গুচ্ছকবিতা:
ইউটোপিয়া: একটি অসমাপ্ত বিপ্লব…
আবদুল্লাহ আল আদীব
প্রস্তরযুগের উত্তরাধিকার…
প্রস্তরযুগের ধ্বংসাবশেষ থেকে উঠে এসে,
চকমকি পাথর হাতে, অভাবী চোখে—
উদোম গায়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি বালক,
একটি স্বচ্ছ কাচের শপিং মলের সামনে।
আরেকজন বৃদ্ধ তার সমস্ত জীবন খেটে
ফুড বুটিকের সামনে ক্ষুধার্ত পেটে বসে আছে।
তাদের চোখে সভ্যতার সম্ভ্রম খসে পড়েছে।
হঠাৎ রাজপথে বিপ্লবীদের শোরগোল—
"এবার নিজের বস্ত্র বানাবো,
এবার নিজের খাদ্য ফলাবো।"
এক বিজ্ঞ দার্শনিকের চশমা ভেঙে গিয়েছে।
সজ্জিত একটি চশমার দোকান দেখে দার্শনিক বলে—
আফসোস হায়! অভাবীর চোখে চশমা নাই,
চশমা যে বানিয়েছে তার কাছেও নাই।
এক আদিবাসী জিঙ্গালী পথ ভুলে চলে আসে লোকালয়ে।
সারাদিনের মজুরি একটি টাকা হাতে পেলে,
সে তার কপালের ঘাম মুছে টাকাটা ছিঁড়ে ফেলে।
অন্যরা হাসতে থাকে, জিঙ্গালী টাকার মূল্য বোঝে না।
গভীর রাতে জিঙ্গালীর অভুক্ত ফাঁকা পেটে
জঙ্গলের স্বপ্ন নেচে ওঠে, সে উল্লাসে নিথর হাসে।
সে কল্পনায় ছুটে যায় শৈশবে, ছুটে যায় জঙ্গলে,
ছুটে যায় পরিবার আর প্রিয় মানুষদের বৈভবে।
ভাবে— "আমি তো প্রকৃতির মেয়ে।
গাছে ফল ছিলো খেয়েছি, সন্তানদের খাইয়েছি।
এখানে সবকিছু___!" সবকিছু কি, কিছুই সে বোঝে না।
প্রভাতে সূর্যের প্রথম আলিঙ্গনে জিঙ্গালীর মৃতদেহের পাশে
ঝলমলে রোদে ঝিকমিকিয়ে ওঠে একটি সদ্যোজাত শিশু।
শিশুটি হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে কোথায়?
তার নগ্ন দেহে ও চোখে লেপ্টে যায় পতিত সভ্যতার গ্লানি।
সে গিয়ে বসে ক্ষুধার্ত বৃদ্ধের পাশে ফুড বুটিকের সামনে।
জননীর জরায়ু থেকে বেরিয়ে আসার সময়
সে নিয়ে এসেছিলো প্রস্তরযুগের একটি চকমকি পাথর।
শৃঙ্খলিত-শৃঙ্খল…
হুতাশনে লয় তুলে উদ্গীথ, নয়নলোকে অরণ্যনৃত্য;
আখেটে ধারালো চকমকি, মুখে বুনোশূকরের গোশত।
আর্টেমিস হেসে ওঠে। উলম্ব দেহে নেই কোনো উচ্ছিষ্ট;
নিরাভরণ শশাঙ্ককিরণে দেহ মেলে ধরে জীবনের সত্য।
তাগিদে সম্ভোগ ছিলো প্রকৃতি-নির্বাধ, ছিলো না ছাদ।
ওহে, তোমার উপরে ছাদ— কোথায় করছো চাষ? তুমি দাস?
নিসাবার নামে উঠেছে গুদাম— ধ্যানে মত্ত অভুক্ত মর্তধাম।
আশ্রয় হলো মালিকানা, মাটির নাম সম্পদ, শক্তি— সীমানা।
মানুষের উপর মানুষ বিজয়ী, রাষ্ট্র বিজয়ী, আইন বিজয়ী;
বিজয়ী সভ্যতা, দেবতা, দৈত্য— মানুষের দেহ ভোগের মানচিত্র।
কত বিচিত্র শিকল— দাস? নাকি শ্রমিক? শিক্ষিত? নাকি প্রশিক্ষিত?
ভেবেছো কি— তুমি যে সাফল্য চাও, তা কি সত্যিই তোমার?
প্রমিথিউসের আগুন হারিয়ে যায় ডেডালাসের গোলকধাঁধায়।
পুরো কাঠামোটাই প্যানঅপ্টিকন— মানুষ নিজেই নিজের কারাগার।
সিসিফাস আমরা সবাই— সভ্যতাকে ঠেলে, ঠেলতে আবার ফিরে যাই।
স্মৃতি-লিপ্ত গণতন্ত্র…
সামাজিক সমঝোতার লিবার্টির প্রাচীন অ্যালগরিদম
আজ ব্যালট বাক্সে সংরক্ষিত ক্ষমতার ভ্রান্তি বিলাস।
ইতিহাস ফিসফিস করে-
এথেন্সের রিটে লেখা সোর্স কোড
রোমে ডিবাগিং
আর ফরাসি বিপ্লবে আপডেট হয়ে
আজকের দিনে করাপ্টেড সফটওয়্যার,
প্রতিশ্রুতির ধ্বংসাবশেষে দেখি HTTP 403 Forbidden।
গণতন্ত্র এখন সার্ভার রুমে-
ভোটাররা আইপিএড্রেস,
প্রতিটি ইনপুট প্যাকেটকে শনাক্ত করে ফায়ারওয়াল।
শাসকের ইচ্ছা যেন টেকনিক্যাল রুল।
দুর্নীতির ট্রোজান ঘোরে,
পরিষ্কার অডিট ট্রেইল মুছে ফেলা হয়,
কোর ফাংশনে ঢুকে পড়ে কালো কোড;
সততার লুপ রিকারসিভ হয়ে বিক্ষিপ্ত হয়—
অবশেষে সবাই স্মৃতি-লিপ্ত।
নির্বাচন একটি নদী,
যেখানে স্রোতের দিক নিয়ন্ত্রণ করে পাহাড়।
গণ অধিকার সংরক্ষিত,
প্রতিবার কম্পাইল করার সময় নতুন করে লেখা হয়।
ন্যায়বিচার হলো একটি অনির্ধারিত ভ্যারিয়েবল,
যা কখনো ইনিশিয়ালাইজ হয় না।
সংসদ একটি রেইনফরেস্ট,
এখানে লতাগুল্মের মত ডিটেক্টরশীপ জড়িয়ে ফেলে
গঠনমূলক সমালোচনা।
শাসক যেন কোবরা কালাচ।
প্রিয়তমার বিশ্বাসঘাতকতার মত
গণতন্ত্রের বেঈমানী
সামাজিক জিনোমে মিউটেশন ঘটায়।
লিবারেলিজম যেন ইভেন্ট হরাইজনে ফ্রীডম খুজে।
ইতিহাস বলে
প্রতিটি বিপ্লব একেকটি সিস্টেম রিবুট,
কিন্তু হার্ডওয়্যারে বরাবরই দোষ থেকে যায়।
আমরা চাই এক নতুন স্থাপত্য,
যেখানে সংলাপ হবে ডিফল্ট প্রোটোকল,
সততা হবে এনক্রিপ্টেড কোর,
স্বাধীনতা হবে অপরিবর্তনীয় কনস্ট্যান্ট।
যেখানে প্রতিটি মানুষ একই সাথে শাসকও,
শাসিতও।
ঐতিহাসিক প্রেমের ভয়ঙ্কর প্রতারণা…
প্রিয়তমষু,
আমার প্রগাঢ় হিতৈষী,
গণতান্ত্রিক মনাস্ট্রি;
এথেন্সের অ্যাক্রোপলিসে জন্ম নেওয়া
আমাদের পবিত্র প্রেম
কর্তৃত্ব ও স্বাধীনতার দ্বন্দ্বে
আজ করুণ বিচ্ছেদে জর্জরিত ও বিতর্কিত।
প্রাচীন নীল-ফিরোজা মেসোপটেমিয়ার
নদীর শীতল জলের সুরেলা ঢেউয়ের বদলে
প্রতিশ্রুতির অচেনা সিগ্ন্যাল।
অভিজ্ঞতা যেন মাচু পিচুর ধাপে ধাপে
ঐতিহাসিক প্রেমের এক ভয়ঙ্কর প্রতারণা।
কথা ছিলো-
আমাদের সংলাপ হবে স্টাগেন অঞ্চলের
পাশাপাশি বয়ে যাওয়া সমুদ্রের মত মুক্ত।
জীবনবর্তিকার প্রতিটি স্পর্শ হবে
ইন্টারনেটের ওপেন সোর্স প্রকল্প,
যার প্রতিটি তরঙ্গ হবে
প্রেম ও স্বাধীনতার অবগাহন।
কিন্তু সংলাপের বদলে
শাসনের গড়পড়তা হিসাবের ফাঁদে
আজ আমার জীবন বন্দী।
প্রতিটি প্রকল্প,
প্রতিটি ব্যয় যেন আমার উপর আপনার
একচেটিয়া সীদ্ধান্তের ভারী হাত।
ভালবাসা যেন স্টকহোম সিনড্রোম,
স্টোনহেঞ্জের অদৃশ্য শক্তি নিয়ন্ত্রণ করছে সময়।
সকালে ঘুম থেকে উঠে
দৈনিক পত্রিকা হাতে নিয়ে দেখতে হয়
আজকের ব্রেকফাস্টে আমার জন্য
কোন খাবারের অনুমোদন দিয়েছেন!
আমার শিক্ষা,
আমার চিকিৎসা,
আমার থাকা-পরা
এমনকি আমার অগোচরে
আমার টাকায়
আমার ঘরের মশা মারছেন___
হাজার কোটি ব্যয়।
আমার কন্ঠস্বর বিলীন,
বেঁচে থাকা যেন পাহাড়ের ঝিরিপথে
ঝর্ণার নিরুপায় প্রবাহ।
নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন…
আমার ত্রিমাত্রিক কায়ায়
সো'হমের বহুমাত্রিক অভিশাপ মেখে
শুয়ে আছি সিরিয়াস নক্ষত্রের বুকে।
অশ্রুর ফোয়ারা এক নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন নিয়ে
বয়ে যাচ্ছে নাইল নদীর ধ্রুব স্রোতে।
প্রতিটি অঞ্চল, জনপদ, পাহাড়, প্রাচীন শহর,
প্রত্নধ্বনি, পথচিহ্ন ও
মহাসমুদ্রের তলদেশ থেকে
দিগন্ত বিস্তৃত আকাশ___
সবই যেন সেই স্বপ্নের
অ্যাংলো-স্যাক্সন শিলালিপি।
যেখানে মানুষ মানুষের চোখে মানুষ।
মানুষ ইচ্ছা করলেই উড়ে যেতে পারে
পাখির মতো,
ডানায় লেনিনগ্রাদে সূর্যোদয়,
চোখে বায়ুমণ্ডলীয় নৃত্য অরোরা।
ভাষার প্রতিটি ধ্বনি হবে অর্ফিয়াসের লিরা,
প্রতিটি পদক্ষেপে থাকবে
গ্র্যান্ড ক্যানিওন ও ভিক্টোরিয়ার চারণভূমি।
সীমান্ত বলতে কিছু নেই,
পাসপোর্টে লেখা থাকবে "পৃথিবীর সন্তান"।
জাতিতে জাতিতে বিদ্বেষ,
ধনী-দরিদ্র বিভেদ,
সাদা-কালোয় বিভাজন নেই;
প্রয়োজন নেই কোন হাম্মুরাবির আইন।
সার্বভৌমত্বের প্রতীক হবে
কিং আর্থারের এক্সক্যালিবার।
প্রতিটি শিশুর হাসি হবে
অ্যাজটেক সোনার সৌর দীপ্তি।
বৃদ্ধের অভিজ্ঞ চোখে ঝরবে
অ্যান্টিগোনে ও ক্রেওনের
নৈতিক দ্বন্দ্বের সমাধান।
যেখানে প্রতিটি হৃদয় বাস করবে
প্রতিটি হৃদয়ের গহিনে।
প্রেম যেখানে একমাত্র সংবিধান,
ভালবাসা একমাত্র আইন,
প্রতিটি নিঃশ্বাসে বন্ধুত্বের বাতাস,
প্রতিটি চোখে বিশ্বাসের ছাপ
আর সূর্যের মত আলোকময় হবে
সমতা ও মানবতার নির্যাস।
প্রতিটি প্রাণ উপভোগ করবে
সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধির অন্তর্লীন সমরস।
.........................................
আবদুল্লাহ আল আদীব।
ঠিকানা: কুমিরা, সীতাকুণ্ড, চট্টগ্রাম,বাংলাদেশ।
পড়াশোনা: সরকারি সিটি কলেজ, চট্টগ্রাম।
বয়স: ২৪ বছর।
Comments
Post a Comment