মাস্টারমশাই
অঞ্জনা গোড়িয়া সাউ
শবদেহ শোওয়ানো আছে বাড়ির উঠানে।
এই তো সেদিন পথে দেখলাম। সবাই ভীড় করে দাঁড়িয়ে আছে। দূর দূর থেকে গ্রামবাসীরা ছুটে আসছে একবার দেখার জন্য।
এই তো সেদিন, একব্যাগ বিস্কুট, লজেন্স কিনে ছোটোদের হাতে বিলি করতে করতে বাড়ি ফিরছেন।
তারই মাঝে কী এমন হলো, মাস্টারমশাই চলে গেলেন।
বড্ড প্রিয় মানুষ ছিলেন সবার ।
এই গ্রামেরই প্রাথমিক স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক। তিনছেলে মেয়ে সবাই প্রতিষ্ঠিত। সবাই থাকে বিদেশে।প্রচন্ড ব্যস্ত। কেউ একটি বারো দেখতে আসার সময় পায় না।
কথা বলার জন্য একটা যন্ত্র তো আছে। যেটুকু কথা মাঝেমধ্যে, কানে কানে এপার থেকে ওপারে।
তাতে অবশ্য মাস্টার মশাইয়ের কোনো দু:খ ছিল না। এই গ্রামের সবাই আগলে রেখেছিল।গ্রামের প্রতিটি মানুষ মাস্টারমশাইকে আপন করে নিয়েছিল।
কেনই বা নেবে না? যখন যে যা চেয়েছে, দুহাত ভরে বিলিয়ে দিয়েছে।
জীবনের শেষে প্রফিডেন্ট ফান্ডের টাকা দিয়ে একটা বৃদ্ধাশ্রম করেছেন। অসহায় মেয়েদের জন্য একটা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র তৈরী করেছেন। যেখানে সেলাই,কম্পিউটার আরও কত কি শেখানো হয়।
এমনকি নিজের বাড়িটা পর্যন্ত দান করে দেন ছোট্ট স্কুলটাকে।
পেনশনের টাকায় দিন চলে যেত।
আর তিনি বলতেন,আমার ছেলেমেয়েরা সবাই প্রতিষ্ঠিত। কারোর কোনো অভাব নেই। আমার এই কাজে ওরা খুশিই হবে।
কিন্তু তিনি জানতেন না, কেউ মানতে পারে নি বাবার স্বর্বস্ব দান করা। রাগে ক্ষোভে তারা বাবার সাথে কথা বলাও বন্ধ করে দিয়ে ছিল।
বাবার মৃত্যু সংবাদ পেয়েও শেষ সময়ে কেউ এল না। ফোন করে জানিয়ে দিল গ্রামবাসীকে,বাবার মুখাগ্নি করতে আসতে পারবে না। যাদের জন্য বাবা,সব কিছু বিলিয়ে দিয়েছে, তারাই সমস্ত ব্যবস্থা করুক।
তাই এখনো বাড়ির উঠানে শোওয়ানো আছে মাস্টারমশাইকে।
বেলা গড়িয়ে বিকেল হল।
সবাই কী করবে কিছুই বুঝতে পারছে না। ঠিক সেই সময় দূর থেকে পটলা আর তার দলবল ছুটে এল। স্কুলের সেই বোকাটে ছেলের দল। প্রতিদিন যারা নিত্যনতুন দুষ্টুমি করে স্যারকে নাজেহাল করে দিত।তারা এসেছে স্যারের কাছে ক্ষমা চাইতে।
নতজানু হয়ে তারা প্রণাম করল। চোখভর্তি জলে স্যারের পা ধুইয়ে দিল।
চিৎকার করে বলল, স্যারের মুখাগ্নি আমরা করব। স্যারের এত ছেলে থাকতে,কীসের চিন্তা?
সাজানো ফুলের খাটে স্যারকে মাথায় করে নিয়ে চলল শ্বসানের পথে।
মাস্টার মশাইয়ের চোখ দুটো তৃপ্তির হাসিতে জ্বলে উঠলো। মুখে মৃদু হাসি। শান্তিতে চলছে স্বর্গের পথে।
Comments
Post a Comment