
ওরা ট্রেন থামিয়ে দিল
অঞ্জনা মজুমদার
শিবু
আর তিনু দুই ভাই খেলছিল রেললাইন এর ধারে। রোজ ওরা এখানেই খেলে, ওদের ঘর
মানে বাঁশ পাতার ছোট্ট ঝুপড়িটা যে রেললাইন এর ধারেই। শিবু আজ স্কুলের মাঠের
কোণে একটা লাল বল কুড়িয়ে পেয়েছে। সেই বল নিয়েই দুই ভাই খেলছিল।
আজ
রথের দিন মা দুই ভাইকে দুটো লাল রঙের জামা কিনে দিয়েছেন। ওরা নিজেরা
লতাপাতা দিয়ে গত বছরের পুরোনো রথটাই সাজিয়েছে। বাড়ির পাশের লাল বাগানবিলাস
ফুল দিয়ে সেই রথের মাথায় চূড়ো তৈরি করেছে। রথের তিনটে চাকার একটা চাকা
রেললাইন এর ওপর রেখে তিনু টানছে আর শিবু ঠেলছে। ওদের বস্তির গোটা দশেক
বাচ্চাও রথের পেছনে পেছনে দৌড়াচ্ছে। জয় জগন্নাথ, জয় জগন্নাথ চিৎকার করে
আনন্দ করতে করতে রেললাইন ধরে ওদের ভাঙাচোরা রথ চলছে।
ভালোই
চলছিল রথ হঠাৎ রথ উল্টে পড়ে গেল। তিনু হোঁচট খেয়ে রেললাইনে পড়ে গেল।
ছেলেরা থমকে দাঁড়াল। রথ আর তিনুকে তুলতে এসে শিবু আঁতকে উঠল।
রেললাইন
এর খানিকটা অংশ বেঁকে রয়েছে আর খানিকটা অংশ মোটে নেই! শিবু আর কমল স্কুলে
পড়ে তিন ক্লাসে। আর সবাই ছোট। এই লাইনে ওদের ছোট্ট রথ উল্টে গেল। তবে বড়
ট্রেন যেতে পারবে কি? একটু বাদেই তো সেই বন্দেভারত এক্সপ্রেস, ভারি সুন্দর
ট্রেনটা এই লাইন দিয়েই যাবে!
শিবু আর কমল দুজনে দুজনের দিকে তাকিয়ে একসাথে বলল,না!
কিছুতেই না। ট্রেন থামাতে হবে।
কিন্তু কি করে? শিবু উদ্বিগ্ন স্বরে বলল, ছোটরা সবাই রেললাইন থেকে নিচে নেমে যা। তাড়াতাড়ি!
শিবু
লেখাপড়ায় ভালো, স্কুলের মাস্টারমশাইরা তাকে ভালবাসেন। তাই পাড়ার ছেলেরাও
ওকে মানে। সব ছোট বাচ্চারা রেললাইন এর ওপর থেকে নেমে গেল।
কমল বলল, লাল সিগন্যাল এ ট্রেন থেমে যায়। ঐ দেখ এখন সিগন্যাল লাল আছে কিন্তু সবুজ হবার দেরি নেই।
বলতে
বলতেই সিগন্যাল সবুজ হয়ে গেল। শিবু বলল, আমাদেরই কিছু একটা করতে হবে।
নিজের লাল জামাটা খুলে রথের মাথার পতাকার লাঠির মাথায় লাগিয়ে উঁচু করে তুলে
নাড়াতে লাগল।
চেঁচিয়ে বলল, তিনু তোর জামাটা খুলে দে কমলকে।
তিনু দাদার খুব বাধ্য। জামা কোনও কথা না বলে খুলে দিল।
কমল তিনুর জামা আর একটা লাঠির মাথায় লাগিয়ে জোরে জোরে নাড়াতে লাগল।
সিধুর
বিনুর কাছে দুটো ছোট্ট ছোট্ট টর্চ ছিল। একহাতে লাল জামা অন্য হাতে টর্চ
নিয়ে দুই বন্ধু রেললাইন এর ভাঙা অংশের সামনে দাঁড়িয়ে নাড়তে লাগলো। রেললাইন
এর ধারে বাচ্চারা কাঁদতে শুরু করে দিল। দাদারা কি করতে চাইছে ওরা ভালো
বোঝেনি। কিন্তু কিছু একটা বিপদ হতে পারে তা বুঝতে পেরেছে।
পাশ
দিয়ে সাইকেলে পড়তে যাচ্ছে পাড়ার মিনুদিদি। ট্রেনের হুইসিল বাজছে, ছেলে
দুটো রেললাইন এর ওপর লাল জামা নাড়াচ্ছে দেখে কাছে এসেই মিনু লাইন ভাঙা দেখে
বিপদ বুঝতে পারল। নিজের গায়ের হালকা লাল ওড়নাকে মাথার পতাকার মতো নাড়াতে
লাগল।
হু হু করে ছুটে আসছে ট্রেনটা। ছেলে মেয়ে তিনটে
স্থির ভাবে লাল কাপড় নাড়িয়েই চলেছে। ট্রেনের বাঁশি জোরে জোরে বাজছে।
ট্রেনের জোরালো আলো তিনটে ছেলে মেয়ের ওপর।
ওদের চোখে জোরালো আলো। চোখ বন্ধ বুজে গেল তিনজনেরই।
ট্রেনের গতি কি একটু একটু করে কমে গেল?
শিবুরা তাকিয়ে দেখল সত্যি সত্যিই ট্রেন থেমে গেছে।
ট্রেন থেকে নেমে এসেছেন দুজন ড্রাইভার নাকি পাইলট?
তোমরা এভাবে ট্রেন থামালে কেন? ছুটন্ত ট্রেনের সামনে আসতে ভয় করলো না?
ওরা
কথা বলতে পারছে না। ছুটে রেললাইন এর ভাঙা অংশ দেখালো। ড্রাইভারেরা
তাড়াতাড়ি তাদের স্যাটেলাইট ফোনে রেল আধিকারিকদের ফোন করতে শুরু করলেন।
কয়েক মিনিট পরেই উল্টো দিকের থেকে বাঁশি বাজাতে বাজাতে বিশেষ ট্রেন চলে এলো। হুড়োহুড়ি করে অনেক অফিসাররা নেমে এলেন।
একজন ড্রাইভার শিবুদের তিনজনকে ধরে টেনে বললেন, এরা, এই বাচ্চাদের জন্যই আজ আমাদের ট্রেন, এতো প্যাসেঞ্জারের জীবন রক্ষা হল স্যর।
ট্রেন
ঘিরে এখন মানুষের মেলা। পুলিশও ট্রেনলাইন ঘিরে রেখেছে। একজন অফিসার ওদের
নাম, বাবা মায়ের ফোন নং নিয়ে নিলেন। বন্দেভারতের দরজা যাত্রীরা নিজেরা
খুলতে পারেন না।
দরজা খুলে প্যাসেঞ্জারদের অন্য বিশেষ ট্রেনে হাওড়া রওনা করিয়ে দিয়ে অফিসাররা ফিরলেন।
তারপর
সেই দিনটা এলো। সেদিন সকালে রেললাইন এর ধারের বস্তি পুলিশে পুলিশে ছেয়ে
গেল। লাল বাতি লাগানো সাইরেন বাজানো গাড়ি থেকে সাদা ধুতি পাঞ্জাবী পরা একজন
সুন্দর বয়স্ক সাদা চুলের মানুষ শিবুদের দরজায় এসে দাঁড়ালেন। পিছনে পিছনে
কালো সাদা কোট প্যান্ট জনাচারেক। সকলের হাতে তিনটি লাল রঙের খাম।
শিবু দাস, কমল রায় আর মিনতি বিশ্বাসকে ডেকে দিন দয়া করে।
পাড়ার দিদা রানি ঠাকুমা তেড়ে এলেন, কেন গো ভালোমানুষের পো? আমার সোনার চাঁদ নাতি নাতনিদের কি দরকার?
একজন কোট প্যান্ট পরা লোক বললেন, ওরা ট্রেন থামিয়েছে।
রানি
ঠাকুমা তেড়ে গেলেন, সে তো তোমাদের ভালোই করেছে। তাই পুলিশ দিয়ে ধরে নিয়ে
যেতে এসেছো? আমি আর আমরা সবাই থাকতে কেমন ওদের ধরে নিয়ে যাও দেখি?
একগাছা মুড়ো ঝাঁটা হাতে রানি ঠাকুমা সামনে দাঁড়িয়ে পড়লেন।
এবার
সেই ধুতি পাঞ্জাবী পরা বললেন, কেন ওদের পুলিশ দিয়ে ধরে নিয়ে যাবো? ওরা
সাহসের সঙ্গে কতজনের প্রাণ রক্ষা করলো তাই রাজভবনে ওদের সম্মান আর পুরস্কার
দেওয়া হবে। তাই আমরা ওই তিনজনের সঙ্গে আপনাদের সবাইকে রাজভবনে নিমন্ত্রন
করতে এসেছি।
রানি ঠাকুমা গালে হাত দিয়ে বললেন, রাজভবনে? তা তুমি কি রাজা নাকি?
শিবুর বাবা বললেন, না কাকি উনি এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী।
মুখ্যমন্ত্রী বললেন, শিবু, কমল আর মিনতি নিমন্ত্রণের চিঠি নাও।
মা বাবা সবাইকে নিয়ে যেও।
লাল বাতির গাড়ি হুইসিল বাজিয়ে চলে গেল।
রাজভবনে সবাই যেতে পারেনি। কিন্তু নিজেদের ছেলে মেয়েদের সাহসিকতার কথা সবাই সারা দেশের সঙ্গে টিভির পর্দায় দেখেছে।
সেখানে
শিবুরা মেডেল, টাকা, মিষ্টি, ফুল, সার্টিফিকেট পেয়েছে। ওদের খুব ভালো
লেগেছে। কিন্তু ওদের কাছে সবচেয়ে বড় পুরস্কার স্কুলে মাস্টার মশাইদের
ভালোবাসা আর অন্য ছাত্রছাত্রীদের চোখে সম্মান।
ওরা বলেছে, সারাজীবন কেউ বিপদে পড়লে ওরা এভাবেই সামনে এসে দাঁড়াবে। টিভিতে সবাই এটা দেখেছে।
Comments
Post a Comment