রঙের আড়ালে মানুষ
মইনুদ্দিন সরদার
উত্তর ২৪ পরগনার এক নিভৃত গ্রাম — খোড়গাছি। ভোরবেলা যেখানে শিশিরভেজা ঘাসের ডগায় সূর্যের আলো মুক্তোর মতো ঝলমল করে ওঠে, বিকেল নামলে যেখানে ধানক্ষেতের বুক চিরে হাওয়া ছুটে বেড়ায়। সেই গ্রামেরই এক সাধারণ পরিবারের আঙিনায় জন্ম নিয়েছিল এক শিশু। মায়ের দ্বিতীয় সন্তান। তার নাম রাখা হয়েছিল মইনুদ্দিন সরদার।
পৃথিবীতে আসার সময় তার গায়ে কোনো পরিচয়ের ছাপ ছিল না। সে ছিল শুধু একজন মানুষ। তার হাসি ছিল অন্যসব শিশুর মতোই নিষ্পাপ, তার কান্নাও ছিল সবার মতোই স্বাভাবিক। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সে আবিষ্কার করল, সমাজ মানুষকে সব সময় মানুষ হিসেবে দেখে না। কখনো কখনো মানুষকে তার গায়ের রঙ দিয়েও মাপা হয়।
ছোটবেলায় যখন গ্রামের মাঠে খেলতে যেতাম, কিংবা স্কুলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করতাম, তখন মাঝেমধ্যে কিছু শব্দ কানের ভেতর এসে বিঁধত। শব্দগুলো খুব বড় ছিল না, কিন্তু তাদের আঘাত ছিল গভীর। কেউ আমাকে আমার নাম ধরে ডাকত না; তার বদলে ডাকত আমার গায়ের রঙের পরিচয়ে। তারা হয়তো হাসতে হাসতেই বলত, কিন্তু সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকত অবহেলার একটা তীক্ষ্ণ ধার।
প্রথমদিকে ভাবতাম, হয়তো এটা খুব সাধারণ ব্যাপার। কিন্তু ধীরে ধীরে বুঝলাম, কিছু শব্দ মানুষের শরীরে নয়, মনে আঘাত করে। মানুষের গায়ের রঙ নিয়ে ঠাট্টা করা যেন অনেকের কাছে বিনোদন, অথচ সেই বিনোদনের মূল্য দিতে হয় একজন মানুষকে তার আত্মসম্মান দিয়ে।
তখন থেকেই একটা প্রশ্ন আমার ভেতরে জন্ম নিতে শুরু করল। প্রশ্নটা আজও আমাকে তাড়া করে বেড়ায়—
“কালো” শব্দটা কেন অপমান?
কালো কি কোনো অপরাধের নাম? কালো কি কোনো অযোগ্যতার পরিচয়? নাকি মানুষের মন এতটাই সংকীর্ণ হয়ে গেছে যে সে একজন মানুষের হৃদয়, স্বপ্ন আর মেধার আগে তার গায়ের রঙটাকেই দেখতে শেখে?
আমি উত্তর খুঁজতে শুরু করলাম। মানুষের কাছে নয়, প্রকৃতির কাছে। কারণ মানুষ অনেক সময় ভুল বিচার করে, কিন্তু প্রকৃতি কখনো নিজের সৃষ্টিকে ছোট করে না।
প্রকৃতির কাছে উত্তর খুঁজতে গিয়ে প্রথমেই আমি ফিরে গেলাম নিজের কাছেই। কারণ পৃথিবীর সব প্রশ্নের উত্তর হয়তো দূরে কোথাও লুকিয়ে থাকে না; অনেক সময় উত্তর লুকিয়ে থাকে আমাদের নিজেদের মধ্যেই।
একদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। সেই মুখ, যাকে নিয়ে মানুষ এত কথা বলে। সেই রঙ, যাকে নিয়ে মানুষ এত বিচার করে। হঠাৎ আমার চোখ দুটোর ওপর দৃষ্টি থেমে গেল।
আমি দেখলাম, আমার চোখের মণি কালো।
শুধু আমার নয়, পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি মানুষের চোখের সবচেয়ে মূল্যবান অংশটিই কালো। আশ্চর্যের বিষয়, মানুষ নিজের চোখের ভেতরে থাকা এই কালোকে কখনো অপমান করে না। বরং এই ছোট্ট কালো মণির ওপরই নির্ভর করে তার সমস্ত দেখা, সমস্ত চেনা, সমস্ত অনুভব।
আমি ভাবতে লাগলাম, যদি এই কালো মণিটুকু না থাকত, তাহলে কি আমি আমার মায়ের মুখ দেখতে পেতাম? খোড়গাছির সবুজ মাঠ দেখতে পেতাম? বর্ষার মেঘ, শরতের কাশফুল কিংবা সন্ধ্যার লাল আকাশ দেখতে পেতাম?
না, কিছুই দেখতে পেতাম না।
পৃথিবীর হাজারো রঙকে দেখার ক্ষমতা লুকিয়ে আছে একটি কালো বিন্দুর মধ্যে। যে কালো আমাকে পৃথিবীর সৌন্দর্য দেখায়, মানুষকে চিনতে শেখায়, স্বপ্ন দেখতে শেখায়, সেই কালোকেই মানুষ অপমানের ভাষায় ব্যবহার করে!
তখন আমার মনে হলো, সমস্যাটা কালো রঙে নয়; সমস্যাটা মানুষের দৃষ্টিতে। কারণ মানুষ চোখ দিয়ে পৃথিবীকে দেখে ঠিকই, কিন্তু সব সময় হৃদয় দিয়ে বিচার করতে শেখে না।
চোখের মণির কথা ভাবতে ভাবতেই আমার স্কুলজীবনের আরেকটি দৃশ্য মনে পড়ে গেল। প্রতিদিন যার সামনে বসে আমি পড়াশোনা করেছি, জ্ঞানের প্রথম পাঠ শিখেছি। আশ্চর্যের বিষয়, সেও ছিল কালো।
সেটা ছিল আমাদের শ্রেণিকক্ষের ব্ল্যাকবোর্ড।
প্রতিদিন সকালে ক্লাসে ঢুকেই আমি তার দিকে তাকাতাম। কখনো বাংলা ব্যাকরণের নিয়ম, কখনো ইতিহাসের সাল-তারিখ, কখনো ভূগোলের মানচিত্র—সবকিছুই সেই ব্ল্যাকবোর্ডের বুকে ফুটে উঠত। তখন বুঝিনি, কিন্তু আজ ভাবলে মনে হয়, আমার জীবনের অনেক আলোর শুরুই হয়েছিল একটি কালো পটভূমি থেকে।
ব্ল্যাকবোর্ডের রঙ কালো বলেই সাদা চক তার ওপর নিজের অস্তিত্ব প্রকাশ করতে পারে। কালো না থাকলে অক্ষরগুলো স্পষ্ট হতো না, জ্ঞানের রেখাগুলোও হয়তো এত সহজে চোখে পড়ত না। অর্থাৎ জ্ঞানের আলোকে দৃশ্যমান করার জন্যও কালোর প্রয়োজন হয়েছে।
আশ্চর্য লাগে, যে সমাজ স্কুলে গিয়ে সেই কালো বোর্ডের সামনে মাথা নত করে শিক্ষা অর্জন করে, সেই সমাজই আবার একজন কালো মানুষকে অবহেলার চোখে দেখে। জ্ঞানের উৎসকে সম্মান করে, কিন্তু সেই একই রঙ বহন করা একজন মানুষকে সম্মান করতে শেখে না।
অনেক সময় মনে হয়, আমরা বই পড়ে শিক্ষিত হই ঠিকই, কিন্তু মানবিক হতে পারি না। কারণ সত্যিকারের শিক্ষা শুধু অক্ষর চেনায় না; মানুষকেও চিনতে শেখায়। যদি শিক্ষা আমাদের মানুষকে তার রঙের জন্য ছোট করতে শেখায়, তাহলে সেই শিক্ষা অসম্পূর্ণ।
আমি যখন ব্ল্যাকবোর্ডের কথা ভাবি, তখন মনে হয় সে যেন নীরবে একটা কথা বলে—
“আমার রঙ কালো বলেই তো তোমাদের জ্ঞানের আলো এত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।”
সেই কথার ভেতর যেন একটা গভীর সত্য লুকিয়ে আছে। পৃথিবীর অনেক মূল্যবান জিনিসই হয়তো বাহ্যিক সৌন্দর্যে নয়, নিজের অবদানে মহৎ হয়ে ওঠে।
ব্ল্যাকবোর্ডের সেই কালো বুকের কথা ভাবতে ভাবতেই আমার চোখ চলে যায় আকাশের দিকে। দিনের বেলা যে আকাশকে আমরা নীল দেখি, রাত নামলে সেই আকাশই ধীরে ধীরে কালো হয়ে যায়। আর ঠিক তখনই সেখানে জ্বলে ওঠে অসংখ্য তারা।
হয়তো প্রকৃতি সেখানেও একই শিক্ষা দিতে চেয়েছে।
দিনের বেলায় আকাশকে যতই সুন্দর মনে হোক, তার বুকে কোনো তারা দেখা যায় না। সূর্যের আলোয় তারা হারিয়ে যায়। কিন্তু সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে যখন আকাশ ধীরে ধীরে কালো চাদরে নিজেকে ঢেকে ফেলে, তখন একে একে জেগে ওঠে অসংখ্য তারা।
ছোটবেলায় খোড়গাছির উঠোনে শুয়ে আমি অনেক রাত আকাশের দিকে তাকিয়ে কাটিয়েছি। দূরের তারাগুলোকে দেখে মনে হতো, যেন আকাশের বুকজুড়ে কেউ এক মুঠো আলো ছড়িয়ে দিয়েছে। তখন বুঝিনি, আজ বুঝি—সেই তারাগুলোর সৌন্দর্যকে দৃশ্যমান করে তুলেছিল আকাশের কালো রঙ।
যদি রাতের আকাশ কালো না হতো, তাহলে হয়তো তারাদের অস্তিত্বই আমাদের চোখে ধরা পড়ত না। আমরা তাদের আলো দেখতাম না, তাদের সৌন্দর্য অনুভব করতাম না। অর্থাৎ কালো এখানে আলোকে আড়াল করেনি; বরং আলোকে প্রকাশ করার সুযোগ দিয়েছে।
মানুষের জীবনও অনেকটা এরকম। অনেক সময় যাদের আমরা অবহেলা করি, যাদের দিকে তুচ্ছতার চোখে তাকাই, তাদের মধ্যেই এমন আলো লুকিয়ে থাকে যা একদিন চারপাশকে আলোকিত করতে পারে। কিন্তু আমরা সেই আলো দেখার আগেই তাদের গায়ের রঙ দেখে বিচার করে ফেলি।
আকাশ কখনো তারাদের বলে না, “তোমরা আমার চেয়ে উজ্জ্বল।” আবার তারারাও আকাশকে বলে না, “তুমি কালো বলে তোমার মূল্য কম।” প্রকৃতির মধ্যে এই অহংকার নেই, এই বিভেদ নেই। বিভেদ সৃষ্টি করেছে মানুষ।
আমি তখন ভাবি, প্রকৃতি যদি কালো আকাশকে সম্মান করতে পারে, তাহলে মানুষ কেন কালো মানুষকে সম্মান করতে শিখবে না?
হয়তো কারণ মানুষ অনেক সময় বাহ্যিক রঙ দেখে, কিন্তু ভেতরের আলো দেখতে শেখে না।
তারাদের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমার মনে পড়ে গ্রামের মাঠের কথা। সেই মাঠ, যেখানে কৃষকের ঘাম মিশে থাকে। সেই জমি, যাকে কেউ সুন্দর বলে কবিতা লেখে না, অথচ সেই জমিই মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন পূরণ করে।
আর সেই জমির রঙও অনেক সময় গাঢ় কালো।
খোড়গাছি গ্রামের সন্তান হওয়ার কারণে মাটির সঙ্গে আমার পরিচয় খুব ছোটবেলা থেকেই। বর্ষার পর মাঠে যখন নতুন চারা রোপণ করা হতো, তখন দূর থেকে তাকালে দেখা যেত ভেজা কালো মাটি নিঃশব্দে শুয়ে আছে। তার কোনো ভাষা নেই, কোনো অহংকার নেই, কোনো অভিযোগও নেই। অথচ সেই নীরব মাটির বুকেই কৃষক নিজের স্বপ্ন বুনে দেয়।
কয়েক মাস পরে সেই একই জমি সবুজে ভরে ওঠে। তারপর একসময় সোনালি ধানের ঢেউ মাঠ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ তখন ফসল দেখে আনন্দ পায়, কৃষকের পরিশ্রমের প্রশংসা করে, কিন্তু খুব কম মানুষই সেই মাটির কথা ভাবে, যার বুক চিরে এই জীবনের জন্ম হয়েছে।
মাটির রঙ কালো হতে পারে, কিন্তু তার অবদান সোনার চেয়েও মূল্যবান।
আমি কখনো দেখিনি কেউ কালো মাটিকে অপমান করছে। কারণ মানুষ জানে, এই মাটি না থাকলে তার ঘরে অন্ন আসবে না। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, যে মানুষ কালো মাটির গুরুত্ব বোঝে, সেই মানুষই কখনো কখনো একজন কালো মানুষকে তুচ্ছ করতে দ্বিধা করে না।
তখন মনে হয়, মানুষ প্রকৃতির কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছে, কিন্তু সবচেয়ে জরুরি শিক্ষাটা হয়তো শেখেনি।
মাটি কখনো নিজের রঙ নিয়ে গর্ব করে না। সে শুধু নিজের কাজ করে যায়। মানুষের পায়ের নিচে থেকেও সে জীবন সৃষ্টি করে। তার এই নীরবতা আমাকে বারবার ভাবায়। কারণ পৃথিবীর অনেক মহান জিনিসই প্রচার করে না; তারা শুধু নিজের মূল্য কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করে।
জীবনের পথে হাঁটতে হাঁটতে আমিও বুঝেছি, একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার চেহারায় নয়, তার কর্মে। রঙ হয়তো প্রথম নজরে চোখে পড়ে, কিন্তু চরিত্রই মানুষের প্রকৃত পরিচয় হয়ে বেঁচে থাকে।
চোখের মণি, ব্ল্যাকবোর্ড, রাতের আকাশ আর কৃষকের মাটি—এতগুলো উদাহরণ দেখার পরও যখন সমাজ একজন মানুষকে তার গায়ের রঙ দিয়ে বিচার করে, তখন প্রশ্ন জাগে—
সমস্যাটা কি সত্যিই রঙে?
নাকি সমস্যাটা মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে?
হয়তো উত্তরটা এখানেই লুকিয়ে আছে। কারণ প্রকৃতি কখনো কালোকে অবহেলা করেনি; অবহেলা করেছে মানুষ।
এই কথাটা ভাবলেই আমার নিজের জীবনের অনেক ঘটনা মনে পড়ে যায়। এমন অনেক দিন গেছে, যেদিন কোনো কথার উত্তর আমি মুখে দিইনি, কিন্তু মনে মনে অনেক প্রশ্ন করেছি। যারা আমাকে আমার নাম ধরে না ডেকে গায়ের রঙের পরিচয়ে ডাকত, তারা কি কখনো ভেবেছিল সেই শব্দগুলো আমার হৃদয়ে কতটা আঘাত করত?
সম্ভবত না।
কারণ যে আঘাত দেয়, সে সব সময় আঘাতের গভীরতা বুঝতে পারে না। সে শুধু শব্দ উচ্চারণ করে। কিন্তু যে মানুষ সেই শব্দ শুনে, তার ভেতরে নীরবে একটি ক্ষত তৈরি হয়।
অনেক সময় আমি ভেবেছি, যদি আমার গায়ের রঙ একটু ফর্সা হতো, তাহলে কি মানুষ আমাকে অন্যভাবে দেখত? তাহলে কি একই মানুষ আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করত না? তাহলে কি আমার পরিচয় বদলে যেত?
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারলাম, এই প্রশ্নগুলোর কোনো মূল্য নেই। কারণ মানুষের মূল্য তার রঙে নয়। যদি রঙই মানুষের যোগ্যতার মাপকাঠি হতো, তাহলে পৃথিবীর ইতিহাস অন্যরকম হতো। তখন পরিশ্রমের মূল্য থাকত না, মেধার মূল্য থাকত না, মানবিকতারও কোনো মূল্য থাকত না।
জীবন আমাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে—
“যে মানুষ অন্যকে তার গায়ের রঙ দিয়ে বিচার করে, সে আসলে নিজের চিন্তার সীমাবদ্ধতাকেই প্রকাশ করে।”
কারণ একজন মানুষের চামড়া দেখা খুব সহজ, কিন্তু তার হৃদয়কে দেখা খুব কঠিন। আর কঠিন কাজগুলোই মানুষ সবচেয়ে কম করে।
আজ আমি আর নিজের রঙ নিয়ে প্রশ্ন করি না। কারণ আমি জানি, আমার রঙ আমার পরিচয় নয়। আমার পরিচয় আমার স্বপ্ন। আমার পরিচয় আমার পরিশ্রম। আমার পরিচয় আমার লেখা, আমার চিন্তা, আমার ব্যবহার এবং আমার মানবিকতা।
আমি আজও কালো। কিন্তু সেই কালো রঙের ভেতরেও আমি একজন মানুষ। আমারও স্বপ্ন আছে, অনুভূতি আছে, সম্মানবোধ আছে। আর পৃথিবীর প্রতিটি কালো মানুষেরও আছে।
হয়তো সমাজের সব মানুষকে বদলানো সম্ভব নয়। কিন্তু অন্তত একজন মানুষ যদি এই লেখাটি পড়ে বুঝতে পারে যে, গায়ের রঙ নিয়ে কাউকে অপমান করা কোনো হাসির বিষয় নয়, বরং একটি মানুষের আত্মসম্মানে আঘাত করা—তাহলেই এই লেখার উদ্দেশ্য পূরণ হবে।
কারণ মানুষকে ছোট করার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো তার বাহ্যিক রূপ নিয়ে বিদ্রূপ করা, আর মানুষকে বড় করার সবচেয়ে সুন্দর উপায় হলো তাকে মানুষ হিসেবে সম্মান করা।
এবং আমি বিশ্বাস করি, পৃথিবী একদিন সেই শিক্ষাটাই শিখবে।
সেদিন হয়তো কোনো শিশুকে তার গায়ের রঙের কারণে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না। কোনো কিশোরকে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চেহারার সঙ্গে লড়াই করতে হবে না। কোনো মানুষকে তার নামের আগে একটি অবহেলার শব্দ বহন করতে হবে না।
মানুষ তখন বুঝবে, রঙ কোনো যোগ্যতার সনদ নয়, আবার কোনো অযোগ্যতারও পরিচয় নয়। রঙ কেবল প্রকৃতির একটি সৃষ্টি; মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার মন, তার কর্ম এবং তার মানবিকতা।
আজ যখন আমি পেছন ফিরে তাকাই, তখন চোখের মণির কালো রঙ, ব্ল্যাকবোর্ডের কালো বুক, রাতের আকাশের কালো বিস্তৃতি এবং কৃষকের কালো মাটিকে একই সুতোয় বাঁধা দেখতে পাই। তারা সবাই যেন নীরবে একটি কথাই বলে—
“যার ভেতরে মূল্য আছে, তাকে তার রঙ দিয়ে বিচার করা যায় না।”
চোখের মণি আমাদের পৃথিবী দেখায়, ব্ল্যাকবোর্ড আমাদের শিক্ষা দেয়, রাতের আকাশ আমাদের স্বপ্ন দেখায়, আর মাটি আমাদের জীবন বাঁচায়। তাদের কেউই নিজের রঙের কারণে ছোট হয়ে যায়নি। তাহলে একজন মানুষ কেন যাবে?
সমাজের সবচেয়ে বড় সমস্যা অশিক্ষা নয়; মানুষের ভেতরের সংকীর্ণতা। কারণ শিক্ষিত হওয়া আর মানবিক হওয়া এক জিনিস নয়। অনেক মানুষ বই পড়ে শিক্ষিত হয়, কিন্তু খুব কম মানুষ অন্যের হৃদয়কে সম্মান করতে শেখে।
তাই আজ আমার একটাই কথা—
কাউকে তার গায়ের রঙ দিয়ে ডাকার আগে তার হৃদয়ের রঙটা দেখো। কারণ চামড়ার রঙ চোখে দেখা যায়, কিন্তু চরিত্রের রঙ দেখতে লাগে বিবেক।
“মানুষকে তার রূপ দিয়ে বিচার করলে ভুল হতে পারে, কিন্তু মানুষকে তার কর্ম দিয়ে বিচার করলে সত্যের কাছাকাছি পৌঁছানো যায়।”
“যে অন্যের রঙ নিয়ে হাসে, সে নিজের মানবিকতাকেই ছোট করে; আর যে মানুষকে মানুষ হিসেবে সম্মান করে, সে নিজের শিক্ষাকেই সম্মান করে।”
খোড়গাছির সেই ছেলেটি আজও কালো। কিন্তু আজ সে জানে, কালো হওয়া কোনো লজ্জা নয়। লজ্জা হলো এমন একটি মন নিয়ে বেঁচে থাকা, যে মন মানুষের মূল্যকে তার চামড়ার রঙে মাপতে চায়।
কারণ পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর রঙের নাম সাদা, কালো, নীল কিংবা লাল নয়।
পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর রঙের নাম—মানবতা।
.....................................
— মইনুদ্দিন সরদার
গ্রাম+পোস্ট : খোড়গাছি
জেলা : উত্তর ২৪ পরগনা, বসিরহাট - বাদুড়িয়া পশ্চিমবঙ্গ
থানা : বাদুড়িয়া
Comments
Post a Comment