দর্শন
নিরাশাহরণ নস্কর
সালটা ১৯৯৪। আমি আর আমার সহপাঠী অন্তরঙ্গ বন্ধু বিশ্বনাথ এসেছি পার্ট ওয়ানের পরীক্ষা দিতে কাকদ্বীপের সুন্দরবন মহাবিদ্যালয়ে। আমাদের বাড়ি থেকে কাকদ্বীপ অনেক দূর। যাতায়াত অসম্ভব। আর রাস্তাঘাটের অনিশ্চয়তার কথা ভেবে ওর বাবা আর আমার বাবা এসেছিলেন একটা অস্থায়ী আস্তানার সন্ধানে। মিলেও গিয়েছিল। একটা মেসের কিছু সিট খালি ছিল। সেখানেই মাসখানেকের জন্য আমাদের অস্থায়ী আস্তানা। থাকা, খাওয়া, পড়া আর পরীক্ষা দেওয়া। এক একটা পরীক্ষার ফাঁকে বেশ কিছুদিন ছুটি। প্রতিদিন ভোরে আর সন্ধ্যায় অনতিদুরের কোন একটা মন্দির থেকে ভেসে আসত ভক্তিগীতি সুর। একদিন ওকে বললাম, চল, একবার একটু ঘুরে আসি। আশপাশটাও দেখা হবে আর মন্দিরটাতে একবার ঘুরে আসব। প্রতিদিন এত সুন্দর সুন্দর ভক্তিগীতির সুর শুনি, মন্দিরটা নিশ্চয়ই সুন্দর বা মূর্তিটাও সুন্দর হবে।
সন্ধ্যার কাছাকাছি একদিন বেরিয়ে পড়লাম। গ্রাম্য পরিবেশের মাধুর্যের মধ্যে সুর লক্ষ্য করে হেঁটে চলেছিলাম দুজন। ৫-৭ মিনিট হাঁটতেই চলে এলাম মন্দিরের কাছাকাছি। আহামরি বিরাট কিছু না হলেও খুব ছোট নয় মন্দিরটা। সৌন্দর্যও বেশ। রাস্তার পাশেই সিংহ দরজা। ভিতরে মন্দিরে অঙ্গনটা অনেক প্রশস্ত। বড় গেটের কাছে একটু ইতস্তত করে তেমন কাউকে না দেখে দুজনে আস্তে আস্তে পা বাড়ালাম অঙ্গনের দিকে। মূর্তির সামনে যাওয়ার আগেই এক অদ্ভুত দৃশ্য।
মন্দিরের পুরোহিত – হাটু পর্যন্ত ধুতি, এলো গা, গলায় পইতে – একটা কম বয়সী মেয়েকে চুলের মুঠি ধরে টানতে টানতে মন্দিরের ভেতর থেকে বারান্দা দিয়ে হিড়হিড় করে টানতে টানতে উঠোনে আনছে। আরেক হাতে ঝাঁটা। – বল, কেন তুই ভেতরটা ভালো করে মুছিসনি? কেন ঠাকুরের এঁটো বাসনকোসনগুলো ধুসনি? কেন ওবেলা কাজে আসিসনি?
তীব্র কান্না আর আকুতিতে মেয়েটার কথাগুলো ভালো করে শোনা যাচ্ছে না। –সব ভালো কোরে, করে দেবো ঠাকুর... আমার ছেলেটার ধুম জ্বর... তাই আসতে পারিনি ওবেলা... আমি সব করে দেবো... ঠিক ঠিক করে দেবো... মেয়েটার কথাগুলো ছাপিয়ে উঠছে তার কান্না।
দুজন আর দাঁড়াতে পারি না। নিঃশব্দে ফেরার পথ ধরি। ও অস্ফুটে একবার বলে, কিরে দর্শন হলো! তারপর আর কারো মুখে কথা নেই। সন্ধ্যার অন্ধকার মুখে নিয়ে ফিরছে দুজন।
মন্দির থেকে তখনও ভেসে আসছে– আমার চেতনা চৈতন্য করে দে মা...
.........................................

Comments
Post a Comment