অসুখী ঋণের বোঝা
ভাস্কর সিনহা
মাঝরাতে শংকরের ঘুম ভাঙল তিনটে টোকার শব্দে। ঠক। ঠক। ঠক।
শব্দটা দরজায় নয়—মনে হলো, খাটের নিচ থেকে আসছে। সে উঠে বসতেই টিনের চালের ওপর দিয়ে বাতাস বয়ে গেল। অথচ জানালার পাশে ঝোলানো মিতুর স্কুলের ফিতা একটুও নড়ল না। ঘর অন্ধকার। কেবল ভাঙা জানালা দিয়ে পাশের ওষুধের দোকানের নীল আলো এসে মিতার মুখে পড়েছে। মুখটা এমন ফ্যাকাশে দেখাচ্ছিল, যেন বহুদিনের মৃত কেউ ঘুমিয়ে আছে।
শংকর আস্তে ডাকল, “মিতা?”
মিতা চোখ না খুলেই বলল, “আজও এসেছে?”
শংকরের বুকের ভেতরটা জমে গেল, “কে?”
“যে রোজ তিনবার টোকা দেয়।”
এবার খাটের নিচ থেকে কাগজ ঘষার মতো শব্দ হলো। কেউ যেন পাতার পর পাতা উল্টাচ্ছে। শংকর নিচু হয়ে তাকাতে পারল না। তার কারণ ছিল।
খাটের নিচে সে গত সাত রাত ধরে একটি খাতা দেখতে পাচ্ছিল—কালো মলাট, লাল সুতোয় বাঁধা। অথচ দিনের আলোয় খুঁজলে সেখানে ধুলো, একটি ভাঙা পুতুল আর পুরোনো জুতোর বাক্স ছাড়া কিছুই পাওয়া যেত না।
খাতাটি প্রথম দেখা দিয়েছিল যেদিন পাওনাদার স্বপন এসে বলেছিল, “মাসের মধ্যে পাঁচ হাজার না দিলে অটোটা তুলে নিয়ে যাব।”
শংকর অটো চালায়। তার নিজের অটো নয়; দৈনিক ভাড়া দিয়ে চালাতে হয়। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ঘুরেও হাতে থাকে সামান্য কিছু টাকা। তবু সে মেয়েকে ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে ভর্তি করেছিল। মিতু পড়াশোনায় ভালো। মেয়েটি একদিন ডাক্তার হবে—এই বিশ্বাসটুকুই শংকরের জীবনের শেষ সঞ্চয়। সেই সঞ্চয় রক্ষা করতে গিয়ে সে ধার নিয়েছিল।
প্রথমে দু-হাজার। তারপর পাঁচ। তারপর চিকিৎসার জন্য আরও এক হাজার।
এরপর সে হিসাব রাখা ছেড়ে দিয়েছিল। কিন্তু কেউ একজন হিসাব রাখছিল। খুব নিখুঁতভাবে।
সেই প্রথম রাতে শংকর সাহস করে খাতাটি খুলেছিল। প্রথম পাতায় লেখা, শংকর দাসের দেনা।
নিচে একে একে নাম:
জগন্নাথের মাসি — ২,০০০
স্বপন — ৫,০০০
ওষুধের দোকান — ৮৭০
স্কুলের বকেয়া — ৩,২০০
বাড়িভাড়া — ৪,৫০০
সব মিলিয়ে এমন একটি অঙ্ক, যা দেখলে তার মাসিক আয়ের চেয়েও বড় মনে হয়; যেন সংখ্যাগুলো টাকা নয়, একেকটি অন্ধ গর্ত। পাতার একেবারে নিচে লাল কালিতে লেখা ছিল, “মানুষ টাকা শোধ করতে না পারলে অন্য কিছু দিয়ে শোধ করে।”
শংকর ভেবেছিল, স্বপনের কুৎসিত রসিকতা। কিন্তু পরদিন স্বপনকে জিজ্ঞেস করলে সে বলেছিল, “কী খাতা? মাথা খারাপ নাকি?”
এরপর থেকে খাতাটি কেবল রাতে আসত। আর প্রতিরাতে তিনবার টোকা পড়ত। ঠক। ঠক। ঠক।
সকালে উঠে শংকর দেখত, তালিকায় একটি নতুন লাইন যোগ হয়েছে।
প্রথম দিন। ঘুম: তিন ঘণ্টা কর্তন।
সেদিন থেকে সত্যি সে তিন ঘণ্টার বেশি ঘুমোতে পারেনি।
দ্বিতীয় দিন। শরীরের শক্তি: আংশিক আদায়।
পরদিন অটো চালাতে গিয়ে তার ডান কাঁধ অবশ হয়ে যায়।
তৃতীয় দিন। স্ত্রীর বিশ্বাস: বন্ধক।
সেই রাতেই মিতা তাকে বলেছিল, “তোমার জন্যই আমাদের এই দশা।”
শংকর জানত, কথাটা রাগের। তবু মনে হয়েছিল, বাক্যটি মিতার মুখ দিয়ে অন্য কেউ বলিয়েছে।
আজ ছিল অষ্টম রাত। খাটের নিচে আবার পাতার শব্দ।
মিতা চোখ বন্ধ রেখেই বলল, “খুলে দেখো।”
“তুমি জানো ওখানে কী আছে?”
“জানি।”
“কী করে?”
মিতা এবার চোখ খুলল। নীল আলোয় তার চোখের মণি প্রায় কালো।
“গতকাল খাতাটা আমার নাম ধরে ডেকেছে।”
শংকর আর বসে থাকতে পারল না। খাট থেকে নেমে কাঁপা হাতে নিচে তাকাল। খাতাটি রয়েছে।
কালো মলাটের ওপর জলবিন্দুর মতো কিছু চকচক করছে। হাত বাড়াতেই বুঝল, জল নয়—ঘন, আঠালো, কালচে রক্ত।
সে খাতা খুলল।
আজকের নতুন হিসাব। মিতুর ভবিষ্যৎ: জামানত হিসেবে গৃহীত।
শংকরের মুখ থেকে শব্দ বেরোল না।
পরের লাইনে লেখা, পরিশোধের শেষ তারিখ: আগামী অমাবস্যা।
অমাবস্যা আগামীকাল।
পরদিন শংকর অটো নিয়ে বেরোল, কিন্তু যাত্রী তুলল না। এক পাওনাদার থেকে অন্য পাওনাদারের কাছে ঘুরল। কারও দরজায় হাত জোড় করল, কারও পায়ে পড়ল, কারও কাছে আরও ধার চাইল—পুরোনো ধার শোধ করার জন্য।
সবাই একইভাবে তাকাল। কেউ বিরক্ত হয়ে, কেউ করুণা করে, কেউ দরজা বন্ধ করে। শেষে সে গেল স্বপনের কাছে।
স্বপন চায়ের দোকানে বসে ছিল। শংকর বলল, “অটোটা নিয়ে নাও। পাঁচ হাজার কেটে রেখো।”
স্বপন বিস্মিত হয়ে বলল, “তাহলে খাবি কী?”
“অটো থাকলে কী হবে, যদি মেয়ে না থাকে?”
“মেয়ের কী হয়েছে?”
শংকর সব বলল। কালো খাতা, লাল লেখা, অমাবস্যা।
স্বপন অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর হেসে উঠল, “তুই পাগল হয়ে গেছিস।”
হাসতে হাসতেই সে থেমে গেল। তার চোখ পড়েছে শংকরের পেছনে, “ঐ বুড়োটা কে?”
শংকর ঘুরে দেখল। রাস্তার ওপারে এক বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে। নোংরা ধুতি, কাঁধে কাপড়ের ঝোলা, চোখ দুটো কোটরের ভেতর ঢুকে গেছে। বৃদ্ধটি শংকরকে আঙুল তুলে ডাকল।
শংকর তার কাছে যেতেই বৃদ্ধ বলল, “ঋণ শোধ করতে চাইছ?”
“চাই।”
“সব?”
“সব।”
“টাকার ঋণ, না জীবনের?”
শংকর উত্তর দিতে পারল না।
বৃদ্ধ ঝোলা থেকে একটি পিতলের মুদ্রা বের করল। মুদ্রার এক পাশে খোদাই করা একটি চোখ, অন্য পাশে খোলা মুখ।
“আজ রাত বারোটায় নদীর সেতুর নিচে এসো। খাতাটাও আনবে।”
“আপনি কে?”
বৃদ্ধ বলল, “আমি আদায় করি না। আমি হিসাব মেলাই।”
অমাবস্যার রাতে মিতা শংকরকে যেতে দিতে চাইল না, “ওসব পাগলামি করো না।”
“মিতুর নাম খাতায় উঠেছে।”
“খাতা পুড়িয়ে দাও।”
“কাল রাতে চুলায় দিয়েছিলাম। মনে নেই?”
মিতার মুখ শুকিয়ে গেল। মনে ছিল। খাতাটি আগুনে পুড়েছিল। কিন্তু ভোরে অক্ষত অবস্থায় মিতুর বালিশের নিচে পাওয়া গিয়েছিল। শুধু মলাটে নতুন একটি শব্দ যোগ হয়েছিল, “সুদ।”
শংকর বেরিয়ে গেল। রাস্তা জনশূন্য। শহরের আলো দূরে পড়েছে, কিন্তু সেতুর নিচে অন্ধকারটা যেন আলাদা—ঘন, তৈলাক্ত, নিশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। নদীতে জল নেই বললেই চলে, তবু নিচ থেকে কলকল শব্দ উঠছে।
বৃদ্ধ অপেক্ষা করছিল। তার সামনে মাটিতে একটি দাঁড়িপাল্লা। এক পাল্লায় কালো খাতা। অন্য পাল্লা ফাঁকা।
বৃদ্ধ বলল, “মানুষ ভাবে ঋণ কেবল টাকায় হয়। ভুল। তুমি মেয়ের কাছে স্বপ্ন ধার করেছ, স্ত্রীর কাছে ধৈর্য, শরীরের কাছে শ্রম, ভবিষ্যতের কাছে সময়। এখন সবাই পাওনা চাইছে।”
শংকর কাঁপা গলায় বলল, “আমি কী দেব?”
“যা সবচেয়ে দামী।”
“আমার জীবন?”
বৃদ্ধ মাথা নাড়ল, “জীবন সব সময় সবচেয়ে দামী নয়। অনেকের জীবন খুব সস্তা।”
“তাহলে?”
বৃদ্ধ দাঁড়িপাল্লার ফাঁকা পাল্লায় হাত রাখল, “তোমার সবচেয়ে সুখের স্মৃতি।”
শংকর স্তব্ধ।
বৃদ্ধ বলল, “তোমার বিয়ের দিন। মিতার লাল শাড়ি। মিতুর জন্মের প্রথম কান্না। মেয়ের প্রথম ‘বাবা‘ ডাক। যে স্মৃতি তোমাকে এখনও বাঁচিয়ে রেখেছে—সব দিতে হবে।”
“দিলে কী হবে?”
“ঋণ শোধ হবে।”
“মিতুর?”
“তার ভবিষ্যৎ ফিরবে।”
শংকর চোখ বন্ধ করল। তার সামনে ভেসে উঠল আট বছর আগের বিকেল। লাল শাড়িতে মিতা। ছোট্ট ভাড়া ঘরে ফুলের গন্ধ। তারপর হাসপাতালের সাদা বিছানায় সদ্যোজাত মিতু; আঙুলগুলো কচি, চোখ বন্ধ। প্রথম স্কুলের দিন মিতুর হাত ধরে রাস্তা পার হওয়া। বৃষ্টির রাতে তিনজনে এক থালায় খিচুড়ি খাওয়া।
এগুলো হারালে সে আর কী নিয়ে বাঁচবে?
নদীর অন্ধকার থেকে তখন একটি শিশুকণ্ঠ ভেসে এল, “বাবা!”
শংকর চোখ খুলল। নদীর শুকনো বুকে মিতু দাঁড়িয়ে। স্কুলের পোশাক পরা। কিন্তু তার পা দুটো কাদার নিচে ডুবে যাচ্ছে।
“বাবা, আমাকে নিয়ে যাও।”
শংকর পাল্লায় হাত রাখল, “নিন।”
বৃদ্ধ তার কপালে আঙুল ছোঁয়াল। প্রথমে ঠান্ডা লাগল। তারপর অসহ্য যন্ত্রণা। মনে হলো, মাথার ভেতর থেকে কেউ একে একে আলো খুলে নিচ্ছে। মিতার মুখ ঝাপসা হয়ে গেল। মিতুর হাসি মুছে গেল। বিয়ের দিন, জন্মদিন, স্কুল—সব সাদা হয়ে গেল। দাঁড়িপাল্লা সমান হলো।
কালো খাতাটি নিজে থেকেই খুলে গেল। প্রতিটি হিসাবের ওপর লাল দাগ পড়ল। পরিশোধিত।
বৃদ্ধ খাতাটি বন্ধ করে বলল, “যাও।”
শংকর জিজ্ঞেস করল, “আমার মেয়েকে বাঁচালেন তো?”
বৃদ্ধ মৃদু হাসল, “তোমার মেয়ে?”
শংকর হঠাৎ থমকে গেল। মেয়ে? তার কি কোনো মেয়ে ছিল?
ভোরে পুলিশ শংকরকে সেতুর ধারে অচেতন অবস্থায় পায়। সে বাড়ির ঠিকানা বলতে পারেনি। নিজের নামও অনেকক্ষণ মনে পড়েনি। পকেটে ছিল একটি স্কুলের ছবি—একটি ছোট মেয়ে, মাঝখানে সিঁথি করা চুল, পাশে লেখা: “বাবার জন্য, মিতু।”
ছবিটি দেখে শংকর শুধু বলেছিল, “মেয়েটি কে?”
মিতা হাসপাতালে এসে তাকে জড়িয়ে ধরেছিল। শংকর ভদ্রভাবে সরে গিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, “আপনি?”
ডাক্তার বললেন, গভীর মানসিক আঘাতে স্মৃতিভ্রংশ হয়েছে। পরিচিত পরিবেশে রাখলে হয়তো ধীরে ধীরে সব মনে পড়বে। কিন্তু কিছুই মনে পড়ল না। ঋণের কথা নয়। বিয়ের কথা নয়। মিতুর জন্ম নয়। এমনকি মিতুর মুখও নয়। তবু আশ্চর্য, পাওনাদারেরা আর এল না।
স্বপন বলল, সে কোনোদিন শংকরকে পাঁচ হাজার টাকা ধারই দেয়নি। বাড়িওয়ালা জানাল, সব ভাড়া নাকি আগেই মিটে গেছে। ওষুধের দোকানের খাতায় কোনো বকেয়া নেই। স্কুল থেকে চিঠি এল—এক অজ্ঞাত দাতা মিতুর উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত সমস্ত খরচ দিয়ে গেছেন।
মিতা বুঝতে পারল না, এটি আশীর্বাদ, না শাস্তি।
শংকর আবার অটো চালাতে শুরু করল। প্রতিদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে সে মিতুকে দেখে হাসে, যেন প্রতিবেশীর কোনো ভদ্র মেয়েকে দেখছে।
মিতু পড়ার টেবিলে বসে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখে। মাঝে মাঝে বাবার কাছে এসে বলে, “আমাকে একটু অঙ্ক বুঝিয়ে দেবে?”
শংকর লজ্জিতভাবে বলে, “আমি তো বেশি পড়িনি, মা।”
‘মা‘ শব্দটি সে সকল ছোট মেয়েকেই বলে।
এক রাতে মিতা ঘুম ভেঙে দেখল, শংকর খাটে নেই। সে মেঝেতে বসে একটি কালো খাতা খুলে রেখেছে।
মিতা আতঙ্কে বলল, “ওটা আবার কোথা থেকে এলো?”
শংকর মাথা তুলে হাসল, “এটা আমার নয়।”
খাতার প্রথম পাতায় এবার লেখা, মিতু দাসের দেনা।
নিচে একটিমাত্র হিসাব: পিতার সমস্ত সুখস্মৃতি, ধার হিসেবে গৃহীত।
পরিশোধের স্থানে লেখা: “সন্তান প্রতিষ্ঠিত হলে সুদসহ ফেরতযোগ্য।”
মিতা কাঁপতে কাঁপতে শেষ পাতা উল্টাল।
সেখানে নতুন লাল অক্ষর ফুটে উঠছে, পরবর্তী অমাবস্যায় প্রথম কিস্তি আদায় করা হবে।
ঠিক তখন খাটের নিচ থেকে তিনবার টোকা পড়ল। ঠক। ঠক। ঠক।
মিতু পাশের ঘর থেকে ঘুমজড়ানো গলায় ডাকল, “মা, বাবা কি আমাকে ডাকছে?”
মিতা উত্তর দিল না। কারণ তার পাশে বসে থাকা শংকর তখনও হাসছিল।
আর খাটের নিচ থেকে শোনা যাচ্ছিল শংকরেরই গলা, “মিতু… একবার নিচে তাকাও।”
.......................................
ভাস্কর সিনহা
বিশ্ব ভারতী এবং আই আই টি দিল্লীর প্রাক্তনী।
জেলা পশ্চিম বর্ধমান। কর্মসূত্রে দুবাই নিবাসী।
মেল আইডি: b_sinha_iitd@yahoo.com
Comments
Post a Comment