যখন পুজো আসত
অতনুর জন্ম কলকাতার এক প্রান্তের ছোট্ট এক উদ্বাস্তু-পাড়ায়। দেশভাগের পর পূর্ববঙ্গ থেকে আসা কিছু মানুষ নিজেদের হাতের কাজ আর স্বপ্ন নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন এই পাড়া। কারও ছিল কামারশালা, কারও প্রতিমা তৈরির কারখানা। দুর্গাপুজো যেন এখানকার মানুষের জীবনযাত্রারই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল।
তবে ওদের পাড়ার পুজোটা ছিল একটু অন্যরকম। স্কুলে বন্ধুরা বলত, তাদের প্যান্ডেলের কাজ নাকি এক মাস আগেই শুরু হয়ে গেছে, মহালয়ার পরই প্রতিমা এসে দাঁড়িয়েছে। অতনু তখন বাড়ি ফিরে দেখত, ওদের মাঠ এখনও ফাঁকা। পাড়ার দাদারা চাঁদা তুলতে ব্যস্ত—কারও মুখে দুশ্চিন্তা, কারও মুখে আশ্বাস, ‘কোনোমতে পুজোটা হলেই হলো।’
তারপর চতুর্থী, কখনও পঞ্চমীর দিন মাঠে বাঁশ পড়ত। সারাদিন কারিগরদের ঘ্যাঁচ-ঘোঁচ শব্দে মুখর থাকত চারদিক। ধীরে ধীরে তৈরি হতো সাদামাটা কাপড়ে মোড়া একটি প্যান্ডেল। কিন্তু সেই নতুন কাপড়ের গন্ধই যেন বলে দিত—মা আসছেন।
গভীর রাতে পাড়ারই প্রতিমা তৈরির কারখানা থেকে আসত ঠাকুর। ঘুমে চোখ জড়িয়ে এলেও অতনু জেগে থাকত। প্রতি বছর একই প্রতিমা, তবু পঞ্চমীর সেই প্রথম দর্শনের উত্তেজনা যেন কখনও কমত না। যত রাতই হোক, বাবার হাত ধরে প্যান্ডেলে গিয়ে প্রথমবার মাকে দেখার আনন্দটাই ছিল পুজোর আসল শুরু।
আজ বাবা নেই। প্রতিমা তৈরির সেই পুরোনো কারখানার জায়গায় উঠেছে বহুতল। পাড়ার পুজোও এখন অনেক বড় হয়েছে। আলো, থিম, স্পনসর—সবই এসেছে। প্রতিমাও আসে কুমোরটুলি থেকে।
সবকিছু যেন আজ আরও সুন্দর, আরও সমৃদ্ধ। তবু অতনুর মনে হয়, কোথাও যেন কিছু হারিয়ে গেছে। আজও নতুন কাপড়ের গন্ধ পেলেই তার মনে পড়ে সেই সাদামাটা প্যান্ডেল, বাবার হাত, আর পঞ্চমীর গভীর রাত।
কলকাতা
Comments
Post a Comment