- কে-বা দেবে চাল- ? মাঝি বুঝি নাইরে ; কল্কির কেল্লা শুরু হলো হল্লা কোথা যাবে জনগণ এ-যে বুঝি মহারণ অনেক হয়েছে দ্বন্দ্ব সোজা করো মেরুদন্ড । নাই তবে নিস্তার হও সবে সোচ্চার চাপ দাও দন্ডে ভর সাথে ভার তবে সরবে বসে বসে সবে মিলে সময় গুনছে ; তাঁর নাম করছে তাঁর বাণী পড়ছে ! যুদ্ধের দামামা ওই- দেখো- বেজেছে- । ___________________ সুবিনয় হালদার পিতা - ঈশ্বর প্রদীপ হালদার গ্রাম - দৌলতপুর পোস্ট - দিঘীরপাড় বাজার থানা - ফলতা জেলা - দক্ষিণ ২৪ পরগ...

ছড়া ।। লিচু ।। আনন্দ বক্সী

লিচু  আনন্দ বক্সী 'গোয়াঙডঙ প্রদেশ' জায়গাটি চিনে  শুরু হয় চাষ এর অতীতের দিনে। টক আর মিষ্টিতে মজাদার খেতে  ছোটো-বড় সকলেই চায় স্বাদ পেতে। আকারে লম্বা-গোল ছোটো ছোটো ফল  থোকা থোকা ঝুলে থাকে গাছে অবিরল।  ছূঁচালো অগ্রভাগে খসখসে দেহ  কাঁচায় সবুজ ত্বক নেই সন্দেহ।  পাকলে গোলাপি লাল বাইরের ছাল  ভিতরের অংশটা সাদা চিরকাল।  আঁটিটা শক্ত খুব পয়জনে ভরা  বাদামি রঙেই এর দেহখানি গড়া। গ্রীষ্মের ফল এটি ভরপুর রসে  স্বাদ এর মনটাকে করে নেয় বশে। ভেবে বলো এর নাম পেলে নাকি কিছু? ঠিকই চিনেছ একে ফলটি যে লিচু। খোসাটা ছাড়িয়ে খাও কাঁচা হোক পাকা  স্যালাড-মিষ্টি-জুসে পাবে এর দেখা। শর্করা-চিনি-জল নেই এতে কম  ভিটামিন-ফাইবারে ভরা একদম। খনিজের আছে স্থান এই ফল মাঝে  শরীরের উপকারে লাগে যেটা কাজে। লোহিত কণিকা গড়ে আমাদের দেহে  হার্টকে সুস্থ রাখে অপরূপ স্নেহে। দেহ-ত্বকে ধরে রাখে এর যে সতেজতা  ওজনটা কমাতেও করে সহায়তা। রক্তচাপকে করে করতলগত  মধুমেহ রোগ এর হয় অনুগত। বশে রাখে লিচু শুনি বাত-হাঁপানিকে নানা কাজে প্রয়োজন এই ফলটিকে। খালি পেট...

ছোটগল্প ।। মনোকষ্টে বাবলা ।। দীপক পাল

মনোকষ্টে বাবলা দীপক পাল পয়লা বৈশাখে হালখাতা করতে গিয়ে যা বেহাল অবস্থায় পরেছিল তিন মক্কেল তারপরে বাড়ীতে মা বাবার যা বকুনি জুটেছে তা আর বলার নয়। তিন মক্কেলও ঘর থেকে বেরোয়নি। তৃতীয় দিন সকালে বাবলার বাবা বাবলাকে বলে, - ' জানিস আজ সকালে দিদি ফোন করেছিলো আমরা কেউ গিয়ে একবারও দেখা সাক্ষাত করি না কোন খোঁজ খবর করিনা আমরা কেমন আছি। তাই আমি ঠিক করেছি এই টাকাটা নিয়ে তুই একবার ঘুরে আয় সোনারপুর। ' -' আজ যাবনা বাবা। একা যেতে ইচ্ছে করেনা , কাল বিশ্বরূপ ও সৌম্যকে নিয়ে যাব।' - ' আচ্ছা তাই যাস যদি ওরা যায়। তবে আরো কটা টাকা নে।' বাবলা সৌম্য ও বিশ্বরূপকে ফোনে সন্ধে সাতটার সময় পার্কে আসতে বলল। বললো অনেক কথা আছে।  যথারীতি সন্ধে সাতটায় পার্কে সবার দেখা হলো। কিছুক্ষণ সাধারন কথাবার্তা চলার পর অটোমেটিক হালখাতার সন্ধের ঘটনার কথাটা উঠলো। এবার আর কোন বিরক্তি বা রাগের কথাতো উঠলেই না কোন দোষারোপ না। সবাই খানিক মজা আর হেসে লুটোপুটি খেলো। এর মধ্যে সৌম্য হঠাৎ বলে উঠলো, - ' আচ্ছা বাবলাদা তুমি হঠাৎ আমাদের পার্কে ডেকে পাঠালে কেনো, কি ব্যাপার?' - ' কেন, আমি তোদের ডাকতে পা...

উন্মুক্ত পাগলামি ।। আশরাফুল মণ্ডল

উন্মুক্ত পাগলামি আশরাফুল মণ্ডল আহা, অপরূপ নিজস্বতার দাহ! কুঁকড়ে যায় আবহমান, সজনে পাতার বোঁটায়! ভাপওঠা ভাতের কাছে মাছি সত্তায় কী নিপুণ! তবুও ঘোর লাগা বসন্তের ডাক, হাঁকে! খেদিয়ে দেয় পা দোলানো প্রস্তাব, ওই ধুনুরি চোখ! রাংতায় মোড়া ডাকের সাজ, দে দোল দোল! হুইসেল বাজিয়ে কে রুখে দ্যায় সেই নাকছাবির রুদালি কাঁপন! খালবিল ছেঁচে পাঁচসিকের  মানত কুড়িয়ে আনে, বাংলা বাজার। ঠ্যাং নাচানো সুরে চোখ মারছে, দ্যাখো ভ্যানতারা! মুখ খোলা মানেই পাঁজরের স্রোত ভাবা যেন উগরানো টালমাটাল! ঢিল মারা প্রশ্নের রোয়াকে বক্রচোখে যেন মেধাবী কবিতা! মুছে দিও তবে লাজুক গুপ্ত রোগ, দিনরাত্রি! ভালো থেকো তোমরা বাছাধন, রং মাস সে আর কতদিন... ================    ASRAFUL MANDAL Chandidas Avenue, B-zone, Durgapur, Paschim Bardhaman, Pin - 713205,  

বাংলার কথা ।। আবদুস সালাম

বাংলার কথা : একটি আলোচনা আবদুস সালাম যে বাংলা নিয়ে আমাদের এত গর্ব এত অহংকার সেই বাঙলা কিন্তু একদিনে গড়ে ওঠেনি। বহু বিবর্তনের পথ ধরে বাংলা রূপ নিয়ে আজ আমাদের সম্মুখে বিরাজমান। আচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে--" মৌর্য বিজয় থেকে আরম্ভ করে গুপ্ত রাজবংশের রাজত্ব পর্যন্ত খ্রিস্টীয় পূর্ব ৩০০ বছর থেকে খ্রীষ্টিয় ৮০০ বৎসর ধরে বাংলার অস্ট্রিক ও দ্রাবিড় ভাষাভাষী জনগণ নিজ অনার্য ভাষা ত্যাগ করিয়া ধীরে ধীরে আর্যভাষা অর্থাৎ মগধের প্রাকৃত ভাষা গ্রহণ করিল। উত্তর ভারতের ব্রাহ্মণ্য ধর্ম সভ্যতা ও ঐতিহ্য অর্থাৎ সংস্কৃত ভাষার সত্তা হারিয়ে আর্য-অনার্য ইতিহাস পুরাণ এবং উত্তর ভারতের আর্য অনার্যে ইতিহাস পুরাণ বঙ্গদেশের অধিবাসীরাও গ্রহণ করে। বৌদ্ধ ও জৈন মতবাদ আসিল, তাহাও বাংলায় গৃহীত হইল।" এভাবেই দ্রাবিড় অস্ট্রিক ও উত্তর ভারতের মিশ্র আর্য জাতির মিলনে সৃষ্টি হলো বাঙালি জাতি। দু হাজার বছর ধরে বহিঃস্থ শক্তি সমূহ মৌর্য,গুপ্ত ,পাল, চন্দ্র,বর্মন, দেব, কোল,সেন, তুর্কি, মুঘল, ইংরেজ প্রভৃতি জাতির আক্রমণে বিধ্বস্ত হয়ে নিজের সত্তাকে বিসর্জন দিয়ে শংকর জাতি হয়ে জীবন যাপন ক...

ছোটগল্প ।। নীলিমার আত্মজাগরণ ।। পরেশ চন্দ্র মাহাত

নীলিমার আত্মজাগরণ পরেশ চন্দ্র মাহাত নীলিমা মাহাত, বয়স পঁচিশ প্লাস —তার বাবা মায়ের পঞ্চম তথা শেষ সন্তান। দুই দাদা —বড়দাদা শঙ্কর ও ছোটদাদা বিজয়। বড় দাদা শঙ্কর আর দুই দিদি তাদের কিন্তু বিয়ে হয়ে গেছে। একমাত্র নীলিমা আপাতত স্বামীর কোমল হাতের স্পর্শ ও সহানুভূতি থেকে বঞ্চিত এবং আদৌ কবে অথবা সেই সৌভাগ্য আসবে সেটা ঈশ্বরের নিকটই একমাত্র জ্ঞাত। সেই সঙ্গে দুবছরের সিনিয়র ছোটদাদা বিজয়েরও নীলিমার মতো অবস্থা। তারও জীবনসঙ্গিনী জুটেনি। মোট সাতজন সদস্য নিয়ে গঠিত সংসার নীলিমাদের পরিবার। মধ্যবিত্ত পরিবার —মধ্যবিত্ত পরিবার না বলে যদি নিম্নবিত্ত বলা হয় তবুও কোনো অত্যুক্তি করা হয় না। বাবার প্রত্যেকদিনের আয়ের উপর ভিত্তি করেই চলে সংসার। এই কঠোর এবং কঠিন পরিস্থিতিতেও নীলিমার মা শ্রীমতী মেনকা‚ সংসার সামলে তার ছেলেমেয়েদের পড়াশুনার প্রতি যথেষ্ট তৎপর ও সহানুভূতিশীল। তাদের পড়াশুনায় কোনো খামতি রাখেননি। যথা সময়ে তাদেরকে বিদ্যালয়ের মুখ দেখিয়েছে – টিউশনের বন্দোবস্ত করেছে। তাদের জীবন যাতে সুখকর হয় সেটাই প্রতিদিন ভগবানের কাছে প্রার্থনা করেছে। পাঁচ-পাঁচটি ছেলেমেয়ের মধ্যে সবাইকে উচ্চশিক্ষিত করে তোলা একপ...

প্রচ্ছদ ও সূচিপত্র ।। ৯৮তম সংখ্যা ।। বৈশাখ ১৪৩৩ এপ্রিল ২০২৬

  শুভ নববর্ষ ১৪৩৩ নবপ্রভাতের পক্ষ থেকে সকলকে জানাই শুভ বাংলা নববর্ষের হার্দিক শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধা।  সকলের মঙ্গল হোক। পারস্পরিক সৌহার্দ্যে নন্দিত হোক জীবন। বাংলা নববর্ষকেন্দ্রিক লেখাগুচ্ছ এই সংখ্যায় রইল। অন্যান্য লেখা পরে প্রকাশিত হবে। —নিরাশাহরণ নস্কর, সম্পাদক, নবপ্রভাত।   সূচিপত্র পহেলা বৈশাখ : অদ্বিতীয় বাঙালির সর্বজনীন উৎসব ।। অলোক আচার্য বোশেখের ঘুড়ি ।। শাহ মতিন টিপু পয়লা বৈশাখ : বাঙালির প্রাণের উৎসব ।। উৎপল সরকার মাটি, বঁড়শি ও রক্তের আখ্যান ।। দিব্যেন্দু ঘোষ হালখাতা — বাঙালিয়ানা ।। শ্যামল হুদাতী বাংলা নববর্ষ : বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের প্রতীক ।। তপন মাইতি বাংলা পঞ্জিকার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ।। তুষার ভট্টাচার্য হালখাতা ।। চন্দ্রমা মুখার্জী নববর্ষের গৌরচন্দ্রিকা ।। অভীক চন্দ্র নববর্ষের সেকাল একাল ।। মিতা ভৌমিক নববর্ষের নবতম আশা ।। সমীর কুমার দত্ত দুই আকাশ, এক নববর্ষ ।। রাজদীপ মজুমদার আমার সন্ন্যাস ।। অংশুদেব পয়লা থেকে একলা হওয়া ।। সুকান্ত ঘোষ পহেলা বৈশাখে আনন্দ নগরের স্মৃতি ।। সারাবান তহুরা মৌমিতা বাংলা নববর্ষ ।। পার্থপ্রতিম দত্ত স্মৃতির পাতায় পয়লা ।। দেবশ্রী চক্রবর...

কবিতাঃ চন্দন ঘোষ

এক টুকরো রুটি বস্তির রাস্তায় একটা বৃদ্ধ মানুষ সারাদিন বসে আছে। উত্তরে দেখে দক্ষিনে দেখে বহুদূর কেউ একটুকরো রুটি দিয়েযায় পাছে। চক্ষু কোটোরা গত শরীর মাস হীন, হাড় মাত্র। হয়তো স্বাধিনতা আন্দোলনের বিপ্লবী! হয়তো কলেজের আদর্শ ছাত্র। হয়তো ব্রিটিশ গোরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল  তার ছোট্টো ঝুঁপরির উপর। সে বাধা দিয়েছিল প্রতীবাদী হাতে। হয়তো পঙ্গু হয়েছিল সেই রাতে। আমি এক প্রশ্ন তুলেছিলাম, কেমনে হইল এ অবস্থা? বাক সরেনা মুখে সরকার কেন করেনা কোনো ব্যাবস্থা?? শরীর বস্ত্রহীন এই রাতে। নিম্নাঙ্গে একটা নোংগরা ধুতি। কী জানি কত দিন খায়নি? কত দিন দেখেনি এক টুকরো রুটি! রাজধানী শহরের আকাশটা দেখছে। দেখছে নেতা মন্ত্রী গন। হাইরে কেউতো তারে উঠিয়ে তোলেনি। দেখেনি কোনো কোমল মন। আজ ভারতবর্ষ উন্নতশীল রাষ্ট্র!   কথাটা অতীব মিথ্যা মাটি। এমন কতযে মানুষ ক্ষুদার্থ, দেখেনা এক টুকরো রুটি। নতুন মন্ত্রী, নতুন রাষ্ট্রপতি সবাই আসে সবার হয় আবর্তন। হাইরে পিছিয়ে পড়া মানুষ গুলো! তাদের হয়না কোনো পরিবর্তন। আজ 71 বছর আজাদ হয়েও  বোধহয় যে...

দুটি কবিতা ।। জয়িতা চট্টোপাধ্যায়

দুটি কবিতা ।। জয়িতা চট্টোপাধ্যায় আধুলি ও কড়িতে কেনা নেই আমাকে আমার চেনা হয়নি জানা হয়নি ঘায়ের আকার ঠিক কতটা হলে সেলাই পড়ে নিজেকে দামি ভেবে গেছি রোজ... বার বার ভুলের পর,আজ যা পড়ে আছে তা কেবল আত্মশ্লাঘা এক জনমের সওদায় যাকে বিক্রি করা যাবে না তাই তো বুকে আগলে বসেছি আমার বিস্ফোরণ আর সেই ধ্বংসস্তূপে নুন ছিটিয়ে যাচ্ছে গোটা শহর। নিরালায় আছি মানচিত্রে আমাদের স্থান এক ও অনন্য অন্ধের দৃষ্টি খোঁজার মতো আমরাও আমাদের মৃত ভালোবাসাকে উস্কে দিই ব্রক্ষ্মাণ্ডে,তখন চাঁদটাও নগন্য লাগে যেন একটুকরো কালো পাথর আবার সময়ে সময়ে বেড়ালের ল্যাজ নাড়াটাও হয়ে ওঠে পৃথিবীর অন্যতম মনোরম দৃশ্য ওর ল্যাজে লেগে থাকা পিঁপড়েটা তখন আমি, ক্ষুদ্র ও তুচ্ছ যেন প্রকৃতির বুকের এক টুকরো বিরহ। ....................... জয়িতা চট্টোপাধ্যায় শ্যামনগর উত্তর চব্বিশ পরগনা ভারত

জনপ্রিয় লেখা

সাহিত্যের মাটিতে এক বীজ : "ত্রয়ী কাব্য" -- সুনন্দ মন্ডল

সাহিত্যের মাটিতে এক বীজ -- "ত্রয়ী কাব্য" ------------------------------------------------------------------------------ সুনন্দ মন্ডল নবীনচন্দ্র সেন সাহিত্যে তথা বাংলা কবিতার জগতে এক অবিস্মরণীয় নাম। তিনি চট্টগ্রাম জেলার নওয়াপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ১৮৪৭ সালে তাঁর জন্ম এবং মত্যু ১৯০৯ সালে। বঙ্কিমচন্দ্র তাঁকে 'বাংলার বায়রন' বলেছেন। ‎জীবৎকালীন যুগে আত্মপ্রত্যয়ের মধ্যে জাতীয় চরিত্র আত্মস্থ করে নতুন সংস্কারে প্রয়াসী হয়ে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেছেন।মধুসূদন-হেমচন্দ্র-নবীনচন্দ্র--এই তিন কবি বাংলা কাব্যধারায় প্রাণ সঞ্চার করেছিলেন। বিশেষত মহাকাব্য লেখার দুঃসাহস দেখিয়েছিলেন। এদিক থেকে মধুসূদন দত্ত একজন সফল মহাকাব্যিক। তাঁর 'মেঘনাদ বধ' কাব্যের মত গভীর ও ব্যঞ্জনাময় না হলেও নবীনচন্দ্র সেনের 'ত্রয়ী' কাব্য বিশেষ মর্যাদা দাবি করতেই পারে। তাছাড়া 'ত্রয়ী' কাব্যে ধর্মীয় ভাবধারার আবেগ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ‎ ‎নবীনচন্দ্র সেন বহু কাব্য লিখেছেন। যেমন- 'অবকাশরঞ্জিনী','পলাশীর যুদ্ধ', 'ক্লিওপেট্রা', 'রঙ্গমতী', 'খ্রীষ্ট', ...

প্রবন্ধ ।। লুপ্ত ও লুপ্তপ্রায় গ্রামীণ জীবিকা ।। শ্রীজিৎ জানা

লুপ্ত ও লুপ্তপ্রায় গ্রামীণ জীবিকা শ্রীজিৎ জানা "সময় চলিয়া যায় নদীর স্রোতের প্রায়"। স্রোতের ধারা তার দু'প্রান্তে রেখে যায় ভাঙাগড়ার চিহ্ন। কালের দৃশ্যপটেও পরিবর্তনের ছবি অনিবার্যভাবেই চোখে পড়ে। সমাজ সময়ের ছাঁচে নিজেকে গড়ে নেয় প্রতিনিয়ত।  সেখানে মনে নেওয়ায় বাধা থাকলেও,মেনে নেওয়ার গাজোয়ারি চলে না। ফলত কাল বদলের গাণিতিক হিসেবে জীবন ও জীবিকার যে রদবদল,তাকেই বোধকরি সংগ্রাম বলা যায়। জীবন সংগ্রাম অথবা টিকে থাকার সংগ্রাম।  মানুষের জীবনযাপনের ক্ষেত্রে আজকে যা অত্যাবশ্যকীয় কাল তার বিকল্প রূপ পেতে পারে অথবা তা অনাবশ্যক হওয়াও স্বাভাবিক। সেক্ষেত্রে উক্ত বিষয়টির পরিষেবা দানকারী মানুষদের প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হওয়া অস্বাভাবিক নয়। এক কালে গাঁয়ে কত ধরনের পেশার মানুষদের চোখে পোড়তো। কোন পেশা ছিল সম্বৎসরের,আবার কোন পেশা এককালীন।  সব পেশার লোকেরাই কত নিষ্ঠা ভরে গাঁয়ে  তাদের পরিষেবা দিত। বিনিময়ে সামান্য আয় হত তাদের। আর সেই আয়টুকুই ছিল  তাদের সংসার নির্বাহের একমাত্র উপায়। কালে কালান্তরে সেই সব পেশা,সেই সব সমাজবন্ধুরা হারিয়ে গ্যাছে। শুধুমাত্র তারা বেঁচে আছে অগ্রজের গল্পকথায়,আর বিভিন...

গ্রন্থ আলোচনা: শর্মিষ্ঠা দেবনাথ

প্রতিবাদ যখন অগ্নিবাণী বাংলাদেশে নারীমুক্তি ও নারী আন্দোলনের পুরোধা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ১৯৯তম জন্মদিনের শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদিত হল " আসিফা এবং.." কাব্য সংকলনটির মধ্যদিয়ে।সংকলনটির বিশেষত্ব হল,এটি উৎসর্গ করা হয়েছে নারীর সম্মান রক্ষার আন্দোলনের যোগ্যতম ব্যক্তি শহীদ শিক্ষক বরুন বিশ্বাসকে। সংকলক প্রকাশক সন্দীপ সাহু নিজে এবং বিশিষ্ট কবি সাহিত্যিকদের দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছেন এমন কিছু কবিতা, যা শুধুমাত্র শব্দ ও ছন্দের অনুবন্ধ নয়, এক একটি অগ্নিবাণী।আসলে জীবনকে দেখার স্বাতন্ত্র‍্যে কবিরা সব সময়ই অগ্রগণ্য এবং অনন্য।যুগ ও জীবন দ্বন্দ্বের কণ্ঠস্বরকে আশ্রয় করে,একদিকে মনের প্রবল দাহ ও অন্যদিকে  নির্যাতিতা শিশুকন্যা ও নারীর প্রতি মনের গভীর আকুলতা থেকে প্রকাশ পেয়েছে "আসিফা এবং" এর  কবিতাগুলি।এক অন্ধকার সময়ের মুখোমুখি আমরা,সেই অন্ধকার আমাদের নিয়ে এসেছে সামাজিক অবক্ষয়ের শেষধাপে যেখানে নৈতিকতা,পাপবোধ,গ্লানিকে সরিয়ে রেখে, সমাজের বানানো নিয়মকে তোয়াক্কা না করে,অনায়াস দক্ষতায় ও ক্ষিপ্রতায় নিজেরই ধর্মচেতনাকে জলাঞ্জলি দিয়ে কিছু মানুষ তার পশুত্বের পরিচয় দিয়েছে ধর্ষণ ও ন...

শ্যামাপদ মালাকারের কবিতা

চোখ """"""" নদী, অরণ্য, রাতের ফালি চাঁদ- সবেই তো আমার...স্বর্ণপিঁড়িটাও!। সেদিন, শুকতারাটার গা' মাপতে গিয়ে মনে হল, --ওরা আমার চেয়েও সুখী? দেখিনা একবার গাইতি-শাবল চালিয়ে... চালালাম। জল-মাটি ভেজা একটা 'চোখ' কুড়িয়ে ফিরলাম! সেই চোখদিয়ে দেখি-- শেষ বিকেলের নিরন্ন আঁচে ঝলসানো বুকে নীড়ে ফিরছে ধূলিমাখা কত কাল পা, কি শান্তি - কি তৃষ্ণা! পাতাক্ষোয়া কোদালেরর মাথায় ঝরেপড়া ললাটের ঘামে, কারা যেন জীবন শাণ দেয়! রুক্ষঠোঁটের আবরণে এক সময় নেমে আসে শিশিরস্নাত কালনিশি-- মাঝের ব্যবধান মুছে দেয় প্রতিশ্রুতির ভীড়- - পূর্বজনমের নিদর্শনচুম্বন শেষে হেরে যায় কার মমতাজ-- ম্লান হয়ে যায় কত পিঁড়ি! ... ম্লান হয়ে যায় কত পিঁড়ি! ... ম্লা...

লেখা-আহ্বান-বিজ্ঞপ্তি : মুদ্রিত নবপ্রভাত বইমেলা ২০২৫

   মুদ্রিত  নবপ্রভাত  বইমেলা ২০২৫ সংখ্যার জন্য  লেখা-আহ্বান-বিজ্ঞপ্তি মুদ্রিত  নবপ্রভাত  বইমেলা ২০২৫ সংখ্যার জন্য  প্রবন্ধ-নিবন্ধ, মুক্তগদ্য, রম্যরচনা, ছোটগল্প, অণুগল্প, কবিতা ও ছড়া পাঠান।  যে-কোন বিষয়েই লেখা যাবে।  শব্দ বা লাইন সংখ্যার কড়াকড়ি বাঁধন  নেই। তবে ছোট লেখা পাঠানো ভালো,  তাতে অনেককেই সুযোগ দেওয়া যায়।  যেমন, কবিতা/ছড়া ১২-১৬ লাইনের মধ্যে, অণুগল্প/মুক্তগদ্য কমবেশি ৩০০/৩৫০শব্দে, গল্প/রম্যরচনা ৮০০-৯০০ শব্দে, প্রবন্ধ/নিবন্ধ ১৫০০-১৬০০ শব্দে। তবে এ বাঁধন 'অবশ্যমান্য' নয়।  সম্পূর্ণ অপ্রকাশিত লেখা পাঠাতে হবে। মনোনয়নের সুবিধার্থে একাধিক লেখা পাঠানো ভালো। তবে একই মেলেই দেবেন। একজন ব্যক্তি একান্ত প্রয়োজন ছাড়া একাধিক মেল করবেন না।  লেখা  মেলবডিতে টাইপ বা পেস্ট করে পাঠাবেন। word ফাইলে পাঠানো যেতে পারে। লেখার সঙ্গে দেবেন  নিজের নাম, ঠিকানা এবং ফোন ও whatsapp নম্বর। (ছবি দেওয়ার দরকার নেই।) ১) মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখবেন 'মুদ্রিত নবপ্রভাত বইমেলা সংখ্যা ২০২৬-এর জন্য'।  ২) বানানের দিকে বিশেষ নজর দেবেন। ৩) য...

কোচবিহারের রাস উৎসব ও রাসমেলা: এক ঐতিহ্যবাহী অধ্যায় ।। পার্থ সারথি চক্রবর্তী

  কোচবিহারের রাস উৎসব ও রাসমেলা : এক ঐতিহ্যবাহী অধ্যায়  পার্থ সারথি চক্রবর্তী  কথায় বলে বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। রাজার শহর কোচবিহারের ক্ষেত্রে সংখ্যাটা আরো অনেক বেশি। দুর্গাপূজা আর দীপাবলির মতো দু'দুটো বিরাট মাপের উৎসবের রেশ কাটতে না কাটতেই, এ শহর ভাসে রাস উৎসবের উন্মাদনায়। মদনমোহন ঠাকুর কোচবিহারের প্রাণের ঠাকুর। তাঁকে নিয়ে সবার আবেগ আর শ্রদ্ধা ও ভালবাসা এখানে বাঁধনছাড়া। এক অপূর্ব মিলনোৎসবের চেহারা নেওয়া এই উৎসব ঐতিহ্যবাহী ও ঐতিহাসিক। জন, মত, সম্প্রদায়ের উর্ধে এই উৎসবের গ্রহণযোগ্যতা। সময়ের কষ্টি পাথরে পরীক্ষিত! এক প্রাণের উৎসব, যা বহুদিন ধরেই গোটা উত্তরবঙ্গের সর্ববৃহৎ উৎসবে পর্যবসিত।কোচবিহারের এই রাস উৎসবকে কেন্দ্র করে যে মেলা হয় তাও সময়ের হাত ধরে অনেক বদলে গেছে। এসেছে আধুনিকতার ছোঁয়া! শৈশবে বাবার হাত ধরে যে মেলা দেখেছি তা চরিত্র ও আকৃতি দু'দিক থেকেই বদলে গেছে। গত পঁচিশ বছর ধরে খুব কাছে থেকে এই উৎসব ও মেলা দেখা, অনুভব করার সুযোগ হয়েছে। যা দিনদিন অভিজ্ঞতা ও প্রাপ্তির ঝুলিকে সমৃদ্ধ করে গেছে প্রতি ক্ষেত্রেই।  খুব সংক্ষেপে এই উৎসবের ইতিহাস না জানাটা কিন্তু অবিচারই ...

মুদ্রিত নবপ্রভাত বইমেলা 2024 সংখ্যার জন্য লেখা-আহ্বান-বিজ্ঞপ্তি

লেখা-আহ্বান-বিজ্ঞপ্তি (লেখক ও সম্পাদকীয় দপ্তরের কথোপকথন আকারে) --কী পত্রিকা? --নবপ্রভাত। --মুদ্রিত না অনলাইন? --মুদ্রিত। --কোন সংখ্যা হবে এটা? --বইমেলা 2024। --কোন কোন ধরনের লেখা থাকবে? --প্রবন্ধ-নিবন্ধ, ছোটগল্প, অণুগল্প, কবিতা ও ছড়া। --বিশেষ কোন বিষয় আছে? --না। যে-কোন বিষয়েই লেখা যাবে। --শব্দ বা লাইন সংখ্যার কোন বাঁধন আছে? --না। নেই। তবে ছোট লেখা পাঠানো ভালো (যেমন, কবিতা 12-14 লাইনের মধ্যে, অণুগল্প কমবেশি 200/250শব্দে)। তাতে অনেককেই সুযোগ দেওয়া যায়। --ক'টি লেখা পাঠাতে হবে? --মনোনয়নের সুবিধার্থে একাধিক লেখা পাঠানো ভালো। --ফেসবুক বা অন্য কোন প্লাটফর্মে প্রকাশিত লেখা কি পাঠানো যাবে? --না। সম্পূর্ণ অপ্রকাশিত লেখা পাঠাতে হবে। --পত্রিকা কোন সময়ে প্রকাশিত হবে? --জানুয়ারি 2024-এর দ্বিতীয় সপ্তাহে। --লেখা পাঠানোর শেষতারিখ কত? -- 17 ডিসেম্বর 2023। --কীভাবে পাঠাতে হবে? --মেলবডিতে টাইপ বা পেস্ট করে পাঠাবেন। word ফাইলে পাঠানো যেতে পারে। --লেখার সঙ্গে কী কী দিতে হবে? --নিজের নাম, ঠিকানা এবং ফোন ও whatsapp নম্বর। (ছবি দেওয়ার দরকার নেই।) --বিশেষ সতর্কতা কিছু ? --১)মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখবেন '...

লেখা-আহ্বান-বিজ্ঞপ্তি : মুদ্রিত নবপ্রভাত বইমেলা ২০২৬

  লেখা-আহ্বান-বিজ্ঞপ্তি মুদ্রিত  নবপ্রভাত  বইমেলা ২০২৬ সংখ্যার জন্য  প্রবন্ধ-নিবন্ধ, মুক্তগদ্য, রম্যরচনা, ছোটগল্প, অণুগল্প, কবিতা ও ছড়া পাঠান।  যে-কোন বিষয়েই লেখা যাবে।  শব্দ বা লাইন সংখ্যার কড়াকড়ি বাঁধন  নেই। তবে ছোট লেখা পাঠালে  অনেককেই সুযোগ দেওয়া যায়।  যেমন, কবিতা/ছড়া ১২-১৬ লাইনের মধ্যে, অণুগল্প/মুক্তগদ্য কমবেশি ৩০০/৩৫০শব্দে, গল্প/রম্যরচনা ৮০০-৯০০ শব্দে, প্রবন্ধ/নিবন্ধ ১৫০০-১৬০০ শব্দে হলে ভালো। তবে এ বাঁধন 'অবশ্যমান্য' নয়।  সম্পূর্ণ অপ্রকাশিত লেখা পাঠাতে হবে। মনোনয়নের সুবিধার্থে একাধিক লেখা পাঠানো ভালো। তবে একই মেলেই দেবেন। একজন ব্যক্তি একান্ত প্রয়োজন ছাড়া একাধিক মেল করবেন না।  লেখা  মেলবডিতে টাইপ বা পেস্ট করে পাঠাবেন। word ফাইলে পাঠানো যেতে পারে। লেখার সঙ্গে দেবেন  নিজের নাম, ঠিকানা এবং ফোন ও whatsapp নম্বর। (ছবি দেওয়ার দরকার নেই।) ১) মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখবেন 'মুদ্রিত নবপ্রভাত বইমেলা সংখ্যা ২০২৬-এর জন্য'।  ২) বানানের দিকে বিশেষ নজর দেবেন। ৩) যতিচিহ্নের আগে স্পেস না দিয়ে পরে দেবেন। ৪) বিশেষ কোন চিহ্ন (যেমন @ # ...

উৎসবের সৌন্দর্য: সেকালে ও একালে।। সৌরভ পুরকাইত

  উৎসবের সৌন্দর্য:  সেকালে ও একালে   সৌরভ পুরকাইত বাংলার উৎসব বাংলার প্রাণ। প্রতিদিনের জীবনযাপনের মধ্যে যখন মন ক্লান্ত হয়ে পড়ে তখন তাকে বেঁচে থাকার রসদ যোগায় এই উৎসব। কথায় বলে 'বারো মাসে তেরো পার্বণ'।মন আনন্দই চায়।তাই তাকে সজীবতা দিতে,পরিবারের,সমাজের ভালো-মন্দের কথা মাথায় রেখে মানুষ নিজেই সৃষ্টি করে নিয়েছে নানাবিধ উৎসবগুলিকে। একেবারে প্রাচীন কাল থেকে আজ পর্যন্ত মানুষ কখনোই উৎসব বিমুখ ছিল না।উৎসবই তাকে ঘর থেকে বাইরে টেনে এনেছে,চিনতে শিখিয়েছে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার আনন্দকে। উৎসব আসলে প্রাণের সাথে প্রাণের যোগ, হৃদয়ের সাথে হৃদয়ের যোগ।রবীন্দ্রনাথ বলেছেন 'সত্য যেখানেই সুন্দর হয়ে প্রকাশ পায় সেইখানেই উৎসব'।হৃদয়ের সেই সুকোমল বৃত্তির জাগরণ যেন ফুটে ওঠা ফুলেরই মতো সত্য ও সুন্দর।এই জাগরণই উৎসব। তাই নানা কিছুর মধ্য দিয়ে,নানা উপলক্ষ্যে এই উৎসব প্রকাশ পায়। প্রাচীনকালে মানুষের হাতে না ছিল পসার, না ছিল পসরা।ছিল মনের আন্তরিকতা,মানুষকে কাছে টেনে নেবার ক্ষমতা।সেটাই ছিল উৎসবের সৌন্দর্য। তাই সেদিনের উৎসবে ক্ষুদ্র,তুচ্ছ উপকরণও প্রাণের উচ্ছ্বাসে মহৎ হয়ে উঠত।সেকালের উৎসবে লোক দেখানো ব্যাপার কিছু ...

কবিতা ।। বসন্তের কোকিল তুমি ।। বিচিত্র কুমার

বসন্তের কোকিল তুমি   বিচিত্র কুমার                      (০১) তোমার দু-আঁখির গহীন অরণ্যে একটা স্বপ্নের বহমান নদী রয়েছে, তারই রেশ ধরে আমি হেঁটে চলি অজানা বসন্তের পথে নীর উদ্দেশ্যে। সে চলার কোন শেষ সীমা নেই তাই আমার বিষণ্ণ একতারা সন্ন্যাস খুঁজে ফিরে , কবে তুমি বুঝবে অনুশ্রী মনের পর্দা খুলে একুশ বসন্ত তোমার রঙ ছিটিয়ে যাচ্ছে অচিনপুরে। এদিকে আমার দেহের প্রতিটি শিরা ধমনীতে প্রবাহিত হচ্ছে তোমার ভালোবাসার একটু উষ্ণতা পাবার জন্যে, শুধু অনুভবে তাণ্ডব উচ্ছাসিত হচ্ছে--- যেদিকে তাকাই --- ফুলে ফুলে ভ্রমর গুনগুনিয়ে উড়ে উড়ে পরে বসন্তের কোকিল গান গায় নব বসন্তে, তোমার দুই চোখে আমার একই ছায়া রয়ে যায় উতলা ভালোবাসার সীমান্তে।                 (০২)        এক রক্তাক্ত বসন্তের স্মৃতি কোন এক উতলা বসন্তের সকালে পুষ্পবনে ফুটেছিল একটি টকটকে লাল গোলাপ, তার সাথে হয়েছিলো দেখা প্রথম ফাগুনে হয়েছিল দুজনার এ জীবনের আলাপ।  তারপর প্র...

বছরের বাছাই

লেখা-আহ্বান-বিজ্ঞপ্তি : মুদ্রিত নবপ্রভাত বইমেলা ২০২৬

  লেখা-আহ্বান-বিজ্ঞপ্তি মুদ্রিত  নবপ্রভাত  বইমেলা ২০২৬ সংখ্যার জন্য  প্রবন্ধ-নিবন্ধ, মুক্তগদ্য, রম্যরচনা, ছোটগল্প, অণুগল্প, কবিতা ও ছড়া পাঠান।  যে-কোন বিষয়েই লেখা যাবে।  শব্দ বা লাইন সংখ্যার কড়াকড়ি বাঁধন  নেই। তবে ছোট লেখা পাঠালে  অনেককেই সুযোগ দেওয়া যায়।  যেমন, কবিতা/ছড়া ১২-১৬ লাইনের মধ্যে, অণুগল্প/মুক্তগদ্য কমবেশি ৩০০/৩৫০শব্দে, গল্প/রম্যরচনা ৮০০-৯০০ শব্দে, প্রবন্ধ/নিবন্ধ ১৫০০-১৬০০ শব্দে হলে ভালো। তবে এ বাঁধন 'অবশ্যমান্য' নয়।  সম্পূর্ণ অপ্রকাশিত লেখা পাঠাতে হবে। মনোনয়নের সুবিধার্থে একাধিক লেখা পাঠানো ভালো। তবে একই মেলেই দেবেন। একজন ব্যক্তি একান্ত প্রয়োজন ছাড়া একাধিক মেল করবেন না।  লেখা  মেলবডিতে টাইপ বা পেস্ট করে পাঠাবেন। word ফাইলে পাঠানো যেতে পারে। লেখার সঙ্গে দেবেন  নিজের নাম, ঠিকানা এবং ফোন ও whatsapp নম্বর। (ছবি দেওয়ার দরকার নেই।) ১) মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখবেন 'মুদ্রিত নবপ্রভাত বইমেলা সংখ্যা ২০২৬-এর জন্য'।  ২) বানানের দিকে বিশেষ নজর দেবেন। ৩) যতিচিহ্নের আগে স্পেস না দিয়ে পরে দেবেন। ৪) বিশেষ কোন চিহ্ন (যেমন @ # ...

সূচিপত্র ।। ৮৯তম সংখ্যা ।। শ্রাবণ ১৪৩২ জুলাই ২০২৫

সূচিপত্র   প্রবন্ধ ।। বাংলা যাত্রা ও নাট‍্যশিল্পে অবক্ষয় ।। মাখনলাল প্রধান প্রবন্ধ ।। শ্রমিকের অধিকার ।। চন্দন দাশগুপ্ত প্রবন্ধ ।। ভিনগ্রহীদের সন্ধানে ।। শ্যামল হুদাতী প্রবন্ধ ।। নারীমর্যাদা ও অধিকার ।। হিমাদ্রি শেখর দাস কবিতা ।। মশালের রং তুলি ।। তূণীর আচার্য কবিতা ।। জললিপি ।। রূপক চট্টোপাধ্যায় গুচ্ছকবিতা || শিশির আজম নিবন্ধ ।। পূনর্জন্ম ।। শংকর ব্রহ্ম মুক্তভাবনা ।। কোলাহল তো বারণ হলো ।। মানস কুমার সেনগুপ্ত গল্প ।। গানের হাড় ।। শুভজিৎ দত্তগুপ্ত গল্প ।। শিকড়ের খোঁজে ।। সমীর কুমার দত্ত সুপ্রভাত মেট্যার পাঁচটি কবিতা গ্রন্থ-আলোচনা ।। আবদুস সালামের কাব্যগ্রন্থ 'অলীক রঙের বিশ্বাস'।। তৈমুর খান অণুগল্প ।। হরিবোল বুড়ো ।। সুমিত মোদক রম্যরচনা ।। গোয়েন্দা গোলাপচন্দ আর প্রেমের ভুল ঠিকানা ।। রাজদীপ মজুমদার দুটি গল্প ।। মুহাম্মদ ফজলুল হক দুটি কবিতা ।। তীর্থঙ্কর সুমিত কবিতা ।। মেঘমুক্তি ।। বন্দনা পাত্র কবিতা ।। ব্যবচ্ছিন্ন শরীর ।। কৌশিক চক্রবর্ত্তী কবিতা ।। শমনচিহ্ন ।। দীপঙ্কর সরকার কবিতা ।। ভালোবাসার দাগ ।। জয়শ্রী ব্যানার্জী কবিতা ।। ফণীমনসা ।। বিবেকানন্দ নস্কর ছড়া ।। আজও যদি ।। বদ্রীন...

মুদ্রিত নবপ্রভাত বইমেলা ২০২৬ সংখ্যার চূড়ান্ত সূচিপত্র

  মুদ্রিত নবপ্রভাত বইমেলা ২০২৬ সংখ্যার চূড়ান্ত সূচিপত্র প্রকাশিত হল।     যত লেখা রাখা গেল, তার দ্বিগুণ রাখা গেল না। বাদ যাওয়া সব লেখার 'মান' খারাপ এমন নয়। কয়েকটি প্রবন্ধ এবং বেশ কিছু (১৫-১৭টা) ভালোলাগা গল্প শেষ পর্যন্ত রাখা যায়নি। আমাদের সামর্থ্যহীনতার কারণে।     তবুও শেষ পর্যন্ত দশ ফর্মার পত্রিকা হয়েছে। গত দুবছরের মতো A4 সাইজের পত্রিকা।    যাঁদের লেখা রাখা গেল না, তাঁরা লেখাগুলি অন্য জায়গায় পাঠাতে পারেন। অথবা, সম্মতি দিলে আমরা লেখাগুলি আমাদের অনলাইন নবপ্রভাতের জানুয়ারি ২০২৬ সংখ্যায় প্রকাশ করতে পারি।    পত্রিকাটি আগামী ৯-১৩ জানুয়ারি ২০২৬ পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি আয়োজিত কলকাতা লিটল ম্যাগাজিন মেলায় (রবীন্দ্র সদন - নন্দন চত্বরে) পাওয়া যাবে।     সকলকে ধন্যবাদ। শুভেচ্ছা।

কবিতাঃ চন্দন ঘোষ

এক টুকরো রুটি বস্তির রাস্তায় একটা বৃদ্ধ মানুষ সারাদিন বসে আছে। উত্তরে দেখে দক্ষিনে দেখে বহুদূর কেউ একটুকরো রুটি দিয়েযায় পাছে। চক্ষু কোটোরা গত শরীর মাস হীন, হাড় মাত্র। হয়তো স্বাধিনতা আন্দোলনের বিপ্লবী! হয়তো কলেজের আদর্শ ছাত্র। হয়তো ব্রিটিশ গোরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল  তার ছোট্টো ঝুঁপরির উপর। সে বাধা দিয়েছিল প্রতীবাদী হাতে। হয়তো পঙ্গু হয়েছিল সেই রাতে। আমি এক প্রশ্ন তুলেছিলাম, কেমনে হইল এ অবস্থা? বাক সরেনা মুখে সরকার কেন করেনা কোনো ব্যাবস্থা?? শরীর বস্ত্রহীন এই রাতে। নিম্নাঙ্গে একটা নোংগরা ধুতি। কী জানি কত দিন খায়নি? কত দিন দেখেনি এক টুকরো রুটি! রাজধানী শহরের আকাশটা দেখছে। দেখছে নেতা মন্ত্রী গন। হাইরে কেউতো তারে উঠিয়ে তোলেনি। দেখেনি কোনো কোমল মন। আজ ভারতবর্ষ উন্নতশীল রাষ্ট্র!   কথাটা অতীব মিথ্যা মাটি। এমন কতযে মানুষ ক্ষুদার্থ, দেখেনা এক টুকরো রুটি। নতুন মন্ত্রী, নতুন রাষ্ট্রপতি সবাই আসে সবার হয় আবর্তন। হাইরে পিছিয়ে পড়া মানুষ গুলো! তাদের হয়না কোনো পরিবর্তন। আজ 71 বছর আজাদ হয়েও  বোধহয় যে...

প্রবন্ধ ।। নারীমর্যাদা ও অধিকার ।। হিমাদ্রি শেখর দাস

নারীমর্যাদা ও অধিকার হিমাদ্রি শেখর দাস  নারীর মর্যাদা বলতে বোঝায় নারীর সম্মান, অধিকার, এবং তার ব্যক্তিগত স্বাধীনতা। এটি সমাজে নারীর অবস্থান এবং তার প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিকে নির্দেশ করে। নারীর প্রতি সম্মানজনক আচরণ করা হয় এবং তাদের অধিকার গুলি সুরক্ষিত থাকে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে এই শ্রেণি সংগ্রাম শুরু হয়েছিল অনেক আগে।  একদিকে শ্রেণী বৈষম্য অপরদিকে নারী পুরুষের বৈষম্য এই দুটি ছিল শ্রেণীবিভক্ত সমাজের অন্যতম দুটি মূল ভিত। নারীর অধিকারহীনতা বা দাসত্ব শুরু হয় পরিবার ও সম্পত্তির উদ্ভাবনের ফলে। বহু যুগ ধরে নারী সমাজকে পারিবারিক ও সামাজিক দাসত্বের বোঝা বহন করতে হয়েছে বিনা প্রতিবাদে। সভ্যতার ক্রম বিকাশের সাথে সাথে নিপীড়ন ও নির্যাতনের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে - দাস সমাজব্যবস্থা এবং সামন্ততান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় নারীরা পুরুষ ও পরিবারের অধীনতা স্বীকার করে নিতে বাধ্য হয়েছে। সামাজিক উৎপাদনের কাজে নারীদের বঞ্চিত রেখেই তাদের পরাধীন জীবন যাপনের মধ্যে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। নারীর অধিকারহীনতার বিরুদ্ধে সংগ্রামের সূচনা হয় ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লবের পরবর্তী সময়ে। নতুন করে নারীদের সামাজিক উৎপাদনের কাজে ...

গল্প ।। জাতিস্মর ।। আশীষ কুমার বিশ্বাস

    জাতিস্মর   আশীষ  কুমার   বিশ্বাস    গল্পের শুরুটা প্রায় ষাট বছর আগের কথা । যার নাম গৌতম, ডাক নাম ছিল বাবু ।  তার বছর তখন ছয়-সাত হবে । আমরা বা আমি তখন একটু বড় । এক সাথেই চলতো খেলা । গোল্লা ছুট, দাঁড়িয়া বান্দা, চোর-পুলিশ । যে মাঝে মাঝে খেলা থেকে বিরত থাকতো ; সে-ই জাতিস্মর । মাঠের পাশেই ছিল একটা খেঁজুর গাছ । তাতে হাত রেখে দূরের এক গ্রামের দিকে এক মনে তাঁকিয়ে থাকতো "বাবু" । গ্রামটির নাম "বিনয় পল্লী " । মাঝে বড়ো মাঠ । হাঁটা শুরু করলে তিরিশ - চল্লিশ মিনিট লাগবে । মাঝে জলে ভরপুর দেখে কখনো যাওয়া হয়নি । বাবু কে যখন বলতাম, ওপারে কি দেখছিস? ও বলতো, ওখানে আমার ছোট মা থাকে, দিদি থাকে, আমার ভুলু কুকুর থাকে । এ কথা আমাদের বিশ্বাস হতো না । আবার খেলায় ফিরে যেতাম, খেলতাম ।  কিন্তু ও বসে বসে , ওপারের গাছ পালা , বাড়ি ঘর দেখতো । কাছে গেলে বলতো , ওই যে সবুজ ,কচি কলাপাতা রঙের দালান বাড়ি, ওটাই আমাদের বাড়ি !  এই ভাবে মাস ছয়, বছর গড়াতে লাগলো । মনে প্রশ্ন জাগতে লাগলো, এ টা কি মন গড়া , বা বানিয়ে বানিয়ে বলছে? সত্যি প্রকাশ হোল এক দিন ।  সে বাড়িতে কিছু ...

প্রবন্ধ ।। বাংলা যাত্রা ও নাট‍্যশিল্পে অবক্ষয় ।। মাখনলাল প্রধান

বাংলা যাত্রা ও নাট‍্যশিল্পে অবক্ষয় মাখনলাল প্রধান বাংলার শিল্প-সংস্কৃতির জগতে যাত্রা শিল্প তথা নাট‍্যশিল্পে মড়ক নেমে এসেছে । যাত্রা শিল্পের মড়কে শুধু কোভিড নয় তার বহুপূর্ব থেকেই অর্থনৈতিক বিপর্যয় , শিক্ষাক্ষেত্রে বন্ধ‍্যাত্ব এবং গ্ৰাম বাংলার পটপরিবর্তন শেষ পেরেক ঠুকে দিয়েছে। যাত্রা-শিল্পের লীলাভূমি ছিল গ্ৰাম বাংলা। গ্ৰামে প্রচুর যাত্রাপালা হত নানা উৎসবকে কেন্দ্র করে । জমিদারি ব‍্যবস্থা লুপ্ত হওয়ার পর গ্ৰামীণ মানুষের উদ‍্যোগে শীতলা পূজা,  কালীপূজা, দুর্গাপূজা, কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা, চড়ক ইত‍্যাদিকে উপলক্ষ‍্য করে যাত্রাপালার আয়োজন না হলে কেমন যেন ম‍্যাড়ম‍্যাড়ে লাগতো। সেই সঙ্গে কলকাতার বড়বড় কোম্পানির যাত্রাপালা ঘটা করে, টিকিট সেল করে হত মাঠে। খুব বড় মাপের খেলার মাঠ যেখানে ছিল না সেখানে ধানের মাঠ নেওয়া হত ‌। ত্রিশ-চল্লিশ হাজার মানুষ দেখতে আসত। স্পেশাল বাস পাঠাত  আয়োজক কর্তৃপক্ষ। বিনা ভাড়ায় বাসে যাতায়াত করত যাত্রার দর্শকেরা। কিন্তু বিকল্প ধানচাষ শুরু হলে জমিগুলো সময় মতো ফাঁকা পাওয়া গেল না । প্রথম দিকে ব‍্যাপকহারে ধান শুরু না হওয়ায় খুব একটা অসুবিধা হত না। বহুক্ষেত্রে  ধান কা...

ছোটগল্প ।। নীলিমার আত্মজাগরণ ।। পরেশ চন্দ্র মাহাত

নীলিমার আত্মজাগরণ পরেশ চন্দ্র মাহাত নীলিমা মাহাত, বয়স পঁচিশ প্লাস —তার বাবা মায়ের পঞ্চম তথা শেষ সন্তান। দুই দাদা —বড়দাদা শঙ্কর ও ছোটদাদা বিজয়। বড় দাদা শঙ্কর আর দুই দিদি তাদের কিন্তু বিয়ে হয়ে গেছে। একমাত্র নীলিমা আপাতত স্বামীর কোমল হাতের স্পর্শ ও সহানুভূতি থেকে বঞ্চিত এবং আদৌ কবে অথবা সেই সৌভাগ্য আসবে সেটা ঈশ্বরের নিকটই একমাত্র জ্ঞাত। সেই সঙ্গে দুবছরের সিনিয়র ছোটদাদা বিজয়েরও নীলিমার মতো অবস্থা। তারও জীবনসঙ্গিনী জুটেনি। মোট সাতজন সদস্য নিয়ে গঠিত সংসার নীলিমাদের পরিবার। মধ্যবিত্ত পরিবার —মধ্যবিত্ত পরিবার না বলে যদি নিম্নবিত্ত বলা হয় তবুও কোনো অত্যুক্তি করা হয় না। বাবার প্রত্যেকদিনের আয়ের উপর ভিত্তি করেই চলে সংসার। এই কঠোর এবং কঠিন পরিস্থিতিতেও নীলিমার মা শ্রীমতী মেনকা‚ সংসার সামলে তার ছেলেমেয়েদের পড়াশুনার প্রতি যথেষ্ট তৎপর ও সহানুভূতিশীল। তাদের পড়াশুনায় কোনো খামতি রাখেননি। যথা সময়ে তাদেরকে বিদ্যালয়ের মুখ দেখিয়েছে – টিউশনের বন্দোবস্ত করেছে। তাদের জীবন যাতে সুখকর হয় সেটাই প্রতিদিন ভগবানের কাছে প্রার্থনা করেছে। পাঁচ-পাঁচটি ছেলেমেয়ের মধ্যে সবাইকে উচ্চশিক্ষিত করে তোলা একপ...

প্রচ্ছদ ও সূচিপত্র ।। ৯৮তম সংখ্যা ।। বৈশাখ ১৪৩৩ এপ্রিল ২০২৬

  শুভ নববর্ষ ১৪৩৩ নবপ্রভাতের পক্ষ থেকে সকলকে জানাই শুভ বাংলা নববর্ষের হার্দিক শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধা।  সকলের মঙ্গল হোক। পারস্পরিক সৌহার্দ্যে নন্দিত হোক জীবন। বাংলা নববর্ষকেন্দ্রিক লেখাগুচ্ছ এই সংখ্যায় রইল। অন্যান্য লেখা পরে প্রকাশিত হবে। —নিরাশাহরণ নস্কর, সম্পাদক, নবপ্রভাত।   সূচিপত্র পহেলা বৈশাখ : অদ্বিতীয় বাঙালির সর্বজনীন উৎসব ।। অলোক আচার্য বোশেখের ঘুড়ি ।। শাহ মতিন টিপু পয়লা বৈশাখ : বাঙালির প্রাণের উৎসব ।। উৎপল সরকার মাটি, বঁড়শি ও রক্তের আখ্যান ।। দিব্যেন্দু ঘোষ হালখাতা — বাঙালিয়ানা ।। শ্যামল হুদাতী বাংলা নববর্ষ : বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের প্রতীক ।। তপন মাইতি বাংলা পঞ্জিকার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ।। তুষার ভট্টাচার্য হালখাতা ।। চন্দ্রমা মুখার্জী নববর্ষের গৌরচন্দ্রিকা ।। অভীক চন্দ্র নববর্ষের সেকাল একাল ।। মিতা ভৌমিক নববর্ষের নবতম আশা ।। সমীর কুমার দত্ত দুই আকাশ, এক নববর্ষ ।। রাজদীপ মজুমদার আমার সন্ন্যাস ।। অংশুদেব পয়লা থেকে একলা হওয়া ।। সুকান্ত ঘোষ পহেলা বৈশাখে আনন্দ নগরের স্মৃতি ।। সারাবান তহুরা মৌমিতা বাংলা নববর্ষ ।। পার্থপ্রতিম দত্ত স্মৃতির পাতায় পয়লা ।। দেবশ্রী চক্রবর...

প্রবন্ধ ।। ভিনগ্রহীদের সন্ধানে ।। শ্যামল হুদাতী

ভিনগ্রহীদের সন্ধানে  শ্যামল হুদাতী  ইতিহাসের শুরু থেকে বারবার মানুষকে একটা প্রশ্ন কুঁড়ে কুঁড়ে খায় – এই মহাবিশ্বে আমরা কি একা? পৃথিবীর মতো আরও গ্রহ রয়েছে, যেখানে মানুষের মতো বুদ্ধিমান প্রাণীরা বাস করে – এই সম্ভাবনা বরাবর মানুষকে মুগ্ধ করেছে। আমাদের প্রত্যেকের জীবনের কখনও না কখনও এই ভাবনা এসেছে। দীর্ঘ কয়েক দশকের গবেষণার পরও, এই বিষয়ে কোনও নিশ্চয়তা দিতে পারেননি বিজ্ঞানীরা। জেমস ওয়েব মহাকাশ টেলিস্কোপ, বহু দূরের এমন কিছু গ্রহের সন্ধান দিয়েছে, যেগুলিতে প্রাণ থাকতেই পারে। তবে, নিশ্চিত কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে, আমেরিকার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সাম্প্রতিক গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, ভিনগ্রহীদের খুঁজতে বহু দূরে যাওয়ার কোনও দরকার নেই। তারা এই পৃথিবীতেই মানুষের ছদ্মবেশে মানুষের মধ্যেই বসবাস করতে পারে। আমরা ভিনগ্রহীদের যেমন কল্পনা করি, এরা তার থেকে আলাদা। এরা অনেকটাই, দেবদূতদের মতো। মানব জগতের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক প্রযুক্তিগত নয়, বরং জাদুকরি। মহাকাশে সৌরজগতের গ্রহ পৃথিবী ছাড়া অন্য কোথায় প্রাণ রয়েছে কি না তা নিয়ে চলছে বিস্তর গবেষণা। একই সঙ্গে পৃথিবী ছাড়া অন্য কোনো গ্রহে মানুষ বসবাস ক...

মাসের বাছাই

প্রচ্ছদ ও সূচিপত্র ।। ৯৯তম সংখ্যা ।। জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ মে ২০২৬

লেখা-আহবান-বিজ্ঞপ্তি   আগামী মাসে প্রকাশিত হবে নবপ্রভাত ওয়েব ম্যাগাজিনের ১০০তম সংখ্যা ।   কোনো বিশেষ বিষয় থাকছে না। শব্দ বা লাইন সংখ্যার কোনও বাঁধন নেই।     বিভাগ-১: প্রবন্ধ-নিবন্ধ-ফিচার, বিভাগ-২: সব ধরনের গল্প, বিভাগ-৩: ভ্রমণকাহিনি-মুক্তগদ্য-রম্যরচনা, বিভাগ-৪: কবিতাগুচ্ছ (ন্যূনতম ৩টি)-ছড়াগুচ্ছ (ন্যূনতম ৩টি) পাঠাতে পারেন।   নির্বাচিত লেখাগুলি (সর্বোচ্চ ৯৯টা) প্রকাশিত হবে এবং প্রতি বিভাগ থেকে একটি করে সেরা লেখার লেখককে মানপত্র ও নবপ্রভাত প্রকাশনীর বই উপহার দিয়ে সম্মান জানানো হবে। সম্ভব হলে সংখ্যাটির মুদ্রিত সংস্করণও হতে পারে। সুতরাং মানসম্মত ভালো লেখা পাঠান।   e-mail: nabapravatblog@gmail.com   পাঠানোর শেষদিন : 12/06/2026 পত্রিকা প্রকাশ : ১লা আষাঢ় ১৪৩৩ ( 15/06/2026) সূচিপত্র দেবাশিস সাহার গুচ্ছকবিতা ভবরোগবৈদ্যম ।। শ‍্যামাপ্রসাদ সরকার ছড়াকারের পরিচয়-সঙ্কট ।। জাহাঙ্গীর আলম জাহান Gen Z-এর প্রভাব : সমাজতাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ।। শিবশিস  মুখার্জী আধুনিক সমাজ ও সক্রেটিস: প্রশ্নের ভেতর দিয়ে মানুষের যাত...

কবিতাঃ চন্দন ঘোষ

এক টুকরো রুটি বস্তির রাস্তায় একটা বৃদ্ধ মানুষ সারাদিন বসে আছে। উত্তরে দেখে দক্ষিনে দেখে বহুদূর কেউ একটুকরো রুটি দিয়েযায় পাছে। চক্ষু কোটোরা গত শরীর মাস হীন, হাড় মাত্র। হয়তো স্বাধিনতা আন্দোলনের বিপ্লবী! হয়তো কলেজের আদর্শ ছাত্র। হয়তো ব্রিটিশ গোরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল  তার ছোট্টো ঝুঁপরির উপর। সে বাধা দিয়েছিল প্রতীবাদী হাতে। হয়তো পঙ্গু হয়েছিল সেই রাতে। আমি এক প্রশ্ন তুলেছিলাম, কেমনে হইল এ অবস্থা? বাক সরেনা মুখে সরকার কেন করেনা কোনো ব্যাবস্থা?? শরীর বস্ত্রহীন এই রাতে। নিম্নাঙ্গে একটা নোংগরা ধুতি। কী জানি কত দিন খায়নি? কত দিন দেখেনি এক টুকরো রুটি! রাজধানী শহরের আকাশটা দেখছে। দেখছে নেতা মন্ত্রী গন। হাইরে কেউতো তারে উঠিয়ে তোলেনি। দেখেনি কোনো কোমল মন। আজ ভারতবর্ষ উন্নতশীল রাষ্ট্র!   কথাটা অতীব মিথ্যা মাটি। এমন কতযে মানুষ ক্ষুদার্থ, দেখেনা এক টুকরো রুটি। নতুন মন্ত্রী, নতুন রাষ্ট্রপতি সবাই আসে সবার হয় আবর্তন। হাইরে পিছিয়ে পড়া মানুষ গুলো! তাদের হয়না কোনো পরিবর্তন। আজ 71 বছর আজাদ হয়েও  বোধহয় যে...

ছোটগল্প ।। নীলিমার আত্মজাগরণ ।। পরেশ চন্দ্র মাহাত

নীলিমার আত্মজাগরণ পরেশ চন্দ্র মাহাত নীলিমা মাহাত, বয়স পঁচিশ প্লাস —তার বাবা মায়ের পঞ্চম তথা শেষ সন্তান। দুই দাদা —বড়দাদা শঙ্কর ও ছোটদাদা বিজয়। বড় দাদা শঙ্কর আর দুই দিদি তাদের কিন্তু বিয়ে হয়ে গেছে। একমাত্র নীলিমা আপাতত স্বামীর কোমল হাতের স্পর্শ ও সহানুভূতি থেকে বঞ্চিত এবং আদৌ কবে অথবা সেই সৌভাগ্য আসবে সেটা ঈশ্বরের নিকটই একমাত্র জ্ঞাত। সেই সঙ্গে দুবছরের সিনিয়র ছোটদাদা বিজয়েরও নীলিমার মতো অবস্থা। তারও জীবনসঙ্গিনী জুটেনি। মোট সাতজন সদস্য নিয়ে গঠিত সংসার নীলিমাদের পরিবার। মধ্যবিত্ত পরিবার —মধ্যবিত্ত পরিবার না বলে যদি নিম্নবিত্ত বলা হয় তবুও কোনো অত্যুক্তি করা হয় না। বাবার প্রত্যেকদিনের আয়ের উপর ভিত্তি করেই চলে সংসার। এই কঠোর এবং কঠিন পরিস্থিতিতেও নীলিমার মা শ্রীমতী মেনকা‚ সংসার সামলে তার ছেলেমেয়েদের পড়াশুনার প্রতি যথেষ্ট তৎপর ও সহানুভূতিশীল। তাদের পড়াশুনায় কোনো খামতি রাখেননি। যথা সময়ে তাদেরকে বিদ্যালয়ের মুখ দেখিয়েছে – টিউশনের বন্দোবস্ত করেছে। তাদের জীবন যাতে সুখকর হয় সেটাই প্রতিদিন ভগবানের কাছে প্রার্থনা করেছে। পাঁচ-পাঁচটি ছেলেমেয়ের মধ্যে সবাইকে উচ্চশিক্ষিত করে তোলা একপ...

প্রচ্ছদ ও সূচিপত্র ।। ৯৮তম সংখ্যা ।। বৈশাখ ১৪৩৩ এপ্রিল ২০২৬

  শুভ নববর্ষ ১৪৩৩ নবপ্রভাতের পক্ষ থেকে সকলকে জানাই শুভ বাংলা নববর্ষের হার্দিক শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধা।  সকলের মঙ্গল হোক। পারস্পরিক সৌহার্দ্যে নন্দিত হোক জীবন। বাংলা নববর্ষকেন্দ্রিক লেখাগুচ্ছ এই সংখ্যায় রইল। অন্যান্য লেখা পরে প্রকাশিত হবে। —নিরাশাহরণ নস্কর, সম্পাদক, নবপ্রভাত।   সূচিপত্র পহেলা বৈশাখ : অদ্বিতীয় বাঙালির সর্বজনীন উৎসব ।। অলোক আচার্য বোশেখের ঘুড়ি ।। শাহ মতিন টিপু পয়লা বৈশাখ : বাঙালির প্রাণের উৎসব ।। উৎপল সরকার মাটি, বঁড়শি ও রক্তের আখ্যান ।। দিব্যেন্দু ঘোষ হালখাতা — বাঙালিয়ানা ।। শ্যামল হুদাতী বাংলা নববর্ষ : বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের প্রতীক ।। তপন মাইতি বাংলা পঞ্জিকার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ।। তুষার ভট্টাচার্য হালখাতা ।। চন্দ্রমা মুখার্জী নববর্ষের গৌরচন্দ্রিকা ।। অভীক চন্দ্র নববর্ষের সেকাল একাল ।। মিতা ভৌমিক নববর্ষের নবতম আশা ।। সমীর কুমার দত্ত দুই আকাশ, এক নববর্ষ ।। রাজদীপ মজুমদার আমার সন্ন্যাস ।। অংশুদেব পয়লা থেকে একলা হওয়া ।। সুকান্ত ঘোষ পহেলা বৈশাখে আনন্দ নগরের স্মৃতি ।। সারাবান তহুরা মৌমিতা বাংলা নববর্ষ ।। পার্থপ্রতিম দত্ত স্মৃতির পাতায় পয়লা ।। দেবশ্রী চক্রবর...

উন্মুক্ত পাগলামি ।। আশরাফুল মণ্ডল

উন্মুক্ত পাগলামি আশরাফুল মণ্ডল আহা, অপরূপ নিজস্বতার দাহ! কুঁকড়ে যায় আবহমান, সজনে পাতার বোঁটায়! ভাপওঠা ভাতের কাছে মাছি সত্তায় কী নিপুণ! তবুও ঘোর লাগা বসন্তের ডাক, হাঁকে! খেদিয়ে দেয় পা দোলানো প্রস্তাব, ওই ধুনুরি চোখ! রাংতায় মোড়া ডাকের সাজ, দে দোল দোল! হুইসেল বাজিয়ে কে রুখে দ্যায় সেই নাকছাবির রুদালি কাঁপন! খালবিল ছেঁচে পাঁচসিকের  মানত কুড়িয়ে আনে, বাংলা বাজার। ঠ্যাং নাচানো সুরে চোখ মারছে, দ্যাখো ভ্যানতারা! মুখ খোলা মানেই পাঁজরের স্রোত ভাবা যেন উগরানো টালমাটাল! ঢিল মারা প্রশ্নের রোয়াকে বক্রচোখে যেন মেধাবী কবিতা! মুছে দিও তবে লাজুক গুপ্ত রোগ, দিনরাত্রি! ভালো থেকো তোমরা বাছাধন, রং মাস সে আর কতদিন... ================    ASRAFUL MANDAL Chandidas Avenue, B-zone, Durgapur, Paschim Bardhaman, Pin - 713205,  

গল্প ।। জাতিস্মর ।। আশীষ কুমার বিশ্বাস

    জাতিস্মর   আশীষ  কুমার   বিশ্বাস    গল্পের শুরুটা প্রায় ষাট বছর আগের কথা । যার নাম গৌতম, ডাক নাম ছিল বাবু ।  তার বছর তখন ছয়-সাত হবে । আমরা বা আমি তখন একটু বড় । এক সাথেই চলতো খেলা । গোল্লা ছুট, দাঁড়িয়া বান্দা, চোর-পুলিশ । যে মাঝে মাঝে খেলা থেকে বিরত থাকতো ; সে-ই জাতিস্মর । মাঠের পাশেই ছিল একটা খেঁজুর গাছ । তাতে হাত রেখে দূরের এক গ্রামের দিকে এক মনে তাঁকিয়ে থাকতো "বাবু" । গ্রামটির নাম "বিনয় পল্লী " । মাঝে বড়ো মাঠ । হাঁটা শুরু করলে তিরিশ - চল্লিশ মিনিট লাগবে । মাঝে জলে ভরপুর দেখে কখনো যাওয়া হয়নি । বাবু কে যখন বলতাম, ওপারে কি দেখছিস? ও বলতো, ওখানে আমার ছোট মা থাকে, দিদি থাকে, আমার ভুলু কুকুর থাকে । এ কথা আমাদের বিশ্বাস হতো না । আবার খেলায় ফিরে যেতাম, খেলতাম ।  কিন্তু ও বসে বসে , ওপারের গাছ পালা , বাড়ি ঘর দেখতো । কাছে গেলে বলতো , ওই যে সবুজ ,কচি কলাপাতা রঙের দালান বাড়ি, ওটাই আমাদের বাড়ি !  এই ভাবে মাস ছয়, বছর গড়াতে লাগলো । মনে প্রশ্ন জাগতে লাগলো, এ টা কি মন গড়া , বা বানিয়ে বানিয়ে বলছে? সত্যি প্রকাশ হোল এক দিন ।  সে বাড়িতে কিছু ...

যুদ্ধের দামামা ।। সুবিনয় হালদার

যুদ্ধের দামামা সুবিনয় হালদার যুদ্ধের দামামা ওই দেখো বেজেছে সাইরেনের শব্দ শুনতে কি পাচ্ছো ? লাল বাতি নীল বাতি ছোটাছুটি করছে , সুস্থ অসুস্থ নয় তো বা অন্য কিছু যাচ্ছে ফিসফাস চুপচাপ কানাঘুষো কত কথা হচ্ছে ; যুদ্ধের দামামা ওই দেখো বেজেছে । ঢং ঢং আওয়াজে- রাত জাগে মানুষে- (২) চারিদিকে স্তব্ধ ঘরে ঘরে নিঃশব্দ ভেসে আসে কোলাহল- কারা করে চিৎকার- ? ধুমধাম গর্জন মনে হয় কম্পন আলোর রোশনাই সব হলো পুড়ে ছাই ; তাই শুনি বলতে বারুদে লাগাও তবে সলতে ভনিতা অনেক এবার হয়েছে লাশের পাহাড় দেখি জমেছে যুদ্ধের দামামা ওই দেখো বেজেছে । শুধু দেখি হায়- ভয়ের চাপে সরে যায় জয় কে ধরবে হাল- কে-বা দেবে চাল- ? মাঝি বুঝি নাইরে ; কল্কির কেল্লা শুরু হলো হল্লা কোথা যাবে জনগণ এ-যে বুঝি মহারণ অনেক হয়েছে দ্বন্দ্ব সোজা করো মেরুদন্ড । নাই তবে নিস্তার হও সবে সোচ্চার চাপ দাও দন্ডে ভর সাথে ভার তবে সরবে বসে বসে সবে মিলে সময় গুনছে ; তাঁর নাম করছে তাঁর বাণী পড়ছে ! যুদ্ধের দামামা ওই- দেখো- বেজেছে- । ___________________ সুবিনয় হালদার পিতা - ঈশ্বর প্রদীপ হালদার গ্রাম - দৌলতপুর পোস্ট - দিঘীরপাড় বাজার থানা - ফলতা জেলা - দক্ষিণ ২৪ পরগ...

বাংলা নববর্ষ : বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের প্রতীক ।। তপন মাইতি

বাংলা নববর্ষ : বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের প্রতীক তপন মাইতি বাংলা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ শুধু একটি দিন নয়; এটি বাঙালির সামষ্টিক স্মৃতি, কৃষিনির্ভর সভ্যতার চিহ্ন, অর্থনৈতিক বিন্যাসের সূচনা এবং সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের প্রতীক। সময়কে মানুষ ক্যালেন্ডারে বন্দি করলেও, নববর্ষ আসলে মানসিক পুনর্জন্মের এক সামাজিক অনুষঙ্গ। বছরের প্রথম দিনকে কেন্দ্র করে বাঙালি নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলার সংকল্প করে। পুরোনো হিসাব বন্ধ করে নতুন খাতা খোলা—এই ধারণা বাঙালি জীবনদর্শনের গভীরে প্রোথিত। নববর্ষ মানে শুধুই উৎসব নয়; এটি স্মৃতি, শ্রম, আশা ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের একটি সামাজিক চুক্তি। বাংলা নববর্ষ তাই একদিকে কৃষিজীবনের ঋতুচক্রের সাথে যুক্ত, অন্যদিকে নাগরিক সংস্কৃতির আধুনিক উৎসবে রূপান্তরিত এক ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা। বাংলা সনের উৎপত্তি নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও সাধারণভাবে মনে করা হয় মুঘল সম্রাট আকবর রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে সৌরভিত্তিক বাংলা সাল চালু করেন। কৃষিভিত্তিক সমাজে ফসল কাটার সময় অনুযায়ী কর আদায় প্রয়োজন ছিল।হিজরি চান্দ্র সন কৃষির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।ফলে সৌরবর্ষভিত্তিক বাংলা সনের প্রবর...

কবিতা ।। মনোজকুমার রায়

জল সিঁড়ি চেক বইয়ের পাতা ফুরিয়ে যেতে থাকে -- ঝরে পড়ে বৃদ্ধ গাছটির পত্রমুকুল কাঁচা গন্ধ বেয়ে চলে সময়ের স্রোতে  সারা ভোর জেগে থাকি ঘুমের টলে তাড়া দেয় একগ্রাস অবিশ্বাসী বায়ু দিন ফুরনো লাল সূর্যের টানে নেমে আসে পাড় ছোঁয়া জল সিঁড়ি ================= মনোজকুমার রায় দঃ ঝাড় আলতা ডাউকিমারী, ধূপগুড়ি জলপাইগুড়ি -৭৩৫২১০ মো ৭৭৯৭৯৩৭৫৬৬

চিরকুটের কবিতা

নতুন পৃথিবী আজ সকালে রোদ্দুর নামুক ভেজা বর্ষার মতো গা ধুয়ে কিছুটা পবিত্র হবো যত জীর্ণ মলিন দ্বেষ বিলীন হোক সব সময়ের তটে গা ভাসিয়ে কিছুটা বিলাসী হবো যা ছিল অতীত যা ছিল কষ্ট সবকিছু ভুলে নবীনে ব্রতী হবো আসুক ধেয়ে সতেজ হাওয়া দূর হোক যত কুণ্ঠা ব্যথা পুরানো যত বিবাদ ভুলে ভালোবাসার আবার বেড়া দেবো কিছুটা আশাবাদী কিছুটা কর্মঠ কিছুটা জেদি কিছুটা শপথ আসুক ছুঁয়ে বাঁচার আলো হাতে হাত রেখেই বিশ্বাসের ঘরে আবার নতুন দীপ জ্বালাবো