কবিতাগুচ্ছ ।। মেশকাতুন নাহার
অঙ্কুরের অদম্যতা
কিছু ছায়া বৃক্ষের পাশে জন্মে, অথচ বৃক্ষের উচ্চতাই তাদের অসহ্য—
তাই তারা শিকড়ে নয়, ডালে ডালে নীরব অবরোধের ভাষা লেখে।
কিছু কুয়াশা সূর্যকে নিভাতে চায় না, শুধু দিগন্তের দৃশ্য আড়াল করে—
অথচ প্রভাত তার নিজস্ব মহিমায় কুয়াশার সমস্ত অস্তিত্ব অতিক্রম করে।
কোনো কোনো নদীকে পথ দেওয়ার বদলে পাথর সাজানো হয় তীরে,
কোনো কোনো পালকে বাতাসের বদলে অদৃশ্য ভার চাপানো হয় ধীরে ধীরে;
তবু স্রোতের নিয়তি সাগর, আর পাখির নিয়তি নীলিমা—
বাঁধের প্রজ্ঞা যতই কূটিল হোক, প্রকৃতির বিধান তার চেয়েও প্রাচীন।
যে কুঁড়ির অন্তর্গত বসন্তকে দূর থেকে বোঝা যায় না,
তার সুবাসকে বন্দী করতে কোনো প্রাচীরই যথেষ্ট নয়।
কারও অঙ্কুরোদ্গমে নীরব অস্বস্তি জন্ম নিলে জন্মাক—
বীজ তো কারও অনুমতির অপেক্ষায় মহীরুহ হয়ে ওঠে না।
জগতের কিছু দরজা বন্ধ হয়, কিছু পথ ইচ্ছাকৃতভাবে দুর্গম করা হয়,
কিন্তু নিয়তির অলিন্দে যে প্রদীপ জ্বলে, তার শিখা অন্যের হাতে নেভে না।
কারণ উচ্চতা কখনো কেবল সিঁড়ির দান নয়—
কখনো তা অন্তর্লীন নিয়তির এমন এক আহ্বান,
যার সামনে ক্ষুদ্রতার সমস্ত কৌশল অবশেষে নিজেকেই পরাজিত করে।।
নৈঃশব্দ্যের ঋণপত্র
যদি কোনো অনিবার্য প্রলয়ের ন্যায়
হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে যায়
আমার অন্তঃস্থলে প্রজ্বলিত শেষ দীপশিখাটি,
তবে অনুশোচনার কুয়াশাচ্ছন্ন প্রান্তরে
আমার নামের কোনো প্রতিধ্বনি খুঁজো না।
ভাবনার অস্থির প্রহরে নিজেকে বলো না—
“আরও কিছু সাধ্য ছিল,
আরও একটুখানি নিকটে এসে
স্পর্শের সেতু রচনা করা যেত।”
সম্ভবত কোনো নিঃসঙ্গ রজনীতে
তোমার স্মৃতির দ্বারে আঘাত হানবে এক অনুচ্চারিত প্রশ্ন—
আমার অশ্রুর নোনা স্রোতে
তোমার অন্তরের কোনো শিলাস্তর কি কখনো দ্রবীভূত হয়েছিল?
হয়তো অনুভব হবে,
তোমার একটিমাত্র কঠোর উচ্চারণ
আমার আকাশে নামিয়ে এনেছিল ঘন অন্ধকারের মেঘমালা;
তোমার অবহেলার শীতল ছায়ায়
একটি অঙ্কুরিত স্বপ্ন
অকালেই হারিয়েছিল তার সূর্যালোকের অধিকার।
তখন নিজেকে অপরাধের ভারে নত কোরো না
মানুষের চেতনা তো কখনোই পূর্বাহ্নে জানে না
কোন শব্দটি কার অন্তর্জগতে
চূড়ান্ত শলাকার ন্যায় বিদ্ধ হয়ে থাকবে।
তবু যদি বিবেকের নির্জন দর্পণে
আমার অবয়ব কোনোদিন প্রতিফলিত হয়,
নিজেকে কেবল একবার জিজ্ঞাসা কোরো—
“আমি কি তার পথের অনিবার্য কণ্টক ছিলাম,
যখন সে প্রস্ফুটিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষায়
ফুল হয়ে উঠতে চেয়েছিল?”
কারণ মৃত্যু সর্বদা
শুধু শ্বাসের চূড়ান্ত নির্বাপণ নয়;
তার অন্তরালে রয়ে যায়
অসংখ্য অনুচ্চারিত দীর্ঘনিঃশ্বাস,
অসমাপ্ত ক্ষমার ভার,
এবং কারও হৃদয়ের অদৃশ্য দায়ভার।
অতএব আমি না থাকলে
শোকের প্রদীপ দীর্ঘকাল প্রজ্বলিত রেখো না;
বরং জীবিত অবস্থাতেই
মানবহৃদয়ের কঠিন প্রান্তগুলোকে কোমল করো
কারণ চূড়ান্ত বিদায়ের পর
অনুতাপ উচ্চারণ করলেও
কিছু কিছু দ্বার আর কখনো উন্মুক্ত হয় না।
মধুপ্রচ্ছদ
মুখে যেন বসন্তের রোদ
কথায় শিশিরধারা,
হাসির ভাঁজে গোপন থাকে
চাতুর্যের ইশারা।
কথার বনে পুষ্প ফোটায়
সুবাস বড়োই মিঠে,
নিজের নৌকা পার হলেই
বৈঠা ভাঙে পিঠে!
যেন রে ভাই খেজুর-গুড়ে
দুধে ভেজা পায়েস,
মুখে জোগায় সুধার প্রলেপ
আহা! কী যে আয়েস।
“আপনিই তো জ্ঞানসমুদ্র
আপনিই মহাজন”—
শুনতে শুনতে ক্লান্ত স্রোতার
মুছে মানবিক মন।
চাটুকথার রঙিন পাখি
ডাকে মধুর সুরে,
ঋতু শেষে ডানা মেলে,
উড়ে যায় যে দূরে।
অফিস-ঘরে মধুর বন্যা,
হাসি ঝরে মুখে,
প্রয়োজনের প্রদীপ নিভলে
চেনা যায় রে দুখে!
ঘরের ভেতর একই খেলা,
সম্পর্কে তাঁর ছায়া,
ফায়দা ফুরালে মুছে যায়
সোহাগ-মাখা মায়া।
নিত্য নতুন এমন দৃশ্য
রঙের উৎসব যে বেশ,
ভালোবাসার বাক্স খুলে
বেরোয় হিসেবের রেশ।
তবে সে তো আপন নয় গো
বাজারদরের আবেগ,
লাভই সেখানে রাজ্যের রাজা
জন্মায় শুধু উদ্বেগ।
তাই কথার ফুলে মজো না,
দেখো শেকড়খানি—
ফুল ঝরিলে বৃক্ষের রূপে
চেনা যায় তার বাণী।
মুখোশ যত রঙিন হোক না,
সময় খুলবেই জাল,
সত্য তখন আয়না হয়ে
দেখিয়ে দেবে কাল।
অভিযোগহীন ঠিকানা
বয়স যত বাড়ে ধীরে, ততই খোলে মন,
চাওয়া যত কমে আসে, ততই জাগে ধন।
সবই পেলে সুখের নদী ভরবে—ভেবো না,
পূর্ণ চাঁদেও অন্ধকারের দাগ যে মুছে না।
অঢেল সুখের প্রাসাদ গড়ে শান্তি মেলে কই?
একফোঁটা প্রেম হৃদয় ছুঁলে স্বর্গ নেমে রয়।
ভোরের শিশির, মায়ের হাসি, সন্তানেরই মুখ,
এই তো শুধু জীবনজুড়ে অমলিন সব সুখ।
কিছু মানুষ হারিয়ে যাবে সময়েরই স্রোতে,
কিছু স্বপ্ন ঝরে পড়বে নীরব ব্যথার নোটে।
যা নেই তারই হিসেব কষে কাটিও না ক্ষণ,
যা আছে তাই আগলে রাখো—সেটাই অর্জন।
কৃতজ্ঞতার দীপ জ্বালাও অন্তরেরই দ্বারে,
শান্ত হৃদয় স্বর্গ গড়ে আপন আলোকধারে।
সম্পদ মানে স্বর্গ নয়, নয় গর্বের ভার,
বিশ্বস্ত কিছু ভালোবাসা অমূল্য উপহার।
.......................................
মেশকাতুন নাহার
প্রভাষক সমাজকর্ম
কচুয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজ,
চাঁদপুর।।
Comments
Post a Comment