শিবাশিস মুখার্জী, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়
"ইতিহাস আমাকে শিখিয়েছে মানুষ কী করেছে; কবিতা আমাকে শেখায় মানুষ কেন এখনও মানুষ হয়ে আছে।"— এই বাক্যটি হয়তো রোমিলা থাপার কখনও বলেননি, কিন্তু তাঁর সাম্প্রতিক কাব্যগ্রন্থ Just Being যেন এই অঘোষিত দর্শনেরই বহিঃপ্রকাশ।
একজন ইতিহাসবিদ কেন কবিতা লেখেন? প্রশ্নটি আপাতদৃষ্টিতে সহজ, কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে জ্ঞান, সময়, স্মৃতি এবং অস্তিত্বের গভীর সম্পর্ক। ইতিহাসের কাজ অতীতকে ব্যাখ্যা করা, আর কবিতার কাজ মানুষের অন্তর্জগতকে উন্মুক্ত করা। যখন একজন ইতিহাসবিদ কবিতার দিকে এগিয়ে যান, তখন তিনি আসলে তথ্যের সীমা ছাড়িয়ে সত্যের দিকে যাত্রা করেন।
রোমিলা থাপারের নতুন কাব্যগ্রন্থকে তাই কেবল সাহিত্যিক ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি একটি দার্শনিক মুহূর্ত। এমন এক সময়ে, যখন ইতিহাসকে রাজনৈতিক মতাদর্শের সেবকে পরিণত করার চেষ্টা চলছে, তখন ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গবেষক ঘোষণা করছেন—শেষ পর্যন্ত মানুষকে বুঝতে হলে কবিতার কাছে ফিরতেই হয়।
ইতিহাস কি সত্যিই সম্পূর্ণ সত্য?
ইতিহাসকে আমরা প্রায়ই সত্যের সমার্থক বলে ধরে নিই। কিন্তু ইতিহাস কখনও সম্পূর্ণ সত্য নয়; ইতিহাস সত্যের পুনর্গঠন।
হেইডেন হোয়াইট বলেছিলেন, ইতিহাসও এক ধরনের আখ্যান। তথ্য একই থাকতে পারে, কিন্তু বর্ণনা বদলালে অর্থ বদলে যায়। মিশেল ফুকো দেখিয়েছেন, ক্ষমতা নির্ধারণ করে কোন ইতিহাস লেখা হবে, কোন ইতিহাস ভুলে যাওয়া হবে। ওয়াল্টার বেঞ্জামিন লিখেছিলেন, প্রতিটি সভ্যতার দলিল একই সঙ্গে বর্বরতার দলিলও।
রোমিলা থাপারের সমগ্র জীবন এই প্রশ্নগুলোর সঙ্গে লড়াই করে কেটেছে। তিনি কখনও ইতিহাসকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে দেখেননি; বরং একে প্রশ্ন করার ক্ষেত্র হিসেবে দেখেছেন।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—যখন ইতিহাসও অসম্পূর্ণ, তখন মানুষ কোথায় আশ্রয় নেবে?
সম্ভবত সেই কারণেই কবিতা।
ইতিহাস স্মৃতি সংরক্ষণ করে, কবিতা স্মৃতিকে জীবিত রাখে
একটি ইতিহাসের বই লিখতে পারে—
"১৯৪৩ সালে বাংলায় দুর্ভিক্ষ হয়েছিল।"
কিন্তু কবিতা লিখবে—
"মায়ের চোখে তখন ভাতের চেয়ে বড় ছিল সন্তানের নিঃশ্বাস।"
একটি ইতিহাস লিখতে পারে—
"দেশভাগে লক্ষ লক্ষ মানুষ উদ্বাস্তু হয়।"
কিন্তু জীবনানন্দ, শক্তি, নির্মলেন্দু গুণ কিংবা মহাশ্বেতা দেবীর ভাষা আমাদের অনুভব করায়—বাড়ি হারানো মানে কী।
ইতিহাস ঘটনাকে সংরক্ষণ করে।
কবিতা ক্ষতকে সংরক্ষণ করে।
আর মানুষ শেষ পর্যন্ত ঘটনার চেয়ে ক্ষত নিয়েই বেশি বেঁচে থাকে।
"Just Being"—অস্তিত্বের সবচেয়ে কঠিন শিক্ষা
রোমিলা থাপারের কাব্যগ্রন্থের নাম Just Being।
এই দুটি শব্দের মধ্যে লুকিয়ে আছে শতাব্দীর দর্শন।
আজকের পৃথিবী আমাদের শেখায়—
তুমি সফল হও।
আরও উৎপাদন করো।
আরও অর্জন করো।
আরও প্রতিযোগিতা করো।
কিন্তু "শুধু থাকা"—এই শিক্ষাটি কোথায়?
মার্টিন হাইডেগারের মতে, মানুষ পৃথিবীতে "নিক্ষিপ্ত" (Thrownness)। আমরা কেউ জন্ম বেছে নিই না, সময় বেছে নিই না, পরিবার বেছে নিই না।
তবু আমরা বেঁচে থাকি।
এই বেঁচে থাকার নামই Being।
কবিতা সেই Being-এর ভাষা।
ইতিহাসের শেষ সীমায় দাঁড়িয়ে যে নীরবতা
একজন ইতিহাসবিদ জানেন—
অশোকের মৃত্যু কবে হয়েছে।
আকবরের প্রশাসন কেমন ছিল।
গুপ্ত যুগের অর্থনীতি কেমন ছিল।
কিন্তু তিনি জানেন না—
একজন বৃদ্ধা রাতের শেষে কেন একা জানলার পাশে বসে থাকেন।
একজন মানুষ কেন মৃত মায়ের শাড়ির গন্ধে কেঁদে ফেলেন।
কেন একটি নদী দেখে হঠাৎ শৈশব মনে পড়ে।
এই প্রশ্নগুলোর কোনো দলিল নেই।
এগুলোর উত্তর কেবল কবিতা দিতে পারে।
কবিতা কি ইতিহাসের বিরুদ্ধে?
না।
বরং কবিতা ইতিহাসের অসম্পূর্ণতাকে পূর্ণ করে।
ইতিহাস বাহ্যিক সময়ের ভাষা।
কবিতা অভ্যন্তরীণ সময়ের ভাষা।
ঘড়ির সময় আর হৃদয়ের সময় কখনও এক নয়।
পাঁচ মিনিট অপেক্ষা কখনও পাঁচ বছরের সমান দীর্ঘ হতে পারে।
আবার চল্লিশ বছরের স্মৃতি এক মুহূর্তে ফিরে আসে।
এই সময়কে ইতিহাস মাপে না।
কবিতা মাপে।
রোমিলা থাপার কেন আজ আরও গুরুত্বপূর্ণ?
আজ পৃথিবী তথ্যে ভরে গেছে।
কিন্তু জ্ঞান কমে গেছে।
আমাদের কাছে ডেটা আছে।
কিন্তু প্রজ্ঞা নেই।
আমাদের কাছে খবর আছে।
কিন্তু উপলব্ধি নেই।
আমরা সব জানি।
কিন্তু খুব কম বুঝি।
রোমিলা থাপারের জীবন যেন এই কথাটিই মনে করিয়ে দেয়—
জ্ঞান যদি মানুষকে আরও মানবিক না করে, তবে সেই জ্ঞান কেবল ক্ষমতার অলংকার।
কবিতা হলো বিনয়ের শিল্প
একজন ইতিহাসবিদ প্রমাণ খোঁজেন।
একজন বিজ্ঞানী সূত্র খোঁজেন।
একজন দার্শনিক যুক্তি খোঁজেন।
কিন্তু একজন কবি প্রশ্নকে বাঁচিয়ে রাখেন।
রাইনার মারিয়া রিলকে লিখেছিলেন—
"Live the questions now."
প্রশ্নের সঙ্গে বেঁচে থাকো।
রোমিলা থাপারের কবিতাও সেই প্রশ্নের জীবন।
ইতিহাস রাষ্ট্রের হতে পারে, কবিতা মানুষের
রাষ্ট্র তার নিজের ইতিহাস লিখতে পারে।
পাঠ্যবই বদলাতে পারে।
মূর্তি ভাঙতে পারে।
রাস্তার নাম বদলাতে পারে।
কিন্তু একজন মানুষের শোক বদলাতে পারে না।
একজন মায়ের অপেক্ষা বদলাতে পারে না।
একটি প্রেমের স্মৃতি মুছে দিতে পারে না।
সেখানেই কবিতা রাষ্ট্রের চেয়েও শক্তিশালী।
কারণ রাষ্ট্র ক্ষমতার ওপর দাঁড়ায়।
কবিতা স্মৃতির ওপর দাঁড়ায়।
ইতিহাসের শেষ শব্দ নেই
রোমিলা থাপারের জীবন আমাদের শেখায়, একজন প্রকৃত ইতিহাসবিদ কখনও শেষ কথা বলেন না।
তিনি নতুন প্রশ্ন তোলেন।
নতুন দলিল খোঁজেন।
নতুন ব্যাখ্যা দেন।
একজন কবিও তাই করেন।
দুজনেই অসম্পূর্ণতাকে গ্রহণ করেন।
দুজনেই জানেন—
মানুষকে কখনও সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা করা যায় না।
শেষ কথা: মানুষ হওয়ার দীর্ঘ সাধনা
সম্ভবত আশি বছরের বেশি সময় ইতিহাস নিয়ে কাটানোর পর রোমিলা থাপার বুঝেছেন—সবচেয়ে বড় ইতিহাস সাম্রাজ্যের নয়, মানুষের।
রাজা মরে যায়।
সাম্রাজ্য ভেঙে যায়।
সভ্যতা বিলুপ্ত হয়।
গ্রন্থাগার পুড়ে যায়।
কিন্তু একজন মানুষ অন্য একজন মানুষের হাত ধরে যে সান্ত্বনা দেয়, সেটিই মানবসভ্যতার দীর্ঘতম ইতিহাস।
কবিতা সেই ইতিহাসের ভাষা।
ইতিহাস আমাদের বলে আমরা কোথা থেকে এসেছি।
দর্শন জিজ্ঞাসা করে আমরা কে।
কবিতা ফিসফিস করে বলে—"তুমি শুধু বেঁচে থাকো। কারণ পৃথিবী শেষ পর্যন্ত জয়ীদের জন্য নয়; যারা অনুভব করতে পারে, তাদের জন্য।"
এই কারণেই রোমিলা থাপারের Just Being কেবল একটি কাব্যগ্রন্থ নয়; এটি এক ইতিহাসবিদের নীরব আত্মস্বীকারোক্তি। বহু দশক ধরে সভ্যতার উত্থান-পতনের ইতিহাস লিখে তিনি যেন শেষ পর্যন্ত আবিষ্কার করেছেন—মানুষকে বোঝার শেষ ভাষা ইতিহাস নয়, দর্শনও নয়; শেষ ভাষাটি কবিতা। কারণ তথ্য আমাদের বুদ্ধিকে সমৃদ্ধ করে, কিন্তু কবিতা আমাদের অস্তিত্বকে। আর অস্তিত্বের এই গভীর উপলব্ধিই হয়তো মানবসভ্যতার সবচেয়ে প্রাচীন এবং সবচেয়ে ভবিষ্যতম ইতিহাস।
Comments
Post a Comment