সলিল চৌধুরীর গানের জগত : কিছু কথা
আবদুস সালাম
সলিল চৌধুরী বাংলা গানের জগতে যে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তিনি একাধারে সঙ্গীত পরিচালক, গীতিকার এবং সুরকার । বাংলা গানের ধারায় নতুন মাত্রা যোগ করেন যা আমাদের আপামর জনতা তাঁকে মনে রেখেছে। তাই ২০২৫ সালে এসে আমরা উপলব্ধি করি তিনি আজও কতটা প্রাসঙ্গিক।
সলিল চৌধুরীর জন্ম ১৯২৫ সালের ১৯ নভেম্বর আসামের রাজপুর সোনারপুর অঞ্চলের গাজীপুরে। তাঁর বাবা জ্ঞানেন্দ্রময় চৌধুরী ছিলেন আসামের লতাবাড়ি চা বাগানের ডাক্তার। তিনি আবার সঙ্গীতানুরাগীও বটে। গান সম্বন্ধে ধারণা তাঁর ভালোই ছিল।তাই তিনি বাবার কাছেই তাঁর সঙ্গীতের হাতেখড়ি নেন। উনার বাবা ও ছেলের সঙ্গীতের প্রতি ঝোঁক দেখে নিজেই তালিম দিতে শুরু করেন। পরবর্তীতে নিখিল চৌধুরীর কাছেও তিনি সঙ্গীতের তালিম গ্রহণ করেন।
যে গান গণমানুষের কথা বলে, যে গানে কণ্ঠ মেলায় দেশ-সমাজের সাধারণ মানুষ, যে গানে উঠে আসে নিগৃহীত, বঞ্চিত মানুষের প্রতিবাদের ভাষা; সেই গানের প্রবর্তন করেছিলেন তিনি। এর আগে তো এমন কথা কেউ বলেন নি। নিগৃহীত নিপীড়িত মানুষের কথা, তাদের অভাব অভিযোগের কথা গানের কথায় আনার সাহস দেখালেন। আর তাই তো তিনি হয়ে গেলেন সবার সলিল দা। আর হয়ে গেলেন নিজের মানুষ, মনের মানুষ,ঘরের মানুষ।তাই তাকে আমরা ভূষিত করলাম 'গণসঙ্গীত প্রণেতা' হিসেবে।
সলিল চৌধুরী যে সময় বাংলা গানের জগতে এলেন তখন বাংলা গানের ক্ষেত্রে এক যুগগসন্ধিক্ষণ। ইতিহাস তখন বদলাতে শুরু করেছে।রবীন্দ্রনাথ প্রয়াত হয়েছেন। কবি নজরুলের সৃষ্টি গেছে থেমে।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতায় তখন সারা পৃথিবী স্তম্ভিত। হিটলারের আগ্রাসনে পৃথিবীর শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষেরা এক বিরাট প্রশ্নচিহ্নর মুখোমুখি।ভারতবর্ষে চলছে 'ভারত ছাড়ো' আন্দোলন। এসময় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ভারতীয় গণনাট্য সংঘ। বাংলায় চলছে তখন ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। এমনই এক সময়ে সলিল চৌধুরী তাঁর সৃষ্টি সম্ভার নিয়ে এলেন। বলা বাহুল্য এলেন, দেখলেন, জয় করলেন। ধন্য ধন্য পড়ে গেলো চারিদিক।
স্বাধীনতা প্রাপ্তির ঠিক পরের বছরের কথা।সে সময় শ্রদ্ধেয় হেমন্ত মুখোপাধ্যায় থাকতেন ইন্দ্র রায় রোডে।গণনাট্য সংঘের তরুণ তুর্কী সলিল চৌধুরী এসেছেন তাঁর কাছে। প্রাথমিক আলাপের পর হেমন্তকে বেশ কয়েকটা গণনাট্য সংঘের গান শোনালেন সলিল বাবু । হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের পছন্দও হলো কিন্তু সেই গান রেকর্ড করতে পারা যাবে না বলে মন্তব্য করায় তিনি খানিকটা মুষড়ে পড়লেন বইকি।এ যেন ঝড়ের দাপটে বাসা ভেঙে যাওয়ার সামিল। হাল ছাড়লেন না। বিনম্র সহকারে বললেন আবার তিনি নতুন গান তৈরি করে আপনার কাছে আসবো। এমনই এক জেদ যেন চেপে বসেছে তার মাথায়।দৃঢ় প্রত্যয় মাথায় নিয়ে নতুন গানের সম্ভার নিয়ে আবার আসবো এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিদায় নিলেন। সঙ্গে আছেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়।সিঁড়ি দিয়ে নেমে রাস্তা অবধি চলে এসেছেন । হঠাৎ একটি অর্ধ সমাপ্ত গানের কথা হেমন্ত বাবুকে বললেন। আবার দুজনে ঘরে এলেন, বসলেন। প্রথম অংশের শুরুটা ছিলো এরকম,-'কোনও এক গাঁয়ের বধূর কথা তোমায় শোনাই শোনো'। গানটি শুনে চমকে উঠলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায় এমনভাবে গানের কথা লেখা যায়! সলিল চৌধুরীকে গানের শেষভাগটুকু লিখে আনতে বললেন হেমন্ত। সেদিন রাত্রেই সলিল চৌধুরী লিখলেন, 'ডাকিনী যোগিনী এল শত নাগিনী এল পিশাচেরা এল রে'….
দিন দুয়েকের মধ্যেই হেমন্তর হাতে পুরো গানটি এসে গেলো ' গাঁয়ের বধূ'। ১৯৪৯ সালে রেকর্ড করলেন হেমন্ত সেই গান।এরপর যেন বাংলা গানের সংজ্ঞাই বদলে গেলো। এরপর সলিল- হেমন্ত জুটি সঙ্গীতরসিক শ্রোতাদের উপহার দিলেন 'রানার',' পাল্কির গান',' অবাক পৃত্থিবী',' ঠিকানা'। ইত্যাদি ইত্যাদি।
এইসময় সলিল চৌধুরী আর একটি মনে রাখার মতো কাজ করলেন। রবীন্দ্রনাথের ' কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি। কালো তারে বলে গাঁয়ের লোক'- গানটিকে দুর্ভিক্ষের পটভূমিকায় রূপান্তরিত করলেন ' সেই মেয়ে 'গানে।' হয়তো তাকে দেখো নি কেউ কিংবা দেখেছিলে' গানটি ১৯৫০ সালে রেকর্ড করলেন সুচিত্রা মিত্র। রাতারাতি সাড়া পড়ে গেলো শ্রোতাদের মধ্যে।এইসময় সলিল চৌধুরী প্রতিভা যেন টগবগ করে ফুটছে। কিছু কিছু এমন গান সৃষ্টি করলেন যেখানে শুধু ব্যক্তি নয়,পরিবেশ,সমাজ, দেশ- এসব যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। ১৯৫২ সালে দ্বিজেন মুখোপাধ্যায় গাইলেন' শ্যামলবরণী ওগো কন্যা'। এই গানে প্রকৃতি যেন প্রেমিকা যে গানের বর্ণনায় দেশে পর্যবসিত হলো। গায়ক গাইলেন' ওগো তুমি বুঝি মোর বাংলা'। ১৯৫৩ সালে কবি বিমলচন্দ্র ঘোষের কথায় সলিল চৌধুরীর সুরে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় গাইলেন ' উজ্জ্বল একঝাঁক পায়রা'৷ সেই গানে যেন চৈত্রদিনের এক ছবি ফুটে উঠলো। ঐ একই বছর সলিল চৌধুরী নিজের কথায় ও সুরে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়কে দিয়ে গাওয়ালেন ' আয় বৃষ্টি ঝেঁপে ধান দেবো মেপে'। বৃষ্টি নিয়ে প্রচলিত রোম্যান্টিকতা উধাও।পরিবর্তে বাস্তব জীবন,দারিদ্র্যের হাহাকার এবং বিপুল প্রত্যাশার পরশ এই গানের শব্দে শব্দে ১৯৫৪ সালের দুটি গান আবার বাংলা গানের মোড় ফেরালো।নিজের কথায় ও সুরে সলিল চৌধুরী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে দিয়ে গাওয়ালেন এবং অন্নদাশংকর রায়ের কথায় নিজের সুরে বাণী ঘোষালকে দিয়ে রেকর্ড করালেন ' তেলের শিশি ভাঙলো বলে'। ১৯৫৭ সালে দ্বিজেন মুখোপাধ্যায় মাইকেল মধুসূদন দত্তর লেখা দুটি কবিতা রেকর্ড করলেন। 'রেখো মা দাসেরে মনে' এবং' আশার ছলনে ভুলি'। সলিল চৌধুরী বাংলা গানকে কয়েক ধাপ যেন এগিয়ে দিলেন।
তিনি একাধারে সার্থক গীতিকার-সুরকার,এবং সার্থক কম্পোজ়ার। শুধু লেখা, সুর দেওয়াই নয়, যন্ত্র-অনুষঙ্গেও প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন বরাবর। তাঁর গান, সুর-রচনা অবশ্যই স্বতন্ত্র। গণ-আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত সলিল চৌধুরী গান লেখা শুরু গণসঙ্গীত দিয়েই: 'দেশ ভেসেছে বানের জলে।' সোনারপুর অঞ্চলে বন্যাপীড়িত দুর্গত মানুষের কথা ভেবে এ গান লিখেছিলেন তিনি। বিগত শতকের চারের দশকে ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সলিল চৌধুরী পরপর বেশকিছু গণসঙ্গীত লেখেন। যা আপামর জনসাধারণের হৃদয় কে নাড়া দেয়। প্রচলিত গানের থেকে ভিন্ন পথে, ভিন্ন সুরে হাজির করেন তাঁর গান। যেখানে তিনি শুধু বিষয়ের দিকেই নজর দেননি, সুর-ছন্দ-আঙ্গিকের কথাও ভেবেছেন বার বার। গতানুগতিক ভাব থেকে নিজেকে আলাদা করে নিতে পেরেছিলেন। বিদেশী সঙ্গীতের প্রতি আলাদা টান ছিল বলেই দেশি-বিদেশি সঙ্গীত কে এক সাথে বেঁধে অন্য সুরে উপস্থাপন করেছেন গানের তাল লয় ছন্দ। বিদেশী সঙ্গীত আত্মীকরণ করে তিনি সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে পেরেছিলেন অনায়াসে। তাই তো আমরা পায় অন্য সলিল কে।
ছবিটা বদলাতে শুরু করে বিংশ শতকের গোড়ার দিক থেকে ৷ এই ধারার আংশিক প্রবর্তক কাজি নজরুল ইসলাম । বাংলা গানের জগতে অজয় ভট্টাচার্য, প্রণব রায়, মীরা দেববর্মনের মতো গীতিকারদের মতো প্রতিভাময় গীতিকার আসার ফলে বদলে যায় গানের জগত। নতুন প্রতিভার সাথে পুরাতন প্রতিভার মেল বন্ধন তৈরি হয়। তাঁরা শুধু গানই লিখছেন, সুর দিচ্ছেন না৷ অন্য দিকে হিমাংশু দত্ত, পঙ্কজ মল্লিক , শচীন দেববর্মন সুর দিচ্ছেন, কিন্তু লিখছেন না৷
সে সময় তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সাংস্কৃতিক দল ভারতীয় গণনাট্য সংঘ বা আইপিটিএ (ইন্ডিয়ান পিপলস থিয়েটার অ্যাসোসিয়েশন)-এ যোগ দেন। তাঁর শুপ্ত প্রতিভার বিকাশ হতে শুরু করে। শুরু করলেন গান লিখতে ও সুর করতে। সেসময় আইপিটি-এর সাংস্কৃতিক দলটি বিভিন্ন শহর ও গ্রামগঞ্জে ভ্রমণ করতে থাকে। তখন তিনি তার সাধনা লব্ধ জ্ঞান সাধারণ মানুষের কাছাকাছি নিয়ে আসতে শুরু করেন। 'বিচারপতি', 'রানার' এবং 'অবাক পৃথিবী'র মতো গান। যা তখন সাধারণ জনতার কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।তার 'গাঁয়ের বধূ'র মতো গান বাংলা সঙ্গীতে একটি নতুন ধারা তৈরি করেছিল, যা মাত্র ২০ বছর বয়সে সুর করেছিলেন সলিল চৌধুরী। পশ্চিমবঙ্গে তখনকার প্রায় প্রত্যেক প্রতিষ্ঠিত শিল্পী এসব গান গেয়েছেন। এরমধ্যে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।
সলিল চৌধুরী ৭৫টির বেশি হিন্দি চলচ্চিত্র, ৪১টি বাংলা চলচ্চিত্র, ২৬টি মালায়ালাম চলচ্চিত্র, বেশ কিছু মারাঠি, তামিল, তেলেগু, কান্নাডা, গুজরাটি, ওড়িয়া এবং অসামীয়া চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিচালনা করেন। তাঁর 'গাঁয়ের বধূ'র মতো গান বাংলা সঙ্গীতে একটি নতুন ধারা তৈরি করেছিল, যা মাত্র ২০-২২ বছর বয়সে সুর করেছিলেন সলিল।চলচ্চিত্রেও তিনি রেখেছিলেন অসামান্য অবদান। তার প্রথম বাংলা চলচ্চিত্র 'পরিবর্তন' মুক্তি পায় ১৯৪৯ সালে। ১৯৫৩ সালে বিমল রায় পরিচালিত 'দো বিঘা জমিন' চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে সলিল চৌধুরীর হিন্দি চলচ্চিত্র শিল্পে অভিষেক ঘটে। বাংলা এবং হিন্দি চলচ্চিত্রে ২০ বছর কাজ করার পরে সলিল চৌধুরী ১৯৬৪ সালে 'চিম্মিন' দিয়ে মালয়ালাম চলচ্চিত্রে প্রবেশ করেন। চলচ্চিত্র সফলতা পাক বা না পাক সলিলের মালয়ালাম গানগুলো বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।
আসলে বাংলা গানে এক স্বতঃউৎসারিত ঝর্ণাধারায় স্বতঃস্ফূর্ত গতিময়তার আরেক নাম সলিল চৌধুরী। সুরের বৈচিত্র্যে সহজেই তৈরি করে নিয়েছিলেন এক নিজস্ব ঘরানা। রাগরাগিণীর এবং পাশ্চাত্য গানের প্রয়োগে যে ট্রিটমেন্ট সেখানে সলিল চৌধুরী আনলেন অভিনবত্ব। বহু ক্ষেত্রে রিদমিক প্যাটার্নের মূল কাঠামোয় শব্দ এবং ভাব অনুযায়ী সুর আনলেন।কীর্তনের সুরে তৈরি করলেন প্রতিবাদের গান, মোজার্টের সিম্ফনি, রাশিয়ান বা হাঙ্গেরীয়ান সুরের চলনকে নিজের মতো করে ব্যবহার করলেন। স্কেল বা কর্ড নিয়ে চলতে লাগলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা।নীচু স্বর থেকে হঠাৎ উঁচু স্বরে বা উঁচু থেকে পলকে নিচে নেমে এসে জার্ক দেওয়ার প্রবণতা ঘটালেন নিজের কম্পোজিশনে। এছাড়াও স্কেল চেঞ্জ করে বৈচিত্র্য আনার রীতি অনুসরণ করলেন। গানে হঠাৎ কোমল থেকে শুদ্ধ বা কড়িতে তাঁর সুর ষড়জের মত পাল্টে যেত। এসব তত্ত্বকথা ছাড়াও সলিলসুরের প্রধান উপাদান ছিল উচ্ছলতা এবং সাবলীলতা যা ঝর্ণার মত সঞ্চারমান, গতিময় এবং চঞ্চল ছিল। আসলে সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে পারতেন বলেই সলিল চৌধুরী হয়ে উঠেছিলেন ট্রেন্ডসেটার।
সলিল চৌধুরী ছিলেন একাধারে গীতিকার, সুরকার, গায়ক, কম্পোজার লেখক ও কবি। লিখেছেন 'ড্রেসিংটেবিল'এর মতো গল্প বা 'অরুণোদয়ের পথে'-র মতো নাটক। কিংবা 'শপথ' বা 'চাবি' র মতো কবিতা। ছড়াও লিখেছেন যেগুলো কন্যা অন্তরা চৌধুরীকে দিয়ে গান হিসেবে গাইয়েছেন। পরিচালনা করেছেন হিন্দি ছবি 'পিঁজরে কে পনছি', ' দো বিঘা জমিন' এর চিত্রনাট্যকার হিসেবে সলিল চৌধুরীর অবদান আজও আমাদের কাছে বিস্ময়কর। এমনকি যখন কোনও ছবিতে একটিও গান ব্যবহার না করে শুধু আবহসঙ্গীতের ব্যবহার করেছেন সেখানেও রেখেছেন স্বকীয়তার স্বাক্ষর। বাংলা বা হিন্দি গান ছাড়াও ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশের নানা ভাষাতে প্রায় তেরো টি ভাষার চলচ্চিত্রের জন্য সুর করেছেন। এর মধ্যে পঁচাত্তর টির বেশী হিন্দি, একচল্লিশ টি বাংলা, সাতাশটি মালায়ালম এছাড়াও মারাঠি, তেলুগু, কন্নড়, গুজরাটি, অসমীয়া, ও ওড়িয়া চলচ্চিত্র আছে। এছাড়াও তিনি বাঁশি, পিয়ানো, এসরাজ সহ বেশ কয়েকটি বাদ্যযন্ত্রে অতীব দক্ষ ছিলেন। বাংলা ভাষায় অনুপ্রেরণা মূলক কবিতা উপহার দেওয়ার জন্য ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেন। তাঁর বিশেষ একটি গুণ না বললেই নয় তা হলো সার্থক আয়োজক।
তিনিই প্রথম কয়্যার সঙ্গীতের প্রবর্তন করেন। বোম্বে ইয়ুথ কয়্যার তাঁর অন্যতম কীর্তি। পরে পনিফেনিক কয়্যার এর মেল বন্ধন বা বহুস্বর পদ্ধতি চালু করেন।
সারা ভারতবর্ষের বিশিষ্ট সব শিল্পীরা গেয়েছেন সেসব গান। এভাবেই সঙ্গীতের বিস্তীর্ণ প্রান্তরে স্বচ্ছন্দে বিচরণ করেছেন স্রষ্টা সলিল চৌধুরী।
১৯৫৬সালের ১৪ আগস্ট মুক্তি পেলো রাজকাপুর প্রযোজিত ও অভিনীত ' একদিন রাত্রে'।সুরকার সলিল চৌধুরী। আর কে ফিল্মসের ব্যানারে এই প্রথম সলিল চৌধুরীর কাজ।একটি গান তিনি লিখলেন, 'এই দুনিয়ায় ভাই সবই হয় সব সত্যি, ঘুরি এই দুনিয়ার লাট্টু ভগবান হারিয়েছো লেত্তি'।
ছবি বিশ্বাস এক মাতালের ভূমিকায়। মান্না দে গাইলেন সেই গান। এই গান রেকর্ডিংয়ে মান্না দে বেশ অভিনয় করে এই গান গেয়েছিলেন। ছবি বিশ্বাস গান শুনে গেলেন রেগে। মান্না দের কাকা কৃষ্ণচন্দ্র দে ছিলেন ছবি বিশ্বাসের বন্ধু । তিনি মান্না দেকে বেশ বকুনি দিলেন। কিন্তু গান হলো সুপার হিট। বিশেষ করে সলিল চৌধুরী গানে এমন সব কথা বসালেন যা সেইসময় ভাবাই যেতো না।' মানিব্যাগ',' ফলং ফলং ফলা' ইত্যাদি শব্দগুলির প্রয়োগ ঘটালেন অনায়াসেই। বাংলা ছবির গান বেশ কয়েক ধাপ এগিয়ে গেলো এই গানটির মাধ্যমে।
প্রখ্যাত সাংবাদিক-সম্পাদক সন্তোষকুমার ঘোষের কাহিনীনির্ভর কিনুগোয়ালার গলি ছবি মুক্তি পায় ১৯৬৪ সালে। সেই ছবির গান রেকর্ডিং হচ্ছে। সবিতা চৌধুরী গাইবেন,' দখিনা বাতাসে মন কেন কাঁদে'।গোরখকল্যাণ রাগে বাঁধা এই গান হারমোনিয়ামে বাজাচ্ছেন সলিল চৌধুরী। পাশে তবলায় আছেন রাধাকান্ত নন্দী। সারা স্টুডিও স্তব্ধ। সলিলের হারমোনিয়ামবাদনে প্রত্যেকে মুগ্ধ। অবশেষে সবিতা গাইলেন।সে গান আজ ইতিহাস।
কিশোরকুমার সলিল চৌধুরী জুটি এক অনবদ্য জুটি। সংখ্যার বিচারে মান্না দে বা মুকেশ তাঁর সুরে হিন্দিতে অনেক গান হয়তো গেয়েছেন। কিন্তু কিশোরকুমার যে কটি গান গেয়েছেন সবকটিই হিট করেছে। মুসাফির, নৌকরি, হাফ টিকেট, অন্নদাতা,মেরে আপনে— এরকম অসংখ্য ছবির কথা বলাই যায়। তখন সলিল চৌধুরী বম্বেতে পেডার রোডের ফ্ল্যাটে থাকেন। অন্নদাতা ছবির গান রেকর্ডিং হবে। একটি গান গাইবেন কিশোরকুমার তাই তাকে সলিল চৌধুরী ডেকে পাঠিয়েছেন। কিশোরকুমার তাঁর সলিলদার গান করতেন খুব সিরিয়াস মুডে। সেদিনও তাই এসেছেন। সোফায় সলিল বসে কিশোরকুমারকে গান শেখাচ্ছেন —'গুজর যায়ে দিন দিন দিন কি হর পল গিন গিন গিন কিসিকি হায় ইয়াদোঁ মে'।শেষ তিনটি শব্দ শুনেই কিশোরকুমার সোফা থেকে নেমে মাটিতে বসে পড়লেন। মুখ নীচু। সলিল চৌধুরী অত্যন্ত অবাক হয়ে গেলেন।কি এমন হলো যে কিশোরকুমার মাটিতে বসে পড়লেন! তখনও কিশোরকুমার মাটিতে বসে রয়েছেন। কিছুক্ষণ পরে বললেন,- আমাকে মাফ করুন সলিলদা। আপনার সমান উচ্চতায় বসে আমি এ গান শিখতে পারবো না। কি সুর করেছেন। এই বলে বাকি সময়টা মাটিতে বসেই কিশোরকুমার গানটা তুললেন। সেই গান হিট হলো খুব। এভাবেই তিনি গানের জগতে নতুন দিশা দেখালেন। যা আজ জন্ম শতবর্ষে নতুন প্রজন্মের কাছে দিশারী হয়ে থাকবেন। সঙ্গীতের কথা ও বৈচিত্র্য নিয়ে পরীক্ষা করতে ভালো বাসতেন। সলিল চৌধুরীর গান ও সুর বাংলা গানের ইতিহাসে একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে।সঙ্গীত প্রতিভা ছিল বহুমুখী। তাঁর সৃষ্টি বাংলা গানের ধারায় একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে, যা আজও বাংলা গানের জগতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে মনে করলে অত্যুক্তি হবে না। কথা ও সুরের জাদুতে লক্ষ লক্ষ সঙ্গীত পিপাসু মননকে মন্ত্রমুগ্ধ করে চিরায়ত আসন ছিনিয়ে নিয়েছিলেন।
###27/05/2025

Comments
Post a Comment