স্বপন চক্রবর্তী
জগন্নাথ কাহিনী
পুরী জগন্নাথধাম করিব প্রভুর নাম
আজি মোর কাব্যের ছন্দে,
জগদীশ্বর তিনি জোগান সবারে চিনি
রাখেন মোদের ভালো-মন্দে।
নীলাচলে এক নারী ভক্তির ধ্বজাধারী
ঈশ্বর-প্রেম ছিল অপার,
কর্মাবাঈ নামে তিনি প্রভুর হৃদয় জিনি
করিতেন দিব্য সংসার।
ভিখারিণী অতি দীন বার্ধক্যে শক্তিহীন
তথাপি দৃঢ় মনোবল,
প্রত্যহ প্রভুর জন্য রাঁধিতেন কৃশরান্ন
হোক যত ঝড় কি বাদল !
নিত্য তিনি প্রাতে উঠি আনাজ কুটনো কাটি
বাটিতেন বাটনা ভগ্ন শিলে,
রাঁধিতেন খিচুড়ি বৃদ্ধা মিশায়ে আপন শ্রদ্ধা
কপোল সিক্ত আঁখিজলে।
সম্মুখে প্রভুর পট কর্মাবাঈ অকপট
“স্বীকার কর এ নৈবেদ্য,
মন্ত্র তন্ত্র নাহি জ্ঞাত ভক্তিরস সঞ্জাত
ভক্ষণ কর প্রভু খাদ্য।”
তারপর প্রাতঃকৃত্য চলিত এমনই নিত্য
কর্মাবাঈ ভক্তির পরাকাষ্ঠা,
হেরিয়া নারীর ভক্তি দেবতা করেন যুক্তি
করিব পরখ বামা-নিষ্ঠা।
যেই ভাবা সেই কাজ ধরিয়া শিশুর সাজ
প্রাতে প্রভু বৃদ্ধার গেহে,
“দুটি খাদ্য দেবে মোরে আহার জোটেনি ঘরে
ক্লিষ্ট আমি অভুক্ত দেহে।”
শুনিয়া শিশুর কান্না অর্ধসমাপ্ত রান্না
ভক্তিমতী আসেন বাহিরে,
শিশুটিরে লয়ে ক্রোড়ে চুমা দেন প্রাণ ভরে
“আয় বাবা মোর ক্ষুদ্র নীড়ে।”
রান্নার সমাপনে ভোগ দেন খুশীমনে
নারায়ণ কৃষ্ণ জগন্নাথে,
তারপর কৃশরান্ন রেকাবে শিশুর জন্য
ভোজন করান নিজ হাতে।
সেই হতে প্রতি প্রাতে কাটে ক্ষণ শিশু সাথে
আনন্দে বিভোর সেই নারী,
শিশুই স্বয়ং প্রভু জানিতে নারেন কভু
নিত্য সেবা করেন খিচুড়ি।
সহসা এক সন্ন্যাসী কর্মার গৃহে আসি
শুনি সব কথা বৃদ্ধার,
হইলেন ক্রুদ্ধ অতি “হায় এ কি দুর্মতি”
করিলেন তাঁরে তিরস্কার।
“স্নান বিনা ভোগ পাক” সন্ন্যাসী হতবাক
“হেরি এ যে অর্ধমের বন্যা !
“আগামীকল্য হতে স্নান করিবে প্রাতে
তারপরে প্রভু তরে রান্না ।”
পরদিন হতে নারী স্নানান্তে নিত্য দেরী
শিশুটিরও আহারে বিলম্ব,
প্রভু শিশু রূপধারী হস্ত নাহি ধৌত করি
মন্দির লক্ষ্যে দেন লম্ফ।
তর সয় নাহি তাঁর দেউলের মূল দ্বার
খুলিবার ঠিক প্রাক্কালে,
উপনীত মন্দিরে কৃশরান্ন ওষ্ঠ ‘পরে
প্রতিদিনই এমতই চলে।
প্রধান পুরোহিত যিনি আপ্লুত সতত তিনি
প্রভুর লীলায় তিনি ধন্য,
ভাবেন প্রভু কি তবে যান কারো গৃহে ভবে
আহার করিতে কৃশরান্ন !
সেদিন গভীর রাত স্বপনে শ্রী জগন্নাথ
পুরোহিতে দিলেন দরশন,
কর্মাবাঈ-এর কথা করিলেন ব্যক্ত তথা
প্রভুর আশীষ বরষণ ।
এভাবেই দিন চলে কালের বিধির জালে
অবশেষে একদিন প্রাতে,
মহাপ্রাণ কর্মাবাঈ এ ধরায় আর নাই
মিলিলেন শ্রী হরির সাথে।
জগন্নাথ মহাপ্রভু তিনিই পরম বিভু
আঁখিপটে অশ্রুর ধারা,
অবাক ভক্তরা সবে এমন কে হেরিছে কবে
ভেবে ভেবে নৃপতিও সারা।
মহাপ্রভু অবশেষে নৃপতিরে ভালবেসে
স্বপনে করেন চিন্তামুক্ত,
বৃদ্ধা নারীর কথা আপন হৃদয়ে ব্যথা
সকলি করেন তিনি ব্যক্ত।
বাজরার কৃশরান্ন আহা কি অমৃত অন্ন
কে দিবে তাঁহারে এইক্ষণে ?
শিশুবেশী জগন্নাথে কে রহিবে প্রতি প্রাতে
তীব্র ক্ষুণ্ণিবৃত্তি নিবারণে ?
রাজাদেশ হয় জারী বাজরারই খিচুড়ি
বালভোগ রূপে প্রত্যহ,
হইবে প্রভুরে দিতে এই ধরণীর হিতে
অন্যথা করে না যেন কেহ।
কত যুগ আজি বীত তথাপি সে বিধি স্থিত
নীলাচল আজও পুরীধামে,
সর্বাগ্রে বালভোগ কৃশরান্ন বাজরা যোগ
প্রস্তুত শ্রীহরির নামে।
অনন্তর মহাপ্রসাদ আহা কি অপূর্ব স্বাদ
বিতরিত সর্ব ভক্তজনে,
পুরাণ-কথামৃত ছন্দালোকে বিভাসিত
প্রণমি শ্রীজগন্নাথ চরণে।
জয় জগতের সাঁই তোমার তুলনা নাই
তুমি দীন দুঃখীর ভগবান,
আমি অতি তুচ্ছ মতি তুমি বিনা নাহি গতি
কৃপা করো সর্বশক্তিমান।
ওরা উদ্বাস্তু
ওফ্, এখনো কত দেরী ?
এমন সময় কি আসবে আর ফিরে !
রাতের এই গহীন অন্ধকারে,
পালাতে হবে খুব তাড়াতাড়ি।
বেরিয়ে পড়ো সব, থেকো না থেমে,
যা আছে পাও আজ হাতের কাছে,
সব ঝোলাবন্দী করো একদমে,
তারপর বেরিয়ে পড়ো, তাকিও না পিছে।
পড়ে থাক ঘর দোর,
পড়ে থাক আশা,
আগামীকালের ভোর
খুবই সর্বনাশা।
পড়ে থাক ধানজমি,
পুকুরের মাছ সব যাক ভেসে,
সময় নেই আর একদমই,
নিজভূমে মোরা পরবাসী এই দেশে।
ওরা আসছে কাল ভোরে সদলবলে,
রক্তের ফোয়ারায় ওরা নাকি স্নান করে,
তাই আর সময় নেই, এই অন্ধকারে
বেরিয়ে পড়ো , ওরা এসে গেল বলে।
কি হলো ! কান্না সব আজ থাক তোলা,
কষ্ট সব যেতে হবে ভুলে,
ছেলে মেয়ে দুজনারে কোলে তুলে,
এইবেলা পালানোর পালা।
স্বপ্ন সব আজ গেছে টুটে,
ওরা আমাদের বাঁচতে দেবে না মোটে,
যেতে হবে অন্য কোনখানে,
যেথা বাঁচবো আমরা এক নতুন দিনে।
সুধন্যের আর্তনাদে তার গোটা পরিবার
যেন ভেঙে হয়ে গেল খানখান,
গোয়ালের গরু, ধানের ক্ষেত, সোনার সংসার,
এক লহমায় বুঝি সব নিষ্প্রাণ !
পেরিয়ে পুকুর নদী সাগরের ঢেউ,
ওরা ছুটে চলে রাত দিন,
একফোঁটা পানীয় হায় পায় নি তো কেউ,
যেন শোধে সব জন্মভূমির ঋণ !
জিজ্ঞাসা করে ছেলে-আর কত দূর ?
মেয়েটার চোখে মুখে বিষাদের সুর,
ঐ ত’ এসে গেছে, দেরী নেই মোটে,
সামনেই ঐ দেশ-কি সুন্দরী বটে !
কত আশা, ভালোবাসা আর কত হাসি,
কত গান কত স্বপ্ন যেন ঝরে রাশি রাশি,
যেতে হবে আমাদের ওই বেড়াটাকে পেরিয়ে,
নতুন দেশের মাঝে যাবে সব হারিয়ে।
এই, তোমরা কারা এসেছো এখানে আমাদের দেশে ?
ঘুরছো তো দেখি সব বেশ ভালমানুষের বেশে !
কি মতলব সব খুলে বলো-নয়তো দেব জেলে ঠুসে,
পুলিশের ধমকানি শুনে সুধন্য ফেলে হেসে।
আজ্ঞে, ঐ দেশ থেকে এসেছি সকলে,
সাথে আছে বউ আর মোর ছেলেপুলে,
একটু কি আশ্রয় মিলবে না বাবা তোমাদের কাছে,
কান্নাটা বুঝি গলায় ডেলা হয়ে আটকিয়ে আছে।
ও তোমরা উদ্বাস্তু, যাও সব দণ্ডকারণ্য,
কিংবা মরিচঝাঁপি,যেথা আছে সুন্দর অরণ্য,
তারপর সে কি ভীড়, সে কি ভয়ানক জনস্রোত,
সুধন্যর পরিবার, হায় সব এক একটি জীর্ণ পোত।
এমন কত মানুষ নিজের দেশ, নিজের ঘর ছেড়ে,
কপর্দকশূন্য হয়ে চলে আসে অন্য কোন দেশে,
অনাহারে, অনটনে, জীর্ণ ছিন্ন বেশে,
ওরা উদ্বাস্তু,থাকে অনাগত ভবিষ্যতের অন্ধকারে।
ওরা ছাড়েনাকো হাল,নব স্বপনের খোঁজে ব্যস্ত,
তবুও কেউ যায় হারিয়ে,জীবনের সংগ্রামে ধ্বস্ত।
আর যারা গেল টিঁকে,মাটি খুঁজে পেল পদতলে,
একদিন সেই নতুন দেশে মিশে গেল জনতার দলে।
লোভ আর লালসার আগুনে অনেকেই পুড়ে হল ছাই,
আর যারা রয়ে গেল টিঁকে,জারি থাকে জীবনের লড়াই।
ওরা উৎখাত ভিটেমাটি থেকে,সম্পদ সব পিছে রেখে,
ওরা ছুটে চলে নতুনের খোঁজে,সব কিছু সয় মুখ বুঁজে।
ওরা জেল খাটে বিনা অপরাধে,তবু থাকে সত্যের পথে,
মনে মনে যদিও বা কাঁদে,হাসিমুখে বাঁচে একসাথে।
ওরা উদ্বাস্তু, রচে ইতিহাস,তমসার কোরে অবসান,
সৃষ্টিসুখের সে কি উল্লাস ! বিশ্বে যবে সৃষ্টি নব প্রাণ॥
নিবেদন করি মোর শ্রদ্ধা,
ওই সব ছিন্নমূল পদে,
যারা বাহে খেয়া জীবনের নদে,
ওরা উদ্বাস্তু, জীবনের যোদ্ধা।
আয় মেঘা আয়
ছোট্ট একটি গ্রামের ধারে ক্ষুদ্র ললিত গেহে,
থাকেন কেবল একটি মানুষ ন্যুব্জ শ্রান্ত দেহে।
জায়া নেই তাঁর বহুদিন হল, একটিমাত্র কন্যা,
নাম তার মেঘা, রূপে গুণে যে সবার অগ্রগণ্যা।
ওই মেয়েটিই পৃথিবী বাবার, করেছেন তারে লালন,
বাবা ও মায়ের যুগপৎ দায় সার্থকতায় পালন।
মায়ের অভাব দেন নি বুঝতে কখনোই তিনি তারে,
কর্মসূত্রে আমাদের মেঘা থাকে আজ বহুদূরে।
ব্যস্ত জীবন, দিন কাটে তার অনেক কাজের ভীড়ে,
বাবার খোঁজটি প্রতিদিন সে রাখবে কেমন করে !
তবে মেয়ের জন্য বৃদ্ধের মনে চিন্তার শেষ নাই,
দুপুরবেলায় দূরভাষে তাঁর মেঘাকে নিত্য চাই।
“খেয়েছ ত’ তুমি? কি খেলে আজ?”এমন কতই কথা,
সাবধানে থেকো, বৃষ্টি আসছে, সঙ্গে কি আছে ছাতা ?
ওপার থেকে ভেসে আসা স্বর,নয় কভু সেটি তিক্ত,
হয়তো বাবার প্রশ্নের জেরে মাঝে মাঝে মেঘা ত্যক্ত।
প্রতিটি সকাল শুরু হয় পিতার একটি প্রার্থনায়,
ব্যস্ত মেয়ের সাথে যেন তাঁর ভাল করে কথা হয়।
এমনই এক ব্যস্ত দিনেতে ভীষণ কাজের চাপ,
টাইমলাইন, প্রেজেন্টেশন, মিটিং-এর উত্তাপ।
এমন সময় বাবার ফোনটি রোজকার মত বাজে,
খেয়েছ মা মণি ? বৃষ্টি হচ্ছে, যেওনা মোটেই ভিজে।
সাবধানে থেকো, বর্ষায় জেনো রোগের প্রকোপ বেশি,
বাবার কথায় মেঘার কিন্তু পায় না মোটেই হাসি।
বিরক্ত মেঘা,”আমি কি আজও সেই ছোট্টটি আছি ?
বড় হয়ে গেছি, আমি এখন নিজের মতোই বাঁচি।
এসব প্রশ্ন রোজ রোজ করে হয় না কিছুই লাভ,
ফোনটাকে ছাড়ো,”- মেঘার কণ্ঠে ভেসে আসে উত্তাপ।
নীরবতা বুঝি কয়েকটি পল, মলিন কণ্ঠ শেষে,
“সত্যিই তুমি বড় হয়ে গেছো”-বলেন বৃদ্ধ হেসে।
করুণ সে হাসি, ব্যস্ত মেয়েটি বুঝতে কিছুই নারে,
অশ্রুসিক্ত নয়নে বৃদ্ধ দিলেন ফোনটি ছেড়ে।
একদিন যায়, দুদিন যায়, আর তো আসে না ফোন,
প্রথম প্রথম খুশী হয়েছিল ব্যস্ত মেঘার মন।
“অবশেষে আজ স্বাধীন হয়েছি”-সে উচ্ছল বুঝি,
কঠোর কোমল যে কোন শাসনে মেঘা আজ গররাজি।
কিন্তু কদিন যেতে না যেতেই শূন্যতা করে গ্রাস,
ফোন তো বাজে না ! হৃদয়ের মাঝে অদ্ভুত এক ত্রাস।
অপরাধবোধ কুরে কুরে খায়, মেঘা নিজে ফোন করে,
বেজে বেজে ফোন যায় শেষে থেমে, নীরব দ্বিপ্রহরে।
খাওয়াদাওয়া সেরে বাবা রাত্রেতে ঘুমান খুবই ত্বরা,
তাই রাতের বেলা ফোন করা মানে তাঁকে বিরক্ত করা।
কি করবে সে বুঝতে পারে না,তবে কি যাবে সে গ্রামে?
ভেবে ভেবে কোন পায় না সুরাহা,দুচোখে প্লাবন নামে।
দুই সপ্তাহ কেটে গেল শেষে, হয়তো বা তারও বেশী,
দূরভাষ আসে সেদিন দুপুরে, গ্রাম থেকে প্রতিবেশী।
মেঘা মা তুমি যেখানেই থাকো,চলে এসো তাড়াতাড়ি,
ভাল বুঝছি না আমরা কেহই, বাবা অসুস্থ ভারি।
রাতের ট্রেনেই রওনা দিল সে, পৌঁছল কাকভোরে,
গ্রামের বাড়িতে মাটির গন্ধে ভিজে থাকা পথ ধরে।
ঘরের মধ্যে সকলে স্তব্ধ যেন শ্মশানের নীরবতা,
বিছানায় শুয়ে চিরনিদ্রায় মেঘার বৃদ্ধ পিতা।
পাশে পড়ে আছে মুঠোফোন তাঁর,মেঘার নামটি স্ক্রীণে,
হয়তো ইচ্ছা ছিল বৃদ্ধের চিরবিদায়ের ক্ষণে,
বলবেন তিনি সেই কথাটিই আবার মেয়ের সনে,
“চললেম আমি অনন্তলোকে,থেকো তুমি সাবধানে।”
বাণভাসি মেঘা অশ্রুধারায়,কপোল দুখানি সিক্ত,
উথালপাতাল হৃদয়টি তার বাবার বিহনে রিক্ত।
সংকুচিত হাতদুটি তাঁর চেপে ধরে একবার,
“আমি ভাল আছি”-বলতে ইচ্ছে করছিল বুঝি তার।
আমাদের যাঁরা করেন স্নেহ সবার চাইতে বেশী,
তাঁদেরকে কভু দিও না কষ্ট, কেড়ো না মুখের হাসি।
তোমাদের থেকে যন্ত্রণা পেলে হয়ে যান তাঁরা মূক,
নীরবতা যবে হয় শেষ কথা হারায়ে যতেক সুখ।
বাবা ও মায়ের মমতা আসলে শক্ত মুঠির রাশ,
নিরাপত্তার ঘেরাটোপে এক স্নেহময় অভ্যাস।
যতই হোক না বয়সের ভার, তবুও তাঁদের কাছে,
সন্তান যেন আগের মতই সেই শিশুটিই আছে।
ফিরিয়ে দাও সে ভালোবাসা প্রীতি যখন জীবিত তাঁরা,
শ্মশানভূমিতে কান্না কখনো পায় না তাঁদের সাড়া।
মেঘার সেই কান্নাজড়ানো “আমি ভালো আছি” কথা,
ঘরের মধ্যে তাই শুধু ঘোরে ,পায়নাকো সজীবতা॥

Comments
Post a Comment